ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৮

আজকের পত্রিকা

ডাকাতের চর এখন স্বর্ণদ্বীপ
সেনা প্রশিক্ষণ, দুর্গম জনপদে গড়ে উঠছে অবকাঠামো চলছে কৃষিকাজ
জুলকার নাইন

নাম ছিল জাহাজ্জ্যার চর। অনেকে বলতেন, ডাকাতের চর। এখন নতুন নাম স্বর্ণদ্বীপ। চরের ৭২ হাজার একর জায়গাজুড়ে ছিল আড়াই হাজার জলদস্যুর নিরাপদ আস্তানা। এখন গড়ে উঠছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। চরটি ছিল দুর্গম ও ভয়ের জনপদ। এখন গড়ে তোলা হচ্ছে বনায়ন আর অবকাঠামো। প্রস্তুত হচ্ছে কৃষিকাজের ক্ষেত্র। প্রত্যাশার আলোয় কেটে যাচ্ছে ভয়ের অন্ধকার। নোয়াখালীর প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই চরে কোনো এককালে জাহাজ ডুবে যাওয়ায়

স্থানীয়রা দ্বীপটির নাম দিয়েছিল জাহাজ্জ্যার চর। আজ থেকে মাত্র পাঁচ বছর আগেও চরটি ছিল মানুষের কাছে ভয়াবহ। নৌযান আর আশপাশে বিচ্ছিন্নভাবে বাস করা মানুষের ওপর হামলা-লুটপাট ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। তবে এসব এখন অতীত।

২০১৩ সালে সরকার চরটিকে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার পর পাল্টে যেতে থাকে দৃশ্যপট। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে স্বর্ণদীপকে নতুনভাবে গড়ে তুলছে সেনাবাহিনী।  সেখানে তৈরি করা হচ্ছে ২০টি ডেইরি ফার্ম। প্রস্তুতি চলছে ধান চাষের। সবকিছুতে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে স্থানীয়দের। যেন এক নতুন ভূখণ্ডে নিজের বিস্তার ঘটাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

নোয়াখালীর সুবর্ণচরের জহিরঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় স্বর্ণদ্বীপে যেতে লাগে এক ঘণ্টার মতো। নদীপথ ছাড়া চরে যাতায়াতের বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই। যোগাযোগ ব্যবস্থার এ চ্যালেঞ্জ থাকার পরও দুর্বার গতিতে স্বর্ণদ্বীপকে গড়ে তোলার কাজ করে যাচ্ছে সেনাবাহিনী। ফলে সেখানে প্রথমেই অবসান ঘটে জলদস্যু রাজত্বের। নোয়াখালীর সুবর্ণচর, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপসহ আশপাশের এলাকা হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ নিরাপদ। দীর্ঘদিনের জিম্মিদশা থেকে মুক্ত হন স্থানীয়রা। স্বর্ণদ্বীপকে বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং জনসাধারণের উপযোগী হিসেবে গড়ে তুলতে বেশ কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে সেনাবাহিনীকে। সেনা প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজন অবকাঠামোগত উন্নয়ন। চর রক্ষা করতে বনায়ন ও স্থানীয় জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নও একটি কঠিন কাজ। এ ছাড়া রয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন।

স্বর্ণদ্বীপে এরই মধ্যে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন সেনাবাহিনীর ২০ হাজার সদস্য। খুব দ্রুত সেখানে জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনের জন্য বাছাই করা সেনা সদস্যদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। এত দিন বাংলাদেশে এ ধরনের প্রশিক্ষণ বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে স্বল্পপরিসরে ও স্বল্প গ্রুপে ভাগ করে দেওয়া হতো। এখন থেকে স্বর্ণদ্বীপে এ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এই প্রশিক্ষণের ফলে জাতিসংঘে শান্তি রক্ষা মিশনে থাকা বাংলাদেশি সেনা সদস্যদের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বর্ণদ্বীপের উন্নয়ন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। সেনাবাহিনীর চলাচল ও বাসস্থান (এমঅ্যান্ডকিউ) পরিদফতরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মামুন অর রশীদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের সহযোগিতায় ফোর্সেস গোল ২০৩০-এর আওতায় সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে সেনাবাহিনীতে সংযোজিত হয়েছে বিভিন্ন আধুনিক অস্ত্র ও সরঞ্জামাদি। নতুন সংযোজিত এসব আধুনিক অস্ত্র ও সরঞ্জামাদির ওপর সেনা সদস্যদের প্রশিক্ষিত করে তোলার জন্য এখন প্রয়োজন বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ। কিন্তু জনবহুল ও কৃষিনির্ভর এ দেশে পতিত ভূমির পরিমাণ অত্যন্ত অপ্রতুল। তাই দেশের অন্যান্য এলাকায় বড় সেনা দল কর্তৃক কার্যকর যৌথ প্রশিক্ষণ পরিচালনার জন্য বড় আয়তনের প্রশিক্ষণ এলাকা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল। স্বর্ণদ্বীপের বিশাল আয়তনের ভূমি রণকৌশলগত ও বহুমুখী প্রশিক্ষণ এলাকার অভাব দূর করে যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে তার পেশাগত দক্ষতা ও উৎকর্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে সক্ষম হবে।

স্বর্ণদ্বীপের টাস্কফোর্স হেডকোয়ার্টার সমন্বয়কারী কর্মকর্তা মেজর মুরশিদুল আজাদ বলেন, ৩৬০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ দ্বীপে শুধু শীতকালে আনুমানিক ৫ মাস সীমিত এলাকায় প্রশিক্ষণ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যায়। বছরের অন্যান্য সময় স্বর্ণদ্বীপের বেশির ভাগ এলাকা জোয়ারের পানিতে সাধারণত ২ থেকে ৩ ফুট পর্যন্ত নিমজ্জিত থাকে। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পদাতিক ডিভিশনগুলো থেকে নির্বাচিত প্রতিটি ব্রিগেড গ্রুপ আনুমানিক ১৫০০ থেকে ২০০০ সেনা সদস্য ট্যাংক, এপিসি, আর্টিলারি গানসহ অন্যান্য ভারী ও হালকা সরঞ্জামাদি নিয়ে এই দ্বীপে ২-৩ সপ্তাহের প্রশিক্ষণে অংশ নেয়। প্রশিক্ষণকে বাস্তবমুখী করতে এখানে ক্ষেত্রবিশেষে কিছু ভূমিরও পরিবর্তন আনা হয়েছে (ল্যান্ড স্কেপিং)। এটা খুবই ব্যতিক্রম এবং চ্যালেঞ্জিং। ভবিষ্যতে স্বর্ণদ্বীপে সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ পরিধি আরও বিস্তৃত করা হবে।

দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুর্গম এ দ্বীপে তাঁবুতে অবস্থানের মাধ্যমে সেনা সদস্যরা তাদের প্রাথমিক যাত্রা শুরু করে। পর্যায়ক্রমে সেখানে অস্থায়ী ও স্থায়ী আবাসনের কাজ শুরু হয়। সেনাবাহিনী এবং বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীন জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের যৌথ সহায়তায় এরই মধ্যে স্বর্ণদ্বীপে দুটি সাইক্লোন শেল্টার তৈরি করা হয়েছে। এসব শেল্টারে ২০ হাজার গ্যালন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং এবং গ্রিন এনার্জির উৎস্য হিসেবে সোলার বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুর্যোগের সময় প্রতিটি সাইক্লোন শেল্টারে আনুমানিক ৫০০ মানুষ আশ্রয় নিতে পারবেন। এগুলো চরে বসবাসরত ও অবস্থানরত সবাই ব্যবহার করতে পারবে। আরও তিনটি সাইক্লোন শেল্টার তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চরে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য দুটি লেক খনন করা হয়েছে। সুপেয় পানির জন্য এক হাজার মিটার গভীর সৌরবিদ্যুত্চালিত পাম্প খনন এবং বর্ষা মৌসুমে চলাচলের জন্য রাস্তা নির্মাণের কাজ চলছে। স্বর্ণদ্বীপকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নদী ভাঙনের হাত থেকে রক্ষার জন্য বড় পরিসরে বনায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এরই মধ্যে স্বর্ণদ্বীপে ছয় হাজার ঝাউগাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। হেলিকপ্টার থেকে সিড বোম্বিংয়ের মাধ্যমে দুই টন কেওড়ার বীজ ছিটানো হয়েছে। এ ছাড়া ভিয়েতনাম থেকে আনা ১৫০০ নারিকেল গাছের চারা রোপণের মাধ্যমে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কারিগরি সহায়তায় আদর্শ নারিকেল বাগান করা হয়েছে। এ বাগানের সঙ্গে মাছের খামার ও সবজি চাষ করা হচ্ছে। স্থানীয় জনসাধারণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য এরই মধ্যে স্থানীয় জনগণ ও সেনাবাহিনী ‘সম্প্রীতি’ নামে একটি সমবায় গঠন করেছে। চরের বিভিন্ন স্থানে ছড়ানো-ছিটানো মহিষ, গরু ও ভেড়ার বাথানগুলো দ্বীপের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। স্বর্ণদ্বীপে একটি ডেইরি প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। এখানে বাথানগুলোতে পালিত মহিষ ও গরুর দুধ সংগ্রহ করে দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। এসবের পাশাপাশি দ্বীপে ভেড়া ও হাঁস পালনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দ্বীপজুড়ে পরীক্ষামূলকভাবে ১৭ ধরনের ফলের গাছ লাগানো হয়েছে। ধান চাষ হচ্ছে ১০ একর জমিতে।



এই পাতার আরো খবর