ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৮

আজকের পত্রিকা

উখিয়ায় আছে বখতিয়ার
রোহিঙ্গা রাজা সাবেক জামায়াত রোকন এখন আওয়ামী লীগ নেতা, চলছে লাঠি শাসন, ৪৩ মাঝির কমিটিই সরকার
মির্জা মেহেদী তমাল, উখিয়া (কক্সবাজার) থেকে ফিরে

‘খুব হিসাব করে চলতে হয়। ভয়ঙ্কর এলাকা এটা। সন্ধ্যার পর আমি ঘর থেকে বের হই না। ঠুস করে কেউ দিলেই তো সব শেষ। দিনের বেলাতেও কাজ না থাকলে ঘরের মধ্যেই থাকি। কেউ ফোন করলেও চিন্তা ভাবনা করে ধরি। আমি কাউরে বিশ্বাস করি না। রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে এক জায়গায় ভালো বলি, অন্য জায়গায় বলি খারাপ। সব জায়গায় ম্যানেজ আর কি। আমি যখন বাজার দিয়ে হাঁটি, সব ঠাণ্ডা।

সবাই জানে-আমার দুইটা স্পেশাল লাঠি আছে।’

কথাগুলো এভাবেই বলছিলেন কক্সবাজারের সীমান্ত জনপদ উখিয়ার একটি ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার বখতিয়ার। তার পুরো নাম মৌলভী বখতিয়ার আহমেদ। ছিলেন উপজেলা জামায়াতের রোকন। এখন আওয়ামী লীগ নেতা। তাকে ‘রোহিঙ্গা রাজা’ বলেই চেনেন সবাই। সরকারের আইন কানুনের ধার ধারেন না তিনি। নিজের তৈরি আইনেই চলতে পছন্দ করেন। তার দুটি ‘স্পেশাল লাঠি’ আছে। তা দিয়েই চলে তার শাসন-শোষণ। পাহাড় গাছ ভূমি-বাদ রাখেননি। সবই যাচ্ছে তার পেটে। আরও আছে তার ‘মাঝি কমিটি’। চেনা শহরে কমিটির সদস্যরা গড়ে তুলেছেন এক ভিন্ন জগৎ। তিনি এখন রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নং ওয়ার্ডের নির্বাচিত মেম্বার। উপজেলা মত্স্যজীবী লীগের সাধারণ সম্পাদকও।

কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলায় সন্ধান পাওয়া এই রোহিঙ্গা রাজার ইশারাতে চলছে শরণার্থী শিবিরগুলো। দেশ-বিদেশের সাহায্য সহযোগিতা এলেও যেতে হয় তার হাত ধরে। পাশাপাশি জঙ্গি তৎপরতা থেকে শুরু করে সব ধরনের অপরাধও তার ইচ্ছাতেই। এলাকায় প্রচলিত আছে, বখতিয়ারের নির্দেশ ছাড়া রোহিঙ্গা শিবিরে গাছের পাতা পর্যন্ত নড়ে না। উখিয়ায় একের পর এক পাহাড় আর হাজার হাজার গাছ বিনাশ করে রোহিঙ্গাদের যেসব শিবির নির্মাণ করা হচ্ছে— তার সবই করছেন এই বখতিয়ার। ইতিমধ্যে পাহাড় গাছ কেটে কয়েক হাজার বস্তি ঘর তৈরি করা হয়েছে। শুধুই কি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির— এমন প্রশ্নেরও জবাব মিলেছে।

সরেজমিন জানা যায়, বখতিয়ারের হাত ছড়িয়ে আছে উখিয়া জুড়েই। অবৈধ অস্ত্র, ইয়াবা ব্যবসা আর মানব পাচার— সব অপরাধের শিরোমণিও তিনি। স্থানীয় এমপির ঘনিষ্ঠজন বখতিয়ার রাজনৈতিকভাবেও এখন ক্ষমতাধর। সহায় সম্পদ তার পাহাড়সম।

উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের কাছেই বখতিয়ারের বাসা। দোতলা এই আধুনিক আলিশান বাসভবনটি নতুন। নতুন বাসার পাশের টিলার ওপর তার পুরানা আরেক বিশাল বাড়ি। সেই বাড়িটি ভাড়া দিয়েছেন। তবে পুরো বাসার চারদিকেই রয়েছে রহিঙ্গাদের বস্তি ঘর।

বখতিয়ার আহমেদের সঙ্গে গত ২৬ জানুয়ারি কথা হয় তার নতুন বাসায়। তিনি বলেন, গত নির্বাচনেও বিএনপি থেকে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করতে অনুরোধ করা হয় আমাকে। কিন্তু করিনি। কারণ, আওয়ামী লীগে একটা অবস্থান তৈরি করেছি। বিএনপি থেকে নির্বাচন করলে তো আবার ঝামেলা হয়ে যাবে। পাহাড় গাছ বিনাশ করার বিষয়ে তিনি বলেন, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের এখানে আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। পাহাড় না কাটতে বলা হয়েছে। খোঁজ খবর নেওয়া হচ্ছে। আমার নাম ভাঙ্গিয়ে অনেকে অনেক কাজ করতে পারে। জানতে পারলে ব্যবস্থা নেই। এক প্রশ্নের জবাবে হাসতে হাসতে তিনি বলেন, আমার দুটি লাঠি আছে। খুবই স্পেশাল লাঠি। লাঠি দিয়ে পিটাই। যখন প্রয়োজন, তখনই পিটাই। লাগলে প্রতিদিন। একজনের পিটাইলে এক হাজার লোকে দেখে। তারাও ভালো থাকে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির জন্য রোহিঙ্গাদের দায়ী করে বলেন, পুলিশ পোস্টের জন্য থানায় জানানো হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যেই পোস্ট দিবে বলেছে পুলিশ।

সরেজমিন জানা যায়, উখিয়া বাজার ও আশপাশ এলাকায় তার অন্তত ৩০০ দোকানঘর রয়েছে। অধিকাংশই সরকারি জায়গার ওপর। পাহার কেটে ঘর তৈরি করেছেন কয়েকশ। ওই এলাকার সরকারি বেসরকারি ও এনজিওতে কর্মরত কর্মকর্তা কর্মচারীদের কাছে ভাড়া দিয়েছেন। অন্য কোনো বাসায় কেউ ভাড়া থাকতে পারবে না। এটাই বখতিয়ারের আইন। বাধ্যতামূলক তার ঘরগুলোতেই ভাড়া নিয়ে থাকতে হবে। বড় বাজারটির নিয়ন্ত্রণে তিনি নিজেই। দোকানগুলোর মালিক সব রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গা বাজারও বলা হয়ে থাকে। স্থানীয় লোকজন জানান, উখিয়ার রাজাপালং, কুতুপালং এবং আশপাশ এলাকায় রোহিঙ্গাদের এমনভাবে বসতি স্থাপন করে দিচ্ছেন তিনি, ওই এলাকাগুলো রোহিঙ্গা পল্লী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তার এলাকার আশ্রয় কেন্দ্রেই রয়েছে দু’লাখের বেশি রোহিঙ্গা। যার পুরো নিয়ন্ত্রণ করছেন বখতিয়ার।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বখতিয়ারের ছেলে হেলাল উদ্দিন ছিলেন কক্সবাজার জেলা ছাত্রশিবিরের প্রচার সম্পাদক। ছোট ছেলে ছিল বোরহান উদ্দিন কক্সবাজার কলেজ ছাত্রশিবিরের  নেতা। আওয়ামী লীগে বাবার যোগদানের পর তারা শিবিরে এখন সক্রিয় নয়।

স্থানীয়রা জানান, কুতুপালং বাজারের পানের দোকানি বখতিয়ারের কপাল খুলে যায় বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পর। রোহিঙ্গাদের নিয়ে কুতুপালং বাজার গড়ে  তোলার পর  থেকে আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। কুতুপালং বাজারে গড়ে তুলেছেন একাধিক মার্কেট, ৩০০ দোকান, বেশ কয়েকটি বড় বাড়ি। ওই থেকেই তাকে রোহিঙ্গাদের রাজা বলা হয়। তার কথা ছাড়া রোহিঙ্গা বস্তিতে প্রবেশ করা যায় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তার হাতের মুঠোয়।

রোহিঙ্গাদের জন্য বিভিন্ন সংস্থা থেকে আসা অনুদান বখতিয়ারের হাত ধরে যেতে হয়। পাহাড়ে রোহিঙ্গারা খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করলেও ভাড়া দিতে হয় বখতিয়ারকে। কোন রোহিঙ্গা অন্যত্র চলে যাবে, ব্যবস্থা নেবে বখতিয়ার। মাদক ব্যবসা, পতিতা বাণিজ্য, মানব পাচার, অস্ত্র ব্যবসা, জাল টাকা বাণিজ্য সবকিছু চলে তার ইশারায়। আর এসব করেই তিনি নামে বেনামে বিভিন্ন সম্পদ গড়ে তুলেছেন। আছে কক্সবাজার বাস টার্মিনালের পাশে বাড়িসহ ৫টি প্লট। জঙ্গি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া ও  চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তিনি গ্রেফতার হন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রোহিঙ্গা শিবিরে বখতিয়ারের রয়েছে একটি ‘মাঝি কমিটি’। ৪৩ সদস্যের এই কমিটি যেমন আশ্রয় শিবিরের সবকিছু দেখভাল করেন, তারাই উখিয়ার প্রশাসন চালান। বখতিয়ারের ঘনিষ্ঠ আবু সিদ্দিক এই কমিটির চেয়ারম্যান। এই কমিটির সঙ্গে সরকারের কোনো সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও স্থানীয়রা আর রোহিঙ্গাদের কাছে এটাই সরকার। বছরের পর বছর ধরে এই কমিটি রামরাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছে উখিয়ায়। ইয়াবা, মানব পাচার, অবৈধ অস্ত্রব্যবসা থেকে শুরু করে সব ধরনের অপরাধই করছে এই কমিটি। রোহিঙ্গাদের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে বখতিয়ারের কানেকশন রয়েছে বলে গোয়েন্দাদের কাছেও খবর রয়েছে।



এই পাতার আরো খবর