ঢাকা, সোমবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৮

আজকের পত্রিকা

সেই অস্ত্র কারখানায় অভিযান নিহত ১, আহত ১১ পুলিশ
মহেশখালীতে বিপুল অস্ত্র উদ্ধার গ্রেফতার ৩
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও কক্সবাজার প্রতিনিধি

কক্সবাজারের মহেশখালীর পাহাড়ি এলাকার গভীর অরণ্যে দস্যুদের দুটি আস্তানায় পুলিশ অভিযান চালিয়েছে। এ সময় অস্ত্রধারীদের সঙ্গে পুলিশের তুমুল বন্দুকযুদ্ধ হয়। টানা এক ঘণ্টার এ যুদ্ধে দস্যুদলের প্রধান আবদুস সাত্তার (৩৩) নিহত হয়েছেন। দস্যুদের গুলিবর্ষণে আহত হয়েছেন ১১ পুলিশ সদস্য। এদের মধ্যে তিনজন এসআই ও একজন এএসআই। বাকিরা কনস্টেবল। পুলিশ জানায়, নিহত আবদুস সাত্তার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী ও অস্ত্রধারী। আবদুস সাত্তার পাহাড়ের গহিন অরণ্যে আস্তানা গেড়ে অস্ত্র তৈরি করে বিক্রি ছাড়াও ডাকাতি করতেন। দুর্ধর্ষ এই সন্ত্রাসী বহুদিন ধরেই নিজের নামে একটি বড় বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। ঘটনার সময় বাহিনীর অন্য তিন সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের আস্তানা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১৪টি বন্দুক ও ৫৫ রাউন্ড গুলি। আরও উদ্ধার করা হয় অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম ও ধারালো অস্ত্র। গতকাল ভোরে মহেশখালীর হোয়ানক ইউনিয়নের কেরুনতলী নয়াপাড়া পাহাড় ও মাতারবাড়ী ইউনিয়নে মইন্যার ঘোনা এলাকার দুটি দস্যু আস্তানায় অভিযানের সময় এ বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে।

উল্লেখ্য, শুক্রবার বাংলাদেশ প্রতিদিনে মহেশখালীর পাহাড়ের গহিন অরণ্যে অস্ত্র কারখানা ও দস্যুদের আস্তানা নিয়ে সরেজমিন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে মহেশখালী। ১১ পাহাড়ে আছে ২২ অস্ত্র কারখানা। আরও রয়েছে দস্যু আস্তানা, অস্ত্রাগার, মাদক আর চোরাই পণ্যের গুদাম। গতকাল হোয়ানক ইউনিয়নের কেরুনতলী নয়াপাড়ায় যে অভিযান পরিচালিত হয়, পত্রিকার প্রতিবেদনেও এ এলাকার নাম উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রতিবেদন প্রকাশের চার দিনের মাথায় পুলিশ অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে এ সফল অভিযান চালাল।

কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার ড. এ কে এম ইকবাল হোসেন জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মহেশখালী থানা পুলিশ অভিযান চালালে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে নিহত সন্ত্রাসী আবদুস সাত্তার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত আসামি। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। মহেশখালী থানার অফিসার ইনচার্জ প্রদীপ কুমার দাশ জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালানোর সময় সন্ত্রাসীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। তখন দুই পক্ষের গোলাগুলিতে সন্ত্রাসী আবদুস সাত্তার নিহত হন। আরেক আস্তানায় অভিযানের আগে অস্ত্রধারীদের আত্মসমর্পণের জন্য মাইকে ঘোষণা দেওয়া হলেও তারা তা মানেনি। উল্টো পুলিশের ওপর গুলি চালায়। এ সময় উভয় পক্ষে গুলিবিনিময় হয়। তিনি বলেন, মহেশখালীতে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ও মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। এ অভিযান চলবে।

সংঘর্ষে পুলিশের আহত সদস্যরা হলেন— এসআই শাওন, এসআই হারুন, এসআই মনির, এসআই সাহেদ, এসআই সুুজন, নাজমুল প্রমুখ। অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছেন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, এসআই জহির, এসআই হারুন, এসআই সুজন, এসআই মনির, নাজমুল ও মহেশখালী উপজেলা আনসার কোম্পানি কমান্ডার মোহাম্মদ সোহেল। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধাকেই এখানে কাজে লাগাচ্ছে দস্যুরা। দুর্গম দ্বীপ। তাই চাইলেই তারা নিজেদের লুকিয়ে ফেলতে পারে। অপেক্ষাকৃত ঝুঁকিপূর্ণ বলে পুলিশ-র‍্যাবকেও এগোতে হয় অনেকটা কৌশলে।

পুলিশ, গোয়েন্দা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি দেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালীর পাহাড়গুলো এখন দুর্ধর্ষ অপরাধীদের দখলে। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে রয়েছে অস্ত্র তৈরির কারখানা। দুর্গম পথের এই পাহাড়গুলোর গহিন জঙ্গলে ২২ জন অস্ত্রের কারিগর পুরোদমেই সক্রিয়। এখান থেকেই সারা দেশে অস্ত্র সরবরাহ করা হচ্ছে। সন্ত্রাসীরা কক্সবাজার, মহেশখালী, চকরিয়া ও আশপাশের এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে খুন, মুক্তিপণ, অপহরণ, ডাকাতিসহ নানা অপরাধ করে যাচ্ছে। বিভিন্ন সময় এসব এলাকা থেকে গ্রেফতার হওয়া সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে মহেশখালীর পাহাড়ে তৈরি অস্ত্র পাওয়া গেছে। সর্বশেষ জানুয়ারিতে মহেশখালীতে সন্ধান পাওয়া অস্ত্রের কারখানা থেকে ২২টি অস্ত্র ও চার শতাধিক গুলি জব্দ করে র‍্যাব। এ সময় দুই কারিগরকেও আটক করা হয়।

গতকালের অভিযানের বিষয়ে জানা গেছে, পুলিশের কাছে সংবাদ ছিল, মহেশখালীর হোয়ানক ইউনিয়নের কেরুনতলী নয়াপাড়া পাহাড়ে গহিন অরণ্যে একটি আস্তানায় একদল ডাকাত অস্ত্র মজুদ করে ডাকাতির প্রস্তুতি নিচ্ছে। গতকাল ভোররাত ৪টার দিকে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ওই পাহাড়ি এলাকার আস্তানায় অভিযানে যায়। পুলিশ আস্তানার কাছাকাছি পৌঁছলে অস্ত্রধারীরা টের পেয়ে যায়। অস্ত্রধারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে থাকে। পুলিশও পাল্টা গুলি ছুড়লে উভয় পক্ষে তুমুল বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়ে আবদুস সাত্তার। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু ঘটে। দলের প্রধান রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকলে বাহিনীর সদস্যরা পাহাড়ি এলাকার আরও গভীরে পালাতে থাকে। পুলিশ ওই আস্তানা থেকে ছয়টি বন্দুক ও ২৫ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে। নিহত আবদুস সাত্তারের বাবার নাম নূর ছফার। তার বাড়ি হোয়ানক ইউনিয়নের পূর্ব বড়ছড়া মাইজপাড়া গ্রামে। এ সময় ডাকাতদের হামলায় পুলিশের সাত সদস্য আহত হন।

এ অভিযানের ঘণ্টাখানেক আগে মহেশখালী থানার অন্য একটি দল অভিযান চালায় মাতারবাড়ী ইউনিয়নের মইন্যার ঘোনার একটি সন্ত্রাসী আস্তানায়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের সংঘর্ষ বাধে। ব্যাপক গুলিবিনিময়ের পর পুলিশ গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তিন অস্ত্রধারীকে গ্রেফতার করে। পুলিশ তাদের আস্তানা থেকে আটটি লম্বা বন্দুক ও ৩০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে। এ ছাড়া ওই আস্তানা থেকে ধারালো অস্ত্র ও অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় পুলিশের চার সদস্য আহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ তিন দস্যু হলেন মাতারবাড়ী মাইজপাড়া গ্রামের মকছুদ মিয়ার ছেলে ওয়াজ উদ্দিন, আবু ছৈয়দের ছেলে নাছির উদ্দিন ও নাজু ডাকাত।



এই পাতার আরো খবর