ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

আজকের পত্রিকা

বসন্তে ‘সার্জিকাল স্ট্রাইক’
ছবি : ইন্টারনেট

ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। এই সময়টিতে অ্যালার্জিক রাইনাইটিস, হে ফিভার এবং হাঁপানি আক্রমণ বৃদ্ধি পায়। বাতাস শুষ্ক থাকে বলে বাতাসে সালফার ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যায়। এ সালফার ডাই-অক্সাইড পরিবেশ দূষণ ঘটায় বলে এ সময়টিতে বিভিন্ন ধরনের শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। তাই বসন্তকালীন দিনগুলোতে উচিত সাবধানে চলা।

 

ফুল ফুটুক আর না-ই ফুটুক, এখন চলছে ঋতুরাজ বসন্তকাল। গ্রীষ্মের দারুণ গরম আর মাঘের শীতের পর এ সময়টি আবহাওয়ার দিক দিয়ে যতই মধুর হোক না কেন, কিছু কষ্টদায়ক ব্যাধি এ ঋতুটিকে ঘিরে রাখে। এ সময়টিতে গাছে গাছে ফুলের পরাগ রেণু ছাড়ে বলে বসন্তকালে বাতাসে প্রচুর অ্যালার্জেনের আধিক্য পরিলক্ষিত হয়। বিভিন্ন ধরনের অ্যালার্জেনের মধ্যে অ্যালার্জিজনিত হাঁপানি রোগের মধ্যে ফুলের পরাগ রেণু অন্যতম। সে জন্য এই সময়টিতে অ্যালার্জিক রাইনাইটিস, হে ফিভার এবং হাঁপানি আক্রমণ বৃদ্ধি পায়। বাতাস শুষ্ক থাকে বলে বাতাসে সালফার ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যায়। এ সালফার ডাই-অক্সাইড পরিবেশ দূষণ ঘটায় বলে এ সময়টিতে বিভিন্ন ধরনের শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। যাদের শ্বাসকষ্ট আছে তারা এসব রোগের হাত থেকে বেঁচে থাকতে হলে প্রচুর সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। গ্রামের দিকে এ ঋতুতে অ্যালার্জিক এলভিওলাইটিস দেখা দেয়। এক জাতীয় ছত্রাকের দ্বারা এ সমস্যা দেখা দেয় এবং খড়কুটা, গরুর ভুসি ব্যবহারের সময় অ্যালার্জেন (এসপারজিলাস ফিউমিগেটাস) শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢুকে অ্যালার্জিক এলভিওলাইটিস রোগের সৃষ্টি করে। এই রোগেও হাঁপানির মতো শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। তবে হাঁপানির মতো সাঁই সাঁই শব্দ থাকে না এবং এর চিকিৎসাব্যবস্থাও হাঁপানি থেকে ভিন্ন প্রকৃতির। এ থেকে রেহাই পেতে হলে খড়কুটা বা গরুর ভুসি ব্যবহার করার সময় নাকে মাস্ক বা রুমাল দিয়ে নাক ঢেকে রাখতে হবে। আজকাল পরিবেশ দূষণ মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে যাচ্ছে। ফলে শিশুরাও এখন ব্যাপকভাবে শ্বাসকষ্টের শিকারে পরিণত হচ্ছে। প্রতিদিন একটা সাধারণ দৃশ্য চোখে পড়ে। সেটি হলো উদ্বিগ্ন বাবা-মা সন্তানকে কোলে নিয়ে চিকিৎসকের কাছে আসছেন। শিশু শ্বাসকষ্টে ভুগছে। শিশুর সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মার কী নিদারুণ পেরেশানি। তারা বার বার একটা কথাই জানতে চান যে, তাদের সন্তান ভালো হবে তো?

 

বসন্তকালে কিছু ভাইরাসজাতীয় রোগ যেমন— হাম, পানি বসন্ত, ভাইরাস জ্বর প্রভৃতি হতে দেখা যায়। এই জ্বরে ঘরের একজন আক্রান্ত হলে দেখা যায় আস্তে আস্তে অন্য সদস্যরাও আক্রান্ত হওয়া শুরু করে। এমন করে একঘর থেকে অন্য ঘরে, অন্য বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি এ চক্রে জড়িয়ে যায়। বসন্তকালে শীতের আবহাওয়ার সময়কার ঘুমন্ত ভাইরাসগুলো একটু গরম পাওয়ায় বাতাসের মাধ্যমে আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে। পানিবসন্ত এবং হাম ভাইরাসজনিত রোগ। এগুলোকে আমরা সংক্রামক ব্যাধি বলে থাকি। কারণ এগুলো খুবই ছোঁয়াচে। পানিবসন্ত তেমন মারাত্মক রোগ নয় যদিও যার কোনো দিন এ রোগ হয়নি তার জন্য ছোঁয়াচে। সে জন্য এ রোগ হলে যার জীবনে এ রোগ হয়নি তাকে রোগীর কাছ থেকে দূরে রাখা উচিত। সরাসরি সংস্পর্শে এবং রোগীর হাঁচি-কাশির মধ্য দিয়ে এ রোগ পরিবেশে ছড়িয়ে যায়। পানিবসন্ত এবং হাম হলে রোগীকে কখনো ঠাণ্ডা লাগতে দেবেন না। কারণ এ দুটি রোগেই ঠাণ্ডা লেগে নিউমোনিয়া কিংবা ব্রংকো-নিউমোনিয়া দেখা দিতে পারে। হাম-পরবর্তী ব্রংকো-নিউমোনিয়া শিশুর জন্য প্রাণঘাতী সমস্যায় পরিণত হতে পারে। এখনো আমাদের দেশে কুসংস্কার রয়ে গেছে যে, পানিবসন্ত এবং হাম হলে তাকে ঠাণ্ডা খাবার খাওয়াতে হবে। এটা একটা ভয়ঙ্করধর্মী কুসংস্কার। তাই এ ব্যাপারে সবারই সচেতনতা থাকা প্রয়োজন। আরেকটি ব্যাপার দেখা যায়, পানিবসন্ত এবং হাম রোগীকে তার আত্মীয়-স্বজন মাছ, গোশত খেতে দেন না। এটাও একটা ভ্রান্ত ধারণা। কারণ এ দুটি রোগেই শরীরে প্রচণ্ড আমিষের ঘাটতি হয়, তার ওপর যদি তাকে আমিষ থেকে বঞ্চিত করা হয় তাহলে তার জন্য হয়ে দাঁড়াবে অতিরিক্ত বিপদের ঝুঁকি। মনে রাখবেন রোগীকে পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। রোগীকে মাছ, গোশত, ডিম, দুধ, ফলমূল খেতে দিন। এতে বসন্তের ঘা পাকবে না। ভাইরাস জ্বরের সঙ্গে সঙ্গে বসন্তকালে কিছু কিছু টাইফয়েড এবং প্যারাটাইফয়েড হতে দেখা যায়। ভাইরাস হলে সাধারণত একটু কাশি তার ওপর থাকে শরীর ব্যথা এবং মাথাব্যথ্যা। প্রথমদিকে জ্বরের শুরুতে ভাইরাস ফিভার এবং টাইফয়েড জ্বর পার্থক্য করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। জ্বরের ধরন এবং রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে এবং রোগীকে ভালোমতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কিছুটা সন্দেহ করা যায়। আমরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রোগীকে বিশ্রাম নিতে এবং পুষ্টিকর খাবার খেতে বলি। জ্বর ১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইটের উপরে থাকলে প্যারাসিটামল বা এসপিরিন জাতীয় ওষুধ খেতে দিই এবং মাথায় পানি ও শরীর পানি দিয়ে মুছিয়ে দিতে বলি। এর সঙ্গে বেশি করে পানি এবং টাটকা ফলের জুস খেতে দিই। ভাইরাস জ্বর হলে তিন থেকে চার দিনের মধ্যেই জ্বরের বাড়াবাড়ি কমে যায় এবং রোগী পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়। এতসব কিছুর পরও যদি জ্বরের মাত্রা না কমে তবে অবশ্যই একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।

 

সবচেয়ে বড় কথা হলো— ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই আছেন যারা অসুস্থ, রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। যাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তারাই বেশি আক্রান্ত হন। তাই বসন্তকালীন অনাবিল আনন্দের দিনগুলোতে উচিত আবহাওয়ার এ পরিবর্তনের সময়টিতে সাবধানে চলা।



এই পাতার আরো খবর