ঢাকা, সোমবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৮

আজকের পত্রিকা

অগ্নিকাণ্ডে তিন সদস্যের কমিটি
বাবা মা হারিয়ে পাগলপ্রায় ভাইবোন
নিজস্ব প্রতিবেদক

কান্না থামছে না অবুঝ শিশু রোকসানার। মাঝে মাঝেই সে জ্ঞান হারাচ্ছে। কিছু সময় পর জ্ঞান ফেরা মাত্রই শক্ত করে জড়িয়ে ধরছে একমাত্র ভাই শিমুলকে (১৬)। রোকসানাকে কী সান্ত্বনা দেবে কিশোর শিমুল! তার দশাও যে একই। শনিবারের সর্বনাশা আগুন তাদের বাবা-মাকে কেড়ে নিয়েছে। এক দিনের ব্যবধানে তারা আজ এতিম। তাদের স্বজনরা বলেছেন, ঘটনার পর থেকে এক দানা খাবারও মুখে নেয়নি এ দুই ভাই-বোন। এখন অনাথ দুই ভাই-বোনকে নিয়েই যত চিন্তা স্বজনদের। তাদের ঠাঁই হয়েছে চাচা বিল্লাল হোসেনের বাসায়। প্রতিবেশীরা সান্ত্বনা দিচ্ছেন মা-বাবা হারা দুই ভাই-বোনকে। শিমুলকে কিছুটা শান্ত করা সম্ভব হলেও রোকসানার কান্না কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। বারবার সে বলছে, ‘আমি মার কাছে যাব, বাবার কাছে যাব, যেদিক ইচ্ছা সেদিকে চলে যাব।’ ভয়ঙ্কর আগুন রেহাই দেয়নি তাদের ফুফু সালেহা বেগমকেও (৩৮)। স্ত্রী সালেহাকে হারিয়ে এক ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে একই অবস্থা শহিদ মিয়ারও। শনিবার পুরান ঢাকার ইসলামবাগের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর গতকাল এলাকার একটি বাসার চিত্র এটি। অন্যদিকে ইসলামবাগে প্লাস্টিক কারখানায় ভয়াবহ আগুনে একই পরিবারের তিন সদস্যের মৃত্যুর ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস। গতকাল ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক দেবাশীষ বর্ধনকে প্রধান করে এ কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান। এ ছাড়া অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় চকবাজার থানায় নিহতদের বড় ভাই সোহরাব হোসেন একটি অপমৃত্যু মামলা করেছেন। ময়নাতদন্তের পর গতকাল বিকালে নিহতদের লাশ তাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান বলেন, আগুনে ১৩ জন মালিকের ১৯৫টি কক্ষ পুড়ে গেছে। কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা নিরূপণ করা হয়নি।

তবে এক কোটি টাকার মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে সরেজমিন ইসলামবাগে গিয়ে জানা যায়, যৌথ পরিবারের ২১ জন সদস্য থাকতেন ইসলামবাগের ২৯/৬৫ নম্বর বাড়িতে। বাড়ির দুই তলা পর্যন্ত পাকা। তবে এর ওপরের দুটি ফ্লোর টিনশেডের। ওই বাড়ির নিচতলার প্লাস্টিক কারখানার শ্রমিক ছিলেন শামীম। অভাব-অনটনের পরিবারে বাবাকে একটু সাহায্যের জন্য এক বছর আগে কিশোর বয়সেই নিউমার্কেটের একটি দোকানে কাজ নেয় শিমুল। বোন রোকসানা স্থানীয় ইব্রাহিম স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। ঘটনার সময় শনিবার বিকালে নিউমার্কেটের দোকানে কাজ করছিল শিমুল। আর কোচিং ক্লাস করতে বাইরে ছিল রোকসানা। আগুন লাগার খবর শুনে তারা দুজনই দ্রুত চলে যায় বাড়ির সামনে। সবাই নিজ নিজ স্বজনদের খুঁজে পেলেও দুই শিশু-কিশোর তাদের মা-বাবাকে খুঁজে পাচ্ছিল না। এলাকাবাসী বলেন, ১৯৯৬ সালেও ওই এলাকায় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। শুধু ওই বাড়ি নয়, আশপাশের অনেক ভবনের নিচতলায় রয়েছে প্লাস্টিকের গোডাউন, এমনকি কারখানাও। প্রত্যক্ষদর্শী বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘ধ্বংসস্তূপ সরানোর সময় রাত সাড়ে ৮টার দিকে সিঁড়িতে আমি প্রথমে একটি মাথা দেখি। পরে সেখান থেকেই বের করে আনা হয় আমার ভাই, বোন ও ভাবীর লাশ।’ তিনি জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ থানার ওমরিয়ারপুর গ্রামে হলেও স্বাধীনতার পর থেকেই তারা ইসলামবাগ এলাকায় বসবাস করছেন। ওই বাড়িটি তাদের যৌথ। তিনটি কক্ষ ৮-১০ জন ব্যাচেলরকে ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। তিনতলা বাসার অন্য কক্ষগুলোতে তারাই থাকেন। নিহত সালেহার স্বামী রিকশাচালক শহিদ মিয়া বলেন, ‘আগুনের খবর শুনেই আমি সন্তানদের নিয়া বাইর হইয়া আসি। সালেহা তার ভাই ও ভাবীকে লইয়া বাইর হইতে চাইছিল। এর লাইগা তাগো একটু দেরি হইছিল। আগুন তাদের বাঁচতে দেয় নাই। আমি এহন আমার সন্তানগো লইয়া কী করুম। কোথায় যামু।’ স্থানীয় আমির হোসেন জানান, সিঁড়িতে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় তার স্ত্রী রেশমা দোতলা থেকে লাফিয়ে পড়েন। এতে তার পা ভেঙে গেলেও প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন। তিনি বর্তমানে পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শামীম অর রশিদ তালুকদার জানান, রান্নাঘরে দেশীয় চুলায় কাঠ দিয়ে রান্না করা হচ্ছিল। যিনি রান্না করছিলেন তিনি হয়তো রান্না বসিয়ে বাইরে গিয়েছিলেন। এ সময় আগুন ছড়িয়ে পড়ে। পাশে বৈদ্যুতিক ট্রান্সমিটার থাকায় আগুনের কারণে সেটি বিস্ফোরিত হয়। এ কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।



এই পাতার আরো খবর