ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৮

আজকের পত্রিকা

কোচদের তারকাখ্যাতি
ঘরোয়া ফুটবল
ক্রীড়া প্রতিবেদক

এক সময়ে ফুটবলে তারকা খেলোয়াড়ের কমতি ছিল না। ৭০ ও ৮০’র দশকে বাংলাদেশে এমন জনপ্রিয় ফুটবলার ছিলেন যাদের পথ-ঘাটে দেখা পেলেই ভক্তরা ভিড় জমিয়ে ফেলত। শুধু ফুটবলার নয়, বাংলাদেশে বেশ কজন কোচও তারকাখ্যাতি পেয়েছেন। এক্ষেত্রে আবদুর রহিম, মো. আশরাফ, গোলাম সারোয়ার টিপু, আলী ইমাম, ওয়াজেদ গাজী, কাজী সালাউদ্দিন, অমলেশ সেন, শফিকুল ইসলাম মানিক ও মারুফুল হকের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। মানিক ও মারুফ এখনো কোচের দায়িত্ব পালন করছেন। গত কয়েক বছর ধরে শীর্ষ স্থানীয় ক্লাবগুলো বিদেশি কোচের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয়, জতীয় দলের ক্ষেত্রেও একই দশা। অথচ লক্ষ্য করলে দেখা যাবে ঘরোয়া ফুটবলে শিরোপা জেতার পেছনে দেশের কোচদেরই অবদান বেশি।

প্রয়াত দুই কোচ আবদুর রহিম ও মো. আশরাফেরই কথা ধরা যাক। ফুটবল ক্যারিয়ারে অবসান ঘটানোর পরপরই তারা প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা আবাহনী ও বিজেআইসি (বর্তমান টিম বিজেএমসি) তার প্রশিক্ষণে লিগ শিরোপা জিতে। রহিমের হাত ধরে দেশে কত তারকা ফুটবলার যে বের হয়েছেন তার হিসাব মেলানো মুশকিল। ষাট দশকে ঢাকা মোহামেডানের মাঠ কাঁপানো ফুটবলার ছিলেন আশরাফ। অধিনায়ক হিসেবে ঐতিহ্যবাহী এই দলকে এনে দেন অনেক ট্রফি। কোচ হিসেবেও সফল। স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ ও ১৯৭৬ সালে তার প্রশিক্ষণে মোহামেডান টানা দুবার লিগ শিরোপা জিতে। ১৯৭৮ সালে হয় অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন।

গোলাম সারোয়ার টিপুকে মোহামেডানের ঘরের লোক বলা হয়। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি এই দলে কৃতিত্বের সঙ্গে খেলেছেন। তবে ১৯৭৪ সালে ঢাকা আবাহনী প্রথম লিগ জিতে টিপুরই নেতৃত্বে। ১৯৭৫ সালে তিন মৌসুম পর ফিরে আসেন মোহামেডানে। খেলেন ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত। ১৯৮০ সালে টিপু কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করেন। মোহামেডানকে ফেডারেশন কাপ ছাড়াও লিগের ট্রফি এনে দেন। ১৯৮১ সালে লিগ না পেলেও মোহামেডানকে জেতান ফেডারেশন কাপ। ১৯৮২ সালে ফেডারেশন কাপ, লিগ ছাড়াও ভারতে অনুষ্ঠিত আশীষ জব্বার স্মৃতি টুর্নামেন্টে তারই প্রশিক্ষণে সাদা-কালোরা চ্যাম্পিয়ন হয়। ১৯৮৩ সালে আবার ফেডারেশন কাপ। অর্থাৎ টিপুই প্রথম  কোচ স্বাধীনতার পর কোনো টুর্নামেন্টে কোনো দলকে টানা চারবার ট্রফি  জেতান। ১৯৮৪ সালে মাঝপথে মোহামেডানের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব ছেড়ে দেন তিনি। বেশ কবার জাতীয় দলের প্রশিক্ষক ছিলেন। এ ছাড়া অন্য ক্লাবেরও দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু কোচের তারকাখ্যাতিটা পান মোহামেডান থেকেই।

আলী ইমাম ফুটবল ক্যারিয়ারে খেলেন ইস্টএন্ড, ওয়ান্ডারার্স ও আবাহনীতে। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গড়ার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল তার। রহমতগঞ্জ থেকে কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করলেও তারকারখ্যাতি পান আবাহনী, ব্রাদার্স ও মোহামেডান থেকেই। ১৯৮৪ সালে তার প্রশিক্ষণে আবাহনী লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়। পরের বছর ব্রাদার্স ইউনিয়ন রানার্সআপ। দুর্ভাগ্য বলতে হয় আলী ইমামের। যে ম্যাচে আবাহনীর বিপক্ষে ড্র করলেই ব্রাদার্স চ্যাম্পিয়ন সেখানে কিনা ২ গোলে এগিয়ে থেকেও ৩-২ গোলে হেরে যায়। তা না হলে তিনিই হতেন একমাত্র কোচ টানা তিন মৌসুমে ভিন্ন তিন দলকে চ্যাম্পিয়ন করাতেন। কেননা ১৯৮৬ সালে তারই প্রশিক্ষণে তিন বছর পর মোহামেডান লিগ জিতে তাও আবার অপরাজিতভাবে। তিনি অনেক খেলোয়াড় তৈরি করেছেন। ১৯৮৯ সালে আলী ইমাম মৃত্যুবরণ করেন। ওয়াজেদ গাজী খেলেন বিজেআইসি, মোহামেডান ও ওয়ান্ডারার্সে। খেলোয়াড়ি জীবনে অবসর নেওয়ার পর কোচ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। রহমতগঞ্জ, আরামবাগ ও মুক্তিযোদ্ধার কোচ হিসেবে শিরোপা না জিতলেও গাজী আলোড়ন তোলেন। অনেক বড় দলকে হারানোর রেকর্ড রয়েছে। তবে ব্রাদার্সের দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০০৪-২০০৫ মৌসুমে গাজীরই প্রশিক্ষণে গোপীবাগের দলটি প্রথম লিগ শিরোপার স্বাদ পায়।

বাংলাদেশের ফুটবলে উজ্জ্বল নক্ষত্র কাজী সালাউদ্দিন। ওয়ারী ও মোহামেডানে খেললেও তারকারখ্যাতি পান আবাহনীতে খেলেই। ১৯৮৪ সালে অবসর নেন। এর পরের বছরই আবাহনীর কোচ হয়ে যান। অভিষেকেই তিনি ফেডারেশন কাপ ও লিগ জেতান। ১৯৮৬ সালে লিগ ট্রফি না পেলেও আবাহনীকে এনে দেন ফেডারেশন কাপের ট্রফি। ব্রাদার্সেরও প্রশিক্ষণ ছিলেন তিনি। ১৯৯৪ সালে মুক্তিযোদ্ধা শক্তিশালী দল গড়লে কোচ হন সালাউদ্দিন। তার প্রশিক্ষণে ফেডারেশন কাপ জিতে এই দল। ১৯৮৫ সালে সালাউদ্দিনের প্রশিক্ষণে সাফ গেমসে বাংলাদেশ রূপা জিতে। বর্তমানে তিনি বাফুফের সভাপতি। অমলেশ সেন আবাহনীতে খেলেই তারকারখ্যাতি পেয়েছেন। তেমনিভাবে কোচ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। ১৯৯৭ সালে তারই প্রশিক্ষণে আবাহনী ফেডারেশন কাপ জিতে। ২০০০ সালে প্রিমিয়ার লিগ, এর পর পেশাদার লিগে প্রথম টানা তিন শিরোপা আবাহনী জিতে অমলেশের প্রশিক্ষণেই। ২০১২ সালে ফেডারেশন কাপ ও সুপার কাপে আবাহনী চ্যাম্পিয়ন হয় তারই প্রশিক্ষণে। দেশের বাইরে ভারতে বরদুলাই ট্রফিতে আবাহনী চ্যাম্পিয়ন হয় অমলেশের প্রশিক্ষণে। ব্রাদার্স ও মোহামেডানে খেললেও শফিকুল ইসলাম মানিক তারকারখ্যাতি পেয়েছেন কোচ হিসেবেই। মোহামেডান-আবাহনীর দাপট ভেঙে ১৯৯৭-৯৮ মৌসুমে মুক্তিযোদ্ধা লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়। পরের বছরে ফেডারেশন কাপ, মহানগরী কাপ ও ভারতের ম্যাগডোনাস কাপে মুক্তিযোদ্ধা চ্যাম্পিয়ন হয় তারই প্রশিক্ষণে। ২০০১ সালে পুনরায় লিগ। ২০০৪ সালে ফেডারেশন কাপ ও নিটল টাটা জাতীয় লিগ পরের বছর আবার স্বাধীনতা কাপ। অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধার সব শিরোপাই মানিকের অবদান। মোহামেডানের কোচ হিসেবে ২০০৫-০৬ মৌসুমে জেতান নিটল টাটা জাতীয় লিগ ও টাঙ্গাইল গোল্ড কাপ। ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম আবাহনীকে জেতান শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্লাব কাপ। শেখ রাসেলের কোচ হিসেবে চলতি বছর মাগুরাতে জেতান বঙ্গবন্ধু গোল্ড কাপ। মারুফুল হক মারুফ ঢাকার মাঠে বড় দলে খেলার অভিজ্ঞতা নেই। ৯০ দশকে বাংলাদেশ বয়েজে খেলোয়াড় ছিলেন। তবুও তিনি ঘরোয়া আসরে সফল কোচ। ২০০৮ সালে মোহামেডানকে ফেডারেশন কাপ চ্যাম্পিয়ন করিয়ে তার কোচিং ক্যারিয়ার শুরু। পরের মৌসুমে শুধু ফেডারেশন কাপ নয় মোহামেডানকে এনে দেন কোটি টাকার সুপার কাপ। ২০১২-১৩ মৌসুমে শেখ রাসেলকে ফেডারেশন কাপ, লিগ ও স্বাধীনতা কাপ উপহার দেন। ২০১৪-১৫ মৌসুমে শেখ জামাল লিগ জিতে তারই প্রশিক্ষণে। তবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে। একই মৌসুমে তিনি শেখ জামালকে ফেডারেশন কাপ ও ভুটানের কিংস কাপ ট্রফি এনে দেন। সাইফুল বারী টিটু ও কামাল বাবু বড় কোনো দলকে ট্রফি এনে দিতে না পারলেও তারাও দেশের আলোচিত কোচ। ঘরোয়া আসরে সফল হলেও জাতীয় দলে দেশের কোচদের তেমন অবদান নেই। কেননা মিয়ানমার চ্যালেঞ্জ কাপ, ১৯৯৯ সাফ গেমস, ২০০৩ সাফ চ্যাম্পিয়ন ও ২০১০ সালে বাংলাদেশ এসএ গেমসে চ্যাম্পিয়ন হয় বিদেশি কোচের প্রশিক্ষণে। তবে ১৯৮৯ সালে প্রেসিডেন্ট কাপে বাংলাদেশ লাল দল চ্যাম্পিয়ন হয় মো. সাদেকের প্রশিক্ষণে।



এই পাতার আরো খবর