Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৫ মার্চ, ২০১৯ ২১:১৯

সংবাদপত্রের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল

মাহফুজ আনাম

সংবাদপত্রের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল
ছবি : রোহেত রাজীব

মাহফুজ আনাম ইংরেজি ডেইলি স্টারের সম্পাদক। সংবাদ ও সংবাদমাধ্যম নিয়ে ১৪ বছর কাজ করেছেন ইউনেস্কোতে। ইউনেস্কো ছেড়ে দিয়ে দেশে ফিরে প্রখ্যাত সাংবাদিক এস এম আলীর সঙ্গে বের করেন ডেইলি স্টার। ন্যায়নিষ্ঠ ও জনকল্যাণী চিন্তার ধারক এই মুক্তিযোদ্ধা। সাংবাদিকতা ও সমসাময়িক বিভিন্ন প্রসঙ্গে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- শিমুল মাহমুদ শামীম আহমেদ

 

সাংবাদিকতায় কীভাবে এলেন?

ছাত্রজীবনেই। ১৯৭২ সালের মার্চ। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএ অনার্স পড়ি। তখন আমি মহসীন হলের সাধারণ সম্পাদক। দেশ স্বাধীন হয়েছে। আমার ব্যক্তিত্বের মধ্যেও একটা স্বাধীনচেতা ভাব এসেছে। আব্বা-আম্মার ওপর কতদিন থাকব? হলে থাকতেও একটা খরচ আছে। রোজগার করা দরকার। ভাবলাম, এমন কী চাকরি করা যায়, যাতে লেখাপড়াও চলে, আয়-রোজগারও হয়। তখন আবদুস সালাম সাহেব বাংলাদেশ অবজারভারের সর্বজন শ্রদ্ধেয় সম্পাদক। উনি ছিলেন আব্বার ভক্ত। উনাকে বললাম, চাচা সাংবাদিকতা করতে চাই। উনি বললেন, কালকেই চলে আসো। এডিটরিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে অবজারভারে যোগ দিলাম। এভাবেই সাংবাদিকতায় আসা। আমার বিএ অনার্স পড়ার সময়ই তো মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো। যুদ্ধে গেলাম। ফিরে এসে অনার্স ও এমএ শেষ করলাম। পাশাপাশি সাংবাদিকতা চালিয়ে গেলাম। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত দেশে সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলাম। প্রথমে অবজারভারে এডিটরিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট। এরপর রিপোর্টার। শেষের তিন বছর বাংলাদেশ টাইমসে। এটাও একটা মজার ঘটনা। আমি একদিন অবজারভারে বসে কাজ করছি। হঠাৎ পিয়ন এসে বললেন, নিচে গাড়িতে শেখ মনি সাহেব বসে আছেন। আমি নিচে গিয়ে সালাম দিলাম। উনি বললেন, এই গাড়িতে বস। উনি আমাকে তুই করেই বলতেন। গাড়ি নিয়ে একেবারে ধানমন্ডিতে আমাদের বাসায়। আব্বাকে কদমবুছি করে বললেন, কাকা, আমি ইংরেজি কাগজ বের করছি, আপনার ছেলেকে নিয়ে যাচ্ছি। আপনার দোয়া চাইতে এসেছি। আব্বা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এই তুমি কিছু জানো। আমি বললাম, না, জানি না। এই প্রথম শুনলাম। আব্বা বললেন, ওকে জিজ্ঞেস করো। তিনি বললেন, ও রাজি। আপনি দোয়া করলেই হবে। অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর হিসেবে যোগ দিলাম বাংলাদেশ টাইমসে। তখন সম্পাদক শহিদুল হক, সম্পাদনা বিভাগের দায়িত্বে মাহবুবুল আলম।

 

ডেইলি স্টার কীভাবে শুরু করলেন?

ইউনেস্কোর চাকরির সুবাদে আমি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঘুরেছি। সেসব দেশের সংবাদপত্র দেখেছি। তখন থেকেই আমার মধ্যে পত্রিকা প্রকাশের একটা ইচ্ছা কাজ করত। এ ব্যাপারে এস এম আলী ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রায়ই যোগাযোগ হতো। আমার স্টেশন তখন ব্যাংককে, আলী ভাই থাকতেন কুয়ালালামপুর। ওই সময়ে কয়েক বছর উনার সঙ্গে ডেইলি স্টার বের করা নিয়ে নিয়মিত পরিকল্পনা করি। অবশেষে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেই। উনি ইউনেস্কো থেকে অবসরে গেলেন। আমি পদত্যাগ করলাম। দেশে ফিরে দুজনে মিলে ডেইলি স্টার বের করলাম। আমি এই পত্রিকার কো-ফাউন্ডার। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর থেকে ডামি বের করা শুরু করি। পরের বছরের ১৪ জানুয়ারি পত্রিকা বাজারে যায়। আলী ভাইয়ের চিন্তাধারা, অভিজ্ঞতা আর আমার উদ্যম কাজ করেছে ডেইলি স্টারের জন্মে।

 

আপনি সম্পাদক হয়ে কী কী গুণগত পরিবর্তন আনলেন পত্রিকায়?

আমার সম্পাদক হওয়াটা আকস্মিক। আমরা ১৯৯১ সালের ১৪ জানুয়ারি কাগজ বের করলাম। আলী ভাই মারা গেলেন ১৯৯৩ সালের জুনে। আড়াই বছরের মাথায় উনাকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ি। উনি ছিলেন সম্পাদক, আমি নির্বাহী সম্পাদক। পত্রিকার দ্বিতীয় ব্যক্তি আমি। মাত্র ৪১ বছর বয়সে একটি পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হওয়ার মতো অভিজ্ঞতা বা যোগ্যতা কোনোটাই আমার ছিল না। কিন্তু, আমার ছিল আগ্রহ, উদ্যম আর উৎসাহ। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছিল আলী ভাইয়ের বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা ও মেধা। আলী ভাই চলে যাওয়ার পর আমাকে সম্পাদকের দায়িত্ব নিতে হলো। তাৎক্ষণিকভাবে পত্রিকায় তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। আমাদের স্বপ্ন ছিল স্বাধীন, দলনিরপেক্ষ, দেশপ্রেমিক, আধুনিক একটি কাগজ প্রতিষ্ঠা করা। সেই দিকেই ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়েছি।

 

ইউনেস্কোতে কাজ করেছেন ১৪ বছর। প্যারিস, নিউইয়র্ক ব্যাংককে ছিলেন। অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

১৯৭৭ সালে আমি ইউনেস্কোতে চাকরি পাই। ইউনেস্কো জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিকবিষয়ক প্রতিষ্ঠান। এর আওতায় বিশ্বের প্রসিদ্ধ শিক্ষাবিদ, বৈজ্ঞানিক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সমাগম হতো প্যারিসে। এ বিশাল জ্ঞান ভাণ্ডারের মধ্যে আমি নিজেকে পেয়ে সৌভাগ্যবান মনে করেছি। এ পরিবেশ থেকে জ্ঞানার্জন ও নিজস্ব চিন্তাধারা বিকাশের চেষ্টা করেছি। উন্নয়নশীল দেশে সাংবাদিকতার উন্নয়নে ইউনেস্কোর বিশাল ভূমিকা ছিল। আমি সেই কার্যক্রমের একজন কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেই। তখনকার সময়ে সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনা হলো ম্যাকব্রাইড কমিশন প্রতিষ্ঠা যা বিশ্বে সংবাদ প্রবাহের একটি নতুন ধারা সৃষ্টি করতে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উত্থাপন করে। সেটা হলো নিউ ওয়ার্ল্ড ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন অর্ডার (The New World Information and Communication Order-NWICO)। এর মূল প্রস্তাবনা ছিল বিশ্বে সংবাদ প্রবাহে মুষ্টিমেয় পশ্চিমা দেশের আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে সংবাদ ও তথ্য প্রবাহে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে ভারসাম্য আনা। ইউনেস্কোর কমিউনিকেশন সেক্টরের একজন কর্মী হওয়ায় আমি ম্যাকব্রাইড কমিশনের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে কাজ করি ও প্রথমবারের মতো সংবাদপ্রবাহ ও সাংবাদিকতা নিয়ে বিশ্বব্যাপী মূল যে বিতর্ক সেটা অবগত হই। বুঝতে পারি একটা জাতির উন্নয়নের জন্য স্বাধীন সাংবাদিকতার অপরিসীম গুরুত্ব। আরও বুঝতে পারি রাষ্ট্র গঠনে সৎ সাংবাদিকতা ও সাংবাদিকতা পেশার উন্মেষের গুরুত্ব। ১৪ বছর বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যম ও তথ্যপ্রবাহ নিয়ে কাজের সুবাদে অনেক দেশ সফরের সুযোগ হয়েছে। ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়া অঞ্চলের সংবাদমাধ্যম নিয়ে ব্যাপক অভিজ্ঞতা অর্জন করি এ সময়। এসব অভিজ্ঞতা ও চিন্তাধারাও পরবর্তী সময়ে ডেইলি স্টারের বিকাশে কাজ করেছে।

 

আপনার সাংবাদিকতা জীবনে বাবা আবুল মনসুর আহমেদের প্রভাব কতখানি?

বাবার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। উনি একাধারে ছিলেন সাংবাদিক, রাজনীতিক, সাহিত্যিক ও আইনজীবী।

অনেক দিন সাংবাদিকতা করেছেন। সর্বশেষ তিনি কলকাতা থেকে দৈনিক ইত্তেহাদ বের করেন। ওই সময় একটি আধুনিক বাংলা কাগজ হিসেবে পত্রিকাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। একজন সম্পাদকের দৃষ্টিভঙ্গি, দর্শন, একটা সংবাদপত্র বের করতে কী কী দরকার সবকিছুই উনার লেখনির মাধ্যমে পেয়েছি। আব্বা প্রত্যক্ষ রাজনীতি ছাড়েন ১৯৬৬ সালে। ১৯৭৯ সালে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি সংবাদপত্রে নিয়মিত কলাম লিখতেন। রাজনীতিতে উনার নির্দেশনামূলক বই ‘আমার দেখা রাজনীতির ৫০ বছর’-এর কথা সবার জানা। উনার কলামগুলো আমাকে উৎসাহিত করেছে কলামিস্ট হওয়ার ব্যাপারে।

 

ডেইলি স্টারের সাফল্যের রহস্য কী?

সেটা আপনারা বলবেন। আমি নিজেকে তুখোড় বুদ্ধিমত্তার কেউ মনে করি না। তবে আমি আন্তরিক। ডেইলি স্টারের প্রসারের জন্য আমি আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছি। মূলত, সংবাদপত্রের একটা নীতি থাকতে হবে। সেই নীতিতে অবিচলভাবে চলতে হবে। দেশপ্রেম, সমাজ চেতনাবোধ থাকতে হবে। মানুষের সেবা করার ব্রত থাকতে হবে। কোনটাতে দেশের ভালো হয় সেটা চিন্তা করে কাজ করতে হবে। অনেক সময় সম্পাদকের চিন্তায় সব নাও আসতে পারে। এজন্য অন্যের মতামতও তুলে ধরতে হবে। আমি চেষ্টা করেছি দেশের শীর্ষ চিন্তাবিদদের একসঙ্গে জড়ো করতে। ডেইলি স্টার বাংলাদেশের গোলটেবিল বৈঠকের প্রবক্তা। আপনারা যদি মনে করেন ডেইলি স্টার একটা সংবাদপত্রের সাফল্যের প্রতীক, সেটার মধ্যে আমার কোনো ম্যাজিক ফর্মুলা ছিল না। আমি শুধু আমার সম্পূর্ণ আন্তরিকতা দিয়ে চেষ্টা করেছি। আরেকটা ব্যাপার ছিল, স্টাফদের প্রতি সম্পূর্ণ ন্যায়পরায়নতা। আমি সাধ্যমতো ডেইলি স্টার-এ যারা কাজ করে তাদের বেতন, সুযোগ-সুবিধা দিয়েছি। সম্মান দিয়েছি। যতটা সম্ভব তাদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করেছি। সাফল্যের জন্য যা প্রয়োজন তার একটা হলো নৈতিকতা, সমাজ চেতনা এবং আরেকটা হলো ভিতরের স্টাফদের সুযোগ-সুবিধা এবং সম্মানজনক আচরণ।

 

সমকালীন সাংবাদিকতা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।

আমাদের দেশে সংখ্যায় অনেক কাগজ বেরিয়েছে। কিন্তু মান সেভাবে বাড়েনি। দুটো জিনিসের আমি খুব অভাব অনুভব করি। একটা হলো দৃঢ় নৈতিক অবস্থান, অন্যটি সাহসিকতা। আমরা সাংবাদিকরা, সম্পাদকরা যেটা স্পষ্টভাবে বলার প্রয়োজন অনুভব করি, তা বলার সাহস রাখি না।

 

সংবাদমাধ্যমের আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ কী? কীভাবে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যাবে?

ভবিষ্যতে খবরের কাগজ, টেলিভিশন, অনলাইন পোর্টাল শুধুমাত্র এক ধরনের কনটেন্ট প্রচার বা প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সব মিলে হবে মাল্টিমিডিয়া। আমাদের কিন্তু কোনো টেলিভিশন চ্যানেল নেই। ছাপা পত্রিকার পাশাপাশি অনলাইন পোর্টাল আছে। আমাদের অনলাইনে ফুটেজ যাচ্ছে। টক-শো লাইভ করা যাচ্ছে। আমি লোকজন পাঠিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন করতে পারছি; যেটা টেলিভিশন করছে। প্রিন্ট আর অনলাইন মিলে ডেইলি স্টার মাল্টিমিডিয়া। আবার টেলিভিশন ইচ্ছা করলে অনলাইনে বিরাট একটা ভূমিকা রাখতে পারে টেক্সট কনটেন্টে। বিবিসি একটা টেলিভিশন চ্যানেল। কিন্তু তাদের অনলাইনে সংবাদ প্রতিবেদন বের হচ্ছে, বড় বড় আর্টিকেল বের হচ্ছে, সমালোচনা প্রকাশ হচ্ছে। আবার ভিডিও কনটেন্ট থাকছে। তার অর্থ ভবিষ্যতের সাংবাদিকতা হচ্ছে মাল্টি প্লাটফরম। আগামীতে ডেইলি স্টার শুধু একটা খবরের কাগজ থাকবে না। ডেইলি স্টার হয়ে যাবে একটা কনটেন্ট প্রডিউসার। সেই কনটেন্ট আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে পাঠককে পৌঁছে দেব। সকালে খবরের কাগজ দেব, অনলাইনে-মোবাইলে সারা দিন আপডেট দেব, মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে সচিত্র বিবরণ দেব, টক-শোর মাধ্যমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে গুণীজনদের আলোচনা দেব, আবার পরের দিন খবরের কাগজ দেব। এখন কথা হচ্ছে, পরের দিন সকালে যে কাগজটা পাঠকের হাতে যাবে তাতে যদি সারা দিনের খবরের পুনরাবৃত্তি হয়, তাহলে তারা কিনবে কেন? তাই আমাদের খবরের কাগজ হবে খবরের চেয়ে বেশি কিছু। আপনি সারা দিন যে তথ্য পাবেন, পরের দিনের কাগজে সেটার ভালো-মন্দ বোঝার চেষ্টা করবেন। অর্থাৎ, বিশ্লেষণমূলক লেখা থাকতে হবে পরের দিনের কাগজে। তাই ভবিষ্যতের সাংবাদিকদের এখনকার চেয়ে অনেক বেশি শিক্ষিত, অভিজ্ঞতাপূর্ণ, দক্ষ ও প্রজ্ঞাবান হতে হবে।

 

এই মাল্টি প্লাটফরমের কারণে প্রিন্ট মিডিয়ার যুগ কি শেষ হয়ে যাচ্ছে?

শেষ হয়ে যাচ্ছে না। কমে যাবে হয়তো। আমেরিকা ও ইউরোপে ছাপা পত্রিকার বিক্রি কমেছে, কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় বাড়ছে। ভারতে ছাপা পত্রিকার সার্কুলেশন বাড়ছে। যেভাবে লোকে ভেবেছিল ছাপা পত্রিকার মৃত্যু হবে, সেটা কিন্তু হচ্ছে না। সংবাদপত্রের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত কিনা সেটা অনেকাংশে নির্ভর করছে আপনি কীভাবে সংবাদপত্রকে আধুনিকীকরণ করছেন তার ওপরে। এই মুহূর্তে নিউইয়র্ক টাইমস ও গার্ডিয়ান সাংঘাতিকভাবে অনলাইন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে তাদের সংবাদমাধ্যমের প্রসার ঘটাচ্ছে। নিউইয়র্ক টাইমস ছাপা পত্রিকা আগের চেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। এটা সত্য, সংবাদমাধ্যমে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় ছাপা পত্রিকার প্রয়োজন কমছে। একজন পাঠক যদি ডেইলি স্টারের পুরো টেক্সটটা অনলাইনে পান তাহলে ছাপা কাগজ দেখার দরকার কী? একটা খবরের কাগজের উৎপাদন খরচ অনেক বেশি। এক কপি ডেইলি স্টার পত্রিকা ছাপতে খরচ হয় ২৪ টাকা। বিক্রি হয় ১২ টাকায়। সেখান থেকে হকারকে কমিশন দিতে হয়। অনলাইনে ছাপা খরচ নেই, কাগজের খরচ নেই, বিতরণের খরচ নেই। এসব খরচ কমে গেলে আমার উৎপাদন খরচ চলে আসবে ১০ টাকায়। তখন আমি কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে পারব। তাদের অনেক বেশি দক্ষ করতে পারব। অনলাইনে একদিকে খরচ নেই, অন্যদিকে আপনি পাঠকের দরজায় পৌঁছে যাচ্ছেন মুহূর্তের মধ্যে। আমি তো তখন ঘণ্টায় ঘণ্টায় ডেইলি স্টারের নতুন সংস্করণ বের করতে পারব। এছাড়া এখন যেটা ২০ পৃষ্ঠার কাগজ, অনলাইনে ৪০ পৃষ্ঠা করলেও তো কোনো অসুবিধা নেই। অফুরন্ত জায়গা। পাঠকের সঙ্গেও আমার যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে। একটা আর্টিকেল প্রকাশ হলে পাঠক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাতে পারছে। আমরাও তার প্রতিক্রিয়ার জবাব দিতে পারছি। ছাপা পত্রিকায় সেটা সম্ভব নয়। সাংঘাতিক একটা ডায়নামিক যুগে চলে যাচ্ছি আমরা। তাই, সংবাদপত্রের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হলেও সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। আমি মনে করছি, বাংলাদেশের সাংবাদিকরা বা সংবাদপত্র মালিকরা যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে উপলব্ধি করছেন না যে, এই ডিজিটালাইজেশনের ফলে বিরাট সম্ভাবনার জগৎ খুলে যাচ্ছে। তবে, এ ডিজিটাল ফর্মুলাকে নিয়ন্ত্রণ করতে যে আইনগুলো হচ্ছে সেগুলো এ সম্ভাবনাকে অনেকাংশে স্তিমিত করে দেবে।

 

 

স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা আছে কি?

অবশ্যই আছে। অনেক আইনি কাঠামো আমাদের বিড়ম্বনার সৃষ্টি করে। স্বাধীন সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করছে। এই যেমন মানহানির মামলা, আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারা, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন এগুলোর অপপ্রয়োগ বাক স্বাধীনতার কণ্ঠরোধ করছে। বাক স্বাধীনতা না থাকলে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকলে স্বাধীন সাংবাদিকতাও থাকবে না। এতে বাংলাদেশের যতই উন্নয়ন হোক, তা টেকসই হবে না। বাক স্বাধীনতা বর্তমান বিশ্বের, বর্তমান সভ্যতার বহুদিনের সংগ্রামের ফল। মানবসভ্যতার অগ্রগতির অন্যতম গোড়ার একটা অর্জন। এর ফলে সমাজ উন্নত হয়, চিন্তাবিদরা নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার করতে পারেন। কিছুদিন আগে অরুন্ধতী রায় বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনি কাশ্মীর নিয়ে লিখেছেন। সেখানে সরকার, সেনাবাহিনীর সমালোচনা করেছেন। এটা ভারতের কাগজে ছাপা হয়েছে এবং তিনি ওই দেশে এখনো বসবাস করছেন। অনেকেই তার সমালোচনা করেছেন। তবে তিনি যা মনে করেছেন সেটা তো বলতে পেরেছেন। এটাই বাক স্বাধীনতা। ইতিহাস দেখেন। সবচেয়ে সমালোচনামূলক কথাগুলোর মাধ্যমেই তো সমাজ পরিবর্তন হয়েছে। বাল্যবিয়ে, সতীদাহ প্রথা এগুলো তো সমালোচকদের জন্যই পরিবর্তন হয়েছে। সেই সমালোচনা শুধু স্বাধীন মত প্রকাশের পরিবেশেই সম্ভব। এটা গণতন্ত্রের একটা মূল অংশ। স্বাধীন সাংবাদিকতায় সরকার উপকৃত হয়, ক্ষতিগ্রস্ত নয়। এ বিষয়টাই উনারা বুঝতে চান না। ভালোভাবে দেশ চালাতে সরকারের সঠিক তথ্যের প্রয়োজন হয়। একজন মন্ত্রী বা রাজনৈতিক নেতা একটা সিদ্ধান্ত দিতে যাচ্ছেন, সেই সিদ্ধান্ত জনকল্যাণকর হবে নাকি ক্ষতিকর হবে, সেই সত্যটা সরকারকে কে দেবে? অন্যের দৃষ্টিতে ওই সিদ্ধান্ত ভুলও হতে পারে। সেই সত্যটা সরকারের কাছে কে পৌঁছাবে? স্বাধীন সংবাদমাধ্যম। একমাত্র স্বাধীন সাংবাদিকতা থাকলেই সেটা সম্ভব। স্বাধীন তথ্যপ্রবাহ না থাকলে সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সরকার।

 

সাংবাদিক বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে প্রভাবিত, সেটা কীভাবে দেখেন?

এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। সাংবাদিকতা পেশার যে মাহাত্ম সেটা আমরা সাংবাদিকরা অনেকেই বোধহয় ভুলে যাচ্ছি। ডাক্তার যদি তার পেশার গুরুত্ব ভুলে গিয়ে ওষুধ বিক্রির চিন্তা করে ডাক্তারি করেন, দু-একটা ওষুধে যে রোগী ভালো হয়, অহেতুক তাকে যদি ১০-১২টা ওষুধ খাওয়ান, সেটা যেমন তার পেশার মাহাত্মকে কলুষিত করবে, তেমনি সাংবাদিকতায়ও তার ব্যতিক্রম নয়। রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে পারে, কিন্তু পেশাতে সেটার প্রভাব থাকা যাবে না। আমি মনে করি, একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ পেশা সাংবাদিকতা। সাংবাদিকরা অন্তর থেকে উপলব্ধি করতে পারছেন না যে, তারা কী একটা মহৎ সমাজসেবামূলক পেশায় জড়িত।

 

নবীন সাংবাদিকদের উদ্দেশে পরামর্শ কী?

আমার কথা খুব স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন চাইলে কারও এই পেশায় আসা উচিত নয়। এ পেশায় খুব টাকা-পয়সা নেই, নির্ঝঞ্ঝাট জীবন হবে না, সময়ের ধরাবাঁধা নিয়ম নেই, সারা দিন কষ্ট করে তথ্য সংগ্রহ করে একটা নিউজ লিখলেন, ছাপার আগ মুহূর্তে দেখলেন ওই ঘটনার অন্য অ্যাঙ্গেল তৈরি হয়ে গেছে বা অন্য কোনো বড় ঘটনা ঘটেছে, তখন আপনাকে নতুন করে কাজ শুরু করতে হবে। এটা একটা জটিল পেশা, পয়সা-কড়ি নেই কিন্তু সমাজসেবা করার বিরাট সুযোগ আছে। কেবল দেশ, মানুষ ও সমাজের জন্য কাজ করার আকর্ষণ থাকলেই কারও সাংবাদিকতায় আসা উচিত।

 

এতসব কাজে পরিবারের সমর্থন পান কেমন?

আমার স্ত্রীর সম্পূর্ণ সমর্থন না পেলে ডেইলি স্টার শুরু করতে পারতাম না। আমি তখন জাতিসংঘে কাজ করি, খুব ভালো মাইনে পাই, লোভনীয় পেনশন, আমি মরে গেলে পেনশনের অর্ধেক আমার স্ত্রী পাবে আমৃত্যু, আমার মেয়ের ২২ বছর বয়স পর্যন্ত শিক্ষার ৮০ ভাগ খরচ তারাই দেবে, অনেক ভালো একটা স্বাস্থ্যবীমা, পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় চিকিৎসা করাতে পারি। সাংঘাতিক আকর্ষণীয় একটা ক্যারিয়ার, নিশ্চিত জীবন। সেটা ছেড়ে বাংলাদেশে ফিরে কাগজ বের করার ইচ্ছা যখন আমার স্ত্রীকে বললাম, সে এককথায় রাজি হয়ে যায়। বলে, এটা যদি তোমার স্বপ্ন হয় তাহলে আমি তোমার সঙ্গে আছি। অথচ, আমি যখন ব্যাংককে থাকি আমার স্ত্রীও তখন জাতিসংঘের অন্য প্রতিষ্ঠান ইউএনএইচসিআর-এ চাকরি করে। সেও ব্যাংককে। সে আসতে না চাইলে আমারও আসা হতো না।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শুভেচ্ছা জানাই। পত্রিকাটির আরও সাফল্য কামনা করি।


আপনার মন্তব্য