Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, বুধবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:৪০
আমার স্বপ্নের বাংলাদেশ
জুয়েল আইচ
আমার স্বপ্নের বাংলাদেশ

আমার জন্ম পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি উপজেলার সমুদয়কাঠি গ্রামে। আমরা ছিলাম অনেক বড় একটি পরিবারের অংশ।

আমি যখন ছোট তখন আমাদের বাড়ি ছিল অনেক ঘরের সমষ্টি। এজন্য গ্রামে আমাদের বাড়িকে বলা হতো বড়বাড়ি। আমরা ৯ ভাই-বোন। আমার চাচাতো ভাই ছিল চারটে ও চাচাতো বোন একটি। সবাই একসঙ্গে থাকতাম। বাড়ির অন্য সদস্য মিলে অনেক মানুষ ছিল। আমাদের সবার এক হাঁড়িতেই রান্না হতো। বাবা পিরোজপুরেই থাকতেন। ব্যবসা করতেন। প্রতি শুক্রবার গ্রামে আসতেন। মা গৃহিণী। প্রচণ্ড পরিশ্রমী ছিলেন। আজকাল শহরের বাচ্চারা কবুতরের মতো বন্দী থাকে। আমরা তা ছিলাম না। আমাদের শৈশব ছিল জংলি পাখির মতো। আমাদের পায়ে শিকল দেওয়ার কেউ ছিল না। আবার ডেকে এনে ধান খা এটা বলারও কেউ ছিল না। খিদে লাগলে বসবি আর খিদে না লাগলে যা খুশি কর গিয়ে। তবে খুব সাবধান বাড়িতে যেন কোনো নালিশ না আসে। নালিশ এলে খবর আছে।

ছেলেবেলায় আমি একাডেমিক পড়া শুধু পাস করার জন্য মাসখানেক পড়তাম। বাকি এগার মাস অন্য বই পড়তাম, যা ভালো লাগে তাই করতাম। আমি নিজে আতশবাজি বানানো, ম্যাজিক, বাঁশি বাজানো, ছবি আঁকা, ভাস্কর্য বানাতাম। কেউ ছবি আঁকলে হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকতাম। আমার বাবার আঁকাআঁকির অভ্যাস ছিল। মাথায় কিছু এলে সেটা প্রাকটিক্যালি করতাম। মাটির প্রতিমা ও কাঠ দিয়ে স্কাল্পচার করতাম। বাঁশি বাজাতাম। আমি বাঁশি বাজানো শিখেছিলাম প্রতিবেশী নিতাই কৈবর্তের কাছে। পিরোজপুর থেকে ঢাকায় আসার পর ১৯৭২ ওস্তাদ আবদুর রহমানের কাছে শিখি। তিনি সর্বস্ব দিয়ে আমাকে শেখালেন। কোনো দিন পারিশ্রমিক নেননি। অতপর পণ্ডিত হরিপ্রসাদের বাজনা শোনার পর তাকে একটু দেখব এই ছিল আশা। তারপর তার সঙ্গে দেখা হলো। তিনি আমাকে এতই ভালোবাসলেন যে, প্রথম দিনেই দেখিয়ে দিলেন কীভাবে ফিঙ্গারিং করব। তিনি আমাকে শিখিয়েছেন জিবে স্টোক করে সেতারের মতো বাজাতে হয়। পণ্ডিত রবিশঙ্কর আমাকে ভীষণ আদর করতেন।

ছোটবেলায় বাড়ির বড়দের কাছে রূপকথার গল্প শুনতাম। একবার আমাদের বাড়ির পাশে বড় খালে কিছু নৌকা আসে। আমরা ছোটরা ভেবেছিলাম তারা কোনো ডাকাত দল হবে। পরে জেনেছি তারা আসলে বাইদা বা বেদে। তারা সাপের বিষ নামায়, জাদুখেলা দেখায়। নানারকম তন্ত্রমন্ত্র জানে। একদিন সকালে তাদের দেখতে গেলাম। গিয়ে দেখি তারা ছোট ছোট দল বেঁধে বিভিন্ন অঞ্চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যেহেতু তারা ম্যাজিক দেখায় এজন্য একজনকে খুব বিনয়ের সঙ্গে বললাম, আমাকে ম্যাজিক দেখাবেন। তিনি এক সের চাউলের শর্তে রাজি হলেন। আমি রাস্তা দেখিয়ে তাকে নিয়ে হাজির হলাম আমাদের উঠানের আমলকীতলায়। মায়ের কাছে ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর করতে একপর্যায়ে মা বিরক্ত হয়ে এক সের চাল দিয়ে দিলেন। তারা চাল পেয়ে আমাদের ম্যাজিক দেখালেন। বাটি গুটির খেলা দেখালেন।

আমি প্রথম জনসমক্ষে জাদু দেখাই আমাদের পাশের গ্রাম জলাবাড়ী হাটে। বহু মানুষ হয়েছিল। শো শেষে বেশির ভাগ মানুষ চলে গিয়েছিল। কয়েকজন বসে ছিল। তাদের মধ্যে এক দোকানদার আমাকে ও আমার সহযোগীদের ডেকে মিষ্টির দোকানে নিয়ে গেল। দোকানদারকে আমাকে দেখিয়ে বলল, ও যত রসগোল্লা খেতে পারে দাও। আর বাকি সবাইকে একটা করে দাও। সেদিন মহা-আনন্দে জিলাপি ও রসগোল্লা খেয়েছিলাম।

প্রথমবার মুক্তিযুদ্ধের সময়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো, গ্রামে আর্মি ঢুকে পড়ল। ওই সময় কেউ কেউ লুট-ডাকাতি করল। ওদের সরদার সে আমার বয়সী। আমাদের বাড়িতে সে এসেছে। তাকে আমি দুই রাত বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া করিয়েছি। সে-ই আমাদের বাড়িতে ডাকাতি করে। বাড়ির আসবাব সব নেওয়ার পর মেঝের সিমেন্ট খুঁড়ে দেখল গুপ্তধন কিছু আছে কিনা! যাকে আমি বন্ধু ভেবেছি সে যদি আমার বাড়িতে চুরি করে সেটা তো আগুন দেওয়ার চেয়ে বেশি। দ্বিতীয়বার গ্রাম্য হানাহানিতে। আমি বিভিন্ন স্থানে ম্যাজিক শো করি। তখন বড়রা পরামর্শ দিল তোমার একান্ত সাধনার জন্য নিজস্ব জায়গা দরকার। তখন আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু নিটুল কর ওদের একটি ঘর দিল আমাদের রিহার্সেল করার জন্য। ওদের বাড়িটা ছিল জলাবাড়ী হাটে নদীর পাশে। তখন নৌকায় করে বিভিন্ন জায়গায় সহজে যাওয়া যেত। এরপর চেয়ারম্যান ইলেকশনে নিটোলের সঙ্গে একজনের বিরোধ হলো। ওর বিরোধী পক্ষ ছিল খুব খারাপ মানুষ। তার ডাকাত দল এক রাতে নিটোলের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিল। পুড়ে গেল আমার সব জিনিসপত্র। বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ বেরোল। আমি ওই মফস্বলে বসে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের কতগুলো চিঠি পেলাম। তিনি তার সপ্তবর্ণা অনুষ্ঠানে আমাকে দিয়ে শো করাতে চান।

তার একাধিক চিঠি পাওয়ার পর একদিন বরিশালের এক ভদ্রলোক আমাকে বললেন, সায়ীদ সাহেব কী বললেন? আমি বললাম আমি তো যাইনি। তিনি বললেন, তুই জানিস তার অনুষ্ঠানের মূল্য। অনেকেই বসে থাকে তার অনুষ্ঠান দেখার জন্য। তুই শিগগিরই যা। তারপর একদিন সদরঘাট এসে নামলাম। আমার বন্ধু হারুন বলল, তোর যে জাদুর জিনিসপত্র পুড়ে গেল তার কী করলি? ও আমাকে পত্রিকা অফিসে গিয়ে দেখা করতে বলল। তখন বিচিত্রা আমাকে বড় একটা কাভারেজ দিল। বিচিত্রা সম্পাদক শাহাদৎ চৌধুরী আমাকে ডাকলেন। বললেন, কী হয়েছে? কত যায়? বার বার যায়। যারা ক্রিয়েটর তাদের ঘাবড়ে গেলে চলে! তুমি করবে তোমার মতো, কে ঠেকাবে? এরপর ১৯৭৭ সালের মার্চে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সঙ্গে দেখা। তিনি তখন অস্ট্রেলিয়া যাবেন। তারপর সপ্তবর্ণায় অংশ নিলাম। ১৯৮১ সাল থেকে বিশ্বের নানা দেশে শো করছি। মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি।

মুক্তিযুদ্ধ আমার জীবনে বড় অধ্যায়। ঢাকায় ৭ মার্চের ভাষণের সময় আমি উদ্যানে ছিলাম। ২৫ মার্চের বীভৎসতা দেখে কোনোরকমে জান নিয়ে পালাতে হয়েছে। তারপর গ্রামে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেই। পেয়ারাবাগানের এক যুদ্ধে আমরা পাঁচজন পাক আর্মিকে ধরে ফেলেছিলাম। আমাদের আর পায় কে! পিঠমোড়া দিয়ে বেঁধে নিলাম। কেউ তখনই মেরে ফেলবে, রাইফেলের বাঁট দিয়ে পেটাচ্ছে। বললাম, ‘থাম, এরা আমাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। লোকদের বুকে ভরসা আনতে হবে যে আমরাও পারব। ওরা একতরফা মেরে যাচ্ছে, এক তরফা পুড়িয়ে যাচ্ছে—সেটা হবার নয়। ওদের জ্যান্ত রাখতে হবে যত দিন সম্ভব। ’ পানিটানি খাওয়ালাম, খাবার দিলাম যতটুকু সম্ভব। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও হাট বসে। গলায় জুতা ঝুলিয়ে সবগুলোকে এক দড়িতে বেঁধে প্রতিদিন হাটে নিয়ে যেতাম। হাটের সাধারণ মানুষদের বলতাম, আপনারা ঘাবড়াবেন না। জয় আমাদের হবেই। তাদেরকে আমরা আতাভিমরুলি, আটঘর, কুড়িআনা এলাকায় ঘুরাই। তাদের অনেক দিন আটক রাখি। ওদের ধরার পর আমাদের এলাকায় আর্মিদের অত্যাচার আরও বেড়ে যায়। তারা সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দিত। ওরা এত হিংস ছিল যে, শিশু থেকে বৃদ্ধ কেউ ওদের হাত থেকে রেহাই পেত না।

আমাদের দলে মেয়েরাও মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। তারা খেলাধুলার সুযোগ ওইভাবে না পেলেও রাইফেল ট্রেনিং দিয়ে তাদের যোদ্ধা হিসেবে তৈরি করা হয়। একদিন ওই পাঁচজন পাঞ্জাবি সৈনিককে বেঁধে দেওয়া হলো নারী মুক্তিযোদ্ধাদের টার্গেট পয়েন্টে। আমাদের নারী মুক্তিযোদ্ধরা ওই পাঞ্জাবিদের মেরে ফেলে। তখন মানুষের মনে বিপুল সাহস হলো। সবচেয়ে বিস্ময় ছিল—ওই যুদ্ধের সময় আমরা পাঞ্জাবিদের ধরেছিলাম।

এদিকে রাজাকাররা আমাদের ওপর ভীষণ খেপে গেল। তারা বিভিন্ন বাড়িতে আগুন দিয়ে লুট করতে শুরু করল। গনিমতের মাল বলে অন্যের মালামাল তারা লুট করে ঘরে নিয়ে গেল। রাজাকারদের অত্যাচারে আমরা নদী পার হয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিলাম। সমুদয়কাঠির পাশে সেহানঙ্গল গ্রাম। যেখানে কুচক্রী মানুষের সংখ্যা খুব কম ছিল। নয় মাসে এই গ্রামে একজনও রাজাকার হয়নি। ওই সময় বহু মানুষের আশ্রয় তারা দিয়েছিল। তাদের উপকার কখনো ভুলে যাওয়ার নয়।

পিরোজপুরের এমএনএ এনায়েত হোসেনের বাড়ি ছিল সেহানঙ্গলে। তিনি চলে গিয়েছিলেন ভারতে। তিনি খলিল হাজরা নামে একজন পাঠিয়ে দেন মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুট করার জন্য। আমি, নিটোলসহ কয়েকজন তার সঙ্গে যুক্ত হই। আমরা যখন বাগেরহাটের কচুয়া পৌঁছলাম তখন নিটোল বলল, আমি আর যেতে পারব না। নিটোল বাড়ি ফিরে গেল। খলিল ভাই আর আমি হেঁটে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের ইছামতি নদী পার হয়ে ভারতের হিঙ্গোলগঞ্জে উঠলাম। সেখান থেকে গেলাম হাসনাবাদ ক্যাম্পে। এরপর দমদম ক্যান্টনমেন্টে। ওই সময় আমার পায়ে গ্যংগ্রিন হয়ে যায়। তখন চিকিৎসারত অবস্থায় আমি মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন মোটিভেশনমূলক কাজ করতাম। একটু সুস্থ হলে আমাকে বাহাদুরা ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয় মোটিভেশন করতে। সেখানে অনেক কাজ করেছি।

এনায়েত হোসেন খান সাহেবের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। আমি রবিবার ছুটি পেলে কলকাতায় যেতাম এনায়েত ভাইয়ের কাছে। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের সব খবরাখবর নিতাম। যুদ্ধ শেষে এনায়েত সাহেবের গাড়িতে স্বাধীন দেশে ফিরে আসি। এখনো এনায়েত সাহেবের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় আছে। মুক্তিযুদ্ধের আরও অনেক ঘটনা আছে। যা বারবার মনে পড়ে। এটা তো আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে মর্যাদার ব্যাপার। কারণ মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। আমি মনে করি, বাংলাদেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। বিশ্বের কাছে দেশের পরিচিতি আরও উজ্জ্বল করবে তরুণ প্রজন্ম।

 

লেখক : বিশ্বখ্যাত জাদুশিল্পী।

up-arrow