Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৮:৪০
আত্মসমর্পন করেছেন সুন্দরবনের ১৪ জলদস্যু
নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল
আত্মসমর্পন করেছেন সুন্দরবনের ১৪ জলদস্যু

সুস্থ স্বাভাবিক জীবনের আশায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে অস্ত্র-গুলি জমা দিয়ে আত্মসমর্পন করেছে সুন্দরবনের কুখ্যাত জলদস্যু ‘শান্ত বাহিনী’ ও ‘আলম বাহিনী’র প্রধানসহ ১৪ জলদস্যু। অতীত কৃতকর্মে অনুতপ্ত হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করার উদ্দেশ্যে বৃহস্পতিবার বেলা সোয়া ১২টায় বরিশাল নগরীর রূপাতলীতে র‌্যাব-৮ সদর দপ্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান খান কামালের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পন করেন ১৪ জলদস্যু।

এ সময় তারা দেশী-বিদেশি মোট ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ১ হাজার ৮ রাউন্ড গুলি জমা দেন।  

এর আগে গত বুধবার সুন্দরবনের শরনখোলা রেঞ্জে র‌্যাব-৮’র দিনব্যাপী অভিযান চলার সময় এই ১৪ জলদস্যু র‌্যাবের কাছে ধরা দেয় বলে জানিয়েছেন র‌্যাব-৮’র উপ-অধিনায়ক মেজর আদনান কবির।  

অনুষ্ঠানে অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস এমপি ও শেখ টিপু সুলতান এমপি, র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার এসএম রুহুল আমীন, ডিজিএফআই’র পরিচালক কর্নেল মিজানুর রহমান, র‌্যাব-৮ অধিনায়ক লে. কর্নেল ইফতেখারুল মাবুদ, অতিরিক্ত জিআইজি মো. আকরাম হোসেন, জেলা প্রশাসক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান সহ স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা এবং সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।  

আত্মসমর্পনের পর সুন্দরবনের আলম বাহিনীর প্রধান সাতক্ষীরার শ্যামনগরের আলম বলেন, মানুষ ভুল করে। তিনি ভুল করে খারাপ পথে চলে গিয়েছিলেন। এখন ভুল বুঝতে পেরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে অস্ত্র ও গুলি জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেছেন। ওই জীবন অন্ধকার, ওই জীবন আর ভালো লাগে না। তাই তিনি সহ তার সহযোগীরা স্বাভাবিক জীবনে ভালোভাবে বাঁচতে চান। তার বিরুদ্ধে থাকা একটি মামলার কি হবে তা নিয়ে চিন্তিত আলম।  

আরেক দস্যু সাতক্ষীরার শ্যামনগরের আবু বকর সিদ্দিক বলেন, তিনিসহ অন্যরা খারাপ জগতে ছিলেন। এখন ভালো হওয়ার আশায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পন করেছেন।  

আত্মসমর্পনকারী সুন্দরবনের আরেক জলদস্যু ‘শান্ত বাহিনীর’ প্রধান আব্দুল বারেক তালুকদার ওরফে শান্ত বলেন, গত ৪ বছর ধরে সুন্দরবনে দস্যুতা করেছেন তিনি। কিন্তু দস্যুতা করে নিজের এবং পরিবারের ভাগ্য বদলাতে পারেনি। কামাই করেছেন শুধুই বদনাম। তাই সুস্থ জীবনে ফিরে আসার উদ্দেশ্যে অস্ত্র জমা দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে সহযোগীসহ আত্মসমর্পন করেছেন তিনি। এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সরকারের সহযোগিতা চান তারা সবাই।  

আত্মসমর্পন করা ১৪ জলদস্যুর প্রত্যেকের নামেই রয়েছে একাধিক মামলা। এদের আদালতে সোপর্দ করে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দেয়ার পাশপাশি সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে তাদের পুনর্বাসন করার কথা জানিয়েছেন র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ।  

এছাড়াও নদীবিধৌত এই অঞ্চলে দস্যু, সন্ত্রাস এবং জঙ্গি নির্মুলে আধুনিক নৌযানসহ সুন্দরবন অঞ্চলে র‌্যাবের আরো একটি ব্যাটালিয়ন গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি। দস্যুতা, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ এবং জঙ্গীবাদ করে কেউ বাঁচতে পারবে না বলে বক্তৃতায় হুঁশিয়ারি দেন র‌্যাব মহাপরিচালক।  

আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান খান কামাল খুন এবং ধর্ষণ ছাড়া যাদের বিরুদ্ধে অন্যান্য লঘু অভিযোগ রয়েছে তাদের বিষয়টি সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনার কথা বলেন। তিনি বলেন, যারা বে-পথে চলে গেছেন কিংবা পথ হারিয়েছেন কিংবা যারা অনুতপ্ত হয়েছেন, যারা জঙ্গিবাদে চলে গিয়েছেন- অনুতপ্ত হয়েছেন, যারা জলদস্যুতায় চলে গিয়েছেন- অনুতপ্ত হয়েছেন, তাদেরকে ফিরে আসার জন্য প্রধানমন্ত্রী ডাক দিয়েছেন। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে তারা ফিরে আসবে, চলে আসবে, স্বাভাবিক জীবন-যাপন করে বাংলাদেশকে একটি শান্তিপূর্ণ দেশ বিনির্মানে সহযোগিতা করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন মন্ত্রী।  

মন্ত্রী বলেন, কেউ নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আত্মসমর্পন করলে রাষ্ট্র তাকে পুনর্বাসন করে সমাজের মূল ধরায় ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব গ্রহন করবে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই একাধিকবার এ ঘোষনা দিয়েছেন। গুটিকয়েক জঙ্গী-সন্ত্রাসীর জন্য উন্নয়নের অগ্রযাত্রা থেমে থাকবে না। সরকার কঠোর হস্তে সবধরনের উগ্রবাদ দমন করবে।  

আইন শৃক্সখলা বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য যা যা প্রয়োজন তার সব কিছুই বর্তমান সরকার করছে বলে বক্তৃতায় বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।  

আজ আত্মসমর্পণ করা ১৪ জন হলেন শান্ত বাহিনী প্রধান আব্দুল বারেক তালুকদার শান্ত, তার সহযোগী মনির হোসেন হাওলাদার, দুলাল মোল্লা , ফরিদ হাওলাদার, আনিছুর রহমান মোল্লা, বশির আহম্মেদ শেখ, ফরিদ গাজী, মোস্তফা শেখ, নুরুল ইসলাম, খোরশেদ শেখ এবং আলম বাহিনীর প্রধান আলম সরদার, হালিম গাজী, আবু বক্কর সিদ্দিক ও আসাদুজ্জামান। এদের মধ্যে শান্ত বাহিনীর সকলের বাড়ি বাগেরহাট জেলায় এবং আলম বাহিনীর সকলের বাড়ি সাতক্ষীরা জেলায়।  

এ নিয়ে চলতি বছর ৩দফায় ৬ হাজার ৫শ’ ২৮ পিস গুলি এবং ৯৭টি অত্যাধুনিক দেশী-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্রসহ সুন্দরবনের ৫টি দস্যু বাহিনী প্রধানসহ ৩৫ জন জলদস্যু র‌্যাবের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পন করেন।  

এর আগে গত ৩১ মে সুন্দরবনের মাস্টার বাহিনীর ১০ জন ৫২টি অস্ত্র ও সাড়ে ৪ হাজার রাউন্ডগুলি এবং ১৪ জুলাই মজনু ও ইলিয়াস বাহিনীর ১১ জন ২৫টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ১ হাজার ২০ রাউন্ড গুলিসহ আত্মসমর্পন করেন।

এদিকে, একের পর এক বাহিনী প্রধানসহ জলদস্যুরা অস্ত্র সহ আত্মসমর্পন করায় সুন্দরবন সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে এবার দস্যুতা অনেক কমে গেছে এবং এ কারনে জেলেরা সাগরে প্রচুর ইলিশ শিকার করতে পারছে বলে জানিয়েছেন অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া বরিশাল জেলা মৎস্য আড়তদার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অজিত কুমার দাশ মনু বাবু।  

 

বিডি-প্রতিদিন/ ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬/ আফরোজ

আপনার মন্তব্য

সর্বশেষ খবর
up-arrow