Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : ২৪ জুলাই, ২০১৮ ২৩:৪০ অনলাইন ভার্সন
আপডেট : ২৪ জুলাই, ২০১৮ ২৩:৫০
মাসিক সমস্যা গোপন রাখায় রোগ বাড়ছে নারীদের
আলী আজম
মাসিক সমস্যা গোপন রাখায় রোগ বাড়ছে নারীদের
সংগৃহীত ছবি

নারীদের মাসিক বা ঋতু কোনো অসুখ নয়। বরং এটা স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক। সাধারণত ৯ থেকে ১৮ বছর বয়সে মাসিক শুরু হয়। পৃথিবীর সকল নারীকেই এই প্রাকৃতিক পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আমাদের মা-খালারাও উঠতি বয়সে মাসিক বা ঋতুচক্রের অভিজ্ঞতা মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। সাধারণত এটি প্রতি ২৮ দিন পরপর হয়ে থাকে, তবে এর আগে ও পরেও হতে পারে। যা ৩ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। একজন নারীকে ভবিষ্যতে সন্তানসম্ভবা হতে শারিরিকভাবে প্রস্তুত করে এই মাসিক।

একজন নারী প্রাথমিক স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিক গন্ডিতে পা রাখার পর সাধারণত মাসিক শুরু হয়। সে নিজেও এ বিষয়ে প্রস্তুত থাকে না। ফলে যার মাসিক হচ্ছে সে প্রোডাক্ত ফ্যাসিলিটিস না থাকার কারণে ও লোকলজ্জার ভয়ে স্কুলে আসছে না। মা-বাবার সাথে শেয়ার করছে না। এমনকি বন্ধু-বান্ধবীকেও অবহিত করছে না। নিজেকে লুকিয়ে রাখতে নানা অভিনয় করে যেতে হয়। ফলে ভুক্তভোগী প্রায়ই একাকিত্বে ভোগে। প্যাড বা পরিচ্ছন্ন কাপড় ব্যবহার না করায় বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

মেয়েদের মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সিমাভি, রেডঅরেঞ্জ, টিএনও, বিএনপিএস ও ডরপ কাজ করছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো সমন্বনিতভাবে ঋতু নামক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। যা মেয়েদের মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার পরিবেশ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে। এই উদ্যোগটিতে অর্থায়ন করছে বাংলাদেশে নেদারল্যান্ডের দূতাবাস।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের গাইনী বিভাগের অধ্যাপক ডা. মুনিরা ফেরদৌসী বলেন, মাসিক একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এটি গোপন করার বিষয় না। এটা সাধারণত ২৮ দিন পর পর হয়ে থাকে। তবে দু-একদিন আগে-পরে হতে পারে। মাসিকের পূর্বে নারীদের মাথা ব্যথা, মাথা ঝিমঝিম করা, খিদে না পাওয়া, বমি বমি ভাব, স্তন ফুলে যাওয়া, অল্পতেই অবসাদ অনুভব করা, ঘুমের সমস্যা, কোন কোন মহিলার ক্ষেত্রে মেজাজের পরিবর্তন হওয়া ও খিটখিটে হয়ে যাওয়া মানসিক ও শারীরিক পরিবর্তন হতে পারে। তবে এসব লক্ষণের সবগুলো সবার মধ্যে নাও দেখা যেতে পারে। মাসিকের সমস্যা হলে সেটিও গোপন করা উচিত নয়। মাসিকের সময় সমস্যা হলে অতি সত্ত্বর ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

মাসিকের সময় ক্যালেন্ডার অথবা ডায়েরীতে মাসিক শুরু বা শেষ হবার তারিখ এবং মাসিক পূর্ব সিনড্রম-বা উপসর্গগুলো লিখে রাখতে হবে। স্যানিটারি ন্যাপকিন/ প্যাড, কাপড় ব্যবহারে সতর্ক হতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য প্যাড বা কাপড় পরিবর্তনের আগে ও পরে ভালোমত হাত পরিষ্কার করতে হবে; প্রতি ৩/৪ ঘণ্টা পর প্যাড পরিবর্তন করতে হবে এবং প্যাড বা কাপড়টি ভালো করে মুড়ে আবর্জনার মধ্যে ফেলতে হবে। 

মাসিকের সময় সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করতে হবে। শর্করা সম্বলিত-শস্য, ডাল, শাকসবজি, দই, আলু খেতে হবে। আমিষ জাতীয় খাদ্য যেমন: দুধ, ডিম, বাদাম, মাছ ও মাংস খেতে হবে। আয়রণ বা লৌহ জাতীয় খাদ্য যেমন-ডিম, সিম, পালংশাক, আলু, কলা, আপেল, গুড়, খেজুর, কালোজাম ইত্যাদি খেতে খেতে হবে। ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ খাদ্য যেমন-বাদাম, সয়াবিন, গাঢ় সবুজ শাকসবজি খেতে হবে। ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার-দুগ্ধজাত খাবার, দুধ, ডিম, বাদাম এবং সয়াবিন খেতে হবে। কম লবণযুক্ত খাবার খেতে হবে। তাজা ফলের রস পান করতে হবে এবং অতিরিক্ত চা-কফি পান থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রতিদিন ৮-১০ গ্লাস পানি পান করতে হবে।

একটি সংস্থার মতে, নানা কুসংস্কারে ৮৬ ভাগ মেয়ে স্কুল বা বাইরে থাকলে প্যাড পরিবর্তন করে না। গার্মেন্টস সেক্টরে ৮০% কর্মরত নারী মাসিক পিরিয়ড অতিবাহিত করেন। ঋতুকালে ব্যবহৃত কাপড় পরিচ্ছন্নভাবে শুকানো, এর সঠিক ব্যবহার, প্যাড ব্যবহার করলে তা সাশ্রয়ী কিনা, কত সময় ধরে ব্যবহার করছে তা নিশ্চিত করতে না পারলে রিপ্রোডাকটিভ সিস্টেম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। দেখা দিতে পারে নানা রোগ।

স্যানিটারি প্যাড বাজার থেকে কেনা বা বাড়ির কাউকে দিয়ে কিনে আনা মেয়েদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। একটা আড়ষ্টতা কাজ করে। তাই বাধ্য হয়ে অনেক সময় অপরিষ্কার কাপড় ব্যবহার করে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ঋতু বিষয়টি সম্পৃক্ত। বেশি গুরুত্বপূর্ণ যখন কোনো মেয়ে ভ্রমণে থাকে। তাই এর গুরুত্ব জনসাধারণের কাছে তুলে ধরে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

আর এইচ স্টেপের নির্বাহী পরিচালক কাজী সুরাইয়া সুলতানা জানান, সমাজে সুস্থ নারীর পাশাপাশি অনেক ডিজঅ্যাবল নারীও রয়েছে। আমাদের সবাইকে নিয়েই কাজ করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন একটা প্লাটফরম; যার মাধ্যমে আমাদের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাব। মাসিকবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সক্ষম হব।

রেড অরেঞ্জের কমিউনিকেশন অ্যাডভাইজার ইরেন বার্টেডলস জানান, মাসিকের অব্যবস্থাপনার জন্য নারীদের প্রজননক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নারীরা নানা রোগে আক্রান্ত হন। তাই মাসিককে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা কর্মক্ষেত্রসহ সব জায়গায় স্বাভাবিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের উপ-পরিচালক শাহনাজ সুমী জানান, ঋতুস্রাব ইস্যুটি শুধু স্বাস্থ্য সেবা, ন্যাপকিন প্যাড কিংবা স্যানিটেশনের সঙ্গেই জড়িত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একেকজন মেয়ের জীবন, যা জাতির জীবনে চরমভাবে প্রভাব ফেলে। 
ইউনাইটেড ফর বডি রাইটস অ্যালায়েন্স বাংলাদেশের টিম লিডার ডা. আয়েশা সিদ্দিকা জানান, ঋতু বিষয়ে সচেতনতা আমাদের সমাজের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের মাঝে এই বিষয়টির গুরুত্ব বোঝাতে হবে।

রেড অরেঞ্জ মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশনের হেড অব প্রোগ্রামস নকীব রাজীব আহমেদ জানান, ঋতু প্রকল্পের অন্যতম প্রধান বিষয় জাতীয় পর্যায়ে গণ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন টিভি, রেডিও, সংবাদপত্র, ইন্টারনেট ও ফেসবুক ব্যবহার করে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি তুলে ধরা। যাতে সবাই বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে এবং কথা বলে। এছাড়া সবার মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে যাতে এ বিষয়টির গুরুত্ব সুস্পষ্ট হয়।


বিডি প্রতিদিন/২৪ জুলাই ২০১৮/হিমেল

আপনার মন্তব্য

এই পাতার আরো খবর
up-arrow