Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : সোমবার, ১৩ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৩ জুন, ২০১৬ ০১:৫১
দখলে হারাচ্ছে চকের প্রাচীন নিদর্শন
শ্যামপুর টু লালবাগ ৬
মাহবুব মমতাজী
দখলে হারাচ্ছে চকের প্রাচীন নিদর্শন

প্রাচীন ঐতিহ্যমণ্ডিত পুরান ঢাকার চকবাজার থানা এলাকাটি এক সময় অত্যন্ত সুপরিকল্পিত, সুন্দর ও ছিমছাম একটি নগরী ছিল। কিন্তু মুঘল শাসকদের পতনের পর থেকে পুরান ঢাকায় যেন বিপর্যয় নেমে আসে।

ব্রিটিশ শাসকরা এ শহরের কিছু দেখভাল করলেও বর্তমান সময়ের প্রশাসনযন্ত্রের অবহেলায় পুরান ঢাকা ধীরে ধীরে তার শ্রী, ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো হারিয়ে ফেলতে শুরু করেছে। লালবাগ ও কোতোয়ালি থানার অংশ থেকে ২০০৯ সালের ৩০ আগস্ট চকবাজার মডেল থানা গঠন করা হয়। এখানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৮, ৩০ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডগুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এ এলাকায় প্রাচীন নিদর্শনাদি ও প্রত্নসম্পদের মধ্যে রয়েছে— হোসনি দালান, বড় কাটরা, ছোট কাটরা, মীর ইয়াকুব ইমামবাড়ী, করতলব খান মসজিদ ও হাসিনা মঞ্জিল। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে— চকবাজার শাহী মসজিদ, তাঁতখানা     লেন জামে মসজিদ, বায়তুল ইজ্জত শাহী মসজিদ, বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি কেন্দ্রীয় মসজিদ, লালবাগ ছাতা মসজিদ, খাজো দেওয়ান মসজিদ, আহমদিয়া মুসলিম জামাত মসজিদ, বকশীবাজার জামে মসজিদ, বায়তুল মামুর জামে মসজিদ, হজরত মাক্কুশাহর (রহ.) মাজার, ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রভৃতি। উল্লেখযোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো হলো— স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, ড. শহীদুল্লাহ কলেজ, তিব্বিয়া হাবিবিয়া কলেজ, মেট্রোপলিশ ডিগ্রি কলেজ, বেগম আনোয়ারা গার্লস কলেজ, শেখ বোরহানউদ্দিন পোস্টগ্র্যাজুয়েট কলেজ, বেগম আনোয়ারা মুসলিম বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, ইসলামবাগ আশরাফ আলী উচ্চবিদ্যালয়, ইসলামিয়া উচ্চবিদ্যালয়, নবকুমার ইনস্টিটিউট, চম্পাতলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পেয়ারু সর্দার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া। এখানে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্লাব রয়েছে ১১টি, জিমনেসিয়াম একটি, কমিউনিটি সেন্টার সাতটি ও খেলার মাঠ চারটি। আছে শহীদ মতিউর রহমান স্মৃতি কেন্দ্র ও লাইব্রেরি।

জানা যায়, ২০০৯ সালে সরকারি গেজেটে যে ৯৩টি ভবন ও চারটি এলাকাকে হেরিটেজ হিসেবে সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছিল, চকবাজারের মধ্যে থাকা সেসব স্থাপনা বাদ যাচ্ছে না ধ্বংসের হাত থেকে। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাধারণত শতাধিক বছরের পুরনো স্থাপনাকে হেরিটেজের তালিকায় রাখা হয়ে থাকে। ওই তালিকাভুক্ত স্থাপনা ভেঙে নতুন স্থাপনা গড়তে বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে হেরিটেজ তালিকায় থাকা এসব স্থাপনা ভাঙতে হলে রাজউকের বিশেষ অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে। ২০০৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি রাজউকের এক গেজেটে বলা হয়েছে, ‘নগর উন্নয়ন কমিটির অনুমোদন ব্যতীত তালিকাভুক্ত হেরিটেজ ভবন, স্থাপনা অপসারণ, পরিবর্তন, পরিবর্ধন এবং পুনর্নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হইল। ’ প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য আইন, ২০০৪-এর খসড়া আইনের ১৮ ধারায় বলা আছে, ‘কোন স্থাবর প্রত্নসম্পদ সংরক্ষিত ঘোষণা করা হইয়াছে (ভূমি মালিকানা যাহার থাকুক না কেন) উহার ধ্বংস, ভাঙা, বিনষ্ট, পরিবর্তন, ক্ষতিসাধন করা হইলে সর্বোচ্চ ১০ (দশ) বছরের কারাদণ্ড অথবা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবে। ’

জানা গেছে, ঐতিহাসিক যে কোনো স্থাপনার আশপাশের ২৫০ মিটার এলাকাকে ‘বাফার জোন’ বলা হয়, যেখানে কোনো বহুতল ভবন নির্মাণ নিষিদ্ধ। এ ছাড়া ছোট কাটরার কিছু অংশ দখল করেছে স্থানীয় কিছু সাবান ও প্লাস্টিক ফ্যাক্টরির মালিক। ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজার বাড়িটিরও পুরনো চিত্র বের করা প্রায় দুরূহ হয়ে পড়েছে, যার দেয়াল ও ভবন দখল প্রতিযোগিতায় নেমেছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা এমন অভিযোগ পাওয়া যায়। বংশসূত্রে ৬৪টি জন ব্যক্তির নামে লিজ দেওয়া হলে পরবর্তী সময়ে তারা নিজেদের মালিক দাবি করে ভবনের সামনে সাইনবোর্ড টানিয়ে দেন। এমনকি ডিআইটি ও রাজউকের মানচিত্র থেকেও ছোট কাটরা, বড় কাটরা ও ভাওয়াল জমিদারবাড়ী মুছে ফেলা হয়েছে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, মুঘল সম্রাট শাহজাহানের ছেলে শাহ সুজার নির্দেশে ১৬৪১ সালে নির্মিত হয় বড় কাটরা। আর মুঘল সুবাদার শায়েস্তা খান আনুমানিক ১৬৬৩-১৬৬৪ সালে নির্মাণ করেন ছোট কাটরা। এ দুটোই সে সময় ব্যবহার করা হতো সরাইখানা হিসেবে। ইংরেজ শাসনামলে ১৮১৬ সালে মিশনারি লিওনার্দ ছোট কাটরায় খুলেছিলেন ঢাকার প্রথম ইংরেজি স্কুল।

চকবাজারের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, হাফিজুল্লাহ রোডের ‘দারোগাবাড়ী’ নামে পরিচিত শতবর্ষী ভবনটির প্রায় ৫০ শতাংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। বিভিন্ন বহুতল ভবনের আধিক্যে আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে ঐতিহাসিক বিভিন্ন নিদর্শন, যেগুলো খুঁজে বের করতে ঐতিহ্যপ্রেমীদের বেশ বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ভবন নির্মাণ ও দখল চলছে কয়েক শ বছরের পুরনো মুঘল স্থাপত্য ছোট কাটরার ভিতর ও বাইরে। একই পরিস্থিতি বড় কাটরার ভিতরেরও। চারপাশে স্থানীয় এমপি হাজী সেলিম ও তেলমালিক সমিতির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আলীর মালিকাধীন বহুতল কোল্ডস্টোরেজ ও আবাসিক ভবনের কারণে সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলেছে ঐতিহাসিক নিদর্শন ছোট ও বড় কাটরা। এমনকি এসব ভবন নির্মাণ করা হয়েছে সোয়ারীঘাটের গড়ে ওঠা চরের জায়গায়। ১৪ নম্বর বেচারাম দেউরী পুরান ঘরটি অযত্নে-অবহেলায় পড়ে আছে বহু বছর ধরে। এর নিচের অংশে জুতার কারখানা বসানো হয়েছে। মৌলভীবাজারের আলী হোসেন খান রোডের দোকানপাট নির্মাণ করা হয়েছে রাস্তার বেশির ভাগ অংশ দখল করে। ১৬/২ বেচারাম দেউরী লেনের আজগরী মঞ্জিলের অবস্থাও একই। ৩৪ ও ৬৭ বেগমবাজারের বাড়িগুলো দেখলেই বোঝা যাবে শতাধিক বছরের পুরনো। এসব সংরক্ষণ ও সংস্কারের নেই কোনো ধরনের উদ্যোগ। মিটফোর্ড রোডের উত্তরা ব্যাংকের দক্ষিণ পাশের লাগানো ভবনটি উঁচু করা হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে। ১ নম্বর মকিম কাটরা কার দখলে জানে না কেউই। প্রাচীন নিদর্শন দখলের প্রতিযোগিতায় যেভাবে হারিয়ে যাচ্ছে তেমনিভাবে এখানে অসাধু ব্যবসায়ীদেরও দৌরাত্ম্য কম নয়। ছোট কাটরা এলাকার ১৬/এ নম্বর বাড়ি ও ৫/৫ ফিরোজা ম্যানসন গলি থেকে অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ফিল্টার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে আশপাশের বিভিন্ন দোকানে। একই সঙ্গে ইমামগঞ্জের নলগোলা, রাজবাড়ী ও জুম্মন বেপারী লেনে বিভিন্ন অলিগলিতে অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে পলিথিনের কারখানা।

আরও জানা যায়, মিটফোর্ড রোডের রেড ক্রিসেন্ট মার্কেটের সামনে ও চক মোগলটুলীর ইমামগঞ্জ মোড়ে ময়লা-আবর্জনার বিশাল স্তূপ রাস্তার ওপর ফেলে রাখা আছে। কাটা বটগাছ ৫৭ নম্বর বেচারাম দেউরীর পায়রা চত্বরটি তার সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলছে।

প্রাচীন স্থাপত্য ধ্বংস, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পানির জার সরবরাহ ও নিষিদ্ধ পলিথিন উৎপাদনে কে বা কারা জড়িত এমন প্রশ্নের উত্তর মুঠোফোনে জানতে চাওয়া হয় ২৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আনোয়ার হোসেন পারভেজের কাছে। কিন্তু তিনি এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। অপর দুই কাউন্সিলর মো. হাসান ও রফিকুল ইসলাম রাসেলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।

up-arrow