Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : রবিবার, ১০ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৯ জুলাই, ২০১৬ ২৩:২৪
ঈদ আসে, আনন্দ নিয়ে ছেলেমেয়ে আসে না
বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে মা-বাবার আকুতি
শেখ সফিউদ্দিন জিন্নাহ্
ঈদ আসে, আনন্দ নিয়ে ছেলেমেয়ে আসে না

চোখের জলে ঈদ আনন্দ উপভোগ করলেন গাজীপুর বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের বৃদ্ধ বাবা-মায়েরা। এখানে আশ্রিত মা-বাবার ঈদ উদযাপন হয় প্রিয় সন্তানদের কাছে না পাওয়ার আক্ষেপ বুকে নিয়ে। শুধু আক্ষেপই নয়, এ যেন সন্তান জীবিত থেকেও না থাকার মতো অবস্থা। বেশ কজন হতভাগ্য বৃদ্ধ মা-বাবার সঙ্গে কথা হয় ঈদের দিন সকালে। সকাল পৌনে ৮টায় গাজীপুরের বিশিয়া কুড়িবাড়ি এলাকার বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করেন আশ্রিতরা। নামাজ শেষে তারা পরস্পরের সঙ্গে কোলাকুলি করেন। নামাজের পর সেমাই, পিঠা দিয়ে সকালের নাস্তা করেন। ঈদের নামাজ সকালের নাস্তা এসবের মধ্য দিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রের বয়স্করা আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন। তবে সাময়িক এই আনন্দের মধ্যে তাদের চোখে-মুখে হতাশার ছাপ দেখা যায়। চোখ ছলছল করে তাকিয়ে থাকেন এই বুঝি বাড়ি থেকে কোনো স্বজন এলেন। অথবা বাড়ি থেকে প্রিয় খাবার এলো।

ঈদের দিন সকাল থেকেই আশ্রিতরা অপেক্ষা করেন সন্তান-সন্তুতি বা নিকটাত্মীয় কেউ এসে দেখা করবেন। কিন্তু আশা-নিরাশার মধ্য দিয়েই উৎসব-আনন্দের ঈদের দিনটি কাটিয়ে দিলেন বৃদ্ধ বাবা-মা। তারা জীবনের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নিয়েছেন এই বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র। সেমাই মুখে দিতেই অশ্রু ঝরে পড়ে অশীতিপর বৃদ্ধ মিজানুর রহমানের। তার মনে পড়ে সুখের সেই দিনগুলোর কথা। নেত্রকোনা শহরের ৮০ বছরের বৃদ্ধ মিজানুর রহমান (ছদ্মনাম)। দুই ছেলে এক মেয়ের জনক। পেশায় ছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী। দুই ছেলে ও মেয়েকে উচ্চ শিক্ষিত করান। বড় ছেলে ঢাকায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন আর ছোট ছেলে নেত্রকোনা শহরেই ব্যবসা করেন, একমাত্র মেয়েকে বিয়ে দেন ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে। তিনি বলেন, আমার সন্তানরা যখন ছোট, টু-থ্রিতে পড়ে। ঈদের দিন আমি আমার ছেলেদের পাঞ্জাবি-পাজামা পরিয়ে কোলে, কাঁধে করে ঈদগাহ মাঠে নিয়ে যেতাম। ছেলেদের নিয়ে নামাজ আদায় করতাম। তাদের পটকা কিনে দিতাম। তারা খুব খুশি হতো। নামাজ শেষে বাড়িতে এসে একসঙ্গে বসে সেমাই খেতাম। এসব স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে আবু তালেব কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, আমার ছেলেমেয়েরা বড় হলে তাদের বিয়ে দিই। নাতি-নাতনি হয়। কিন্তু সংসারে নানা সমস্যা দেখা দেয় ছেলেদের বিয়ের পর থেকেই। আমি বয়োবৃদ্ধ এবং আমার স্ত্রী না থাকায় আমার সেবা-যত্ন করতে নারাজ ছেলের বউরা। কিছু না হতেই ছেলে বউরা মুখ বেজার করে থাকে। আবার ছেলেরা বাড়িতে এলে তারা আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে। আর এসব দেখে মেয়ে সহ্য করতে না পেরে আমাকে বেড়ানোর কথা বলে এই বৃদ্ধাশ্রমে রেখে যায়। মাঝে-মধ্যে মেয়ে খবর নিলেও ছেলেরা তেমন একটা খবর নেয় না। এখানে তিন বছর ধরে আছি। ইয়াকুব আলী খান (৮৩) ছিলেন বিমান বাহিনীতে। তিনি বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের সঙ্গে ছিলাম। কিন্তু যুদ্ধে অংশ নিতে পারিনি। আমার ছেলে বেসরকারি চাকরি করে, কিন্তু তার ঘরে ঠাঁই হয়নি আমার। আমার মেয়ে একদিন না জানিয়ে এখানে এনে রেখে যায়। তিনি বলেন, আমার বড় ছেলের কন্যা ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। সে বলেছে, দাদু আমি পড়াশোনা শেষে চাকরি নিয়ে তোমাকে নিয়ে একটি বাসায় উঠব। তুমি একটু কষ্ট করে কিছু দিন এখানে থাক।

ঢাকার কেরানীগঞ্জের সামসুদ্দিন খান হিরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন ইংরেজিতে। এই বৃদ্ধের ঠাঁই হয়নি ছেলের বাসায়। তাই স্বেচ্ছায় এখানে চলে আসেন তিনি। দীর্ঘদিন কুয়েত, দুবাই প্রবাসী জীবন কাটিয়ে দেশে এসে ব্যবসা করেন চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার আলী নেওয়াজ। বলেন, আমার কোনো ছেলে সন্তান নেই। আছে তিনটি মেয়ে। তিন মেয়েকে বিয়ে দিই চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন এলাকায়। মেয়েরাই আমাকে এখানে রেখে যায়।

৭২ বিঘার এই আশ্রয় কেন্দ্রে বয়স্কদের থাকার জন্য পুরুষ-মহিলাদের আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। পাঁচতলা তিনটি ভবন ও টিনশেডের একটি বড় ভবন রয়েছে। প্রতি কক্ষে দুই সারি করে ৮ বেডে আটজন করে বয়স্ক থাকেন। এখানে একটি ক্লাসরুমও রয়েছে। সপ্তাহের দুই দিন পুরুষদের এবং দুই দিন মহিলাদের বিভিন্ন নিয়ম-শৃঙ্খলা শিক্ষা দেওয়া হয়। এখানে রুটিন অনুযায়ী খাবার দেওয়া হয়। চিকিৎসার জন্য রয়েছে আলাদা মেডিকেল ইউনিট। তিনজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও দুজন সেবিকা রয়েছেন। জরুরি প্রয়োজনে রয়েছে একটি অ্যাম্বুলেন্স এবং একটি পুলিশ ক্যাম্পও। বিনোদনের জন্য রয়েছে টিভি রুম, কমনরুম এবং পত্রপত্রিকা ও বইপুস্তক পড়ার সুবিধাও রয়েছে। বয়স্কদের পরিচর্যার জন্য রয়েছে ১৭ জন পুরুষ-মহিলা। ১৯৯৫ সালের ২১ এপ্রিল মাদার তেরেসা কেন্দ্রটি পরিদর্শন করেন।

বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করেন শিল্পপতি গিভেন্সি গ্রুপের চেয়ারম্যান খতিব আবদুল জাহিদ মুকুল। তিনি ১৯৮৭ সালে ঢাকার উত্তরা আজমপুর এলাকায় এটি প্রথমে প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুর দিকে মাত্র ১৪ জন বয়স্ক ছিলেন ওই আশ্রয় কেন্দ্রে। পরে কেন্দ্রটি ১৯৯৪ সালে গাজীপুরে স্থানান্তর করেন। আশ্রয় কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক আবু শরীফ জানান, বয়স্কদের সম্পূর্ণ খরচ আমরা বহন করি। এখানে বর্তমানে থাকছেন ২১০ জন বৃদ্ধ মা-বাবা। এর মধ্যে পুরুষ ১০৩ ও মহিলা ১০৭ জন। ২০ জন হিন্দু এবং ৩ জন খ্রিস্টান রয়েছেন।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow