Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, রবিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২২:৫২
মাস শেষে ‘আলসেমি ভাতা’ পান কয়েকশ কর্মচারী
বরিশাল সিটি করপোরেশনে চমৎকার ব্যবস্থা
রাহাত খান, বরিশাল

বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) বিভিন্ন শাখায় আউটসোর্সিং খাতে অর্থাৎ মাস্টাররোলে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাগজে-কলমে কাজ করেন প্রায় দেড় হাজার কর্মচারী। প্রতি মাসে তাদের পেছনে করপোরেশনের ব্যয় এক কোটি ১০ লাখ থেকে ১২ লাখ টাকা।

যথাসময়ে বেতন না দিতে পারলেই শুরু হয় আন্দোলন। এতে করপোরেশনের কাজে যেমন স্থবিরতার সৃষ্টি হয়, তেমনি সেবাবঞ্চিত হয় নগরবাসী। কিন্তু যাদের পেছনে প্রতি মাসে কোটি টাকা ব্যয় হয়, যাদের কারণে নাগরিক সেবা বাধাগ্রস্ত হয় সেই মাস্টাররোল কর্মচারীদের নিয়োগ কবে, কীভাবে হয়েছে তার কোনো হদিস নেই কারোর কাছে। সিটি করপোরেশনের ব্যয়সংকোচন নীতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পর্যবেক্ষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে করপোরেশনের সবগুলো বিভাগের মাস্টাররোল কর্মচারী নিয়োগ প্রক্রিয়া তলব করেছেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ওয়াহিদুজ্জামান।

বিসিসি কর্মচারীরা বলেছেন, দেড় হাজার কর্মচারীর বেশির ভাগই জানেন না তারা কোন শাখায় কাজ করেন, কী তাদের দায়িত্ব। তারা জিন্স প্যান্ট এবং ভালো মানের শার্ট পরে ঘুরে বেড়ান, নিজেদের ব্যবসা-ধান্ধা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, মাস শেষে শুধু সিটি করপোরেশন থেকে বেতন নিয়ে যান। করপোরেশনের অনেকেই এই বেতনকে ‘আলসেমি ভাতা’ বলে থাকেন। সূত্র জানায়, আগে আউটসোর্সিং খাতে প্রায় ১২০০ কর্মচারী নিয়োগ করা হয়েছিল।

বর্তমান মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার পর এ খাতে প্রায় আড়াইশ কর্মচারী নিয়োগ করেন। কাজ না করার প্রবণতা এই নতুনদের মধ্যেই বেশি। সদর উপজেলার টুঙ্গিবাড়িয়া ইউপি সদস্য বিএনপি নেতা হুমায়ুন কবির কামালও দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে বিসিসিতে কাজ করছেন। তিনি নিয়োগ পেয়েছেন বর্তমান মেয়রের শুরুর দিকে। জনপ্রতিনিধি হয়েও মাস্টাররোলে চাকরি করার বিষয়ে জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিসিসির এক স্থায়ী কর্মচারী জানান, স্টোর অফিসার মো. আলমগীর হোসেন একাই তার ফুট-ফরমায়েশ করানোর জন্য ৫ জন কর্মচারী খাটান। সেটেলমেন্টের কর্মচারী তার স্ত্রীর দুপুরের খাবার অফিসে পৌঁছে দেওয়া, বাসার বাজার-সদায়-দুধ পাঠানোসহ ব্যক্তিগত কাজেই ব্যস্ত রাখেন ৫ কর্মচারীকে। তার মতো অনেকেই মাস্টাররোল কর্মচারীদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত রাখেন। একজন প্রভাবশালী কাউন্সিলরের ভাতিজা আবিদ হাসান সাব্বিরকে বর্তমান মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার পর কর আদায় শাখায় কাজে দেওয়া হয়। দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরি ভিত্তিতে ২-৩ মাস কাজ করার পর এখন আর তিনি অফিসে আসেন না। শাখা প্রধান বিল করেন, তিনি এবং তার মতো ঘুরে বেড়ানোরা মাস শেষে বেতন নিয়ে যান। বর্তমান মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যুৎ শাখায় তানজিলা নামে এক মেয়েকে কাজ দিয়েছেন। দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরিভিত্তিক কর্মচারী ওই মেয়েটিও কাজে আসে না। মাস শেষে বেতন নিয়ে যান। তার মতো পানি শাখার আবদুস ছাত্তারও কাজ না করে বেতন পান। তড়িঘড়ি কাজ করে দেওয়ার কথা বলে বখশিশ নেওয়ার অভিযোগে জন্মনিবন্ধন শাখার কার্য সহায়ক মো. রিয়াজকে কিছুদিন আগে শাস্তিমূলক বদলি করা হয় প্রধান প্রকৌশলীর নগরীর ফজলুল হক এভিনিউর ব্যক্তিগত কনসালটেন্সি অফিসে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।

২০০৯ সালে প্রয়াত মেয়র শওকত হোসেন হিরণের আমলে মাস্টাররোলে চাকরি পেয়েছেন টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হুমাউন কবির। তিনি বলেন, মেয়র হিরণ তাকে মাসে ৩ হাজার টাকা বেতনে মাস্টাররোলে কাজ দিয়েছেন। বর্তমান মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার পর বেতন সাড়ে ৪ হাজার টাকা করা হয়। আবার বেতন বাড়িয়ে ৭ হাজার করা হয়। পরে আবার বেতন কমিয়ে সাড়ে ৪ হাজার করা হয়। তিনি বলেন, যুবলীগের পদে থাকলেও দলের কাজ এবং সিটি করপোরেশনের ল্যান্ড সার্ভে শাখায় যথাযথভাবেই দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

বিসিসির পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা দীপক লাল মৃধা বলেন, তার শাখায় প্রায় ৫০০ মাস্টাররোল কর্মচারী আছেন। তাদের নিয়োগ যথাযথ প্রক্রিয়ায় হয়েছে। তারা সবাই কাজে আসেন। তিনি বলেন, বর্তমান মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনিক শাখার মাধ্যমে ৫০ থেকে ৬০ জন কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছেন। তাদের কাগজপত্রে ঘাটতি থাকতে পারে।

নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, আউটসোর্সিং কর্মচারীদের অনেকে কাজ চায় কিন্তু সংশ্লিষ্ট শাখা প্রধানরা তাদের নির্দিষ্ট কাজ দেন না, আবার অনেকে হাড়ভাঙা কাজ করেন। আবার কাজ করেন না ঘুরে বেড়ান, মাস শেষে বেতন নিয়ে যান এমনও আছেন অনেক। কেউ কেউ বলেন মোট কর্মচারীর মধ্যে অন্তত ৫০ ভাগ নির্দিষ্ট কাজ করেন না। তবে ওই সূত্রটির দাবি এই হার কমপক্ষে ৩০ ভাগ।

বিসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, কাজ না করেও অনেকে মাস শেষে বেতন নেন, এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত করার সুযোগ নেই। করপোরেশনের ব্যয়সংকোচনের জন্য সব বিভাগীয় প্রধানদের কাছে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন আউটসোর্সিং কর্মচারীদের নিয়োগ প্রক্রিয়া যাচাই করা হচ্ছে। এরপর প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে মেয়র আহসান হাবিব কামালের ব্যক্তিগত দুটি মুঠোফোন নম্বরে কল দেওয়া হলেও দুটি ফোনই বন্ধ পাওয়া গেছে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow