Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : রবিবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২২:৫২
নিরবচ্ছিন্ন সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ দেওয়াই মূল চ্যালেঞ্জ
ডেইলি সানের গোলটেবিল বৈঠকে প্রতিমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক
bd-pratidin

বিদ্যুতে আমাদের সাফল্য অনেক। তবে গ্রাহকদের কাছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়াই আমাদের মূল চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে গ্রাহকদের সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ দিতে হবে। গতকাল রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়ার কনফারেন্স রুমে ডেইলি সানের আয়োজনে ‘বাংলাদেশ পাওয়ার সেক্টর রোডম্যাপ টু ভিশন ২০৪১’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এসব কথা বলেন।

নসরুল হামিদ বলেন, আমাদের শিল্প-কারখানাগুলোয় রাতেও কাজ হয়। এসব শিল্প-কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে হবে। শহরে বিদ্যুতের ভালো ব্যবহার হচ্ছে। এমনকি পড়ালেখা, ক্ষুদ্রশিল্পের প্রসারের জন্য গ্রামেও বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বিতরণ ও সংযোগ সমস্যার কারণে দেশের কিছু জায়গায় বিদ্যুৎ নিয়ে সমস্যা হচ্ছে বলে স্বীকার করেছেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাত-দিনে বিদ্যুতের ব্যবহার সম্পর্কে আমাদের সচেতন হতে হবে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে সন্ধ্যা ৭টা-৮টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। ভবিষ্যতে অঞ্চলভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ আমদানির বিষয়টি নিয়েও চিন্তা-ভাবনা চলছে। বিদ্যুতের চাহিদার কোনো শেষ নেই। বর্তমানে দেশে একজন মানুষ প্রতি ঘণ্টায় ৫০০ কিলোওয়াট  বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন। ২০২১ সালে প্রতিজনের ঘণ্টায় এক হাজার কিলোওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। শিল্পায়ন অপরিকল্পিতভাবে হলে সেখানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হবে না। বিশেষ করে আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জের মতো স্থানে পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সুবিধা দিতে হবে। বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ড. আহমদ কায়কাউস তার বক্তব্যে বলেন, বিদ্যুতে আমরা ২০৪১ সাল পর্যন্ত রোডম্যাপ তৈরি করেছি। অর্থাৎ আমরা এগিয়ে আছি। স্থানীয় কিছু সমস্যার কারণে দেশের কোথাও কোথাও লোডশেডিং হচ্ছে। বিশেষ করে বড়পুকুরিয়ায় কয়লার অভাবে রংপুর, রাজশাহীতে লো ভোল্টেজের জন্য ফোর্সড লোডশেডিং হচ্ছে। বিগত এক দশকে ১০ বার বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে, এরপরও গ্রাহকরা কোনো অভিযোগ করেনি। উল্টো তারা সংযোগ চাচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মিনারেল রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের অধ্যাপক ম তামিম বলেন, বিদ্যুৎ খাতে অনেক সফলতা এসেছে। কিন্তু কিছু বিষয়ে ভোক্তাদের মধ্যে দ্বিমত আছে। বিদ্যুৎ নিয়ে ভোক্তারা শতভাগ খুশি না। তেলের মাধ্যমে এখনো মোট বিদ্যুতের ৩২ শতাংশ উৎপাদন করছি। খুব কম দেশে এটা হচ্ছে। ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা ও এলএনজির ওপর জোর দেওয়া হবে। কিন্তু এলএনজি বিষয়ে আমাদের অভিজ্ঞ জনবলের অভাব আছে। আর দক্ষ জনবল ছাড়া প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ সম্ভব নয়। বুয়েটের এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ইজাজ হোসেইন বলেন, মেগাওয়াট গেমে সরকার অনেক লক্ষ্য অর্জন করেছে। এবার মেগাওয়াট গেমের বদলে অন্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। আমরা এখনো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন করতে পারিনি। আবার সরকার দেশে কোনো লোডশেডিং নেই বললেও গ্রাহকরা বলছে তাদের এলাকায় লোডশেডিং হচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদক পীর হাবিবুর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ ছাড়া দেশ অন্ধকার। সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় সরকারের হাতে নীতিমালা রেখে বেসরকারি খাতকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যুক্ত করলে দেশের উন্নতি হবে। গ্রামে এখন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ। সামনে এগিয়ে যেতে হলে সরকারের সঙ্গে বেসরকারি খাতকেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে হবে। নিউজ টোয়েন্টিফোরের নির্বাহী পরিচালক হাসনাইন খুরশেদ বলেন, সরকার নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে কাজ করছে, কিন্তু আমাদের বিদ্যুতের প্রকৃত চাহিদা কত এবং আগামী ২০২১ সালে এই চাহিদা কত হবে তা জানতে হবে।

পাওয়ার সেল-এর মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসেইন বলেন, আমরা ২০২১ সালের মধ্যে সবাইকে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে চাই। বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এ ছাড়া আমাদের গ্রাহক সংখ্যাও তিন কোটি ছাড়িয়ে গেছে। ২০০৯ সালে বিদ্যুৎ একবার গেলে আর আসত না। কিন্তু এখন বিদ্যুৎ গেলে গ্রাহক সঙ্গে সঙ্গে ফোন দিয়ে বিদ্যুৎ কখন আসবে তার খোঁজ নেন। আর বিদ্যুৎ খাতের এই উন্নয়নের জন্য বেসরকারি খাতেরও ভূমিকা আছে। বিদ্যুৎ রোডম্যাপ অনুযায়ী ২০৪১ সালের মধ্যে ৩৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কয়লায় উৎপন্ন হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তবে তা জ্বালানি সাশ্রয়ী হবে কিনা সে বিষয়টি দেখা হচ্ছে। আমাদের গ্রিড লাইনে কিছু সমস্যা আছে। সারা দেশে ১১ হাজার কিমির বেশি গ্রিড লাইন লাগানো হয়েছে। এই গ্রিড আরও তিনগুণ বৃদ্ধি করার জন্য কাজ করা হচ্ছে। এ ছাড়া স্মার্ট প্রি-পেইড মিটারের ফলে গ্রাহকদের ভুতুড়ে বিলের সমস্যা শেষ হবে।

পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মঈন উদ্দিন (অব.) বলেন, দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়নের কাজ ২০১৮-১৯ অর্থবছরের মধ্যেই শেষ হবে বলে আমরা আশা করছি। গত তিন-চার বছরে আমরা ৩৯ লাখ গ্রাহককে বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে পেরেছি। যদিও সরকারের প্রথম মেয়াদে সংযোগ দেওয়ার গতি কম ছিল। কাল বৈশাখীর সময় গাছপালা উপড়ে গেলে আমাদের বিদ্যুৎ সংযোগে সমস্যা হয়। আর গুণগত বিদ্যুৎ পেতে আমাদের আরেকটু সময় লাগবে।

বিজিএমইএর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ফারুক হাসান বলেন, ২০০৯ সালে আমাদের পোশাক খাত থেকে রপ্তানি আয় ছিল ১১ মিলিয়ন ডলার, যা বর্তমানে বৃদ্ধি পেয়েছে তিন গুণ। আর এটি সম্ভব হয়েছে শুধু বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য। কারখানাগুলোতে আগের মতো লোডশেডিং নেই। কিন্তু কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যার জন্য লোডশেডিং হচ্ছে। কারখানাগুলোতেও আমরা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছি। বিদ্যুতের সরবরাহের ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করতে হবে। বিদ্যুতের মূল্যও কমাতে হবে।

সামিট পাওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লে. জেনারেল আবদুল ওয়াদুদ (অব.) বলেন, আমাদের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে সালফার কমাতে হবে। আমি মনে করি বিদ্যুৎ না থাকার অপারচুনিটি কষ্ট অনেক বেশি। বিদ্যুতের ট্রান্সমিশন ও সরবরাহ পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে, একে বেসরকারি খাতে দেওয়া যায় কিনা সেটি বিবেচনা করা যেতে পারে।

কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের  গোলাম কিবরিয়া বলেন, মাতারবাড়ী আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল পাওয়ার প্লান্ট হতে যাচ্ছে সবচেয়ে কম দূষণের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ২০২৪ সালে এই কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। এজন্য ১৪ কিমি চ্যানেল খননের কাজ চলছে। যা ২০২২ সালে শেষ হবে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow