Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০১৭

প্রকাশ : ২০ জুলাই, ২০১৬ ১৩:৫০
আপডেট : ২০ জুলাই, ২০১৬ ১৩:৫৫
রাজা-রানি-রাজপুত্রের শাসন
অনলাইন ডেস্ক
রাজা-রানি-রাজপুত্রের শাসন
এমপি এ কে এম এ আউয়াল

পিরোজপুর-১ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম এ আউয়াল। তার স্ত্রী লায়লা ইরাদ জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী। মেজো ভাই মজিবুর রহমান খালেক পিরোজপুর পৌরসভার মেয়র। আরেক ভাই হাবিবুর রহমান মালেক উপজেলার চেয়ারম্যান। ছোট ভাই মশিউর রহমান মহারাজ জেলা বাস মালিক সমিতির চেয়ারম্যানের পাশাপাশি পিরোজপুর বণিক সমিতির সভাপতি। এক কথায় পিরোজপুরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ এমপি আউয়াল পরিবারের কব্জায়। ফলে ভয়ে তাদের কথাতেই ওঠতে বসতে হয় পিরোজপুরবাসীর। বছরের পর বছর এভাবেই চলে আসলেও অবশেষে আউয়াল পরিবারের সেই রাজত্বে ভাঙন ধরেছে। স্বার্থের দ্বন্দের কারণে তার তিন ভাই আউয়ালের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছেন।

জেলার রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণ করছেন এমপি আউয়ালসহ (ভাইদের মধ্যে বড়) তার ছোট তিন ভাই। কিন্তু ক্রমেই তাদের মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। আর এর জের ধরেই ‘প্রতাপশালী’ এমপি আউয়ালের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মাঠে নেমেছেন তার অপর তিন ভাই। একক আধিপত্য আর বেপরোয়া দখলদারিতে একচেটিয়া নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন সংসদ সদস্য আউয়াল, তার স্ত্রী ও ছেলে। সব দখল উৎসব আর আধিপত্যে হাত দেওয়ার সুযোগ নেই অন্য ভাইদেরও। পৈতৃক সম্পত্তির ভাগও দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করছেন অপর ভাইয়েরা। তারা বলছেন, ভাইয়ের সংসারের সদস্যদের কাছে তারা নিজেরাও কোণঠাসা হয়ে আছেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদ সদস্য এ কে এম এ আউয়াল বলেন, ‘যে ভাইদের আমি মানুষ করেছি, তারা যদি এখন আমার বিরুদ্ধে যায়, তাইলে আমার কী করার আছে। চেষ্টা করছি মিলমিশ করার। দেখি কী করা যায়। ’

এক প্রশ্নের জবাবে ওই সংসদ সদস্য বলেন, ‘পরিবারের ভেতরের সমস্যা নিয়ে তারা যদি বাইরে অভিযোগ করে, তবে তো মনে হয় এর পেছনে অন্য কোনো বা কারো ইন্ধন থাকতে পারে। ’ তার দাবি, ‘যে ভাই আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে, তার নিজেরই মানসিক সমস্যা আছে। ’

বিরোধের সূত্রপাত যেভাবে: পিরোজপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতাধীন বেকুটিয়া, টগরা ফেরিঘাট এবং বলেশ্বর ব্রিজের টোল আদায় করে থাকে এমপি আউয়ালের মেজো ভাই পৌর মেয়র মজিবুর রহমান খালেকের প্রতিষ্ঠান। আগামী অর্থবছরের ইজারার জন্য আবারও টেন্ডার জমা দিয়েছেন তিনি। শুরুতে এ নিয়ে কোনো জটিলতা না হলেও হঠাৎ করে গুঞ্জন ওঠে এমপির পরিবার দরপত্র জমা দিয়েছে। তাও আবার দরপত্র দাখিলের নির্ধারিত সময়ের ৩/৪ দিন পর।

এ ব্যাপারে মেয়র খালেক বলেন, ‘পরিবারে আমিই প্রথম জনপ্রতিনিধি (পৌরসভার চেয়ারম্যান) নির্বাচিত হয়েছি। উনি (আউয়াল) পরে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। আমরা ভাইয়েরা প্রত্যেকেই যার যার অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত। কেউ কারো ওপর নির্ভরশীল নয়। অথচ বর্তমানে পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে আউয়াল সাহেব যেভাবে চাইবেন আর বলবেন, সেভাবেই চলতে হবে আমাদের। তিনি বড় ভাই—এই হিসেবে সেটা মানা গেলেও ওনার স্ত্রী ও সন্তানদের আচরণ মেনে নেওয়া সম্ভব না। অবস্থা এমন যে উনি রাজা, ওনার স্ত্রী মহারানি, ছেলেরা রাজপুত্র আর আমরা সবাই তাদের প্রজা। ’

তিনি আরও বলেন, এমপি হওয়ার আগে তার আর্থিক অবস্থা কী ছিল আর এখন কী হয়েছে, তা কারো অজানা নয়। শুধু দুর্নীতি নয়, তার একক আধিপত্য আর দখলদারির মনোভাব এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে কেবল দলই নয়, পরিবারের সদস্যদের পর্যন্ত অবজ্ঞা করতে শুরু করেছেন তিনি।

চলছে সংঘর্ষ আর মামলা : ভাইদের এই বিরোধে পিরোজপুরের আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও বিভক্ত হয়ে পড়েছে। তারাও বহুধাবিভক্ত হয়ে দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদ, এমনকি সংঘর্ষেও জড়িয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি প্রেসক্লাব এলাকায় আকস্মিক হামলার শিকার হন পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ ছাত্রসংসদের জিএস সাব্বির আহম্মেদ। তার দুটি পা ভেঙে দেয় হামলাকারীরা। এর ঘণ্টাখানেক পর নতুন পৌর ভবনের সামনে হামলা চালিয়ে মারধরের পাশাপাশি পা ভেঙে দেওয়া হয় পিরোজপুর সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক রাসেলের। হামলার শিকার এই দু'জনই এমপি আউয়ালের সমর্থক হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি মেয়র আবদুল খালেককে প্রকাশ্যে গালাগাল করেন এমপির বড় ছেলে আবদুর রহমান। ওই ঘটনার পর থেকেই মেয়রের বাসার সামনে সব সময়ই তার অনুসারী অন্তত ২০-৩০ জন অবস্থান নিয়ে আছে। এমপি বহর নিয়ে শহরে মহড়া দিলেও মেয়র সব সময়ই একা চলাফেরা করেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহরের আনাচে-কানাচে অন্তত সহস্রাধিক অনুসারী রয়েছে মেয়রের। সার্বক্ষণিক মেয়রকে তারা আগলে রাখে। বিষয়টি এমপি নিজেও জানেন। ভাইদের মধ্যে এমন শক্তির মহড়া চোখে পড়ার মতো।

বিরোধ যেভাবে প্রকাশ্যে আসে: পিরোজপুর শহরের ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন সংসদ সদস্যের দুই ভাই মজিবুর রহমান খালেক ও মশিউর রহমান মহারাজ। এত দিন তারাই এমপিকে ঢাকা থেকে পিরোজপুরে আসার সময় সম্ভাষণ জানিয়ে বরণ করতেন। কিন্তু ৯ মে ঢাকা থেকে পিরোজপুর আসার সময় হুলারহাট লঞ্চঘাটে অনুসারী নেতাকর্মীদের হাজির করিয়ে শোডাউনের মাধ্যমে শহরে ঢোকেন এমপি আউয়াল। শহরের চালকরা না আসায় পার্শ্ববর্তী স্বরূপকাঠি, ভাণ্ডারিয়া আর কাউখালী থেকে মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে আসা হয়। বিষয়টি জানাজানির পর আউয়াল পরিবারের মধ্যে বিরোধের বিষয়টি এখন তৃণমূল থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণের অজানা নয়। পরদিন জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে এক সভায় ভাইদের উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘বেশি বাড়াবাড়ি করলে তার ফল ভালো হবে না। আমার নেতাকর্মীদের ওপর একটা আঁচড়ও যদি পড়ে, তাহলে পিরোজপুর ছাড়া করা হবে। এখানে আমি যা বলব, সেটাই চূড়ান্ত। এর পরে আর কিছু নেই। ’ এমন বক্তব্যের পর নেতাকর্মীরা বিরোধের তীব্রতার বিষয়টি টের পায়। ক্রমেই নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়েন।


বিডি-প্রতিদিন/২০ জুলাই, ২০১৬/মাহবুব

আপনার মন্তব্য

সর্বশেষ খবর
up-arrow