Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৬:৫৩
গরু মোটা-তাজা করে স্বচ্ছল আদিবাসী পরিবার
রিয়াজুল ইসলাম, দিনাজপুর থেকে
গরু মোটা-তাজা করে স্বচ্ছল আদিবাসী পরিবার

পূর্বে ফুলবাড়ীর আদিবাসী পল্লী আলাদিপুরের বাসিন্দারা প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। সময়ের সাথে সাথে আলাদিপুর ইউনিয়নের এই আলাদিপুর ও পাশ্ববর্তী রাঙ্গামাটি গ্রামের প্রায় সাড়ে ৭শ’ আদিবাসী সাঁওতাল ও দলিত জনগোষ্ঠী পরিবারেও এসেছে পরিবর্তন।

 

ভাগ্য পরিবর্তন ও সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে কয়েক বছর আগে আলাদিপুরের আদিবাসীরা শুরু করেন প্রাকৃতিক উপায়ে গরু মোটা-তাজা করন। এভাবে গবাদিপশু লালন পালন করে ভালো লাভ হওয়ায় আদিবাসীদের মধ্যে এটি দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অনেকের সংসারে এসেছে স্বচ্ছলতা। খাওয়া-দাওয়া, শিক্ষা, পোশাক-পরিচ্ছদে ও কথাবার্তায়ও এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন।  

বর্তমানে প্রতিবছর কোরবানির ঈদ ও রোযার ঈদকে ঘিরে এ গ্রামে চলে প্রাকৃতিক উপায়ে গরু মোটা-তাজা করন। গরু মোটা-তাজা করে স্বচ্ছলতা এনে সবার কাছে মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে কেউ কেউ।  

২০১৪ সালে থেকে বেশ কয়েকটি আদিবাসী পরিবার এ পর্যন্ত ৭২৫টি স্বাস্থ্যবান গরু বিক্রি করেছেন। এবারের ঈদেও প্রায় ৪শ’ বিক্রয় উপযোগী গরু প্রস্তুত রয়েছে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে ফুলবাড়ীর পূর্ব আলাদিপুর গ্রামে চোখে পড়ে গরুর যত্ন নিয়ে আদিবাসীদের মধ্যে নানা ব্যস্ততা। ২০১৪ সাল থেকে সোম কিচকু (৫২) ও শেফালী মার্ডি (২৮) দম্পতি গরু মোটা-তাজা করে বিক্রি করছেন। এর আগে আরও দু’দফায় তারা ৪৫ হাজার টাকা খাটিয়ে ১৩ হাজার টাকা মুনাফা করেছেন। মুনাফার টাকায় তারা এখন একটি মুদি দোকানও দিয়েছেন। শেফালী বললেন, এ বছর কোরবানির ঈদে বিক্রির আশায় প্রায় চার মাস আগে হাট থেকে ঋণের ৩২ হাজার টাকায় একটি এঁড়ে বাছুর কিনে ছিলাম। সেটি বর্তমান বাজারে দাম হতে পারে প্রায় ৫৫ হাজার টাকা।    

আদিবাসী সাঁওতাল কিষানি নীলমনি হাসঁদা বলেন, প্রতিদিনের খাবার হিসেবে ধানের গুঁড়া, খড় ও নেপিয়ার ঘাস বাবদ প্রতি মাসে একটি গরুর পিছনে প্রায় এক হাজার ৫শ’ টাকা খরচ হয়। সে খরচ বাদ দিয়েও প্রতিটি গরু থেকে গড়ে তার লাভ থাকে প্রায় পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা।

নীলমনি হাঁসদার স্বামী পল্টন কিস্কু (৪২) বলেন, গরু মোটা-তাজা করার আগে আমরা স্বামী স্ত্রী মিলে মাঠে মজুরের কাজ করতাম। বর্তমানে আমি রিক্সা-ভ্যান চালাই, আর আমার স্ত্রী, গরুর যত্ন নেয়।  

নীলমনির হাঁসদা বলেন, আমাদের ভিটে-মাটি ছাড়া আবাদি কোনো জমি নেই। লাভের টাকা দিয়ে একটি সেলাই মেশিন কিনেছি। সেখান থেকেও কিছু আয় হয়। স্বামী-স্ত্রীর আয়ের টাকায় আমাদের সংসার চলে। আমার দুই মেয়ে ও এক ছেলে। সবাই পড়াশুনা করছে।  

আয় বাড়ায় নীলমনি-পল্টন দম্পতি গরু থাকার ঘরটি টিন সেড দিয়ে মেঝে পাকা করেছেন। এখন স্বামী-স্ত্রী দু’জনই আলাদা মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। নিজের বাড়িতে নলকূপ বসিয়েছেন, সংযোগ নিয়েছেন বিদ্যুতের।  

অন্যান্য সুবিধাভোগীরাও জানান কোনো ক্ষতিকর হরমোন ইনজেকশন বা রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার না করেই সম্পূর্ন প্রাকৃতিক খাবার খাইয়েই গরু মোটা-তাজা করেন তারা।  

গরু মোটা-তাজা করনের এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযেগিতা করছে প্র্যাকটিক্যাল এ্যাকশন বাংলাদেশ নামে স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা। এতে কারিগরি, প্রযুক্তিগত, বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন, খাদ্যের সমমূল্যের নিশ্চয়তা ও চিকিৎসা সেবা সংক্রান্ত সহায়তা প্রদান করছে তারা। কর্মসূচিতে আর্থিক সহায়তা প্রদান করছে সুইজারল্যান্ডের হেক্স-ইপার নামে একটি দাতা সংস্থা।  

ফুলবাড়ী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ওয়ালী-উল-ইসলাম বলেন, ২০১৪ সাল থেকে ফুলবাড়ী উপজেলার আলাদিপুর ইউনিয়নের দু’টি গ্রামে আদিবাসী সাঁওতাল ও দলিত জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত প্রায় সাড়ে ৭শ’ পরিবার প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে গরু মোটা-তাজা করে আর্থিক কভাবে লাভবান হচ্ছেন।  

 

বিডি প্রতিদিন/০১ সেপ্টেম্বর ২০১৬/ ফারজানা 
  

আপনার মন্তব্য

সর্বশেষ খবর
up-arrow