Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : ৪ অক্টোবর, ২০১৬ ১৭:৫৪
দিনাজপুরে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রিতে নানা অনিয়ম
দিনাজপুর প্রতিনিধি:
দিনাজপুরে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রিতে নানা অনিয়ম
ফাইল ছবি

সরকারের ১০টাকা কেজি দরে চাল বিক্রয় কর্মসূচির হতদরিদ্র পরিবারের তালিকা প্রনয়ণ ও চাল বিতরণে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।  

সরকারী নির্দেশনা অনুযায়ী হতদরিদ্র পরিবার প্রধানরা মাসে প্রতি কেজি ১০ টাকা দরে চাল পাবেন।

কিন্তু এ নিয়ম অনুসরণ না করায় অনেক সচ্ছল পরিবার এ চাল পাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও পার্বতীপুরের ১০ ইউনিয়নে ৩২ ডিলারের বেশিরভাগ সরকারী দলের নেতাকর্মী বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে।

জানা যায়, কর্মাভাব থাকা বছরের সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর এবং মার্চ ও এপ্রিল এ ৫ মাস সারাদেশের ন্যায় পার্বতীপুরের ১০ ইউনিয়নের (পৌরসভা ছাড়া) ১৬ হাজার ১৪৭ হতদরিদ্র পরিবারের মাঝে ১০ টাকা কেজি দরে মাসে ৩০ কেজি চাল বিতরণের সিদ্ধান্ত নেয় খাদ্য অধিদপ্তর।  

এ লক্ষ্যে প্রতি ইউনিয়নে দারিদ্রের প্রকোপ ও দুঃস্থতার মাত্রা বিবেচনায় উপকারভোগি পরিবারের তালিকা প্রনয়ণের জন্য ৬ সদস্যের ইউনিয়ন কমিটি গঠন করা হয়। এছাড়া ইউনিয়ন কমিটির দেয়া তালিকা যাচাই করে তা অনুমোদনের জন্য ১০ সদসের উপজেলা কমিটি গঠন করা হয়। প্রত্যেক ইউনিয়ন কমিটিতে একজন করে সরকারী কর্মকর্তা সংযুক্ত করা হয়।  
সরকারী নীতিমালা অনুযায়ী প্রকৃত হতদরিদ্র পরিবারের তালিকা প্রনয়নের দায়িত্ব ইউপি চেয়ারম্যান ও একজন সরকারী কর্মকর্তার নেতৃত্বে গঠিত ইউনিয়ন কমিটির। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রকৃতপক্ষে তালিকা প্রনয়ণ করছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সম্পাদকের নেতৃত্বে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকগণ। এতে শুধু দুঃস্থতা বিবেচনা না করে দলীয় বিবেচনায় তালিকা করায় উপজেলার সকল ইউনিয়নে অনেক সচ্ছল পরিবার তালিকাভূক্ত হয়েছেন। এর ফলে কোন রাজনীতির সাথে জড়িত নয় এমন বহু দুঃস্থ পরিবার ১০ টাকা কেজি দরে চাল কেনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এতে চাল বিতরণে তাদের কোন রকম অনিয়ম ও দুর্নীতির ব্যাপারে মুখ খুলতে ও এর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারছেন না তদারকির দায়িত্বে থাকা উপজেলা প্রশাসন ও খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা।  

স্থানীয়রা বলছেন, পার্বতীপুর উপজেলার মোমিনপুর ইউনিয়নের ২নং গোবিন্দপুর ওয়ার্ডের দক্ষিণপাড়ার আঃ মান্নান (কার্ড নং ১৫৩) ও তার ছেলে আবু তাহের (কার্ড নং ১৫৪) প্রায় ৫-৬ একর জমির মালিক। তার পরও বাবা ছেলে দু’জনেই কার্ড পেয়েছেন, চালও তুলেছেন।  

২নং গোবিন্দপুর ওয়ার্ডের ইউপি মেম্বার ফাইজুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, তার ওয়ার্ডে ৫টি মৌজায় ১৮টি পাড়া, কার্ডের বরাদ্দ ১৩১। কিন্তু ১৮ পাড়ার মধ্যে শুধুমাত্র শুড়িপাড়া ও ডাঙ্গাপাড়ায় এসব কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া পরিবার প্রধানের নামে কার্ড দেয়ার নিয়ম থাকলেও এ দুই পাড়ায় অনেক পরিবারে স্বামী-স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েদের নামেও কার্ড বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
    
ইউপি মেম্বার ফাইজুল ইসলাম আরও অভিযোগ করেন, সরকারী নীতিমালায় হতদরিদ্রের তালিকা তৈরীতে ইউপি সদস্যকে অন্তর্ভূক্ত করার নিয়ম থাকলেও তাকে নেয়া হয়নি। তার ওয়ার্ডে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুর আলম একাই হতদরিদ্র পরিবারের তালিকা তৈরী করেছেন।

২নং ওয়ার্ডের দুর্গাপুর মাছুয়াপাড়া গ্রামের কার্তিক চন্দ্র (৪৫) জানান, তাদের গ্রামে ৫০-৫৫টি পরিবারের বাস। সবাই সরকারী খাস জমিতে বসবাস করেন। মাছ ধরে ও দিন মজুরী করে দিন কাটে। তা সত্বেও এ গ্রামের মাত্র ৩-৪ জন কার্ড পেয়েছেন।  

৫নং ওয়ার্ডের উত্তর বাসুদেবপুর শড়েয়াতলি আদিবাসীর মঙ্গল মুরমুর ছেলে রবি মূরমু (কার্ড নং ৮৫৭) অভিযোগ করেন, গত ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি চাল তুলতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ডিলার সুমন চন্দ্র রায় তাকে ৩০ কেজির স্থলে ২০ কেজি চাল দিয়েছেন। তবে কার্ডে ৩০ কেজিই উল্লেখ করেছেন।  এ ব্যাপারে ডিলার সুমন চন্দ্র এ অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং পরে দেখা করে কথা বলবেন বলে জানান।  

মোমিনপুর ইউনিয়নে হতদরিদ্রদের তালিকা তৈরী ও চাল বিতরণে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রসঙ্গে ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল ওহাব মন্ডল বলেন, কিছু কিছু এলাকায় ভুলক্রুটি ছিল, সেগুলো সংশোধন করে বর্তমানে সুন্দরভাবে চাল বিতরণের কাজ চলছে।  

এদিকে, গত ৭ সেপ্টেম্বর পার্বতীপুর উপজেলায় ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি শুরু হয়। গত ৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর পার্বতীপুর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে চাল বিতরণ পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে (১০ সেপ্টেম্বর) তিনি দেখতে পান মন্মথপুর ইউনিয়নের ডিলার (৪ ও ৫ নং ওর্য়াড) সামসুর রহমান কনু, রাজাবাসর ল্যাম্ব হাসপাতাল এলাকায় খোলা আকাশের নিচে চাল বিক্রি করছেন। সেখানে তার না আছে নিজস্ব বা ভাড়ার দোকান কিংবা গুদাম ঘর। ঘটনাস্থলে ডিলার সামসুর রহমান কনু খাদ্য বিভাগের সরবরাহ করা মানসম্মত চালের বদলে নিন্মমানের খাওয়ার অনুপযোগি চাল বিক্রি করছেন।  

এ ব্যাপারে পার্বতীপুর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আব্দুল জলিল ব্যাপারী বলেন, এঘটনায় কেন তার ডিলারশীপ বাতিল বা তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবেনা এ মর্মে ৩ দিনের মধ্যে এর সন্তোষজনক জবাব প্রদানের জন্য তাকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেয়া হয়েছে।   তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ডিলার সামসুর রহমান কনু বলেন, সরকারী নীতিমালা অনুসরণ করে আমি চাল বিতরণ করছি। যে মানের চাল সরবরাহ করা হয়েছে, তাই বিতরণ করেছি।  

চাল বিতরণের তালিকা তৈরী, চাল বিতরণ, ওজনে কারচুপিসহ নানা অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগের ব্যাপারে উপজেলার হতদরিদ্রদের তালিকা অনুমোদন কমিটির প্রধান ও পার্বতীপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার তরফদার মাহমুদুর রহমান বলেন- বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে এ সংক্রান্ত নানা অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছি এবং এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিয়েছি। কেউ অভিযোগ করলেই অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। আগামীতে ক্রুটিমুক্ত তালিকা প্রনয়ণ ও অন্যান্য ভুলক্রুটি এড়িয়ে কি ভাবে নীতিমালা অনুসরণ করে চাল বিতরণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যায়, সে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।  

 

বিডি প্রতিদিন/০৪ অক্টোবর ২০১৬/হিমেল

আপনার মন্তব্য

সর্বশেষ খবর
up-arrow