Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : ৪ অক্টোবর, ২০১৬ ১৮:৪৭
১০ টাকা কেজি চালে অনিয়ম
ধনীর পেটে গরীবের চাল
নেত্রকোনা প্রতিনিধি:
ধনীর পেটে গরীবের চাল

দেশব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে নেত্রকোনাতেও শুরু হয়েছে হত দরিদ্রদের জন্য সরকার কর্তৃক স্বল্পমূল্যে (১০ টাকা কেজিতে) চাল বিক্রি। আর এসব তালিকায় উঠে এসেছে শিক্ষক, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতাসহ ডিলারের পরিবারের লোকজনের নাম। জেলার কলমাকান্দার কৈলাটী ইউনিয়নে হত দরিদ্রদের মধ্যে স্বল্প মূল্যে চাল বিক্রিতে এ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।  

দরিদ্রদের পরিবর্তে স্বল্পমুল্যের এ চাল যাচ্ছে স্বচ্ছল, ধনী এবং দলীয় প্রভাবশালী নেতাদের পেটে। এতে করে সরকারের উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার পাশাপশি বঞ্চিত হচ্ছে হত দরিদ্ররা।  

এদিকে কৈলাটী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ডিলার হায়দার আলী খানের সাথে কথা বললে তিনি বলেন 'চেয়ারম্যান মেম্বাররা এ তালিকা করেছে, তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন। ' ডিলারের আত্মীয়দের নামের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি প্রশ্ন করে বলেন 'গরীব আত্মীয় স্বজন থাকতে পারেনা?' 

ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ রুবেল ভূঁইয়া বলেন, অনেক কথাই তো বলা যায় না। তারা আওয়ামী লীগ নেতা তাই প্রভাব খাটিয়ে এসকল তালিকা  নিজেরাই করেছে।  

ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা আলহাজ্ব জয়নাল আবেদীন বলেন, বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন হত দরিদ্রদের মাঝে ১০ টাকা কেজিতে চাল বিক্রি করা হবে। প্রতিশ্রুতি মোতাবেক দেশের বিভিন্ন জেলায় ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগ করা হয়। জেলার কলমাকান্দার কৈলাটী ইউনিয়নে দুইজন ডিলার নিয়োগ করা হয়। তারা হলেন কৈলাটী ইউনিয়ন আীওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ক্ষুদ্র সিধলী গ্রামের হায়দার আলী খান, আর অপরজন হচ্ছেন- ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতির বড় ভাই হাফানীয়া গ্রামের মজিবুর রহমান। ওই ইউনিয়নে হত দরিদ্রদের জন্য ১২০০ কার্ড বরাদ্দ দেয়া হয়। ওই কার্ড স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও দুই ডিলার মিলে ভাগভাটোয়ারা করে নিয়েছেন। ১০ টাকা কেজিতে জনপ্রতি ৩০ কেজি করে চাল দেয়ার কথা। ডিলার নিজে ও তাদের আত্মীয় স্বজনরা হত দরিদ্র সেজে নিজেদের নামে কার্ড করেছেন।

তালিকা অনুযায়ী দেখা গেছে, ডিলার হায়দার আলী খানের স্ত্রী পারভীন আক্তার ও মা আম্বিয়া আক্তার, ভাই মনিরুজ্জামান খান, জাহাঙ্গীর আলম খান, চাচাত ভাই গোলাম মেহেদী খান, গোলাম মোস্তফা খান, মানিক খান, হক মিয়া, ভগ্নিপতি আলতাব হোসেন খান, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও মুক্তিযোদ্ধা মুর্শেদুজ্জামান ও তার স্ত্রী বেগম লায়লা জামান, বেলতলী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রতন মিয়া, সিধলী পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক ও মুক্তিযোদ্ধা সুব্রত বিকাশ সরকার, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক সজল কান্তি রায়, তার স্ত্রী স্বরসতী রায়, ভাই পরিমল রায়, ভাই বৌ চম্পা রানী রায়, ভাই হীরেন্দ্র চন্দ্র রায়, অশীষ কুমার রায়সহ অনেকেই আছেন। এদের মধ্যে প্রায় সকলেই ধর্ণাঢ্য ব্যবসায়ী, স্কুল শিক্ষক ও স্বচ্ছল ব্যক্তি।     

এলাকার হত দরিদ্রদের নাম মাত্র কিছু কার্ড দেয়া হয়েছে। তালিকা করা হয়েছে প্রায় ১২০০ জনের। এর মধ্যে বেশির ভাগই স্বচ্ছল, ধর্ণাঢ্য ব্যক্তি। ডিলাররা নিজেদের পছন্দের লোকদের নামে কার্ড করে ওই চাল উত্তোলনের পর কালোবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা আলহাজ্ব জয়নাল আবেদীন আরও বলেন, এদের অনৈতিক ও দুর্নীতির কারণে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি ব্যাহত হচ্ছে।  ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সম্পাদক মিলে সরকারের উন্নয়ন কাজ বাধাগ্রস্থ করছে। এ ব্যাপারে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে প্রকৃত হত দরিদ্ররা যাতে সরকারী সুবিধা ভোগ করতে পারে এ জন্য সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরবারে দাবি জানাচ্ছি।  

বিষমপুর গ্রামের দিন মজুর আবদুস সাত্তার ও চান মিয়া ক্ষোভের সাথে বলেন, 'সরকার আমাদের জন্য অনেক সুযোগ সুবিধা দিতাছে শুনছি। ১০ টাকা কেজিতে চাউলও দিতাছে। কি অইব আমরারে কেউ কার্ড কইরা দেয় না। গরীবরার চাউল ধনীরা নিয়া খাইতাছে। '

ইউনিয়ন কৃষকলীগের সভাপতি হাফেজ সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আমি এটি প্রতিরোধ করতে পারি নাই। হত দরিদ্ররা শতকরা ১০ জন পেয়েছে কিনা সন্দেহ আছে। টাকা দিয়ে পদসহ এখন ডিলারী নিয়েছে বলে তারা হুংকারও দেয়। তাই এখন টাকা কামাচ্ছে। এটি পরিস্কার, সবাই জানে। তাই বলে গরীবের মাল ধনীদের পেটে যাবে এটা তো মেনে নেয়া যায় না। এ ব্যাপারে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এমপি’র ভাই চন্দন বিশ্বাসের হস্তক্ষেপ চেয়েছিলাম তিনিও বলেছেন একটু কামাই করবেই তো। তাই আর কোন পথ না দেখে আমি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি কামনা করছি।  

এ ব্যাপারে কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ সাইদুজ্জামানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায় নি। এদিকে নেত্রকোনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সোহরাব হোসেন জানান, তালিকার ব্যাপারে ইউএনও এবং চেয়ারম্যান জানেন।  


বিডি প্রতিদিন/০৪ অক্টোবর ২০১৬/হিমেল

আপনার মন্তব্য

সর্বশেষ খবর
up-arrow