Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৭

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৭
প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ১৭:০৩ অনলাইন ভার্সন
আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ১৭:০৩
সুন্দরবনে শিকার নিষিদ্ধ প্রজনন মৌসুমে কাঁকড়া আহরণে মহোৎসব
শেখ আহসানুল করিম, বাগেরহাট :
সুন্দরবনে শিকার নিষিদ্ধ প্রজনন মৌসুমে কাঁকড়া আহরণে মহোৎসব

বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবনের নদী ও খালে শিকার নিষিদ্ধ প্রজনন মৌসুমের শেষ ভাগে এসে এবার নির্বিচারে রফতানি পণ্য শিলা কাঁকড়া আহরণের মহোৎসব শুরু হয়েছে। প্রজনন মৌসুমে শিলা কাঁকড়া আহরণে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বে বনবিভাগের কতিপয় অসৎ কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সহায়তায় বিশ্ব বাজারে সুন্দরবনের ডিমওয়ালা শিলা কাঁকড়ার উচ্চ মূল্য ও ব্যপক চাহিদার সুযোগে জেলেরা শিলা কাঁকড়া আহরণ করে চলেছে।

কাকঁড়া আহরণ বন্ধে প্রচারণা না থাকা এবং জেলে ও শিকারীদের অতি লোভের কারনে প্রজননের ভরা মৌসুমে কাঁকড়া শিকারের ফলে এবার সুন্দরবন থেকে শিলাসহ অন্যসব প্রজাতির কাঁকড়া বিলুপ্তির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন পরিবেশবাদীরা।

পূর্ব সুন্দরবনের প্রায় সারা বছরই মংলা, রামপাল, শরনখোলা, মোড়েলগঞ্জ, দাকোপ, কয়রাসহ সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার বিপুল সংখ্যক বনজীবী সুন্দরবনে শিলাসহ বিভিন্ন প্রজাতির কাঁকড়া ধরে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। এসব বনজীবীরা সরকারি রাজস্ব দিয়ে বনবিভাগের কাছ থেকে বৈধ পারমিট নিয়ে সুন্দবনের কাঁকড়া ধরেন। তবে, প্রতি বছর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি এই দু’মাস কাঁকড়ার ভরা প্রজনন মৌসুম হওয়ায় এ সময় বন বিভাগ কাঁকড়ার বংশ বিস্তারে জন্য আহরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কারণ এসময় সুন্দরবনের নদ-নদীর শিলা কাঁকড়া দলে দলে গভীর সমুদ্রে ও বড় নদীতে বাচ্চা ফুটানোর জন্য চলে আসে।

যে কারণে সুন্দরবনে এ দু’মাসে সারা বছরের চেয়ে বেশি করে শিলা কাঁকড়া পাওয়া যায়। এ কারণে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বেশি লাভের আশায় অসাধু মহাজনেরা গরীব জেলেদের অগ্রিম দাদনের টাকা দিয়ে সুন্দরবনের নদ-নদীতে শিলা কাঁকড়া আহরণ করছে। শুধু তাই নয়, এ কাজে মহাজনেরা বনবিভাগের অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে ম্যানেজ করেছে বলে অভিযোগ আছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জেলে ও বনজীবী জানান, চুক্তি করে বনবিভাগের স্টেশন অফিসে ঘুষের টাকা দিয়ে সাদা মাছের পারমিট নিয়ে বনে গিয়ে শিলা কাঁকড়া ধরে থাকি।

তাছাড়া টহলরত ফরেস্টারদের সাথেও চুক্তি থাকে। যে কারণে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বনে প্রবেশ করার আগেই জেলেদের খবর জানিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় জেলেরা গভীর বনের খালে লুকিয়ে থাকে। এভাবেই সুন্দরবনে শিরাসহ অন্যসব প্রজাতির কাঁকড়া ধরা অব্যাহত রয়েছে। আবার অনেক জেলে পাশ পারমিট না করেই বন বিভাগকে ম্যানেজ করে বনে ঢুকে দেদারছে শিলা কাঁকড়া ধরছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

মংলা ও শরণখোলার কয়েকজন কাঁকড়া আড়ৎদার জানান, বর্তমানে ডিমওয়ালা শিলা কাঁকড়া ১৫শ’ থেকে ১৮শ’ টাকা কেজি দরে কিনে থাকি। এসব কাঁকড়া ঢাকায় ২ হাজার থেকে আড়াই টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়ে থাকে। তবে এ দুই মাস শিলাসহ অন্যসব প্রজাতির কাঁকড়া ধরা নিষেধ এটা জানার পরও কেন কাঁকড়া কিনছেন এমন প্রশ্নের জবাবে এক আড়ৎদার জানান, আমার মত অনেক কাঁকড়া ব্যবসায়ী এ সময় কাঁকড়া কিনছে, তাই আমিও কিনছি। বন বিভাগ কোন পদক্ষেপ না নেয়ায় এভাবে কাকড়া শিকার করা হচ্ছে।

সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি নিয়ে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠান সেভ দ্যা সুন্দরবন ফাইন্ডেশনের চেয়ারম্যান পরিবেশবিদ ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম সুন্দরবনে প্রজনন মৌসুমে নির্বিচারে শিলা ছাড়াও অন্যসব প্রজাতির কাঁকড়া শিকারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, সরকার বা বন বিভাগ কেউই ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইড এই ম্যানগ্রোভ বনের প্রান-প্রকৃতি রক্ষায় মেটেই আন্তরিক। শিকার নিষিদ্ধ সময়ে ডিমওয়ালা অন্যসব প্রজাতির পাশাপাশি রফতানি পণ্য শিলা কাঁকড়া প্রজনন মৌসুমে নির্বিচারে আহরণ করার ফলে কাঁকড়ার ভান্ডার খ্যাত সুন্দরবন লাল টুকটুকে কাঁকড়ার বাচ্চা বিলুপ্তি ঘটবে। এত করে সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতিতে বিরূপ প্রভাবসহ আন্তজাতিক বাজারে বিপুল চাহিদা থাকা শিলা কাঁকাড়া নামের রফতানি পণ্যটিও হুমকির মুখে পড়বে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য বাঁচাতে দ্রুত শিকার নিষিদ্ধ প্রজনন মৌসুমে সব ধরনের কাঁড়া আহরণ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে সরকার ও বন বিভাগকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ক্ষতিকর দিক উল্লেখ করে প্রজনন মৌসুম শুরুর আগেই কাঁকড়া আহরণ বন্ধে ব্যাপক প্রচারনা চালাতে হবে।

পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) মেহেদীজ্জামান সুন্দরবনে শিকার নিষিদ্ধ প্রজনন মৌসুমে কাঁকড়া শিকারের তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, জেলেরা চুরি করে অবৈধ পন্থায় শিলা কাঁকড়া ছাড়াও অন্য প্রজাতির কাঁকড়া শিকার বন্ধে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগ তৎপর চালাচ্ছে। শনিবারও একটি ট্রলারে ১০ মণ শিলা কাঁকড়াসহ দুই জেলেকে আটক করেছে বন বিভাগ। আটককৃতদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পর আদালত তাদের কারাগারে পাঠিয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অবৈধ উপায়ে কাঁকড়া শিকারে জেলেদের সাথে সুন্দরবন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পৃক্ততা থাকলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় বন বিভাগ তৎপর রয়েছে।


বিডি-প্রতিদিন/২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭/মাহবুব

আপনার মন্তব্য

up-arrow