Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : ২১ অক্টোবর, ২০১৮ ১২:৫৭ অনলাইন ভার্সন
আপডেট : ২১ অক্টোবর, ২০১৮ ১৪:৪৩
মোংলায় ফাদার রিগনকে সর্বস্তরের মানুষের শেষ শ্রদ্ধা
শেখ আহসানুল করিম, বাগেরহাট
মোংলায় ফাদার রিগনকে সর্বস্তরের মানুষের শেষ শ্রদ্ধা

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রেখে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’প্রাপ্ত ও বাংলাদেশের নাগরিকত্ব অর্জনকারী ইতালির খ্রিস্ট ধর্মযাজক ফাদার মারিনো রিগনের কফিনে আজ রবিবার সকাল থেকে সর্বস্তরের হাজারো মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। 

এর আগে, সকাল ১০টায় ফাদার মারিনো রিগনের কফিনবাহী হেলিকপ্টারটি মোংলার শেখ রাসেল স্টেডিয়ামে অবতরণ করে। বাংলাদেশের এই বিদেশি বন্ধুর কফিনটি গ্রহন করেন খুলনা সিটি মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক ও বাগেরহাট জেলা প্রশাসক তপন কুমার বিশ্বাস।

এরপর কফিনবাহী গাড়িটি নিয়ে যাওয়া হয় মোংলা উপজেলা পরিষদের মাঠে। সেখানে ফাদার মারিনো রিগনের কফিনে সর্বস্তরের হাজার-হাজার মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানানোর পর কফিনটি তার প্রতিষ্ঠিত সেন্ট পল্স উচ্চ বিদ্যালয় এবং সেন্ট পল্স হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। সেন্ট পল্স উচ্চ বিদ্যালয় এবং সেন্ট পল্স হাসপাতালের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীসহ হাজারো অনুরাগী ফাদার মারিনো রিগনের কফিনে শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন।

শ্রদ্ধা জানানো শেষে শেলাবুনিয়ার সেন্ট পল্স গীর্জার সামনে তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হবে। এরপর বিকালে সেখাইে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ফাদার মারিনো রিগনকে সমাধিস্থ করা হবে। 

ফাদার রিগনের অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী মৃত্যুর এক বছর পর সরকারিভাবে তার মরদেহ ইতালি থেকে দেশে আনা হয়েছে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় অসুস্থ ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও সেবা প্রদানের পাশাপশি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন ফাদার মারিনো রিগন। 

রবিবার ভোর ৫টায় তার্কিশ এয়ারলাইন্স’র একটি ফ্লাইটে মৃত্যুর এক বছর পরে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ফাদার মারিনো রিগনের মরদেহ ঢাকায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে পৌঁছায়। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখার স্বীকৃতি স্বরূপ ২০০৯ সালে সরকার তাকে Friends of Liberation War Honour পদকসহ বাংলাদেশের সম্মানসূচক নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়।

মোংলায় থাকা অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চলাচরের শক্তি হারিয়ে ফেললে ২০১৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ফাদার রিগনের ভাই-বোন এসে তাকে ইতালিতে নিয়ে যান। ইতালিতে মৃত্যু হলে তার লাশ বাগেরহাটের মোংলার সেন্ট পল্স গীর্জার পাশে সমাহিত করতে হবে এই শর্তে তিনি ভাইয়ের সাথে যেতে রাজী হন। গত বছরের ২০ অক্টোবর ইতালির ভিচেঞ্চায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ফাদার রিগন। 

ইতালির নাগরিক ফাদার রিগন ১৯২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সে দেশের ভিচেঞ্চায় জন্ম নেন। মাত্র ২৮ বছর বয়সে খৃষ্ট্রধর্ম প্রচারে ১৯৫৩ সালের ৭ জানুয়ারি তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানে আসেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি গোপালগঞ্জের বানিয়ারচর গির্জায় ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাসহ অসুস্থ ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও সেবা প্রদানের পাশাপশি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। দেশের বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেশ স্বাধীনের পর তিনি মোংলার শেলাবুনিয়ায় স্থায়ী আবাস গড়ে তোলেন। 

দীর্ঘ সময়ে মোংলায় অবস্থানকালে ফাদার মারিনো রিগন ইতালিয়ান ভাষায় অনুবাদ করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলিসহ ৪০টি কাব্যগ্রন্থ, লালন সাঁইয়ের তিনশত পঞ্চাশটি গান, জসীম উদ্দীনের নক্সীকাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট ছাড়াও এদেশের খ্যাতিমান কবিদের অসংখ্য কবিতা। 

অন্যদিকে, ফাদার রিগন বাগেরহাট জেলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ সেন্ট পল্স উচ্চ বিদ্যালয়, সেন্ট পল্স হাসপাতালসহ প্রতিষ্ঠা করেন ১৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। নারীদের কর্মসংস্থানের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন সেন্ট পল্স সেলাই কেন্দ্র। যেখান থেকে বিদেশে রফতানি করা হতো নক্সীকাঁথা। 

ফাদার রিগন শিক্ষা উন্নয়ন ফাউন্ডেশন’র সভাপতি সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস রিগণ সম্পর্কে বলেছেন তিনি ইতালিতে বাংলাদেশের অঘোষিত রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন। আর সেন্ট পল্স উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক ফ্রান্সিস সুদান হালদার বলেছেন, ফাদার রিগন নিজেই বলতেন ‘আমার মস্তকে রবীন্দ্রনাথ- অন্তরে রয়েছে লালন’।

বিডি প্রতিদিন/এনায়েত করিম

আপনার মন্তব্য

এই পাতার আরো খবর
up-arrow