Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ২১ জানুয়ারি, ২০১৭

প্রকাশ : শুক্রবার, ১৫ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৪ জুলাই, ২০১৬ ২৩:৩৫
আমি যদি পাখি হতাম
নুরুল ইসলাম বাবু
আমি যদি পাখি হতাম

বয়স ওর আট বছর। সে অনুযায়ী ক্লাস থ্রিতে পড়ার কথা। কিন্তু ক্লাস টুতে পড়ে লামিম। বয়স বেড়েছে। লিকলিকে লম্বাও হয়েছে। কথাবার্তায় পাকামি। গলা ছেড়ে গান গায়। যখন-তখন, যেখানে-সেখানে। কণ্ঠটা ভালোই। শুধু লেখাপড়ায় এগিয়ে যেতে পারেনি। ভীষণ অমনোযোগী।

সারাদিন টইটই করে ঘুরে বেড়ায় লামিম। কোন গাছে পাখির বাসা। কোন বাসায় ডিম ফুটে বাচ্চা বেরিয়েছে। কোন দুষ্ট ছেলেরা দল পাকিয়েছে। তাদের পিছু নেওয়া যায় কিনা। এসব চিন্তায় ব্যস্ত থাকে লামিম।

দুষ্ট ছেলেরা গাছে উঠে পাখির বাসা ভাঙে। লামিম তাতে মন খারাপ করে। বরং পশু-পাখি দারুণ পছন্দ করে সে। বিশেষ করে দোয়েল পাখি দেখলে আনন্দে লাফাতে শুরু করে। স্কুলের স্যার বলেছেন— দোয়েল আমাদের জাতীয় পাখি। সে কথা খুব ভালো করে মনে আছে লামিমের।

পাখির খোঁজে ঘুরে বেড়ায় লামিম। নতুন নতুন পাখি খুঁজে বের করা ওর শখ। গাছের ডালে, লাউয়ের মাচায়, ধানখেতে, বনে-বাদারে কত পাখি! কত রঙের! কত চমৎকার দেখতে সেই পাখিগুলো। লামিম দেখে। কত রকম সেই পাখিদের ডাক! দেখতে দেখতে শুনতে শুনতে মনে মনে পাখি হয়ে যায় লামিম। উড়ে বেড়ায় নীল আকাশে। লাফিয়ে বেড়ায় গাছের ডালে ডালে। ‘আহা! সত্যি যদি পাখি হতাম!’

পশু-পাখিদের কখনোই ক্ষতি করে না লামিম। কেউ ক্ষতি করতে চাইলে বাধা দেয়। গতকাল ওদের ক্লাসের সাঈদ একটি পাখি ধরেছিল। এ কথা শুনেই সাঈদের খোঁজে বের হলো লামিম। সত্যি একটি পাখি ধরে আধমরা করে ফেলেছে। তাও আবার দোয়েল পাখি।

সাঈদ লামিমকে এগিয়ে আসতে দেখেই দিল ভোঁ দৌড়। পিছু পিছু লামিমও দৌড়াল। সাঈদ দৌড়ে পালাল ঘরের কোণে। লামিম কিছু সময় আশপাশ দিয়ে ঘোরাঘুরি করল। কিন্তু সাঈদ একবারও বের হলো না। মন খারাপ করে বাড়ি ফিরে গেল লামিম।

আজ স্কুলে বেশ হৈচৈ হয়ে গেল। গতকাল সাঈদ দোয়েল পাখি ধরেছিল। শুধু ধরে নাই। পায়ে সুতা বেঁধে আটকে রেখেছে। তাই কাল থেকেই ভীষণ মন খারাপ লামিমের। আজ স্কুলে সাঈদকে দেখেই রেগে আগুন হয়ে গেল। স্যাররা তখনো স্কুলে পৌঁছায়নি। এই তো সুযোগ। লামিম ক্লাসে বই রেখেই পিছু নিল সাঈদের। পেছন দিক থেকে নয়। একেবারে সামনে দাঁড়াল।

—তুই পাখি ধরেছিস কেন? রাগ দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল লামিম।

—ইচ্ছা হয়ছে ধরেছি, তাতে তোর কি। বলল সাঈদ।

এরপর আর কোনো কথা বলেনি লামিম। একেবারে সাঈদের গলা টিপে ধরেছে। ধরেছে তো ধরেছেই। দম যেন আটকে আসছে সাঈদের। হাত দিয়ে জোরাজুরি করছে। কিছুতেই ছাড়াতে পারছে না সাঈদ। অবশেষে ক্লাস ফাইভের তুষার,

মণি, মারুফ এসে ছাড়িয়ে দিল।

ছাড়া পেয়ে স্কুল মাঠে বসেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল সাঈদ। ঠিক তখনই মঈন উদ্দিন স্যার এসে হাজির হলো। মঈন স্যার ভীষণ রাগী। ছাত্র-ছাত্রীরা প্রচণ্ড ভয় পায়। স্যার এসে দাঁড়াতেই কেউ একজন বলল, স্যার, লামিম ওর গলা টিপে ধরেছিল। অন্য একজন আরও জোর গলায় বলল, দম আটকায়া ফালাই ছিল।   মঈন স্যার ভয়ঙ্কর কণ্ঠে বললেন, কইরে লামিম।

ছাত্রদের মধ্যে একজন হাত দিয়ে  দেখিয়ে বললেন,

ওই যে স্যার, সিঁড়ির উপর বসে আছে।

স্যার আরও ভয়ঙ্কর গলায় বললেন, শয়তানটাকে ধরে নিয়ে আয়। প্রথমে ভয়ে কেউ যেতে চাইল না। স্যার সাহস দিলে কয়েকজন এগিয়ে গেল। তবে লামিমকে জোর করে ধরে আনতে হলো না। নিজেই এসে স্যারের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়াল।

মঈন স্যার গর্জন করে জিজ্ঞাসা করলেন, কিরে সাঈদের গলা টিপে ধরেছিস কেন?

—স্যার, স্যার... এছাড়া আর কথা বের হলো না লামিমের মুখ থেকে।

—কি স্যার-স্যার করছিস। বল ওর গলা টিপে ধরেছিস কেন?

তারপরও লামিমকে চুপ থাকতে দেখে স্যার শান্ত গলায় বললেন, বলিস না কেন?

এবার মনে কিছুটা সাহস পেল লামিম। নিচু মাথা একটু উঁচু করল। তারপর স্যারের দিকে তাকিয়ে বলল, সাঈদ দোয়েল পাখি ধরে আটকে রেখেছে। আমি ছেড়ে দিতে বললে আমাকেই মারতে আসে।

স্যার এবার সাঈদকে কাছে ডেকে বললেন, লামিম যা বলছে তা কি ঠিক?

—জী স্যার ঠিক। আস্তে করে বলল সাঈদ।

—কোথায় রেখেছিস পাখিটা?

—বাড়িতে। আরও নিচু গলায় বলল সাঈদ।

পাখি ধরা অপরাধ। সাঈদ পাখি ধরে অন্যায় করেছে। স্যার ব্যথিত হলেন। আর অবাক হলেন লামিমের কাণ্ড দেখে। মনে মনে ভাবলেন, লামিম নিশ্চয়ই পাখি ভালোবাসে।

এবার সবার উদ্দেশ্যে স্যার বললেন, তোমরাই বল, আসলে কার দোষ?

ছাত্র-ছাত্রীরা একসঙ্গে বলল, সাঈদের দোষ। নিজেও দোষ স্বীকার করল সাঈদ। তবু আধাঘণ্টা কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকার শাস্তি ওকে পেতেই হলো। সেই সঙ্গে আদেশ হলো বেঁধে রাখা পাখিটা নিয়ে আসতে হবে।

সাঈদ দৌড়ে বাড়িতে গেল। সঙ্গে গেল আরও কয়েকজন। কিছুক্ষণের মধ্যে পাখিটা এনে মঈন স্যারের হাতে দিল। স্যার সুতা খুলে পাখিটা লামিমের হাতে দিয়ে বললেন, উড়িয়ে দে। লামিম দুই হাত দিয়ে উঁচু করে ধরতেই উড়ে গেল পাখিটা। লামিম হাততালি দিল। সবাই ওর সঙ্গে হাততালিতে যোগ দিল।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow