Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ১৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৩ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:৪১
আশ্চর্য বালক
মঈন মুরসালিন
আশ্চর্য বালক

অনেক আগের কথা। এক বনে ছিল এক কাঠুরে আর তার বউ।

তাদের অনেক বয়স হয়েছিল। একদিন কাঠুরে-বউ একগাদা জামাকাপড় নিয়ে যাচ্ছিল নদীর দিকে। নদীর জলে যত ময়লা ধুয়ে সাফ করবে বলে।

নদীর জলে চোখ পড়তেই দেখল মস্ত বড় একটা পীচফল জলে ভেসে বেড়াচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে বুড়ির মনটা আনন্দে নেচে উঠল। মনে মনে বলল আজ রাতে তবে মিষ্টি এই ফল খেয়েই পেট ভরবে। এই ভেবে সে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারপর সেটা নিয়ে রাখল ডাঙায়।

জামাকাপড় ধুয়ে পীচফলটাকে কাঁধে চাপিয়ে সে এলো বাড়িতে। বুড়ো তো বুড়িকে দেখে অবাক! বলল, এটা আবার কোথা থেকে আনলে?

বুড়ি বুড়োকে বলল, এটা নদীতে ভেসে যাচ্ছিল, নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে তবে নিয়ে এসেছি।

বুড়ো বলল, বাহ, আজ রাতে তবে ফল খেয়েই থাকতে পারব।

সন্ধ্যে হলো। রাত হলো। এবারে খাওয়া দাওয়ার পালা। খাওয়া বলতে আজ সারাদিনে আর কিছুই তো ভাগ্যে জোটেনি, এই ফলটুকু ছাড়া।

একটা ধারালো ছুরি দিয়ে ফলটাকে কাটা হলো। ফলটাকে কাটতেই দুজনে অবাক! এ যে বিশ্বাসই করা যায় না। একটা ছোট্ট ছেলে, খুবই ছোট্ট, ফলের মধ্যে কেমন ঘুমিয়ে আছে!

বুড়োর মুখে কথা নেই। বুড়ির মুখে কথা নেই। কিছুক্ষণ পর বুড়ো বলল, ছেলেটাকে ভাবছি ডাকব ‘শুভ’ বলে।

বুড়ি বলল, বেশ ভালো নাম রেখেছ। আমরা ওকে কোলেপিঠা মানুষ করব। দেখবে ছেলেটা আস্তে আস্তে ঠিক বড় হবে।

দিন যায়। মাস যায়। শুভ বড় হয়। দেখতে দেখতে শুভ আরও বড় হয়ে উঠল।

একদিন গম্ভীর গলায় সে তার বাবা-মাকে বলল, আমি এখন ওগরু দ্বীপে যাব। আমার জন্য কিছু গরম গরম পিঠা বানিয়ে দেবে কি?

মা বাবা তো ভেবেই অস্থির। বলল, সেখানে গিয়ে তুই কি করবি?

শুভ বলল, শুনেছি সেখানে এক রাজা আছে। একবার রাজার কাছে যেতে দাও। আমি জানি সেখানে গেলেই আমাদের ভাগ্য খুলবে।

মা বাবা আর কি বলেন! শুধু যাওয়ার সময় বললেন, ঠিকমতো রাস্তা দেখে চলবি। রাস্তায় যাকে পাবি মিষ্টি করে কথা বলবি। সে যদি খেতে চায় খেতে দিবি। ভালো ব্যবহার করবি। কাউকে দুঃখ দিবি না। কারও সঙ্গে বেইমানি করবি না। কখনো মিথ্যা বলবি না।

শুভ মাথা নাড়িয়ে সব কথা শুনল, তারপর কাঁধে পিঠার ব্যাগ ঝুলিয়ে রাস্তার দিকে পা বাড়াল।

কিছুদূর যেতেই দেখা এক বানরের সঙ্গে। বানরটা কাছে এসে বলল, শুভ ভাই আমার, কোথায় যাচ্ছ তুমি?

শুভ যেতে যেতে বলল, আমি ওগরু দ্বীপে যাচ্ছি। শুনেছি সেখানে এক রাজা আছে। একবার রাজার কাছে যেতে দাও। আমি জানি সেখানে গেলেই আমাদের ভাগ্য খুলবে। জান তো, এতদূর যাব বলে আমার মা আমার জন্য গরম গরম পিঠা বানিয়ে দিয়েছে।

বানরটা বলল, যদি তুমি আমাকে একটা পিঠা খেতে দাও, আমি তোমার সঙ্গে যেতে পারি।

শুভ আর কি করে! সঙ্গে সঙ্গে তাকে একটা পিঠা খেতে দিল। পিঠা খেয়ে বানর এবার শুভর সঙ্গে হেঁটে চলল।

অনেক দূর চলে এসেছে অমনি দেখা এক ময়ূরের সঙ্গে। ‘কেকা’ ‘কেকা’ শব্দ করে ময়ূর কাছে এসে বলল, শুভ ভাই আমার, এই অবেলায় যাচ্ছ কোথায়?

শুভ যেতে যেতে বলল, আমি যাচ্ছি ওগরু দ্বীপে। শুনেছি সেখানে এক রাজা আছে। আমি জানি সেখানে গেলেই আমার ভাগ্য খুলবে। জান তো, আমার মা আমার জন্য গরম গরম পিঠা বানিয়ে দিয়েছে।

ময়ূর বলল, যদি তুমি আমাকে একটা পিঠা খেতে দাও, আমি তোমার সঙ্গে যেতে পারি।

শুভ বলল, এটা আর বলতে! এই নাও পিঠা, এক্ষুণি চলে এসো।

পিঠা খেয়ে ময়ূর এবারে শুভর সঙ্গে হেঁটে চলল।

এবারে কিছুদূর যেতেই ‘ঘেউ’ ‘ঘেউ’ শব্দ করে একটা কুকুর দৌড়ে এল। বলল, শুভ কোথায় যাচ্ছ শুনি?

শুভ যেতে যেতে বলল, আমি যাচ্ছি ওগরু দ্বীপে। জান তো, আমার মা আমার জন্য গরম গরম পিঠা বানিয়ে দিয়েছে।

কুকুর বলল, যদি তুমি আমাকে একটা পিঠা দাও, তোমার সঙ্গে আমিও যেতে পারি।

শুভ বলল, বেশ তো, এই নাও পিঠা, খেতে খেতে চল।

অনেক হাঁটাহাঁটির পর শুভ এলো ওগরু দ্বীপে। ওর সঙ্গে সঙ্গে এলো বানর, ময়ূর আর সেই কুকুর। হাঁটতে হাঁটতে এসে পৌঁছাল রাজার বাড়ি।

ওগরু দ্বীপের রাজা শুভকে দেখে বলল, তোমার নাম কি বালক? এখানে কেন এসেছ?

শুভ বলল, আমার নাম শুভ। আমি এসেছি ওগরু দ্বীপের রাজার কাছে। মানে আপনার কাছে। লড়াই করব বলে।

রাজা শুভর সঙ্গী বানর, কুকুর আর ময়ূরকে দেখে অবাক হলেন। বললেন, আমি বুড়ো হয়েছি। লড়াই করে আর কাজ নেই বাছা।

আমার ছেলেপুলে নেই। তুমি খুব বুদ্ধিমান আর শক্তিধর। তুমি এখানেই থেকে যাও। আমার পরে তুমিই এ দেশের রাজা হবে।

শুভ বলল, তা হয় না রাজামশাই। আমার দুঃখী মা-বাবা আমার পথ চেয়ে বসে থাকবে। সিংহাসনের চেয়ে আমার কাছে অনেক বড় আমার মায়ের কোল।

রাজা খুব খুশি হয়ে বললেন, তোমাকে কিছু সোনাদানা উপহার দিচ্ছি। এই নিয়ে বাড়ি ফিরে যাও। সবাই খুশি হবে।

তখনই শুভর কাছে এসে পৌঁছাল এক বস্তা ভর্তি সোনারূপো হিরা আর জহরত। আর এলো একখানা শেরওয়ানি, সঙ্গে নীলটুপি।

রাজা বললেন, শোনো, এই অদ্ভুত কোটটুপি পরলে তোমাকে কেউ দেখতেও পাবে না। বিপদে আপদে শুধু এই শেরওয়ানি ও টুপি ব্যবহার করবে। কারোর ক্ষতি করবে না।

শুভ এত সব পেয়ে ভীষণ খুশি।

বস্তাভর্তি সোনারুপা কাঁধে ঝুলিয়ে, এক হাতে শেরওয়ানি ও টুপি নিয়ে, সে ফিরে চলল বাড়ির দিকে।

বানর, ময়ূর আর সেই কুকুরটাকেও সঙ্গে নিতে ভুলল না সে।

    

     (জাপানি রূপকথার ভাব অবলম্বনে)

এই পাতার আরো খবর
up-arrow