Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ১ জুন, ২০১৬ ২৩:৫২
সীমানার বাইরে প্রথম পা
শামীম আজাদ
সীমানার বাইরে প্রথম পা

জামালপুর গার্লস স্কুলে পড়ার সময় আব্বা মুকুলের মহফিল ও কচিকাঁচার মেলার জন্য লিখিয়ে খামে ভরে পাঠিয়ে দিতেন। একদিন দেখি মুকুলের মহফিলে নিয়মিত লেখকদের ছবির সঙ্গে আমাদের দুই বোন শিরিন তরফদার ও শামীম তরফদারেরও ছবি। আমার গোলাপ ফুল জামা পরা শ্রেষ্ঠ ছবিটিই আব্বা পাঠিয়েছেন। তিনি তখন আমাদের প্রাইভেট সেক্রেটারি। সবগুলো ছোটদের পাতার ঠিকানা তার কাছে। কোন কাগজে কী লিখব তাও খবরদারি করেন। ছাপা হলে বসার ঘরে চা খেতে খেতে আম্মা-আব্বা উচ্চৈঃস্বরে হাসার সময় তার চেয়ে উচ্চৈঃস্বরে হাঁক দেন শামীম নতুন লেখাটা নিয়ে আস। আমি যাই এবং দাঁড়িয়ে সেটা পড়ে শোনাই। মোটেই বিড়ম্বিত বোধ করি না। পাস করার আগে থেকেই আব্বা ভাবতে লাগলেন এমন কোথায় উচ্চ মাধ্যমিক পড়ানো যায়, যেখানে পায়ে বাঁধা পড়বে কৃষ্টির নূপুর। রাজনীতি সচেতনতা নিয়ে আইয়ুবের আমলে একটু ভয়েই  আছেন। দানবীর রনদা প্রসাদ সাহার কুমুদিনী কলেজের কাচগাঁথা সুউচ্চ প্রাচীরঘেরা ভিতরে শাপলা ফোটা জলপাই গাছঘেরা টিনশেড বাঁশের দেয়াল ও এক ঘরে আট বা ছজন শিক্ষার্থীর ব্যবস্থা তার পছন্দ হলো।

আর আমি সেখানে প্রবেশের পরই ভাবলাম এবার লেখা যাক দু-একটি প্রেমের গল্প। আব্বা জানতেই পারবেন না যে আমি কোথায় কী পাঠাচ্ছি! বেগমের সম্পাদক নূরজাহান আপা। অপরূপ সুন্দরী। ঈদ সংখ্যায় কতজনের ছবি ওঠে! আম্মাকে দেখেছি নিয়মিত সংখ্যা থেকে সেলাইর ডিজাইন কার্বন কপি করে আমার হলুুদ জামার বুকে লেইজি ডেইজি প্যাটার্ন  তুলে নিতে। একবার আম্মা কী অসাধারণ একটা মোরব্বা করলেন। গোলাপি স্পঞ্জের মতো টুকরা। ঘন সরপরা দুধের ক্ষিরে চুবানো। মুখে দিলেই দাঁতের ফাঁকে ফাঁকে মিষ্টির রসে আয়াস চলে আসে। আমরা কেউই চিনলাম না কী খাচ্ছি। আম্মা রান্নাঘর থেকে তার রাঙা কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বললেন, জানতাম তোমরা কেউ বুঝতে পারবে না। এ হচ্ছে জাম্বুরার খোসার। আমি বেগম থেকে পেয়েছি! আমাদের বাসায় কখনো ইত্তেফাক কখনো আজাদ রাখা হতো, কিন্তু বেগম রাখা হতো নিয়মিত। আম্মার জন্য। আর আমার খালি প্রেমের গল্প লিখতে ইচ্ছা হতো। আব্বা জানেনই না আমি ক্লাস সেভেনেই লুকিয়ে কপাল কুণ্ডলা পড়ে ফেলেছি। আর তার মতো হওয়ার জন্য আম্মাকে আর চুল কাটতেই দিতে চাই না। কড়ি দিয়ে কিনলাম লেপের ভিতরে রেখেই শেষ করে ফেলছি। সঞ্চয়িতার কবিতা নকল করছি। স্কুলের পড়া শেষ করে কুমুদিনীতে অ্যারেস্টেড হয়ে পেলাম মুক্তি। সে রাতে টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শুনে শুনে লিখলাম, ‘এক পসলা বৃষ্টি’র মতো ক্লিশে নামেই আমার প্রথম প্রেমের গল্প। সাধারণ সংখ্যায় তা উঠল। সেদিন জলপাই গাছের নিচে কমন রুমের সামনে আমার কী ভাব। মাই গড, বিখ্যাত শিল্পী হাশেম খান এর ইলাশট্রেশন করেছেন! এদিকে আব্বার ট্রান্সফার হয়ে গেছে। পুরো পরিবার নারায়ণগঞ্জে। তখন কায়দে আজম রোডের বালুর মাঠের উল্টোদিকে তারা থাকেন। দারোগা চাচার গাড়ি করে গরমের ছুটিতে আড়াইশ মাইল বাসে করে সেই শীতল পদ্মফুলের ব্যালকনিতে পা দিয়ে গা জুড়িয়ে গেল। ড্রইং রুমেই আব্বার বন্ধুরা। আমি সালাম জানিয়ে ভিতরে গিয়ে দেখি ঠিক আগের মতো চা ও পিয়াজু হচ্ছে। আমিও চিনি ঘুটতে থাকলাম আম্মার সঙ্গে। হঠাৎ শুনি আব্বা অনেক গর্ব ভরে তার সিলেটি বন্ধুকে বলছেন, ‘আমার ফুরি (কন্যা) অখন বড় অই গেছে। বেগম’অ লেখে... বেগমের কোনো ঈদ সংখ্যায় না লিখেও বড়দের জন্য লিখতে শুরু করেছি তারই পরিচর্যায়। কোনো মোবাইলে বা চোখের দেখায়ও না। কাগজে কাগজে। ডাক যোগাযোগের মাধ্যমে।

লেখক :  প্রবাসী কবি।




up-arrow