Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : রবিবার, ৫ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ৪ জুন, ২০১৬ ২৩:৩৮
ইউপি নির্বাচনে ১১৭ লাশ পড়ার দায় কার?
কাজী সিরাজ
ইউপি নির্বাচনে ১১৭ লাশ পড়ার দায় কার?

এ লেখা যখন লিখছি তখন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ষষ্ঠ ধাপ, অর্থাৎ শেষ ধাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।  প্রার্থনা করি, গত পাঁচ ধাপে নির্বাচনের নামে যে ‘অধর্ম’ হয়েছে ‘আমার ভোট আমি দেবো, তোমার ভোটও আমি দেবো’র যে নোংরা খেলা হয়েছে সর্বোপরি সহিংসতা আর খুনোখুনির যে বীভৎস তাণ্ডব হয়েছে, এই ধাপে যাতে তার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। অবশ্য শেষ ধাপের এই ভোটাভুটিকে কেন্দ্র করে ভোটের আগেই প্রাণ গেছে কয়েকজনের।  সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী পাঁচ দফা ইউপি ভোটে ঝরে গেছে ১১৭টি অমূল্য প্রাণ (বাংলাদেশ প্রতিদিন ৩০ মে, যুগান্তর, ৩০-৫-১৬)। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ, পর্যবেক্ষক এমনকি সাধারণ মানুষেরও অভিমত, নির্বাচন কমিশনের চরম অদক্ষতা, ব্যর্থতা ও উদাসীনতায় এতগুলো তাজা প্রাণ এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে গেল। এই প্রথম দলীয় ভিত্তিতে দলীয় প্রতীকে তৃণমূল পর্যায়ের নির্বাচন হলো পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদে। ইউপি নির্বাচনে এত প্রাণহানির ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের যে প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে তা রাজীতিবিদদের ‘ছবক’ দেওয়ার মতো। রাজনীতিকরা সদাচরণ করলেই নাকি কোনো সহিংসতা হবে না। অর্থাৎ ইউপি নির্বাচনে অনিয়ম, কেন্দ্র দখল, জাল ভোট, সহিংসতা, হানাহানি, খুনোখুনি যা ঘটেছে তাতে নির্বাচন কমিশনের কোনো দায় নেই! কমিশন এ ব্যাপারে সরকার ও সরকারি দলের দিকেও অভিযোগের আঙ্গুল তুলেছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের জাতীয় ইতিহাসে ইউনিয়ন বোর্ড বা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ইতিপূর্বে কখনো এমন হানাহানি ও প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও এবার কেন তা ঘটল সে ব্যাপারে সরকারের কোনো প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি। মামুলি দু-একজন মন্ত্রী-মিনিস্টার আর হাইব্রিড নেতার দুঃখ প্রকাশ ছাড়া সরকারি কোনো কৈফিয়ৎ জনগণ পায়নি। স্থানীয় সরকারের এসব স্তর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণায়ের অধীন। দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম মন্ত্রণালয় চালাতে গিয়ে অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন বা তিনি সকাল-সন্ধ্যা সচিবালয়ে ফাইল ওয়ার্ক করেননি বলে মন্ত্রণালয়ের কোনো কাজ আটকে ছিল অথবা বিশাল বাজেটের মন্ত্রণালয়ে তিনি নয়-ছয় করেছেন, এমন কোনো অভিযোগ না থাকলেও সৎ মানুষটিকে হটিয়ে দেওয়া হয়। জনগণকে এমন একটা ধারণা দেওয়া হয়েছিল যে, সৈয়দ আশরাফকে দিয়ে এই মন্ত্রণালয় আর চলছে না, তিনি ‘এনালগ’ মন্ত্রী, তাই ‘ডিজিটাল যুগে’ ডিজিটাল মন্ত্রী দেওয়া হলো। কিন্তু এই ডিজিটাল মন্ত্রীর আমলেই পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এতসব অপরাধমূলক কাজ হয়ে গেল, মন্ত্রীর টুঁ শব্দটিও নেই। যেন কিছুই ঘটেনি, ‘সব কুচ্ ঠিক হ্যায়’। প্রশ্ন উঠেছে, তৃণমূলের এ নির্বাচন দলীয় স্বার্থে দলীয় ভিত্তিতে করার সিদ্ধান্ত বিনা বাধায় নেওয়ার জন্য তৃণমূলের ক্ষমতা যেনতেন প্রকারে দলীয় কব্জায় রাখার চিন্তা-পরিকল্পনা ‘ফ্রম, উইদিন আনচ্যালেঞ্জড’ রাখার জন্যই কি অধিকতর অনুগত ও বিশ্বস্তজনকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এত লোকের প্রাণহানির পরও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী স্বপদে বহাল আছেন, স্বেচ্ছায়ও পদত্যাগ করছেন না, ভাবতেই অবাক লাগে। মন্ত্রীর এ অবস্থান সরকারি অবস্থানেরই সমার্থক বলে ধরে নেওয়া যায় এবং এমন বিশ্লেষণ থেকে যে কেউ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেন যে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে, দলীয় প্রতীকে করার সিদ্ধান্তটি সরকার ও সরকারি দলের নীতিনির্ধারকদের পূর্ব পরিকল্পিত এবং তা সম্পূর্ণ দলীয় লাভালাভের বিবেচনায়। গণতন্ত্রকে তৃণমূলে পৌঁছানোর বা ভিত্তি দেওয়ার প্রচারটা ছিল মুখের বুলি মাত্র। উদ্দেশ্য ছিল, যে কোনো প্রকারে স্থানীয় সরকার পরিষদসমূহ দলের দখলে আনা। এ সর্বনাশা সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এত লোকের প্রাণহানি ঘটবে, এত লোক আহত হবে, দলের ভিতর বিদ্রোহের ঝাণ্ডা ওড়াবে কেউ, শাসকদলের নীতিনির্ধারকরা তা ভেবেছিলেন কিনা কে জানে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে করার ব্যাপারে সময় নিয়ে আলোচনা হয়নি। এ ব্যাপারে না উদ্যোগ ছিল নির্বাচন কমিশনের, না উদ্যোগ ছিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বা সরকারের। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞসহ পর্যবেক্ষকরা দলীয় ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ব্যাপারে ভিন্নমত ব্যক্ত করেছিলেন। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে, এতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের ঐতিহ্য বিলুপ্ত হবে। নির্দল যেসব জনসেবক আগে এসব পরিষদের মাধ্যমে জনগণকে সেবা দিতেন, জনগণ তাদের সেবা থেকে বঞ্চিত হবে। দলীয়ভিত্তিক নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে না। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারও প্রায় একই অভিমত ব্যক্ত করে বলেছিলেন অর্থ, বিত্ত ও পেশিশক্তির সঙ্গে ভদ্রলোকরা পারবেন না। যারা দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দেশের রাজনীতি ও নির্বাচন ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন, তারা সবাই আশঙ্কা ব্যক্ত করেছিলেন যে, গণতন্ত্র নয়, দলীয় ভিত্তিতে তৃণমূল সংগঠনের এ নির্বাচন তৃণমূলে হিংসা ও হানাহানি ছড়াবে। শাসকদল ও সরকার কারও কোনো পরামর্শ কানে তোলেনি। তৃণমূলে গণতন্ত্র ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে তারা দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার সর্বনাশ করেছে। নির্বাচন কমিশন সরকারের ইচ্ছাতেই সায় দিয়েছে— এটা একেবারেই পরিষ্কার। নির্বাচন কমিশন তার ক্ষমতা অনুযায়ী যথাযথ দায়িত্ব পালন করলে স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচন প্রহসনের নির্বাচন বলে সমালোচিত হতো না। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্বাচনকালে নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা। তারাও নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানের ব্যাপারে যথাযথ দায়িত্ব পালন করেনি। উল্টো অভিযোগ আছে যে, সব অনিয়মে তারা সহায়কের ভূমিকা পালন করেছে। প্রথম ধাপ থেকেই এ অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচন কমিশন কি ঘুমিয়ে ছিল? নিশ্চয়ই নয়। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ইউপি নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা ছিল পরিপূরক। সরকারি দলের প্রার্থীদের যে কোনোভাবে জিতিয়ে আনার দায়িত্বটাই তারা পালন করেছে বলে মনে হয়েছে। পাঁচ ধাপ নির্বাচনে এমন ‘একটা দৃষ্টান্ত কি আছে যে, বিএনপিসহ অন্য কোনো বিরোধী দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থী সরকারদলীয় প্রার্থী বা তার সমর্থকদের দ্বারা আক্রান্ত হলে, তাদের ভোটাররা ভোটদানে বাধাগ্রস্ত হলে ইসি বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে? বরং বহু অভিযোগ আছে বিএনপিসহ বিরোধী প্রার্থীদের নিশ্চিত বিজয় ছিনিয়ে নিতে সাহায্য করেছে তারা। এ পর্যন্ত ঘোষিত ফলাফলের প্রতি নজর দিলেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যায়। পাঁচ ধাপে ৩ হাজার ২৯টি ইউনিয়নে ভোটগ্রহণ করা হয়। আওয়ামী লীগ নিয়েছে ২ হাজার ১৯৫ চেয়ারম্যান (৬৭ শতাংশ), স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন ৬৯৭ ইউনিয়নে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী এর মধ্যে ৫০০ জনই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী। প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি কষ্টেশিষ্টে পেয়েছে ৩১৫টি (১০ শতাংশেরও কম)। এটা বিশ্বাসযোগ্য? অনেক পর্যবেক্ষকই বলছেন, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হলে প্রকৃত ফলাফল উল্টোই হওয়ার কথা। এই মহলের মতে দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত, অনিয়ম, কারচুপি, হানাহানি-খুনোখুনির পেছনে এটাই মূল কারণ।

কোনো সরকার যখন নিজেদের জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করে এবং নিজেদের শাসন ক্ষমতা নিয়ে শঙ্কিত থাকে, তখন তারা তৃণমূল স্তরে একটা ভিত্তি নির্মাণের চেষ্টা করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে তা অর্জন করা যাবে না বলে তারা ভিন্ন পথ ধরে। রাষ্ট্রক্ষমতার বলে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে। একটি অনুগত নির্বাচন কমিশন প্রয়োজন হয় তাদের। সেই কমিশনের সহযোগিতায় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে ‘জয়ের’ আয়োজন করে। এমন ‘জয়ের’ জন্য ভোট লাগে ভোটার লাগে না। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যথার্থই বলেছেন যে, এই নির্বাচনে বিএনপি ভোটে হেরেছে, কিন্তু রাজনীতিতে জিতেছে। সরকার ও সরকারি দল অধিকাংশ চেয়ারম্যান পদে জিতেছে বলে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে, কিন্তু এটা করতে গিয়ে তারা যে রাজনীতির পোশাক পরেছিলেন সে পোশাক হারিয়ে যে ‘বে-আব্রু’ হয়ে গেছেন সেটা খেয়াল করছেন না। এটা বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, বিএনপি রাজনৈতিক ভুলের কোটর থেকে বেরিয়ে আসছে। দলটির বিরুদ্ধে নির্বাচন বর্জন, হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা সমর্থন এবং তাদের শাপলা চত্বর সমাবেশে ঢাকাবাসীকে অংশগ্রহণের নিষ্ফল আহ্বান, ব্যর্থ মার্চ ফর ডেমোক্রেসি, তিন মাসের অবরোধ আন্দোলনের হঠকারিতার পর ভুল শুধরে সঠিক পথে ফিরতে চাচ্ছে। বিএনপি দলটি একটি নির্বাচনমুখী উদার গণতন্ত্রী দল। দলটি আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর মতো কর্মীনির্ভর দল নয়, এটি মূলত সমর্থকনির্ভর একটি দল। সমর্থকরা আবার দাঙ্গাবাজ নয়। শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ, মিছিল-বিক্ষোভ হলে হাজারে-লাখে অংশ নেবে, শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হলে নীরব ভোট বিপ্লব ঘটিয়ে দেবে। কোনো ঝামেলা, গোলযোগ দখলে তারা নেই। মনে হবে বিএনপি বুঝি সমর্থকশূন্য হয়ে গেছে। এ উপলব্ধি থেকেই তারা তাদের পথেই আবার ফিরে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে গত দুই/তিন বছরের হঠকারী দল, নির্বাচনবিরোধী কোনো ভূমিকা নেই। দৈনিক যুগান্তর তো গত ৩০ মে লিখেছে— প্রাণহানির ঘটনার নেপথ্যে এমপিদের হাত আছে। এমপি অথবা ভবিষ্যতে যিনি এমপি হতে চান, তারা ভোট অথবা ভোট কাটাকাটির জন্য চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটি বাহিনী হাতে রাখতে চান। তাই লড়াই হয়েছে মনোনয়নের জন্য, মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে জেতার জন্যও নিজেরা নিজেরা কুস্তাকুস্তি করেছে, নিজেরাই নিজেদের লোক মেরেছে। মিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী ১১৭ জন নিহতের মধ্যে অধিকাংশই আওয়ামী লীগের লোক। দলের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে অনেকটা স্থায়ী বিভাজন। বড় সর্বনাশ হয়েছে মানুষের মনে নির্বাচনের ব্যাপারে সৃষ্ট অনাস্থার ভাব।  নির্বাচন কমিশন ও সরকার এ দায়ও এড়াবে কী করে?

এ নির্বাচন কমিশন কি ভবিষ্যতে যে কোনো পর্যায়ের একটি নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে করতে পারবে বলে বিশ্বাস করা যায়?

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।

ই-মেইল : kazi.shiraz@yahoo.com




up-arrow