Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ৬ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা
আপলোড : ৫ জুন, ২০১৬ ২৩:৫৯

প্রসঙ্গক্রমে

ডায়াবেটিস ও রোজা

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

ডায়াবেটিস ও রোজা

বিশ্বে এ মুহৃর্তে ১.১ থেকে ১.৫ বিলিয়ন মুসলমান (যা বিশ্ব জনসংখ্যার ১৮-২৫ শতাংশ) বসবাস করে।

এ জনসংখ্যার সবল ও সাবালক সদস্যদের মাহে রমজানের রোজা রাখা আবশ্যক। বিশ্ব ডায়াবেটিক ফেডারেশনের হিসাব মতে পৃথিবীর জনসংখ্যার ৪.৬ শতাংশ মানুষ ডায়াবেটিসে ভোগে। ১৩টি ইসলামী দেশে ১২ হাজার ২৪৩ জন ডায়াবেটিস রোগীর ওপর পরিচালিত ‘এপিডিমাইওলজি অব ডায়াবেটিস অ্যান্ড রমজান’ (২০১১) শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে ৪৩% টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগী এবং ৭৯% টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগী মাহে রমজানে রোজা রেখে থাকে। এ হিসাবে ৪০-৫০ মিলিয়ন মুসলমান ডায়াবেটিস রোগী রোজা রাখে।

চন্দ্র মাসের হিসাব অনুযায়ী রমজান মাসে ২৯-৩০ দিন রোজা পালিত হয়। ভৌগোলিক ও ঋতুভেদে মোটামুটি ১৫-২০ ঘণ্টা রোজা রাখতে হয়। সুবেহ সাদেক থেকে সূযাস্ত পর্যন্ত ওষুধ সেবনসহ সব ধরনের পানাহার থেকে বিরত থাকতে হয়— সূর্যাস্তের পরে অবশ্য আবার স্বাভাবিকভাবে খাওয়া-দাওয়া করা যায়। অর্থাৎ সূর্যাস্ত থেকে সুবেহ সাদেক পর্যন্ত সময়ে পানাহারের সুযোগ আছে আর সুবেহ সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোনো কিছু গ্রহণ করা চলে না। মাহে রমজানে রোজা পালনের আবশ্যিক এ বিধান এ মাসে ‘অসুস্থ’ আর ‘মুসাফির’দের জন্য শিথিল করে দিয়ে বলা হয়েছে ‘অন্য সময়ে সে রোজা পূরণ করে নিতে হবে। আর এটিও যাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক হবে, তারা এর পরিবর্তে একজন মিসিকনকে খাদ্যদান করবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সিয়াম সাধনার এ সুযোগকে তার প্রিয় বান্দাদের জন্য ‘সহজ করতে চান’ তিনি ‘কোনো জটিলতা কামনা করেন না’।

রোজা পালন একজন ব্যক্তির জন্য যাতে অনাবশ্যক অসুবিধাজনক না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখার বিধান রয়েছে। পবিত্র কোরআনে একজন অসুস্থ ব্যক্তিকে তার স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পরিচর্যার স্বার্থে রোজা পালন থেকে বিরত থাকা বা অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে আবার এ দৃষ্টিতে একজন অসুস্থ ব্যক্তির সুস্থতা বিধানার্থে পানাহারের বিকল্প নয় এমন পর্যায়ের প্রতিষেধক গ্রহণেও সম্মতি রয়েছে। যেমন রোজা রাখা অবস্থায় রক্ত পরীক্ষা করা এমনকি প্রয়োজন হলে ইনসুলিন ইনজেকশন নেওয়া যেতে পারে। বিজ্ঞ আলেমরা অভিমত দিয়েছেন এতে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না।

সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া পর্যবেক্ষণে দেখা যায়—রোজায় ডায়াবেটিস রোগীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তুলনায় উপকৃতই হন বেশি। দেখা গেছে রোজার সময়টায় সেহরিতে সর্বশেষ খাদ্যগ্রহণের মোটামুটি ৮ ঘণ্টা পর শরীর প্রাকৃতিকভাবেই যকৃতে সঞ্চিত গ্লুুকোজ ব্যবহার করতে শুরু করে। এমতাবস্থায় গ্লুুকোজের মাত্রা কমে এলে চাপ পড়ে সঞ্চিত চর্বির ওপর। এভাবে দেহের সঞ্চিত চর্বি কমে বাড়তি ওজনও, যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে বলে চিকিৎসাবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। চিকিৎসার সঙ্গে পরামর্শক্রমে ওষুধ সেবন এবং ইনসুলিন গ্রহণের সময়সীমা ও মাত্রা পূর্ণ নির্ধারণ করে নিয়ে এবং অন্যান্য পরামর্শ সমন্বয় করে নিয়ে একজন ডায়াবেটিস রোগী অনায়াসে রোজা রাখতে পারেন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যারা রোজা রাখেন তারা বেশ কিছু জটিলতার সম্মুখীন হতে পারেন, বিশেষ করে (১) রক্তে সুগারের স্বল্পতা বা হাইপোগ্লাইসেমিয়া (২) রক্তে সুগারের আধিক্য বা হাইপারগ্লাইসেমিয়া (৩) ডায়াবেটিস কিটো এসিডোসিস এবং (৪) পানিশূন্যতা বা ডি-হাইড্রেশনে ভুগতে পারেন। সাধারণত শুধু খাবার আর ব্যায়ামের মাধ্যমে যারা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখেন তাদের রোজা রাখায় কোনো সমস্যা বা ঝুঁকি নেই। যারা মেটফরমিন, গ্লিটাজোনস কিংবা ইনক্রিটিন জাতীয় ওষুধ গ্রহণ করেন তাদের হাইপো হওয়ার ঝুঁকি অনেক কম। যারা ইনসুলিন কিংবা সালফোনাইল গ্রহণ করেন তাদের হাইপো হওয়ার ঝুঁকি কিছুটা হলেও থাকে। ওষুধ ও ইনসুলিনের মাত্রা বাড়িয়ে-কমিয়ে এ ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।

গবেষণায় দেখা গেছে ডায়াবেটিস রোগী রোজার আগের চেয়ে রোজার সময় বরং ভালো বোধ করেন, রক্তের শর্করা ভালো নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়। শুধু প্রয়োজন পূর্ব প্রস্তুতি ও সতর্কতা অবলম্বন।

ডায়াবেটিস রোগী চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে- (১) রোজার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থাগুলো এবং এর উত্তরণের উপায়সমূহ আগেভাগে জেনে নেওয়া (২) হাইপো না হওয়ার জন্য খাদ্য, ব্যায়াম এবং ওষুধের সমন্বয় করে নেওয়া (৩) প্রয়োজনে দিনে রাতে সুগার পরিমাপ (রোজা রেখে সুগার মাপলে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না বলে বিশিষ্ট আলেমদের অভিমত রয়েছে) করে ওষুধ কিংবা ইনসুলিন সমন্বয়ের বিষয়টি রোগী ও রোগীর পরিবারের সবাইকে অবহিত অবগত রাখা (৪) তিনবারের ওষুধ দুই বা একবারে পরিবর্তন করে নেওয়া (৫) রোজা শুরুর কয়েকদিন আগে থেকে দুপুরের ওষুধ রাতে খাওয়া শুরু করা (৬) রোজা শুরুর আগে নফল রোজা রেখে প্রস্তুতি নিতে পারেন।

লেখক : সরকারের সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান। বর্তমানে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির চিফ কো-অর্ডিনেটর।


আপনার মন্তব্য