Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বুধবার, ৮ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ৭ জুন, ২০১৬ ২৩:৪৬
ব্লাডি ইলেকশন
রোবায়েত ফেরদৌস
ব্লাডি ইলেকশন

‘গুলিবিদ্ধ নির্বাচন’, ‘টেঁটাবিদ্ধ নির্বাচন’ ‘রক্তাক্ত নির্বাচন’ ‘প্রাণঘাতী নির্বাচন’— ছয় পর্বের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে আমরা অনেকভাবেই চিহ্নিত করতে পারি। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং মন্তব্য করেছেন সৈয়দ আবুল মকসুদ, তিনি এই নির্বাচনকে ‘শহীদী নির্বাচন’ আখ্যা দিয়েছে। কতটা প্রাণ ঝরলে সেটাকে শহীদী নির্বাচন বিবেচনা করা যায়? আমরা যারা ‘গাজি’— অর্থাৎ নির্বাচন যুদ্ধে যারা এখনো মরিনি— এর উত্তর আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। তিন অর্থে আমরা এর ব্যাখ্যা করতে পারি। এক. নির্বাচনে একশর বেশি মানুষ হত্যার শিকার হয়েছেন, সেই অর্থে এটা শহীদী নির্বাচন; দুই. আবার অন্য অর্থে নির্বাচনে যে ব্যাপক কারচুপি, জালভোট আর অনিয়ম হয়েছে অর্থাৎ পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থাই ‘ইন্তেকাল ফরমাইয়াছেন’, সেই অর্থে নির্বাচনী ব্যবস্থাই শহীদের মর্যাদা লাভ করেছেন। তিন. নির্বাচন কমিশনের নির্বিকারত্ব আর তাদের কাণ্ডজ্ঞানহীন কাণ্ডকারখানা দেখে খোদ নির্বাচন কমিশনকেই ডেথ সার্টিফিকেটের মতো ‘জীবিত শহীদ’-এর সনদ দেওয়া যায়।

এ নির্বাচনে এত ‘ফাউল গেম’ খেলা হয়েছে কিন্তু যারা এর রেফারি ছিলেন সেই নির্বাচন কমিশন কী বলছে শুনুন। তারা বলছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে! প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাদের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন এই বলে যে, ‘ইউপি নির্বাচনে কিছু সহিংসতা ও অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। তবে সামগ্রিকভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। আগের চেয়ে ভালো নির্বাচন করা গেছে। প্রথম পর্বে যেভাবে শুরু হয়েছিল তার চেয়ে ইমপ্রুভ হয়েছে। আজকের পর্ব শুধু নয়, সামগ্রিকভাবে আমি বলেছি যে ভালো নির্বাচন করা গেছে (ইত্তেফাক, ৫ জুন)। বলা হয়ে থাকে ১৯৮৮ সালের ইউপি নির্বাচন সবচেয়ে বেশি সহিংসতাপূর্ণ ও প্রাণঘাতী ছিল। ওই নির্বাচনে ৮০ জনের প্রাণহানি হয়েছিল। আর এবারের নির্বাচনে নিহতের সংখ্যা একশ ছাড়িয়ে গেছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ১০৮, কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে ১১২, সুজনের হিসাবে ১৩৫ জন; আর পঙ্গুত্ববরণ, গুলিবিদ্ধ, কিংবা টেঁটা, বর্শা আর বল্লমের আঘাতে ১২ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। শতাধিক মানুষ নিহত আর বার হাজার মানুষ আহত হওয়ার পরে নির্বাচন কমিশন কীভাবে দাবি করে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে, প্রশ্ন রইল!

এখানে সরকারের অবস্থান বেশ চাতুর্যপূর্ণ। তারা চোরকে বলছে চুরি কর, গৃহস্থকে বলছে ধর ধর। কারণ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও বিভিন্ন সময় সংবাদ সম্মেলনে বলেছে, নির্বাচন কমিশন তাদের অভিযোগ গ্রহণ করছে না। এমনকি তারা নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদল নির্বাচন কমিশনে গিয়েও এসব অভিযোগ জানিয়ে এসেছে।

প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন কমিশনকে আরও কঠোর হওয়ার কথা বলেছিলেন। যদিও প্রধানমন্ত্রীর এমন কথা বলার কোনো দরকার ছিল না। কারণ নির্বাচন চলাকালীন সর্বোচ্চ ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের হাতেই থাকে। এ কমিশন নিয়ে সবচেয়ে মজার মন্তব্য করেছেন মহাজোট সরকারের সঙ্গী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান লেজেহোমো এরশাদ। তিনি বলেছেন, এক্স-রে করে নাকি দেখা গেছে নির্বাচন কমিশনের মেরুদণ্ড নেই। নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা অমেরুদণ্ডী প্রাণী কিনা সেটা স্পষ্ট বোঝা গেছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের চিন্তা ও কর্মতত্পরতা দেখে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এত মানুষ নিহত হলো কেন? বিভিন্ন সময়ই বিভিন্নজন এ নিয়ে মন্তব্য করেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য কারও সঙ্গে আলোচনা করেনি সরকার কিংবা কমিশন। একা একা এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গ্রামগুলোতে একটা দৃশ্যমান বিভেদ তৈরি করে ফেলা হয়েছে এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের পক্ষে বলা হয়েছিল, এর মাধ্যমে তৃণমূল পর্যন্ত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশ ঘটবে; বিপরীতে আমরা বিরাজমান নষ্ট রাজনীতিরি কদর্য সম্প্রসারণই তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে দেখলাম। এমনও দেখা গেছে যে একই গ্রামের পাশের বাড়ি বা পাড়ার লোকের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে অন্য পাড়া। এমন চিত্র এবারই প্রকটভাবে উঠে এসেছে। আগে স্থানীয় নির্বাচনের দিন একটি উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করত; এবার সেটা চোখে পড়েনি; গ্রাম পর্যায়ে যে বিভেদটি তৈরি হলো সেই বিভেদের দেয়াল কি আর ভেঙে ফেলা সম্ভব হবে? এটি একটি স্থায়ী ক্ষতি এর দায় কে নেবে? ক্ষমতাসীন দল যাচ্ছেতাই করেছে এবারের নির্বাচনে। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী উপজেলার নির্বাচন কর্মকর্তা জাহিদকে মারধর করেছে। কারণ কী? কারণ ৪ জুনে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার জন্য সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান উপজেলা নির্বাচন অফিসে নামের তালিকা পাঠান। ওই তালিকা অনুযায়ী বাহারছড়া ইউপির সব ভোটকেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং এজেন্টদের নিয়োগ দিতে বলেন। তালিকা অনুযায়ী কর্মকর্তা নিয়োগ না দেওয়ায় ওই সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা তাকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ডেকে এনে মারধর করেন। মজার ব্যাপার হলো চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে প্রহৃত নির্বাচন কর্মকর্তা জাহিদ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হলেও তার বিরুদ্ধে জামায়াত সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এনেছেন সংসদ সদস্য ও তার অনুসারীরা (বিডিনিউজ, ২ জুন)। বাহ কী সুন্দর। স্থানীয় সংসদ সদস্য যদি নিজেই দায়িত্ব নিয়ে নেয় কে হবে প্রিসাইডিং অফিসার তাহলে আর নির্বাচন কমিশনের দরকার কি? নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবে যে ব্যবস্থাটি নেওয়া হবে তা কচ্ছপ গতিতেই এগোবে বলেই মনে হচ্ছে। এর আগেও আমরা দেখেছি, প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন কমিশনকে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিলেও কয়েকজন পুলিশ সুপার (এসপি) ও থানার ওসি প্রত্যাহার এবং সাতক্ষীরার এসপি ও পাঁচ ওসিকে ঢাকায় ডেকে এনে ভর্ত্সনা করা ছাড়া আর কোনো কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারেনি কমিশন। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে কমিশন গত ২১ এপ্রিল গাজীপুরের এসপিকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়। কিন্তু মাত্র ১৩ দিনের মাথায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কমিশনের অনুমতি না নিয়ে ওই প্রত্যাহার আদেশ প্রত্যাহার করে নেয়। নির্বাচন কমিশনের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হলো বরগুনার সংসদ সদস্য শওকত হাচানুর রহমান, রাজশাহীর সংসদ সদস্য এনামুল হক ও ওমর ফারুক চৌধুরী, শেরপুরের হুইপ আতিউর রহমানকে সতর্ক করা। (কালের কণ্ঠ, ৫ জুন)।

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বর্তমান নির্বাচন কমিশন সরকারের আজ্ঞাবহ, ভয়াবহভাবে। এ কমিশন নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিএনপি ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগ থেকে কমিশন নিয়ে নালিশ করে আসছে। এখন সেটার পক্ষে আরও যুক্তি দাঁড়িয়ে গেল। এবার শুধু বিএনপি নয় জাতীয় পার্টি, সরকারের শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল এ কমিশনের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

কয়েকজনের বক্তব্য দিয়েই শেষ করা যাক, ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা বলেছেন, ‘নির্বাচন কমিশন যে আছে, তার যে একটা ভূমিকা থাকা দরকার, সেটা আমরা দেখিনি। ছয় পর্বের নির্বাচন শেষ হলে কমিশনের বিষয়ে আমরা একটা ফাইট দিব’ (প্রথম আলো ১০ মে)। ওয়ার্কার্স পার্টি সভাপতি ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেছেন, ‘একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের জন্য আমরা দীর্ঘ লড়াই করেছি, আপনারা সেই সংগ্রামের অর্জন। আপনারা ব্যর্থ হোন এটা আমরা চাই না। কিন্তু এ নির্বাচনে যা ঘটছে তা হলো ন্যক্কারজনক; ব্যালটে সিল মেরে বাক্সে ভরার মহোৎসব চলছে’ (বাংলাদেশ প্রতিদিন ৪ এপ্রিল)। জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেছেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সরকারি দলের প্রার্থীদের সঙ্গে তাদেরই বিদ্রোহীদের কোন্দলে সংঘাত হচ্ছে। অনেকের প্রাণ গেছে। অনেকে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৯ এপ্রিল)।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বলেছেন, দেশে এখন গণতন্ত্র নেই। উন্নয়নের নামে গণতন্ত্রকে দাবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। ইউপি নির্বাচনের নামে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যা হয়েছে, তাতে বলা যায়, আমাদের দেশে গণতন্ত্র যেন বিলীন হয়ে গেছে (বাংলাদেশ প্রতিদিন ২১ এপ্রিল)। জাতীয় পার্টির  চেয়ারম্যান এরশাদ বলেছেন, আমার ভোট আমি দেব, তোমার ভোটও আমি দেব— এই হচ্ছে আওয়ামী লীগের স্লোগান (প্রথম আলো, ৯ এপ্রিল)। এই নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার নতুন রেকর্ড হয়েছে। নির্বাচনে মোট ২১১ জন চেয়ারম্যান পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এরা সবাই ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী। এর আগের রেকর্ড, ১৯৮৮ সালে ১০০ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিল (প্রথম আলো, মে ২৭)। নির্বাচনী ব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষের যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে তাকে  ফিরিয়ে আনতে হবে, ফিরিয়ে আনতে হবে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের স্বার্থেই— শাসক দলকে এই সত্য কে বোঝাবে?

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

robaet.ferdous@gmail.com




up-arrow