Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ১০ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৯ জুন, ২০১৬ ২২:৫৭
ব্যবসায়ীরা যেন আখেরাত নষ্ট না করেন
মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী
ব্যবসায়ীরা যেন আখেরাত নষ্ট না করেন

রমজানের একটি নিত্য চিত্র এদেশে প্রচলিত হয়েছে। হু হু করে বাড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম। যারা মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য তারা চিন্তিত হয়ে পড়েন। কীভাবে কী খেয়ে রোজা রাখবেন। যে বাড়তি খরচ হবে এ মাসে তা আসবে কোত্থেকে। একটি মুসলিম দেশের এ দৃশ্য বড়ই লজ্জাজনক। অথচ সিয়াম হচ্ছে ত্যাগের মাস। এ মাসে ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যবসায়ীরা ত্যাগী হতে পারলে সিয়ামের অশেষ পুণ্য কামাতে পারবেন। এ দেশে আমরা কবে থেকে ব্যবসায়ীদের এরকম ত্যাগী মনোভাব দেখতে পাব জানি না। সিয়ামকারী ব্যবসায়ীদের জন্য ধর্মে রয়েছে অনেক দায়িত্ব। যা পালন করে তারা অনায়াসেই আখেরাতের ভারী আজাব থেকে রক্ষা পেতে পারেন।  আর পালন না করলে তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি। এ লেখাটি শুধু ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে লেখা। আশা করি তারা এ লেখা পড়ে উপকৃত হবেন। কোরআন তেলাওয়াত, তারাবি-তাহাজ্জত আর প্রেমে ইতিকাফে তন্ময় থাকার মাস মাহে রমজান। ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্যের প্রশিক্ষণের মাস রমজানে ভ্রাতৃঘাতী ও নির্মমতার চর্চা হয় আমাদের দেশে। মাহে রমজানকে কেন্দ্র করে কয়েক মাস আগ থেকেই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী বেশি মুনাফার লোভে গুদামজাত করা হয়। আর যেসব পণ্য দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই, যেমন কাঁচাবাজার, মাছ-মাংস, এগুলো রোজা শুরুর মাসখানেক আগেই গুদামজাত করা হয়। আর এসব দ্রব্য সতেজ রাখার জন্য বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত কেমিকেল ব্যবহার করা হয়। যা মানব স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। আমাদের ভাগ্য এতই খারাপ যে, রমজন মাসেও ভেজাল খাদ্য থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব হয় না। একদল অসাধু ব্যবসায়ী রমজান মাসকে কেন্দ্র করে বেশি মুনাফার লোভে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী স্টক করেন। যা মোটেই উচিত নয়। রমজান উপলক্ষে ব্যবসায়ীদের প্রথম ও প্রধান করণীয় হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী স্টক করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি না করা। বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা অর্থাৎ বেশি মুনাফার লোভে দ্রব্যসামগ্রী গুদামজাত করা স্পষ্ট হারাম। মানুষকে কষ্ট দিয়ে খাদ্যদ্রব্য গুদামজাতের ব্যাপারে রসুল (সা.) কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

সহি মুসলিমের ১৬০৫ নম্বর এবং তিরমিজির ১২৬৭ নম্বর হাদিসে হজরত মা’মার (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেছেন, ‘জনগণের জীবিকা সংকীর্ণ করে যে ব্যক্তি খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করবে সে বড় অপরাধী। আর জেনে রাখ! সে গুনাহগার সাব্যস্ত হবে।’ শোআবুল ইমানের ১০৪৪৫ নম্বর এবং মেশকাতের ২৭৭১ নম্বর হাদিসে হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রসুল (সা.)কে বলতে শুনেছি, ‘গুদামজাতকারী কতই না ঘৃণিত মানুষ। আল্লাহতায়ালা দ্রব্যমূল্য কমিয়ে দিলে সে চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। আর বাড়িয়ে দিলে সে আনন্দিত হয়। মেশকাতের ২৭৭২ নম্বর হাদিসে হজরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ৪০ দিন খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করে রাখবে, এর দ্বারা মানুষকে কষ্ট দেবে, সে এ সম্পদ দান করে দিলেও তার গুনাহ মাপের জন্য যথেষ্ট হবে না। খাদ্যদ্রব্য গুদামজাতকারী সম্পর্কে রসুল (সা.) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমদানি করবে সে রিজিকপ্রাপ্ত হবে। আর যে গুদামজাত করবে সে অভিশপ্ত হবে।’ মাহে রমজানে ব্যবসায়ীদের দ্বিতীয় প্রধান কর্তব্য হলো খাদ্যে ভেজাল না দেওয়া। খাদ্যে ভেজাল দিয়ে মানুষ ঠকানো বড় ধরনের গুনাহ। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশিয়ে ফেল না। আর জেনে বুঝে সত্য গোপন কর না। তোমরা খুব ভালো করেই জান সত্য কী।’ (সূরা বাকারা : ৪২।) যারা এমন কাজ করে রসুল (সা.) তাদের নিজ উম্মতের অন্তর্ভুক্ত করেননি। সহি মুসলিমে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে প্রতারণা করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ মুসলিমের অন্য বর্ণনায়, একবার রসুল (সা.) বাজারে গিয়ে একটি বস্তায় হাত ঢুকালেন। তিনি দেখলেন ওপরের খাদ্যগুলো শুকনো কিন্তু ভিতরের খাবারগুলো ভিজা। রসুল (সা.) বললেন, ওহে সওদাগর! তুমি ভিজা খাবারগুলো ওপরে রাখলে না কেন? যাতে কেউ প্রতারিত না হয়। ব্যবসায়ী বলল, হুজুর! বৃষ্টির পানিতে পণ্যগুলো ভিজে গেছে, তাই নিচে রেখেছি। রসুল (সা.) বললেন, জেনে রাখ! যে প্রতারণা করে সে আমার উম্মত নয়। ব্যবসায়ীরা অবশ্যই ওজনে কিংবা মাপে কম দেবেন না। অতীতে অনেক সম্প্রদায়কে এ অপকর্মের জন্য ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। আজও যারা মাপে কম দেওয়ার মতো মহাঅন্যায়ের সঙ্গে জড়িত তাদের ধ্বংসের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা ওজনে কিংবা মাপে কম দেয় তাদের জন্য ধ্বংস। তারা মানুষের কাছ থেকে পুরোপুরি মেপে নেয়। কিন্তু যখন মানুষকে মেপে দেয় তখন প্রাপ্যের চেয়েও কম দেয়।’ (সূরা মুতাফফিফিন : ১-৩।)

পবিত্র রমজান মাসে তাকওয়ার প্রশিক্ষণ নেওয়ার কথা থাকলেও আমরা অন্যায়, জুলুম আর মানুষ ঠকানোর প্রশিক্ষণ নেই। অন্য মাসগুলোতে যে হারে মানুষ ঠকানো হয় পবিত্র রমজানে তা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। আর এ ঘৃণ্যতা আমাদের দেশেই হয়ে থাকে বেশি। বিশ্বের অন্যান্য দেশে এভাবে মানুষ ঠকানো হয় না। রমজানসহ সারা বছর মানবতা ও ধর্মচর্চায় তারা আমাদের চেয়েও এগিয়ে। এ রমজানে মানুষ ঠকানো বন্ধ হবে এই প্রত্যাশাই সবার কাছে। মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের তৌফিক দান করুন।  আমিন।

লেখক : বিশিষ্ট মুফাসসিরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।

www.selimazadi.com

এই পাতার আরো খবর
up-arrow