Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বুধবার, ১৫ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ১৪ জুন, ২০১৬ ২৩:২৩
সন্ত্রাস রোধে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই
নূরে আলম সিদ্দিকী
সন্ত্রাস রোধে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই

আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি আমার স্ত্রীসহ পরিবারের কিছু সদস্য নিয়ে ওমরাহ হজের লক্ষ্যে প্রথমে মদিনা মনোয়ারা জিয়ারত ও পরে মক্কায় খানকায়ে কাবায় পবিত্র ওমরাহ হজ পালন করতে গিয়েছিলাম (আল্লাহ আমার রিয়ার গুনাহ মাফ করুন)। উভয় জায়গায় পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে কখনো অশ্রুসিক্ত নয়নে, কখনো বেদনাপ্লুত হৃদয়ে আমার একটা ফরিয়াদ ছিল— আল্লাহ তুমি অভিশপ্ত, দুর্নীতিগ্রস্ত, ক্ষমতালিপ্সু, সংঘাতপূর্ণ ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিবর্গের কবল থেকে দেশকে বাঁচাও।  যারা ক্ষমতা, অর্থ, স্বার্থ ছাড়া দেশ ও জাতির কথা ভাবে না, যারা প্রকাশ্যে জনগণের কল্যাণের কথা বললেও হৃদয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, অনুভূতির পরতে পরতে শুধু স্বার্থচিন্তা লালন করে তাদের প্রভাব থেকে দেশকে রক্ষা কর। আমি এই রমজান মাসে বিনম্রচিত্তে এই ফরিয়াদ করার জন্য দেশবাসীকেও উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি। আল্লাহতায়ালার অলৌকিক শক্তিই একমাত্র বর্তমান পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে পারে। রাজনৈতিক সমস্যা রাজনৈতিকভাবেই সমাধানের সব মননশীলতা আজ অবক্ষয়ের অতলান্তে নিমজ্জিত। আমি আবারও ফরিয়াদ করি, এই ঘনঘোর অমানিশার মধ্য থেকে আল্লাহ তুমি আলোর দীপ্তি ছড়াও।

দেশে ফিরে এসে ব্যথিত চিত্তে অবলোকন করলাম, প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও টার্গেটেড হত্যার কর্মকাণ্ড। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় তো বটেই, তার চেয়েও উৎকণ্ঠার বিষয় যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বিবৃতিতে বলেন— ‘টার্গেট কিলিং হলেও গণহারে হত্যার কোনো তথ্য নেই।’ 

পুুলিশ অফিসারের স্ত্রীর হত্যাটিকে যেভাবেই দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হোক না কেন, আমার কাছে এটি মারাত্মক ও ভয়াবহ এই কারণে যে, পুলিশকে থমকে দেওয়ার পরিকল্পনার এটি একটি অংশ। আমি এখনো গভীর প্রত্যয়ে বিশ্বাস করি, বাস্তবে বাংলাদেশে আল-কায়েদা বা আইএসের মতো কোনো আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের শাখা-প্রশাখা নেই। আমি আগেও বহুবার বলেছি, সন্ত্রাসী ধরলে, অস্ত্রাগার থেকে অকেজো, অচল রাশি রাশি অস্ত্র ঘটা করে প্রদর্শন করবেন না। এটি আন্তর্জাতিক বিশ্বে অকারণে আমাদের দেশের অভ্যন্তরে আইএস বা আল-কায়েদার অবস্থিতির ধারণা সৃষ্টি করবে; অনাকাঙ্ক্ষিত, অনাহৃত, অনভিপ্রেত হলেও আজকে হয়েছেও তাই। এই দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। সন্ত্রাসীর কোনো দল নেই— এটা শুধু মুখে বললেই হবে না, কঠোরভাবে বাস্তবে প্রয়োগ করে জনগণের মনে একটা আস্থা ও প্রতীতির জন্ম দিতে হবে। আজকে মানুষ এতটাই ভগ্নহৃদয় ও হতাশাগ্রস্ত যে, পুলিশ অফিসারের স্ত্রীকে যখন হত্যা করা হলো, তখন কেউ ছুটে তো এলোই না, প্রতিরোধের বিন্দুমাত্র পদক্ষেপও নেয়নি। এর আগেও জনগণের এমন নিস্পৃহতার ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত রয়েছে। এখান থেকে জনগণকে বের করে আনার একমাত্র পথ তাদের মনে এই প্রতীতি ও প্রত্যয় সৃষ্টি করা যে, দোষীদের বিচার হবে এবং সন্ত্রাসের শিকার ব্যক্তি বা পক্ষকে কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে এলে তারা অযথা কোনো হয়রানি ও বিড়ম্বনার শিকার হবেন না। এ বিষয়ে একটা জাতীয় দুর্যোগকাল ঘোষণা করে রাজনৈতিকভাবে সর্বদলীয় ও সামাজিকভাবে সুশীল সমাজের একটি মহাসম্মেলন আয়োজন করার জন্য আমি পরামর্শ দিয়েছিলাম। জাতীয় সমস্যাটিকে মোকাবিলা করার জন্য সবাইকে সম্পৃক্ত করা এবং সমাজের সর্বস্তর থেকে অভিমত ও অভিব্যক্তি তুলে আনার বিকল্প নেই।

সম্প্রতি পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানের যে ঘোষণাটি এসেছে, অনুগ্রহপূর্বক সেটিকে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে পরিচালিত করবেন না। তাতে সমাধান তো হবেই না, বরং সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে। হাতে একটু সময় নিয়ে রাজনৈতিক সংগঠনসমূহের সব স্তরের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে একটি জাতীয় সম্মেলন করতে পারলে এই সাঁড়াশি অভিযান বা সন্ত্রাস দমনের যে কোনো পদক্ষেপ কার্যকর ও ফলপ্রসূ হতো।

জাতি যখন অসহনীয় দুঃস্বপ্নের মধ্যে নিমজ্জিত, তখন যে জাতীয় বাজেটটি পেশ করা হলো, সেটি এতটাই স্বপ্নবিলাসী এবং কল্পনাপ্রসূত যে, এটা বাস্তবায়ন সম্ভব— দেশের অর্থনীতিবিদরা তো বটেই, স্বয়ং অর্থমন্ত্রীও বিশ্বাস করেন না।

স্যার হ্যারল্ড উইলসন একবার বলেছিলেন, শুধু বাজেট কেন, যে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করার জন্য যোগ্য মানুষের সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। স্বয়ং অর্থমন্ত্রী যেখানে বলেন, দেশে আজ পুকুরচুরি নয়, সাগরচুরি হচ্ছে; তখন এই বিশাল কলেবরের বাজেটের সুফল জনগণ কতটুকু পাবেন, তা নির্ণয় করতে কষ্ট হয় না। আমি কারও বিরোধী নই, কারও পক্ষেও নই। আগের বাজেটগুলোর সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে বর্তমান বাজেটের ক্ষেত্রে একটা মৌলিক পার্থক্য দেশবাসী অনুধাবন করতে পারছে। আগের বাজেটোত্তর আলোচনায় শুধু ক্ষমতাসীন মহাশক্তিধরের বন্দনা-অর্চনা, স্তুতি ও স্তাবকতা; অন্যদিকে বিরোধীদলীয় জোটের পিণ্ডি চটকানো ও গোষ্ঠী উদ্ধার করা ছাড়া বাজেটের সমালোচনা ও পর্যালোচনা কিছুই হতো না। বাজেট অধিবেশনটি সামগ্রিকভাবে নেতিবাচক আলোচনারই প্রসূতিকাগার ছিল। এবার মনে হচ্ছে, বাজেট সম্বন্ধে আলোচনা করার একটা প্রবণতা সংসদ সদস্যদের মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ ব্যাপারে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা যতই সুদৃঢ় হবে, ততই কল্যাণকর।

দুর্নীতি আমাদের জাতীয় জীবনকে শুধু কুরে কুরে খাচ্ছেই না, লক্ষ্য অর্জনের এটি প্রধান অন্তরায় হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে এবং সমগ্র জাতির মূল্যবোধকে অবক্ষয়ের অতলান্তে নিমজ্জিত করেছে। এর অসংখ্য দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। যেমন ফ্লাইওভারে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় যেখানে ৪০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশে প্রতি কিলোমিটারের নির্মাণ ব্যয় ১৭২ কোটি টাকা! শোনা যাচ্ছে, পদ্মা সেতুর রেলসংযোগটি চায়নার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিনা টেন্ডারেই প্রদান করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এর অন্তর্নিহিত রহস্যটি কী, সেটি উন্মোচিত না হলেও অহেতুক জনমনে সন্দেহ ও সংশয় তৈরি করছে। দুর্নীতি, দুর্নীতি এবং দুর্নীতিই আমাদের জাতীয় জীবনের মহাশত্রু। দুর্নীতির এই উন্মত্ত খেলায় জাতির সর্বস্তরের মানুষ এমনভাবে সম্পৃক্ত হচ্ছে যে, জাতীয় জীবনে নৈতিকতার অস্তিত্বই আজ নিঃশেষিত। পবিত্র রমজানেও ফরমালিন-বিমুক্ত কোনো খাদ্যপণ্য নিশ্চিন্তে ক্রয় করা যায় না। বাংলাদেশ ছাড়া খাদ্যে বিষপ্রয়োগের এহেন হীনমন্যতা বিশ্বের আর কোথাও আদৌ নেই। আমাদের নিকটতম পড়শী পশ্চিমবঙ্গেও তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রীত খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন মেশানো অসম্ভব। অথচ তাদেরই বাংলাদেশে রপ্তানিকৃত ফলমূলসহ সব খাদ্যদ্রব্যেই ফরমালিনসহ বিভিন্ন প্রাণঘাতী রাসায়নিক পদার্থ অবাধে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে জনগণ কার্যকর ও ফলপ্রসূ কঠিন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি রাখে।

দ্রুতবিচার আইনে শেয়ারবাজার, হলমার্ক, ডেসটিনি, যুবক, বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতির চিহ্নিত ও জঘন্য অপরাধীদের মধ্যে অন্তত দুয়েকজনের প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করলে এটা যে অবদমিত হতো তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। মৃত্যুদণ্ড দেওয়া তো দূরে থাক, তাদের দোর্দণ্ড প্রতাপে সামগ্রিকভাবে সমাজ, বিশেষ করে ব্যাংকগুলোর শিকারির বন্দুকের নলের সামনে কম্পমান পাখির মতো অবস্থা। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো সম্পূরক বাজেট নিয়ে আলোচনাকালে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বাজেট ঘাটতির অনেকটাই পূরণ করতে হবে স্থানীয় ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিয়ে।

আমি যেহেতু সম্প্রতি বিদেশ থেকে এসেছি, প্রবাসীদের দেশের প্রতি যে মমত্ববোধ লক্ষ্য করলাম তা দেখলে আশ্চর্যান্বিত হতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে সৌদি আরবে আকামা পরিবর্তনের ব্যবস্থা গৃহীত হওয়ায় আমাদের প্রবাসী শ্রমিকরা প্রফুল্লচিত্ত। আকামা পরিবর্তনের সুযোগটি তৈরি হলেও বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মচারীদের সযত্ন লালিত্যের প্রয়োজন এটিকে প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে। কিন্তু দূতাবাসের ওই দায়িত্বপ্রাপ্তরা প্রবাসী শ্রমিকদের বিন্দুমাত্র পাত্তাই দেন না। অন্যদিকে তাদের নাগরিকদের ছোট বড় যে কোনো প্রয়োজনে সার্বক্ষণিক ভারত ও পাকিস্তানের দূতাবাসের দ্বার উন্মুক্ত। শুনেছি, সৌদি আরবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ও প্রতিভাদীপ্ত ছাত্র ছিলেন। সৌদি প্রশাসনের সঙ্গে তার নিবিড় সৌহার্দ্যপূর্ণ একটা সম্পর্ক আছে। অথচ আমাদের দূতাবাসে প্রবাসী শ্রমিকদের প্রবেশ প্রায় নিষিদ্ধ। বিগত ওমরাহ সফরকালে তারা আকামা পরিবর্তনের সমস্যাটি নিয়ে কথা বলার জন্য সবিশেষ অনুরোধ করেছিল। আমি এ নিয়ে চ্যানেল আইর ‘তৃতীয় মাত্রা’য় অনেকবার কথা বলেছিও। এ জন্য তাদের কৃতজ্ঞতার কোনো শেষ নাই। এবার তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশে এলে বিমানবন্দরে নেমে তাদের মনে হয়, জলে কুমির ডাঙ্গায় বাঘ। আসার সময় কাস্টমস, যাওয়ার সময় ইমিগ্রেশনের হয়রানি তাদের দেশে ফেরার আবেগ, উচ্ছলতাকে ব্যাহত করে। আমি আশা করব, সরকার এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সম্প্রতি শেখ হাসিনা সাবেক সমাজতান্ত্রিক কয়েকটি দেশ সফর করেছেন। সেসব দেশ থেকে প্রাপ্তির তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য বর্ণনা তিনি দিতে পারেননি। অবশ্য জাপান সফরে কিছু সফলতা তার আছে।

সৌদি আরব সফরে মনে হয়, নতুন করে শুধু ৫ লাখ শ্রমিক প্রেরণই নয়, তিনি বেশ কয়েকটি সম্ভাবনার দ্বার সৃষ্টি করতে পেরেছেন। জঙ্গি দমনে সহযোগিতা প্রদানে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, পবিত্র মক্কা-মদিনার নিরাপত্তার জন্য সৈন্য প্রেরণের অঙ্গীকার আমাদের শুধু আশ্বস্তই করেনি, শান্তির ধর্ম ইসলামের প্রতি আমাদের আন্তরিকতা যে কতটুকু প্রগাঢ়, আমাদের চেতনা যে কতটুকু নিষ্কলুষ, আমাদের হৃদয় যে কতটুকু আবেগাপ্লুত সেটিকেই প্রতিভাত করেছে। এর প্রতিদান আমরা সৌদি বাদশা সালমানের কাছে প্রত্যাশা করি না। আল্লাহ এবং একমাত্র আল্লাহকে খুশি করার জন্য শেখ হাসিনা এই অভিব্যক্তি ব্যক্ত করে থাকলে স্বয়ং আল্লাহই এর প্রতিদান দিবেন— প্রতিটি দেশের প্রতিটি মানুষ এটা সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করে। শেখ হাসিনার ডানে বাঁয়ে অবস্থিত কিছু  লোক হয়তো এতে মনঃক্ষুণ্ন। সৌদি আরব থেকে প্রত্যাবর্তনের পর শেখ হাসিনা যে সংবাদ সম্মেলনটি করেছেন, সেটি কিছুটা গুণগত মানবিচ্যুত হয়েছে অনভিপ্রেত ও অযাচিতভাবে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের সমালোচনা করার কারণে। সমালোচনা যৌক্তিক কি অযৌক্তিক সেটি বড় কথা নয়, এই সম্মেলনে তা প্রাসঙ্গিক ছিল না। রাজনীতিকরা স্টেটসম্যান হওয়ার উদ্যোগ নেবেন কবে? সর্বময় ক্ষমতার অধিকারিণী হওয়া সত্ত্বেও ন্যূনতম ঔদার্য না দেখালে সন্ত্রাস, জঙ্গি, মুরতাদ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠবে কীভাবে?

দেশের রাজনীতিকরা আজকে রাষ্ট্র এবং জনগণের সমস্যার ধার ধারেন না। ক্ষমতাটাই তাদের কাছে সব। অপ্রাসঙ্গিক কিনা বলতে পারব না, দলীয় প্রতীকে সাম্প্রতিক যে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনটি হয়ে গেল তাতে শুধু ১৪২ জন মৃত্যুবরণ করল না, ১০ হাজারের অধিক লোক আহতই হলো না, দেশের রাজনীতিতে বিশেষ করে আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ে যে বিভাজন সৃষ্টি হলো, তা থেকে উত্তরণের পথটা অত্যন্ত কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ।

সৌদি আরব সফর-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনে সংঘর্ষ ও আহত নিহতের বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে ব্যর্থতা স্বীকার না করে শেখ হাসিনা অতীতের নির্বাচনী সংঘর্ষ ও নিহতের সংখ্যা উল্লেখ করে বিষয়টিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে আওয়ামী লীগের কত বড় ক্ষতি করছেন তা উপলব্ধি করার অবস্থানে তিনি এখন নেই। ইউনিয়ন পর্যায়ে মনোনয়ন বাণিজ্য তার দলের ত্যাগী কর্মীদের অকুতোভয় মননশীলতা ও দলের প্রতি তাদের অকৃত্রিম আনুগত্যে যে প্রচণ্ড আঘাত হেনেছে ক্ষমতার অন্ধ দাম্ভিকতায় তিনি আজ তা উপলব্ধি করতে অক্ষম। অন্যদিকে পুলিশের বাড়াবাড়ি রকমের দৌরাত্ম্য, দলকানা নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা আবারও প্রমাণ করল তার দুর্দমনীয় ক্ষমতা ও তার প্রয়োগের মধ্যে কোনো অবস্থায়ই একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন আশা করা যায় না।

বিরোধীদলীয় জোটের ব্যর্থতা, সাংগঠনিক দুর্বলতা, দুর্নীতি ও দুর্বিচারের বিরুদ্ধে তাদের বিস্ময়কর নির্লিপ্ততা সাধারণ মানুষকে আজকে নীরব, নিষ্পৃহ ও নিস্তব্ধ করে দিয়েছে। যুগে যুগে এদেশের মানুষের মুষ্টিবদ্ধ উত্তোলিত হাত আজ মাটির দিকে নামানো। রাজনীতিটাকেই আজ প্রান্তিক জনতা কেবলমাত্র ক্ষমতার জুয়াখেলা মনে করে।  তারা সবাই শঙ্কিত, দুই জোটের কার রোষানলে পড়ে কে কোন বিপদের গহ্বরে নিপতিত হন। চোখের সামনে খুন, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ যাই হোক না কেন, জনগণ সেটা সন্তর্পণে এড়িয়ে যাচ্ছে।  এটা যেন প্রান্তিক জনতার ক্রান্তিকাল।

লেখক : স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা।




up-arrow