Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ১৭ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ১৭ জুন, ২০১৬ ০০:০২
রমজানের পুরো সময় কোরআনের সঙ্গে থাকার চেষ্টা করুন
মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী
রমজানের পুরো সময় কোরআনের সঙ্গে থাকার চেষ্টা করুন

মধু মাস জ্যৈষ্ঠ শেষে আষাঢ়ের বারি বরষণে মুমিন দিলে দোলা দিচ্ছে যে প্রেম, তারই নাম সংযম। যাবতীয় সাধন শিখে নেওয়ার এই তো সময়। মাহে রমজান ইবাদতের বসন্তকাল। এখনই সুযোগ প্রভুর প্রেমে মগ্ন থেকে নিজেকে জান্নাত উপযোগী হিসেবে গড়ে তোলা। বিগত জীবনের পাপ মাপের এই তো সুযোগ। রমজানের শ্রেষ্ঠ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য রমজানের আমল সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা চাই।  রহমতের মাস রমজানের প্রথম ও প্রধান আমল হলো ‘রোজা’। রোজার প্রতিদান ও খোশ-খবরি সম্পর্কে অসংখ্য হাদিস রয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেছেন, ‘আদম সন্তানের প্রতিটি ভালো কাজের সওয়াব ১০ থেকে সাতশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়।

আল্লাহ বলেন, রোজা এর ব্যতিক্রম। কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমিই এর প্রতিদান দেব। সে তার প্রবৃত্তি ও পানাহারকে আমার জন্যই বর্জন করেছে।’ (মুসলিম : ২৭৬৩, ইবনে মাজাহ : ১৬৩৮।) আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন রোজা বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, হে আল্লাহ! আমি তাকে পানাহার ও যৌন সম্ভোগ থেকে বিরত রেখেছি। অতএব, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন।’ (মুসানাদে আহমাদ : ৬৬২৬, মুস্তাদরাক হাকিম : ২০৩৬।)

রহমতের রমজানের দিনে ও রাতে অবিরত ধারায় মহান প্রভুর দয়া বর্ষিত হয়। দিনে রোজা রাখার পর রাতে প্রভুর দয়ায় সিক্ত হতে চাইলে মুমিন বান্দাকে দাঁড়িয়ে যেতে হবে তারাবির নামাজে। গভীর রাতে তাহাজ্জুতও পড়তে হবে প্রেমের সঙ্গে। তবেই কোরআনে বর্ণিত মুমিন চরিত্র অর্জন করা যাবে। আল্লাহ বলেন, ‘রহমানের বান্দা হলো তারা, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং মূর্খরা তাদের সঙ্গে ঝগড়া করতে চাইলে শান্তিপূর্ণভাবে জবাব দেয়। আর তারা সেজদা ও নামাজে দাঁড়িয়ে রাত কাটিয়ে দেয়। (সূরা ফোরকান : ৬৩-৬৪।) রমজানের রাতের নামাজের ফজিলত সম্পর্কে রসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইমান এবং ইহতেসাবের সঙ্গে রমজানে নামাজে দাঁড়িয়ে থাকে তার আগের সব গুনাহ মাপ করে দেওয়া হবে।’ (বুখারি : ৩৭, মুলিম : ৭৫৯।) হজরত ওমর (রা.) রাতের যতটুকু ইচ্ছা নামাজে দাঁড়িয়ে থাকতেন। যখন রাতের অর্ধেক অতিবাহিত হতো তখন তিনি পরিবারের সদস্যদের জাগিয়ে দিতেন। আর নামাজ! নামাজ! বলে এই আয়াত তেলাওয়াত করতেন, ‘তোমার পরিবারবর্গকে নামাজের নির্দেশ দাও এবং তার ওপর অবিচল থাক।’ (সূরা ত্ব-হা : ১৩২।) দিনে সিয়াম আর রাতে কিয়ামের পাশাপাশি দানের হাতকেও প্রসারিত করতে হবে। রমজানকে দানের মাস হিসেবে গ্রহণ করুন। বেশি বেশি দান-সদকার মাধ্যমে রমজানের ফায়দা পুরোপুরি অর্জন করুন। তিরমিজি শরিফে হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রসুল (সা.) বলেছেন, ‘শ্রেষ্ঠ সদকা হলো রমজান মাসে সদকা করা।’ বুখারি শরিফে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, ‘রসুল (সা.) রমজান মাসে প্রবাহিত বাতাসের মতো অর্থাৎ অকাতরে দান করতেন।’ দান করা মুমিনের অন্যতম গুণ। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর কিতাব তেলাওয়াত করে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করে আর আল্লাহর দেওয়া জীবিকা থেকে গোপনে এবং প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারাই এমন ব্যবসার আশা করতে পারে যাতে ক্ষতির কোনো সম্ভাবনা নেই।

কারণ তারা বিশ্বাস করে, আল্লাহ তাদের কাজের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন এবং আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে আরও বেশি দেবেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল ও গুণগ্রাহী। (সূরা ফাতির : ২৯-৩০।) অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘এ কিতাবে কোনো ভুল বা সন্দেহ নেই। এটি মুত্তাকিদের জন্য পথপ্রদর্শক। (আর মুত্তাকিদের পরিচয় হলো) যারা গায়েবের প্রতি বিশ্বাস করে, নামাজ কায়েম করে এবং তাদের যে রিজিক দিয়েছে তা থেকে ব্যয় করে। (সূরা বাকারাহ : ২-৩।)

রমজানের পুরো সময় কোরআনের সঙ্গে থাকার চেষ্টা করুন। প্রযুক্তির কল্যাণে কোরআনের সঙ্গে থাকা এখন অনেক সহজ। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোরআনের একটি অক্ষর পড়বে বিনিময়ে তাকে একটি সওয়াব দেওয়া হবে। আর প্রতিটি সওয়াব দশ গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হবে।’ (তিরমিজি : ২৯১০, সহি আল জামে : ৬৪৬৯।) হজরত আয়শা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোরআনের জ্ঞানী হবে, কেয়ামতের দিন সে সম্মানিত ফেরেশতাদের সঙ্গে থাকবে। (বুখারি : ৪৫৫৬, মুসলিম : ১৮৯৮।) হজরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কোরআন তেলাওয়াত কর। কারণ কেয়ামতের দিন কোরআন তার তেলাওয়াতকারীর জন্য সুপারিশ করবে।’ (মুসলিম : ১৯১০, মুসনাদে আহমাদ : ২২১৪৬।)

হজরত বুরাইদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন কোরআন তেলাওয়াতকারীর মাথায় নূরের তাজ পরানো হবে এবং বলা হবে— কোরআন পড়তে থাক আর উচ্চ মাকামে উঠতে থাক।  (মুসনাদে আহমাদ : ২২৯৫০, মুস্তাদরাকে হাকেম : ২০৮৬।)

আল্লাহ আমাদের কোরআন বোঝার তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : বিশিষ্ট মুফাসসিরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।

            www.selimazadi.com




up-arrow