Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৮ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৮ জুন, ২০১৬ ০০:০৭
অরল্যান্ডোর ম্যাসাকার কী বার্তা দেয়
মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার পিএসসি (অব.)
অরল্যান্ডোর ম্যাসাকার কী বার্তা দেয়

ইসলামের মতো পবিত্র ও শান্তিকামী ধর্মের নামে জঙ্গিবাদীদের নিরীহ নিরপরাধ মানুষ হত্যা আজ এক মহাবৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে জঙ্গি আক্রমণ হলে ভূমিকম্পের মতো মুহূর্তের মধ্যে তা প্রতিটি শান্তিকামী মানুষের হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশে জঙ্গি আক্রমণ হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যেমন উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ আছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রে জঙ্গি আক্রমণ হলেও আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ আছে। পার্থক্য শুধু এই যে, আমেরিকা আমাদের সরকারের ওপর খবরদারি করে, আর আমাদের সরকার সঙ্গত কারণেই আমেরিকার ওপর খবরদারি করে না। স্বল্পসংখ্যক বা ক্ষুদ্র কিছু ধর্মান্ধ উগ্র গোষ্ঠীর অপকর্মে বিশ্বের প্রায় দেড়শ কোটি মুসলমান আজ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে প্রতিনিয়ত হেয় হচ্ছে, প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। আমরা বাংলাদেশের মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ, আমাদের অনেক আপনজন বহুবিধ কারণে আমেরিকায় বসবাস করছে। নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রের চাহিদা অনুযায়ী আমেরিকাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। আইএস বা আল-কায়েদা, যে নামেই হোক একেকটি আক্রমণের পর আমেরিকার মূল স্রোতের মানুষের একাংশের মধ্যে মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রতি যে ঘৃণা ও বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ দেখি তাতে হৃদয় কেঁপে ওঠে, শঙ্কিত হই। সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে স্বজনহীন পরিবেশে থাকা একমাত্র সন্তানের মঙ্গল কামনায় মন অস্থির হয়ে ওঠে। ১১ জুন দিবাগত রাতে অরল্যান্ডোর স্থানীয় সময় ১২ জুন ভোর দুই ঘটিকায় পালস নামক একটি নাইট ক্লাবে এক দুর্বৃত্তের আক্রমণে ৪৯ জন নিহত এবং আরও প্রায় ৫৫ জন আহত হয়। আমি প্রথমে যখন খবরটি শুনতে পাই তখনো সিএনএন ও বিবিসি টেলিভিশন, যারা লাইভ সচিত্র প্রতিবেদন দেখাচ্ছিল তারা প্রথমদিকে আক্রমণকারীর পরিচয় ও আক্রমণের কারণ সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলতে পারছিল না।

আমি ভেবেছিলাম আক্রমণের পিছনে হয়তো আমেরিকান ইভেনজেলিক্যাল খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের কট্টরপন্থি কোনো গ্রুপের কাজ হবে। ইভেনজেলিক্যাল কট্টরপন্থি খ্রিস্টান ধর্মীয় গ্রুপ এর আগেও আমেরিকায় সমকামীদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে এবং তাতে বেশ হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। যে কোনো মানুষের মৃত্যুর খবরে, বিশেষ করে এ ধরনের বর্বরতার খবরে প্রতিটি মানুষের মন বিচলিত ও ভারাক্রান্ত হবে, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আজকের কঠিন বাস্তবতায় অরল্যান্ডো আক্রমণে ইভেনজেলিক্যালদের হাত থাকতে পারে ভেবে প্রথমদিকে মনের মধ্যে কিছু স্বস্তি অনুভূত হয় এই ভেবে যে, হয়তো আমার জন্য বা আমার মতো যাদের আপনজন আমেরিকায় থাকে তাদের জন্য এ যাত্রায় উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। কারণ, এটা ইভেনজেলিক্যাল কোনো গ্রুপের কাজ হলে আমেরিকায় বসবাসরত মুসলমানদের বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো হেইট ক্যাম্পেইন বা ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযান শুরু হবে না, যা দেখে গেছে গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে প্যারিসে এবং এ বছর মার্চে বেলজিয়ামে ব্রাসেলস বিমানবন্দরে হামলার পরে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর যখন শুনলাম অরল্যান্ডোর পালস ক্লাবে আক্রমণ করেছে একজন মুসলমান, তখনই অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠল। তারপর তো সব কিছুই জানা গেল। আক্রমণকারী ওমর মতিন একজন আফগান বংশোদ্ভূত আমেরিকান মুসলমান নাগরিক, বয়স ২৯ বছর। তার জন্ম আমেরিকায় এবং সেখানেই বড় হয়েছে। আক্রমণের আগ মুহূর্তে মতিন টেলিফোন করে পুলিশকে বলেছে, সে একজন ইসলামের সৈনিক এবং ইরাক-সিরিয়ায় বোম্বিংয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আইএসের পক্ষে সে এই আক্রমণ চালাচ্ছে। মতিনের ব্যাকগ্রাউন্ড এবং টেলিফোনের বক্তব্য, দুটোই গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। মতিনের পরিচয় পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তুরুপের তাস হাতে পেয়ে যান রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প, আগামী নির্বাচনে যার প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনাকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখা হচ্ছে না। ট্রাম্প দম্ভভরে বলেন, ‘আমার কথা সত্যে পরিণত হয়েছে এবং আমার কল্পনাশক্তিই কেবল আমেরিকাকে জঙ্গি মুসলমানদের হাত থেকে বাঁচাতে পারে’। তিনি বোধ হয় উত্তেজনায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বলে ফেললেন, সব মুসলমানদের আমেরিকা থেকে বের করে দেওয়া হোক, প্রত্যেক মুসলমানদের ওপর বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থা করা হোক, ইত্যাদি। ভয়ঙ্কর সব কথা। দেখেশুনে মনে হচ্ছে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হলে সর্বনাশের যা বাকি আছে তাও ঘটবে। স্বল্পসংখ্যক বিপদগামী দুর্বৃত্তের অশুভ কাজের জন্য সমগ্র মুসলমান সম্প্রদায়কে শত্রু ঘোষণা করলে তা আমেরিকার জন্য আরও বড় মহাসংকটের সৃষ্টি করবে। আমেরিকান নেতৃত্বকে বুঝতে হবে আইএস-আল-কায়েদা ওটাই চায়। আল-কায়েদার পাতা ফাঁদে ট্রাম্প পা দিতে চাচ্ছেন। যদিও প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বলেছেন। তবু ট্রাম্পের কথাকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। ইতিপূর্বে দেখা গেছে আমেরিকান নাগরিকদের মধ্যে এক প্রকার সুপিরিয়র কমপ্লেক্স কাজ করে। বিশ্ব অঙ্গনে পরাশক্তির সুপ্রিম ক্ষমতার অহংকার ও বড়াই প্রদর্শনের একটা সহজাত প্রবৃত্তি আমেরিকানদের ভিতরে দেখা যায়। ২০০০ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের জর্জ বুশ জুনিয়র প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ভোটের প্রান্তিক ব্যবধানে। কিন্তু ২০০৪ সালের নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো বিপুল ভোটের ব্যবধানে তিনি জয়ী হন। তখন অনেক বিশ্লেষকরা বলেছিলেন, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারকে উত্খাত, ওসামা বিন লাদেনকে পাহাড়ের গর্তে ঢুকিয়ে দিতে পারা এবং সাদ্দাম হোসেনকে নির্মমভাবে উত্খাত করে ইরাক দখলের কৃতিত্ব হিসেবে আমেরিকার জনগণ দ্বিতীয়বারের মতো বুশকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করে। এত সময়ে অরল্যান্ডো হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য পরিণতি এবং যে ভীতিকর বার্তাটি দেয় তার কথাই বললাম। এবার একটু অন্য আরেকটি দিক দেখি। ২০০১ সালে নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর আল-কায়েদা ভিডিও বার্তায় ঘোষণা দেয়- ‘আমেরিকার গর্বকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে’। তারপর আমেরিকাও তার শক্তি প্রদর্শন করেছে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া ধুলার সঙ্গে মিশে গেছে। কিন্তু শান্তি আসেনি। হিংসা ও অস্ত্রের বদলে অস্ত্রের শক্তির ব্যবহারে আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্বের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। মূল কারণে না গিয়ে ডালপালা উৎপাটনে আমেরিকা যে শক্তি ক্ষয় করেছে তা কোনো ফল দেয়নি। বিশ্বের প্রায় তাবৎ সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করেন আইএস বা আল-কায়েদার শিকড় উৎপাটনের ক্ষমতা আমেরিকার রয়েছে। কিন্তু আমেরিকা কেন সেটি করছে না তা রহস্যজনক। আর সেই রহস্যজনক খেলার পরিণতিতে ১২ জুন প্রত্যুষে ঘটেছে অরল্যান্ডোতে ওমর মতিনের আক্রমণ। আইএস এই আক্রমণের কৃতিত্ব দাবি করেছে। ৯/১১-এর পর আমেরিকা তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ঢেলে সাজিয়েছে। স্বল্প সময়ে নতুন করে গড়ে তোলে শক্তিশালী হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ফোর্স। ভেবেছিল তারা অন্তত নিজ দেশে নিরাপদ। ইউরোপ আইএসের হাতের নাগালে। আমেরিকার প্রতিরক্ষায় রয়েছে আটলান্টিক। কিন্তু সে চিন্তা কাজ দেয়নি। ঘরের মধ্যে শত্রু জন্ম নেবে তা হয়তো আমেরিকার গোয়েন্দারা ভাবেনি। বাংলা সাহিত্যের পৌরাণিক কাহিনী লখিন্দর ও বেহুলার বাসরঘরের কাহিনী আমেরিকান গোয়েন্দারা জানে না। সব ছিদ্র বন্ধ করা যে কত কঠিন কাজ তা মার্কিন গোয়েন্দারা এবার হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। তবে এটাও ঠিক ৯/১১-এর পর অরল্যান্ডো ঘটনার আগ পর্যন্ত আমেরিকায় মূল ভূমিতে জঙ্গিরা বড় হামলা করতে পারেনি। যদিও সঙ্গত কারণেই ধরা হয় আইএস-আল-কায়েদার শত্রুর তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন গোয়েন্দাদের ব্যর্থতার কারণেই ১২ জুন পালস ক্লাবে ওমর মতিন আক্রমণ চালাতে পেরেছে। মতিন বহু আগ থেকেই এফবিআইয়ের নজরে ছিল। মতিনের ব্যক্তিগত জীবন ছিল উচ্ছৃঙ্খল ও আত্মমুখী। তিনবার এফবিআই মতিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। আল-কায়েদাসহ বিশ্বের জঙ্গি সংগঠনের প্রতি সমর্থন ও সহানুভূতির কথা জিজ্ঞাসাবাদের সময় মতিন পুলিশকে বলেছে। ঘটনার পর বের হয়ে আসা তথ্যে জানা যায় বিভিন্ন জিহাদি ওয়েবসাইটে মতিন প্রায়ই সময় কাটাত। এহেন একজন জঙ্গি ভাবাপন্ন উচ্ছৃঙ্খল যুবককে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দারা সঠিকভাবে চিহ্নিত ও ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। মতিন হোম গ্রোন বা নিজ দেশের পরিবেশ ও সমাজের মধ্য থেকে জঙ্গিয়ানায় উদ্বুদ্ধ হয়েছে। মতিন একা নয়, জানা যায় বেশ কয়েকশ আমেরিকান যুবক স্বইচ্ছায় ইরাক-সিরিয়ায় আইএসের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। বিষয়টি শান্তিকামী সব পক্ষের জন্য উদ্বেগের। মার্কিনিদের ধারণা ভুল, নিজ দেশের মূল ভূখণ্ডে তারা যে অভেদ্য নয় সেটাই আরেকবার প্রমাণিত হলো অরল্যান্ডোর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের মধ্যদিয়ে। বাংলাদেশে সন্ত্রাসী ও জঙ্গি দমন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, আইএস আছে কি নেই বলে যুক্তরাষ্ট্র অহরহ ছবক দেয়। নিজেদের ঘর সামলানোই এখন তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন বন্দুকযুদ্ধে মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। আন্তর্জাতিক একটা সংস্থার পরিবেশিত এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২০১৫ সালে, এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে ৩৭২টি শুটিংয়ের ঘটনা ঘটেছে এবং তাতে ৪৭৫ জন নিহত ও ১৮৭০ জন আহত হয়েছে। সে তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থা অনেক ভালো। আইএস, আল-কায়েদার জঙ্গিরা আজ পবিত্র ইসলাম ধর্মের নাম ব্যবহার করলেও মুসলিম বিশ্বের গ্র্যান্ড মুফতিরা বলছেন, ধর্মের মধ্যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কোনো স্থান নেই। এরা ধর্ম ও মানবতার শত্রু। এদের নির্মূলে সব ধর্মের মানুষ ও জাতিকে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে হবে। তার জন্য পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে এবং একই সঙ্গে দ্বৈতনীতি পরিহার করাও অপরিহার্য। ভূরাজনৈতিক ও কর্পোরেট স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জুতা আবিষ্কার কবিতার সুরে বলা যায় আমেরিকা তাদের চরণ দুটি ঢাকলে তাতে আমেরিকাও যেমন জঙ্গিমুক্ত হবে, তেমনি গবুচন্দ্র উজিরের মতো বিশ্ববাসীও হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে।

লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

sikder52@gmail.com

এই পাতার আরো খবর
up-arrow