Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, সোমবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : বুধবার, ২৯ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৮ জুন, ২০১৬ ২৩:৩১
ভারতের ১৩০ কোটি মানুষ কী পেল?
সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত
ভারতের ১৩০ কোটি মানুষ কী পেল?

২৬ মাস আগে গালভরা প্রতিশ্রুতি দিয়ে আরএসএস তথা বিজেপি ভারতের ক্ষমতা দখল করে। গুজরাটের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বসেন প্রধানমন্ত্রীর আসনে। নরেন্দ্র মোদি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন— আচ্ছে দিন। কোটি কোটি টাকা খরচ করে টিভিতে বিজ্ঞাপন দিয়ে বলেছিলেন, বিদেশি ব্যাংকে গচ্ছিত কালো টাকা তিন মাসের মধ্যে ফিরিয়ে এনে প্রত্যেক ভারতীয়কে ১৫ লাখ টাকা করে অনুদান দেবেন। দ্বিতীয় প্রতিশ্রুতি ছিল দ্রব্যমূল্য কমাবেন।   তৃতীয় প্রতিশ্রুতি ছিল দুর্নীতিমুক্ত ভারত গড়ে তুলবেন। এ কথাও তিনি বলেছিলেন, দেশের সব রাজ্যে আইনের শাসন কায়েম করতে সাহায্য করবে তার সরকার।

কার্যত ভারতের ১৩০ কোটি মানুষ কী পেল? তার চুলচেরা হিসাবনিকাশ যখন শুরু হলো তখন তিনি পিছনে হটে গিয়ে বলছেন, সুইস ব্যাংক থেকে টাকা আনছি। তিন মাসের জায়গায় ২৬ মাস হয়ে গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে কি জানানো হয়েছে সুইস ব্যাংকে কোন ব্যবসায়ীর কত টাকা আছে। কেঁচো খুঁড়তে বড় সাপ বেরিয়ে পড়ার ভয়েতেই সুইস ব্যাংক পানামাসহ বিভিন্ন ব্যাংকে কাদের অ্যাকাউন্ট আছে তা তিনি প্রকাশ করতে পারছেন না।

কোন রাজ্যের ব্যবসায়ী তারা? কত টাকা বিদেশে গচ্ছিত রেখেছেন বিদেশি ব্যাংকে? তাদের নাম প্রকাশ করলে কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে তা ভেবে থতমত খেয়ে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রভাই দামোদরদাস মোদি। এ ব্যাপারে যারা বিস্তারিত জানেন, সেই ইউপিএ ১ ও ২ সরকারের আমলের তিনজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীও চেষ্টা করেছিলেন বিদেশ থেকে ভারতীয়দের কালো টাকা উদ্ধার করতে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়াতেও দেখা গিয়েছিল, উঠে আসছে বেশ কিছু বিজেপি নেতার নামও। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার সময়ও প্রশ্ন উঠেছিল, যে বিপুল টাকা খরচ করে বিজেপি ক্ষমতায় এলো সে টাকার সূত্র কী? শুধু কি গুজরাটি ব্যবসায়ীরাই অনুদান দিয়েছিলেন, নাকি বিদেশের কালো টাকার কিছু অংশও এসেছিল। এসব প্রশ্নে আসন্ন সংসদ অধিবেশন যে উত্তাল হতে চলেছে তা বলাই বাহুল্য।

ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব বলেছিলেন— চালাকি দিয়ে কোনো মহৎ কাজ হয় না। স্বামী বিবেকানন্দর ভক্ত নরেন্দ্র মোদি বেলুড়েও কিছু দিন কাটিয়ে হিন্দুত্ববাদের পাঠ নিয়েছিলেন। মাসের গোড়ায় তিনি ওয়াশিংটনে যাওয়ার পথে সুইজারল্যান্ডে নেমে সুইস রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে ছবি তুলে ভারতবাসীকে দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে কালো টাকা উদ্ধারে তিনি কতই না চেষ্টা করছেন। সে ছবি যাতে ভারতের সব মানুষ দেখতে পান তার জন্য তার দফতরও বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিল।

১৩০ কোটি লোককে ১৫ লাখ টাকা করে দিতে কত টাকা দরকার তা কি সুইস ব্যাংকে আছে? এ প্রশ্ন করেছিলেন কংগ্রেস সংসদ সদস্য শশী থারুর। বিজেপির তরফ থেকে তার কোনোও জবাব দেওয়া হয়নি। কালো টাকা নিয়ে বিতর্ক আজকের নয়। বিজেপি যখন বিরোধী দলে ছিল তখন তারা এই প্রসঙ্গ তুলেই সংসদ অচল করে দিত। ক্ষমতায় আসার পরই তারা ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে। ভারতের অভ্যন্তরে অর্থনীতির হাল এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে যে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। পবিত্র রমজান মাসে জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দামে সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ দিশাহারা হয়ে রয়েছেন। ডালের দাম প্রতি কেজি ১৮০ টাকা। খুচরা ও পাইকারি বাজারে আটাও অমিল। কালোবাজারি ও ফড়িয়াদের বেলাগাম দাপটে খাদ্যপণ্যের দাম নাগালের বাইরে চলে গেছে।

২০১৪ সালে মোদির দল যখন ক্ষমতায় আসে তখন খাদ্যদ্রব্যের বাজারে মুদ্রাস্ফীতি ছিল সাড়ে পাঁচ শতাংশ। দুই বছরে তা সাড়ে আট শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ২৬ মাসে তিনি ৩৮ বার বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে চারবারই গেছেন ওয়াশিংটনে। সেখানে তিনি কী দিয়ে এলেন, আর কীই বা নিয়ে এলেন তা হতভাগ্য ভারতবাসী জানে না। তাহলে দ্রব্যমূল্য রুখতে মোদি সম্পূর্ণ ব্যর্থ।

তৃতীয় প্রতিশ্রুতি অর্থাৎ দুর্নীতিমুক্ত ভারত গড়ে তুলতেও ব্যর্থ হয়েছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। কারণ তার দলের বিরুদ্ধেই, ললিত-মোদিসহ একাধিক ইস্যুতে বার বার দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন বিরোধীরা। সর্বশেষ অভিযোগ, সদ্যসমাপ্ত রাজ্যসভায় নির্বাচনে তিনি ঝাড়খণ্ডে দুজন বিরোধী বিধায়ককে জেলে পুরে রেখে নির্বাচনে জিতেছেন। প্রশ্ন উঠেছে, এই বিধায়ক কেনা কি তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে দেখে শিখলেন? কারণ প্রথমবার ক্ষমতায় এসে অন্যান্য দলের ১৫ জন বিধায়ককে কিনেছিলেন মমতা।

পাঠকদের স্মরণ থাকতে পারে, আটের দশকে রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন বিজেপি ও এনডিএ’র শরিক দলগুলো বোফর্স কামান কেনার দুর্নীতি নিয়ে হৈচৈ করেছিল। দেশব্যাপী নানা আন্দোলন তৈরি করেছিল তারা। বিজেপি ছয় বছর ক্ষমতায় ছিল। বোফর্স নিয়ে নানা তদন্ত করেও তারা প্রমাণ করতে পারেনি যে বোফর্স থেকে রাজীব ঘুষ নিয়েছিলেন। ছয় বছর এবং মোদির দুই বছর, মোট আট বছরেও বোফর্স কেলেঙ্কারির কোনো কূলকিনারা হয়নি। আদৌ কূলকিনারা হবে কিনা তা স্বয়ং নরেন্দ্র মোদি এবং আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবৎও জানেন না। এদিকে আরএসএসের প্রবীণ নেতা সুব্রামনিয়াম স্বামী সমানে দাবি করে চলেছেন, চেন্নাইয়ের জেল থেকে রাজীব হত্যাকারীদের ছেড়ে দেওয়া হোক? তার সঙ্গে ইদানীং গলা মিলিয়েছেন তামিলনাডুর মুখ্যমন্ত্রী তথা মোদির নতুন বন্ধু জে জয়ললিতা।

২০০২ সালে গুজরাটে দাঙ্গার পর প্রবীণ বিজেপি নেতা অটল বিহারি বাজপেয়ি বলেছিলেন, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী রাজধর্ম পালন করছেন না। সে মামলার নিষ্পত্তিও আজ পর্যন্ত হয়নি। মেদি যা করছেন তাহলো কংগ্রেস আমলের দুর্নীতি খুঁজে বের করা। এটাই তার অগ্রাধিকার। ওয়াশিংটনে গিয়ে সেনেট বক্তৃতায় বলেছিলেন, ভারতের সংবিধান তার পবিত্র গ্রন্থ। কিন্তু কংগ্রেসসহ বিরোধীদের অভিযোগ, এটাও তার একটি নাটক। কারণ প্রতি পদে তিনি সংবিধান লঙ্ঘন করছেন। তার হাজারও নজির দেশের মানুষ দেখতে পাচ্ছেন।

সন্ত্রাস দমনের জন্য ওয়াশিংটন-লন্ডন-টোকিও সব জায়গায় গিয়ে অতিনাটকীয় বক্তৃতা করছেন। শুধু তিনি নন, সবাই চায় সন্ত্রাসমুক্ত ভারত। ৯-১১’র ঘটনার পর অটল বিহারি বাজপেয়িসহ বিশ্বের তাবৎ নেতা ‘ওয়ার অন টেরর’-এ স্বাক্ষর করেছেন। সেখানে মোদির করার কিছু নেই। তার একমাত্র কাজ অভ্যন্তরীণ সুশাসনের ব্যবস্থা করা। কালো টাকা বিদেশ থেকে আনা যাবে না তা বুঝেই মোদি সম্প্রতি বলেছেন, দেশের ভিতরে কালো টাকা উদ্ধার করবেন। সেটা কীভাবে করবেন সেটাও তিনি ব্যাখ্যা করেননি। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেও চূড়ান্ত ব্যর্থ নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেছিলেন, ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’। অর্থাৎ বিদেশি বহুজাতিক সংস্থাগুলো ভারতে তাদের উৎপাদন করবে। তাতেও খুব একটা সাড়া পড়েনি। কেন্দ্রীয় সরকারের নথিতেই স্পষ্ট যে গত দুই বছরে বিদেশি বিনিয়োগ তলানিতে ঠেকেছে। তার বিদেশ সফরে যত ব্যবসায়ী ভারতে বিনিয়োগ করবেন বলে কথা দিয়েছিলেন তাদের খুব কমই পরবর্তীকালে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছেন। মেক ইন ইন্ডিয়া তো অনেক দূরের ব্যাপার।

স্বচ্ছ ভারত প্রকল্প নিয়েও গত দুই বছরে প্রচুর মাতামাতি করেছেন মোদি। কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে গঙ্গার জল শোধনে এবং শৌচালয়ের বিজ্ঞাপন দিতে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিপুল অর্থ ব্যয়ে লাভের লাভ কিছুই হয়নি এর কিছুটাও যদি কর্মসংস্থানের জন্য খরচ করা হতো তাহলেও কিছুটা লাভ হতো। বেকার যুবক-যুবতীদের কাছে এখন একটাই জ্বলন্ত সমস্যা— বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দায় কাজের সুযোগ কমছে। যে চাকরি দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে তা আবার শুরু করা হোক। কারণ প্রায় ২০০ টাকা দিয়ে ডাল কিনে খাওয়ার মতো লোকের সংখ্যা খুবই কম ভারতবর্ষে।   গরিব মানুষের প্রধান দুটি খাবার ডাল আর রুটি— এই দুটোই চলে গেছে নাগালের বাইরে। বাকি তিন বছর বারাক ওবামার তোষামোদি ছেড়ে দেশের দিকে তাকান প্রধানমন্ত্রী।

লেখক : প্রবীণ ভারতীয় সাংবাদিক।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow