Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ২ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২ জুলাই, ২০১৬ ০০:০৯
ছোট পোঁটলা বাদ দিয়ে বড় পোঁটলার খবর নিন
তুষার কণা খোন্দকার
ছোট পোঁটলা বাদ দিয়ে বড় পোঁটলার খবর নিন

কনফুসিয়াস বলেছিলেন, মানুষ জন্মের সময় শরীরের সঙ্গে দুটি পোঁটলা বয়ে নিয়ে আসে। বড় পোঁটলাটি মানুষের চোখের আড়ালে তার পিঠের ওপর ঝুলতে থাকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার নিজের দোষত্রুটি আর নিন্দনীয় অপকর্ম দিয়ে পিঠের পোঁটলা দিনে দিনে ভারী হয়ে ওঠে। নিজের অপকর্ম দিয়ে ঠাসা পিঠের পোঁটলা কেউ দেখতে পায় না। কাজেই ওটি নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। জন্মের সময় সঙ্গে নিয়ে আসা ছোট পোঁটলাটি মানুষের বুকের ওপর ঝুলতে থাকে।   ওটির মধ্যে প্রতিবেশী কিংবা আশপাশের মানুষগুলোর দোষত্রুটি জমা হতে থাকে। চোখের সামনে বুকের ওপর ঝুলতে থাকা ছোট পোঁটলার দিকে মানুষ সারাক্ষণ চেয়ে থাকে। ছোট পোঁটলায় প্রতিবেশীর দোষত্রুটি দিব্যি দেখতে পায় আর সারাক্ষণ সেটা নিয়েই কথা বলতে থাকে। পিঠের পোঁটলায় জমা হতে থাকা নিজের দোষত্রুটির দিকে  মনোযোগ দেওয়ার মতো বাড়তি সময় মানুষের হাতে থাকে না। ফলে নিজের অপকর্ম দিয়ে ভরা বিশাল আয়তনের বড় পোঁটলাটি পিঠে নিয়েই একদিন মানুষ পরপারের পথে পাড়ি ধরে। কনফুসিয়াস সব জাতের সব পদ-পদবির মানুষের জন্য উপমাটি তৈরি করেছিলেন। আমাদের মতো আমজনতা, যাদের গতিবিধি প্রতিবেশীর আঙ্গিনা ছেড়ে বেশি দূর বাড়তে পারে না তারা ছোট পোঁটলার গায়ে চোখ আটকে রেখে জীবন পার করলে পাশের বাড়ির মানুষগুলোকে উটকো ঝামেলা পোহাতে হয়। তবে আমজনতাকে মনে রাখতে হয়, প্রতিবেশীর বুকের ওপরও ছোট একটি পোঁটলা ঝুলছে। এক পড়শির নিন্দা-কটু-কাটব্যের তাড়নায় আরেক পড়শি বিরক্ত হলে সেও ছেড়ে কথা বলবে না। সেও পড়শির নামে হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেবে। ব্যস! এর বেশি আর কি! সাধারণ মানুষের ক্ষমতার দৌড় পড়শির বাড়ির দুয়ার পর্যন্ত। আমাদের জীবন ‘গণ্ডূষ জলে ছফরি ফরফরায়তঃ’, এক আঁজলা পানিতে পুঁটি মাছের ছটফটানি। কিন্তু রাজনীতিবিদেরা তো ছফরি নন, আর তারা গণ্ডূষ জলে ফাল দেন না। আমাদের মতো পুঁটি মাছের সঙ্গে তুলনা করলে রাজনীতিকরা তিমি। তাদের বিচরণের সীমা অনেক বড়। তাদের জীবনের পরিসর পড়শির আঙ্গিনা ছাড়িয়ে দেশের সীমান্ত ছুঁয়ে ফেলে। অনেক সময় দেশের সীমানা পেরিয়ে দূর দেশে উনাদের কাজ কিংবা কথার ঢাক জোরেশোরে বাজতে দেখা যায়। অথচ আমার দেশের রাজনীতিকরা যখন জনসমক্ষে বাণী বক্তৃতা দেন তখন উনাদের বুকের ওপর ঝুলতে থাকা অন্য দলের নিন্দার পোঁটলাটি প্রবল বেগে ঝাঁকাতে থাকেন। ক্ষমতাসীন দল এ মুহূর্তে দেশের জন্য কী করছে, সরকারের কর্মকাণ্ডে দেশবাসী খুশি না বেজার সেসব কথার ধারেকাছে না গিয়ে তারা প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নিন্দা কটু-কাটব্য করে দেশের মানুষের চোখ ভিন্ন কিছুতে আটকে রাখার নির্লজ্জ প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন। সরকারি কিংবা সরকারের বাইরে থাকা কোনো রাজনীতিকের মুখে আত্মসমালোচনার লেশমাত্র ছোঁয়া একবারের জন্য শোনা যায় না। বুকের ওপর ঝুলতে থাকা ছোট পোঁটলা ঝাড়া দিয়ে জীবন পার করায় উনারা পিঠের পোঁটলার খবর কোনো দিন নেওয়ার সুযোগ পান না। তবে রাজনীতিকরা একটি সত্য ভুলে যান, পিঠের পোঁটলার খবর উনারা ভুলে গেলেও আমজনতা কিন্তু উনাদের পিঠের পোঁটলার খবর ঠিকই জানে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা চৌদ্দ দল এখন ক্ষমতায়। ২০১৬ সালের জুন মাসে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাদের চৌদ্দ দলের শরিক, আওয়ামী সরকারের ভাগিদার ইনু সাহেবের জাসদসহ সবকটি জাসদ সম্পর্কে পুরনো, তিক্ত কেচ্ছা গেয়ে দিলেন। জাসদের লোকজনকে মন্ত্রিসভায় জায়গা দেওয়ার কারণে আওয়ামী লীগকে একদিন কাফ্ফারা দিতে হবে বলে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। খণ্ডিত অথবা একজোট অস্তিত্ব নিয়ে জাসদ কোনো শক্তিশালী দল নয়। ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন খেলো নির্বাচনে সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা ক্ষমতার ভাগ পেয়েছে। দেশে অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে কোনো একটি সংসদীয় আসনে জনগণের ভোটে জিতে আসার মতো কোনো নেতা-কর্মী জাসদে আছে বলে আমি মনে করি না। তবুও তাদের নিয়ে সৈয়দ আশরাফের মতো জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক এত কথা কেন বলেছেন সেটা রাজনীতিবিদরা ভালো বলতে পারবেন। তবে দেশের আমজনতা মনে করে, বর্তমান সময়ে আইনশৃঙ্খলার দুর্গতি, পুলিশের গ্রেফতার বাণিজ্য, ব্যাংক এবং অন্যান্য সেক্টরের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির খবর পত্রিকার পাতা এবং অন্যান্য সংবাদ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে প্রচারিত হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের দলবাজির নির্লজ্জ কেচ্ছা কাহিনী। এই সবকিছু ধামাচাপা দিয়ে মানুষের মন ভিন্ন তামাশায় আটকে ফেলে সৈয়দ আশরাফ ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ বাড়াতে চেয়েছেন।

১৭ জুন তারিখের অনেকগুলো পত্রিকা পাশাপাশি রেখে দেখুন কোন ধরনের খবরে জনগণের চোখ আটকে যাচ্ছে। লক্ষ্মীপুরের আওয়ামী লীগ নেতার ছেলে বিপ্লবের বিরুদ্ধে অনেক মানুষকে হত্যা করার অভিযোগ। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হত্যা মামলাগুলো বিএনপি জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দায়ের করা হয়েছিল বলে পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে। হয়তো আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে তাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছিল। অথচ আওয়ামী লীগের শাসনামলে রাষ্ট্রপতি তার মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করেছেন। জেল কর্তৃপক্ষ ক্রমাগত তার সাজা মাফ করে যাচ্ছেন যাতে বিপ্লব দ্রুত জেলখানা থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বিপ্লবের সাজা মাফ করার প্রতিযোগিতায় শামিল হয়েছেন বলে পত্রিকার খবর পড়ে জানা গেল। বিপ্লবের হাতে খুন হওয়া মানুষের তালিকা যেমন দীর্ঘ তাতে মনে হয় সে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আরও অনেক মানুষ খুন করবে। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বিপ্লব যে খুনগুলো করবে সেই রক্তের দায় কার ওপর বর্তাবে সরকার সেটি না জানলেও জনগণ তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে অমোঘ সত্যটি জানে। একই তারিখের ডেইলি স্টার পত্রিকার পেছনের পৃষ্ঠার একটি খবর বিপ্লবের খবরের সঙ্গে তুলনা করে দেখুন। ৫৭৬ জন কয়েদ খাটা আসামি যাদের সাজার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে তারা কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে এখনো জেলখানার ভিতর কয়েদ খেটে মরছে। তাদের দুর্দশা লাঘবের কেউ নেই। এই ৫৭৬ জন আসামির দুর্দশার খবর সরকার নিয়োজিত মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান জনগণকে জানিয়েছেন। কাজেই খবরের তথ্যসূত্র অবিশ্বাস করার মতো দুর্বল নয়। বিপ্লব কিংবা বিপ্লবের মতো অনেক খুনের মামলার আসামিদের সরকার খালাস দেওয়ার কাজে কত উদ্যমী। অথচ ছিঁচকে চুরি চামারির অভিযোগে যাদের সাজা হয়েছে এবং সাজার মেয়াদ শেষে তারা জেলখানায় পচে মরছে তাদের দুর্দশা দেখার কেউ নেই।

এদিকে কয়েক মাস ধরে সারা দেশে ইউপি নির্বাচনের নামে দেশে নরহত্যার মহোৎসব হলো। এবারের ইউপি নির্বাচনে ২৬৪ জন চেয়ারম্যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। বাকি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের বিনা ভোটে নির্বাচিত ঘোষণা করতে সরকারের বাধা ছিল কোথায়? সরকার তেমন সিদ্ধান্ত নিলে আর যাই হোক সরকারি দলের দুইশ আড়াইশ কর্মী বেঘোরে খুন হতো না। তার চেয়ে বড় কথা, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এক পরিবারের সঙ্গে আরেক পরিবারের কিংবা এক গ্রামের সঙ্গে আরেক গ্রামের মধ্যে যে ভয়ঙ্কর স্থায়ী শত্রুতার জন্ম হলো সেটি অন্তত হতো না। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এত প্রাণহানির পথ ধরে সামনের দিনগুলোতে আরও অনেক প্রাণ যে যাবে এতে কারও মনে সন্দেহ নেই। বড় কথা, আওয়ামী লীগ দলের মধ্যে যে ধরনের অন্তরকোন্দল গ্রাম পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ল সেটি কি আওয়ামী লীগের ভিত অনেক দুর্বল করে দিল না? আওয়ামী লীগকে যদি কখনো কোনো স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অধীনে সত্যিকার নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা মোকাবিলা করতে হয় তখন মাঠ পর্যায়ে আওয়ামী লীগ কি বর্তমান ক্ষত মুছে আবার একাট্টা হয়ে মাঠে নামতে পারবে? 

জঙ্গিরা কোন ধর্মের, কোন দলের সেটা আমাদের জানা নেই। আমরা জানি, তারা ইচ্ছামাফিক মানুষকে কুপিয়ে মারছে। একজন পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রীও বর্বর হামলায় প্রাণ হারালেন। পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী খুন হওয়ার পরে দেশে গণগ্রেফতার চলছে। পত্রিকার পাতা খুললে পুলিশের গ্রেফতার বাণিজ্যের খবর বিশদে পড়া যায়। পুলিশ এটির নাম দিয়েছে জঙ্গিবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান। খবরে বলা হলো, পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে সারা দেশে ১২ হাজার মানুষ গ্রেফতার হয়েছে যাদের মধ্যে ২৬ জন জঙ্গি। কি আশ্চর্য! লাখে লাখে মরে বীর কাতারে কাতার। সুমার করিয়া দেখি সাড়ে চার হাজার! ২৬ জন জঙ্গি গ্রেফতার করার জন্য ১২ হাজার মানুষকে ধরে জেলে চালান দিয়ে দেওয়া হলো! এই ১২ হাজার পরিবারের ভোগান্তির দায়িত্ব কার। এদের মধ্যে কতজন অপরাধী আর কতজন গ্রেফতার বাণিজ্যের শিকার সে হিসাব সরকারও হয়তো জানে না। সরকারের মন্ত্রীরা পরদল নিন্দা আর চাটুকারিতায় ব্যস্ত। এমন বারোয়ারি গ্রেফতার কিংবা পুলিশের গ্রেফতার বাণিজ্য জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অথচ এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ তদারক করার মতো সরকারি দলের দায়িত্বশীল কেউ নেই। বর্তমানে জনজীবনে অশান্তি বিরোধীদের অপতত্পরতার ফসল এই পুরনো কেচ্ছা গেয়ে সরকার তার দায়িত্ব শেষ করে ফেলছে। তাদের এ পুরনো কেচ্ছার  বিপরীতে আমরা বলতে পারি, জনজীবনে শান্তি বজায় রাখতে না পারা সরকারের ব্যর্থতা।   বেশি দেরি হওয়ার আগেই সরকার বিষয়টি বুঝতে পারবে বলে আমি আশা করি।

     লেখক : কথাসাহিত্যিক।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow