Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৫ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৪ জুলাই, ২০১৬ ২৩:০৬
ধর্মতত্ত্ব
হারিয়ে যাচ্ছে কোলাকুলির ঈদ
মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

ছেলেবেলার কোলাকুলির সেসব মন কেমন করা দৃশ্য ঈদগা মাঠে আজ আর দেখা যায় না। ঈদের কোলাকুলি দৃশ্য আজ-কাল দেখা যায় টিভিতে এবং খবরের কাগজের ছাপানো ছবিতে। হায়! কবে আবার সেই প্রাণখোলা কোলাকুলির ঈদ ফিরে আসবে আমাদের সমাজে।

ঈদ মানে হাসি। ঈদ মানে খুশি। ঈদ মানে অনাবিল আনন্দ। সারা দিন উৎসব আর প্রিয়জনদের সঙ্গে প্রতিটি মুহূর্ত ভাগাভাগি করার নাম ঈদ। ধনী-গরিব, আমির-ফকির, রাজা-প্রজা সবার কাছে খুশির বার্তা নিয়ে হাজির হয় এ ঈদ। বাঙালি মুসলমানদের কাছে সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব এটি। ঈদের দিন সকালে নতুন পোশাক পরে ঈদগাহে ছুটে চলেন সিয়াম সাধকরা। ঈদের জামাতে এক কাতারে দাঁড়িয়ে যান খোদা প্রেমিকরা। ভুলে যায় সব ভেদাভেদ। বেহেশতি এ দৃশ্য অক্ষরের ক্যানভাসে এঁকেছেন কবি ফররুখ আহমদ।

‘আজকে এলো খুশির দিন

দেখ না চেয়ে খুশির চিন

দেখ না চেয়ে আজ

রঙিন খুশির ঝলক ঈদগাহে। ’

ঈদের নামাজ শেষে একে অন্যের সঙ্গে কোলাকুলি করে প্রেমের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করবে। ভুলে যাবে সব দুঃখ-ক্লেশ। একে অন্যকে দেওয়া যত কষ্ট আছে, দুঃখ আছে সব ঝরে যাবে কোলাকুলির মাধ্যমে। শত্রুকে বন্ধু আর বন্ধুকে ভাই করে নেওয়ার শিক্ষা দেয় ঈদের কোলাকুলি। তাই তো জাতীয় কবি লিখেছেন—

 

‘আজিকে এজিদে হাসেনে হোসেনে গলাগলি,

দোজখে বেহেশতে সুল ও আগুনে ঢলাঢলি। ’

ঈদের কোলাকুলির শিক্ষা বলতে গিয়ে কবি নজরুল আরও বলেন, ‘এ দিন শয়তান জান্নাতে শরাব বিলায় আর জাহান্নামের আগুন আনন্দে জ্বলতে থাকে। দোস্ত-দুশমন এক হয়ে যায়। গ্রামের প্রতিটি ঈদের মাঠ একেকটি আরাফার ময়দানে পরিণত হয়। রাজা-ফকির কোলাকুলি করে হয়ে যায় ভাই ভাই। ’ এখনো মুসলমানরা ঈদের নামাজ পড়ে কোলাকুলি করেন। কিন্তু কোলাকুলির যে উদার উদ্দেশ্য সে বিষয়ে নজর নেই কারোরই। এমপি, মন্ত্রী, সরকারি কর্মকর্তা, চেয়্যারম্যান, মেম্বারদের সঙ্গে কোলাকুলির ভিড় লেগে থাকে। কিন্তু গরিব-দুঃখীদের বুকে টেনে নেয় না কেউ। কোলাকুলি সংস্কৃতিতেও লেগেছে রাজনীতির হাওয়া। কর্মীদের সঙ্গে নেতা বুক মিলিয়ে বুঝাতে চায় এ বুক তোমাদের দিয়ে দিলাম। তোমরা থেক আমার সঙ্গে। আবার যারা অফিস আদালতে চাকরি করেন, তারা বসের সঙ্গে কোলাকুলির জন্য বসে থাকেন। বসকে কোনোভাবে সন্তুষ্ট করতে পারলেই প্রমোশন নিশ্চিত। এভাবেই সাম্যের কোলাকুলি হয়ে পড়েছে আভিজাত্যের কোলাকুলি। কোলাকুলি এখন ভোটের জন্য, দলের নেতা হওয়ার জন্য, প্রমোশনের মাধ্যম পরিণত হয়েছে। তাই আজ আর কোলাকুলির মাধ্যমে শত্রুকে বন্ধু আর বন্ধুকে ভাই বানানো যায় না। আমাদের ঈদ সংস্কৃতিতে এই মতলবি কোলাকুলি মুছে ফেলতে হবে। যে কোলাকুলিতে প্রেম নেই, দরদ নেই এমন কোলাকুলি তো কপটতা ছাড়া কিছুই নয়। কোলাকুলির নামে কীভাবে ঠকছি এবং ঠকাচ্ছি আমরা নিজেরাও বুঝতে পারি না। ইসলাম শান্তি ও সাম্যের শিক্ষা দেয়। মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই— এটি ইসলামের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা। বছর ঘুরে ঈদ আসে। এখানেও এ শিক্ষা জাগিয়ে রাখার জন্য চালু হয়েছে কোলাকুলি সংস্কৃতি। যদি মন থেকে মানুষের সঙ্গে প্রেমের কোলাকুলি করতে পারি তবে এ কোলাকুলি আমাদের মাঝে প্রেম ও ভ্রাতৃত্ব তৈরিতে সহায়তা করবে।

প্রিয় পাঠক! আপনি যে মাঠে নামাজ পড়বেন ওই মাঠেই এমন অনেকে থাকবেন যাদের আপনি পছন্দ করেন না। ব্যক্তিগত শত্রুতা, দলীয় ও মাজহাবি বিদ্বেষের কারণে এত দিন আপনি যার ছায়াও মাড়াননি, আসুন! ঈদের এই আনন্দঘন দিনে তাকেই ভাই বলে বুকে জড়িয়ে নিই। কোলাকুলি করি পরম প্রেম দরদ নিয়ে। কোলাকুলির সময় আমরা একে অন্যের ভাই!

এক আল্লাহর বান্দা আমরা

কোনো ভেদাভেদ নেই। ’

হলেখক : বিশিষ্ট মুফাসসিরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।

www.selimazadi.com

এই পাতার আরো খবর
up-arrow