Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ২৬ জুলাই, ২০১৭

ঢাকা, বুধবার, ২৬ জুলাই, ২০১৭
প্রকাশ : সোমবার, ১১ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১১ জুলাই, ২০১৬ ০০:০৫
যেভাবে তারা জঙ্গি হচ্ছে
মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার পিএসসি (অব.)
যেভাবে তারা জঙ্গি হচ্ছে

গুলশানে রেস্টুরেন্ট ও শোলাকিয়ার ঈদ জামাতে হামলার সঙ্গে জড়িত কয়েকজন জঙ্গি সচ্ছল পরিবারের সন্তান ও ভালো বিদ্যাপীঠে শিক্ষা লাভের সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও তারা কেন জঙ্গি হলো— সেই পুরনো প্রশ্নটি আবার নতুন করে সামনে এসেছে। ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী রাজীব হায়দারকে খুন করে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র। কয়েকজন ধরা পড়ার পর স্বীকারোক্তিতে বলেছে তারা নিজেরা কিছু জানে না, বড় ভাইয়ের হুকুমে রাজীবকে হত্যা করেছে। এতেই বোঝা যায় তারা কি নিজেরাই জঙ্গি হচ্ছে, নাকি তাদের জঙ্গি বানানো হচ্ছে। তাই আমরা যদি উত্থাপিত প্রশ্নের সার্বিক উত্তর পেতে চাই তাহলে তারা কেন জঙ্গি হচ্ছে এ প্রশ্নের চাইতে আরও বড় প্রশ্ন নিজেদের করতে হবে এই মর্মে যে, কারা এদের জঙ্গি বানাচ্ছে এবং কোন পদ্ধতিতে বানাচ্ছে। জঙ্গি যারা তৈরি করছেন এবং যে পদ্ধতিতে করছেন সেটি যত সময় অটুট থাকবে ততদিন জঙ্গির উত্পত্তি হতে থাকবে এবং তার শিকার যে কেউ হতে পারেন। সুতরাং প্রথমেই আমাদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন জঙ্গিদের শেকড় ও উত্পত্তিস্থল কোথায়। তারপর চিহ্নিত করা দরকার পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে তারা জঙ্গি হচ্ছে। তাহলেই কেবল আমরা আজকের প্রশ্নের সঠিক জবাব অর্থাৎ তারা কেন জঙ্গি হচ্ছে তা বুঝতে পারব।

আমরা যখন কোনো বিষয়ে উপসংহারমূলক বক্তব্য দিই, তখন সেটি যথেষ্ট তথ্যনির্ভর ও যৌক্তিক হওয়া প্রয়োজন। আবার উত্থাপিত তথ্যের সঠিকতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এর কোনো শেষ নেই। তবে আমরা যদি কোনো উপসংহারে পৌঁছাতে চাই তাহলে আমাদের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত আবশ্যক। এসব ঘটনায় একমাত্র হাইকোর্টে নিষ্পত্তি হওয়া মামলার মাধ্যমে বেরিয়ে আসা তথ্য-উপাত্তই হতে পারে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও নির্মোহ। দ্বিতীয়ত আমাদের নির্ভর করতে হবে মিডিয়ার মাধ্যমে পাওয়া তথ্য-উপাত্তের ওপর। ২০০৬ সালের ১ ডিসেম্বর ক্যাম্পাসে নিজ বাসায় খুন হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. এস এ তাহের। তিনি পরিচিত ছিলেন উদারমনা প্রগতিশীল একজন চিন্তক হিসেবে। তাহের হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের রায়ে চারজনের ফাঁসির দণ্ড হয়। তারা সবাই জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মী। হাইকোর্টেও মামলাটি নিষ্পত্তি হয়েছে। হাইকোর্ট দুজনের ফাঁসির দণ্ড বহাল রেখেছেন এবং বাকিদের অন্যান্য মেয়াদে শাস্তি দিয়েছেন। দুজনের মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মিয়া মহিউদ্দিন জামায়াতের নেতা। দ্বিতীয়ত, ২০১০ সালে গ্রেফতার হন জেএমবিপ্রধান মাওলানা সাঈদুর রহমান। জেএমবিপ্রধান হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি জামায়াতের জেলা আমির ছিলেন। গ্রেফতারের সময় মাওলানা সাঈদুরের আস্তানা থেকে উদ্ধারকৃত কাগজপত্রেও দেখা গেছে তিনি জামায়াতের নেতা ছিলেন। কেবল ধরা পড়ার পরই জামায়াত তার নামে একটা লোক দেখানো বহিষ্কারপত্র ইস্যু করে। তৃতীয়ত, ২০০৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর দৈনিক সংবাদে জামায়াতের আফগান জঙ্গি কানেকশনের সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ‘জামায়াতের আফগান কানেকশন’ এই শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে জামায়াতের অন্যতম নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা আবদুস সুবহানের সঙ্গে আফগান জঙ্গি মুজাহিদ নেতা গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের একটা রঙিন ছবিও ছাপা হয়। এ রকম আরও ডজন ডজন অকাট্য তথ্য উপাত্ত রয়েছে, যাতে প্রমাণিত হয় বাংলাদেশে জঙ্গি উত্পত্তির মূল শেকড় জামায়াত ও ধর্মান্ধ রাজনীতির ভিতর নিহিত। সুতরাং শেকড় অটুট রেখে শুধু ডালপালা নিয়ে নাড়াচাড়া করলে কোনো কাজ হবে না। জামায়াত প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিল তাদের নেতাদের কিছু হলে দেশে গৃহযুদ্ধ বাঁধবে, ঘোষণা দিয়েছিল তাদের প্রশিক্ষিত বিশেষ বাহিনী সারা দেশে যুদ্ধ চালাবে। সুতরাং এটা গোপন কিছু নয়, নতুন কিছু নয়। কিন্তু জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে আমাদের মতো কিছু সুশীল, যারা সব জেনেশুনে এখনো বলছে জঙ্গি তত্পরতায় জামায়াত-শিবির জড়িত তার নাকি কোনো প্রমাণ নেই। আরেক দল আছে জঙ্গি গবেষক, জঙ্গি বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে যান। কিন্তু জামায়াত-শিবিরের নাম মুখে আনেন না। জঙ্গি দমনের মূল সমস্যাটা এখানে। যুগে যুগে দেখা গেছে, সমাজ ও রাষ্ট্রের একটা বড় অংশ সব সময় ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার হিসাব, গোষ্ঠীগত ও শ্রেণিগত ক্ষুদ্র স্বার্থের জায়গায় দাঁড়িয়ে কথা বলেন। এটাও নতুন কিছু নয়। তবে শেষ পর্যন্ত সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। যেমন আমাদের জন্য তা একবার হয়েছিল একাত্তরে। এক সময় বলা হতো শুধু মাদ্রাসার ছাত্ররাই জঙ্গি হয়। এ অপরাধ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যই কথিত কুলীন বিদ্যাপীঠ ও সচ্ছল পরিবারের সন্তানদের জঙ্গি দলে ভেড়ানোর জন্য বহু আগে থেকেই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও মিশন নিয়ে তারা মাঠে নেমেছে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভালো ভালো কিছু বিদ্যাপীঠ তারা বেছে নেয়। একই সঙ্গে জঙ্গি রিক্রুটমেন্টের জন্য সারা দেশকে তারা কয়েকশ বিটে ভাগ করে নেয়। দেশের ছয়টি জেলায় পরিচালিত ২৭টি পিস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ জামায়াতের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা ও রাজনৈতিক আদর্শে পরিচালিত হচ্ছে বলে পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্তরা পরিকল্পিতভাবে মগজ ধোলাইয়ের কাজটি করেন। এক্ষেত্রে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাসনাত রেজা করিমের উদাহরণটির দিকে তাকালে বিষয়টি উপলব্ধি করা যায়। একটু নজর খুলে তাকালেই দেখা যাবে এ পর্যন্ত যেসব বিদ্যাপীঠের নাম এসেছে সেখানে জামায়াতভুক্ত শিক্ষকের সংখ্যা নেহাত কম হবে না। ওইসব বিদ্যাপীঠের হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর মধ্যে থেকে যদি শতকরা একভাগকেও তারা মগজ ধোলাই দিতে পারে তাহলে সেটাই যথেষ্ট। তারপর সারা দেশ তো পড়েই আছে। যুদ্ধাপরাধের দায়ে আমৃত্যু দণ্ডে দণ্ডিত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ধর্মের অপব্যাখ্যা ও জিহাদি ডাকের উত্তেজনাকর বক্তব্যে পূর্ণ ক্যাসেট এখনো হাট-বাজারে সবখানে চলে। ইসলামী ব্যাংকসহ জামায়াতের রয়েছে পাঁচশর অধিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। সুতরাং মগজ ধোলাইয়ের জন্য জামায়াত-শিবিরের মাধ্যমের কোনো অভাব নেই। এসব জানার পরেও আমরা প্রশ্ন করছি জঙ্গি তৈরি হচ্ছে কীভাবে? এটা এক ধরনের ছদ্মবেশী চাতুরী। জোরেশোরে হাঁকডাক ছেড়ে, শূন্যে গদা ঘুরিয়ে, গদার নিচ দিয়ে জঙ্গিদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার শামিল। সুতরাং এটা এখন স্পষ্ট যে, সচ্ছল পরিবারের সন্তান ও কথিত কুলীন বিদ্যাপীঠের তরুণদের জঙ্গি বানানো হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে। তারপরেও আমি বলব জামায়াতের জঙ্গি তৈরির এ প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছে।   পারিবারিক নিরাপত্তা বলয়ের কাঠামোটি আরও একটু শক্ত হলে যতটুকু পেরেছে তাও পারত না। ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে পয়েন্ট জিরো এক পার্সেন্ট মানুষকে তারা যদি জঙ্গি তত্পরতায় জড়িত করতে পারত তাহলে তার সংখ্যা দাঁড়াত ষোল হাজার। জঙ্গি তত্পরতা চালানোর জন্য সেটা কিন্তু বিরাট সংখ্যা। কিন্তু এটা তারা পারেনি। এ প্রকল্পে সফল হলে এতদিনে বাংলাদেশ আরেকটি পাকিস্তান-আফগানিস্তান হয়ে যেতে পারত। আমাদের ভাগ্য ভালো। কারণ, আমাদের দুটি সহজাত শক্তির জন্য আমরা এখনো শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছি।

তার একটি হলো বাঙালি সংস্কৃতি, আর অন্যটি হলো মুক্তিযুদ্ধের গর্ব ও অহংকার। আর এ কারণেই এ দুটি শক্তির ওপরই জঙ্গিরা বারবার আক্রমণ করেছে। বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে এ দুটি শক্তিকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। বিকৃত করার অপচেষ্টা করেছে এবং এগুলো নিয়ে মানুষের মধ্যে এখনো বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। এ অপকর্মটি অনেকটা সুচারুভাবে করার চেষ্টা করেছে জঙ্গিদের গডফাদাররা, দীর্ঘ সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকে। এ বিষয়ে জঙ্গিদের গডফাদাররা এক সময়ে কিছুটা সফলতা পায়। কিন্তু ১৯৯৬ সালে প্রথমবার এবং ২০০৯ সালে পুনরায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকায় এ সময় তারা কোনো সফলতা পায়নি, বরং নিজেরা ক্রমশ ভূমি হারাচ্ছে। সচ্ছল পরিবার ও কথিত কুলীন বিদ্যাপীঠ থেকে যে স্বল্পসংখ্যক জঙ্গি হয়ে যাচ্ছে তা ঠেকাতে হলে তিনটি জায়গা থেকে বড় আকারের ভূমিকা রাখতে হবে। প্রথমত পরিবার, দ্বিতীয়ত নির্দিষ্ট বিদ্যাপীঠ এবং পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থা। এখনো নতুন করে আশঙ্কা করা হচ্ছে একই রকম সচ্ছল ও নামকরা বিদ্যাপীঠের আরও কিছু তরুণ জঙ্গি দলে এখনো আছে। এসব পরিবারের উচিত হবে ছবিসহ খবরটি টেলিভিশনে দেখানো এবং প্রধান প্রধান পত্রিকায় ছবিসহ খবরটি ছাপানো। তাতে পরিবারের আন্তরিকতার প্রমাণ পাওয়া যাবে এবং পুলিশের পক্ষেও অনুসন্ধান কাজ চালানো সহজ হবে।

নিখোঁজ ব্যক্তিকে ধরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে জনগণও সাহায্য করতে পারবে। এভাবে সবকিছু জনসমক্ষে এলে ওই ছেলেকে তার পরিবার জীবিত ফিরে পাওয়ার কিছুটা আশা অন্তত করতে পারবে। জঙ্গি দমনে রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐক্য হওয়ার সম্ভাবনা এখনো নেই। তার প্রধান কারণ, জঙ্গিদের উত্পত্তিস্থল ও শেকড় জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির মিত্রতার বন্ধন এখনো অটুট। জঙ্গি দমনে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার জন্য বড়  আকারের জাতীয় সংলাপ ও আলোচনার কোনো প্রয়োজন নেই। সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে জামায়াত ও ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ালেই জঙ্গি দমনের প্রায় শতকরা ৯০ ভাগ কাজ হয়ে যায়। বাকি দশ ভাগের জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থাই যথেষ্ট। এ ধরনের জাতীয় সংকটের সময় জঙ্গিদের আস্ফাালনকে পুঁজি করে বিএনপি রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে। তারা বলছেন, একটা নির্বাচন দিলেই নাকি আলাদিনের চেরাগের মতো জঙ্গি সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এরকম বক্তব্যে জঙ্গি তত্পরতার দায় পরোক্ষভাবে বিএনপির ওপরও পড়ে। কারণ তাহলে তো বোঝা যায় যত জঙ্গি আক্রমণ হবে, যত মানুষ মরবে ততই বিএনপির রাজনৈতিক পুঁজি বাড়বে, তাদের দাবি জোরালো হবে। জঙ্গি তত্পরতা চালিয়ে সরকার উত্খাত করা যায় না। সরকারের পবিরর্তনও হয় না। যদিও দেশি-বিদেশি কিছু চক্র এ খোয়াব নিজেরা দেখছেন এবং জঙ্গিদের দেখাচ্ছেন। সরকার উত্খাতের ওষুধ দিয়ে পিছনের ওস্তাদরা জঙ্গিদের মগজ ধোলাই করছেন। সমস্যা হলো— মাঝখানে কিছু নিরীহ মানুষ প্রাণ হারাবে, যা সবার জন্য কষ্টদায়ক। সেটা বহন করা রাষ্ট্রের জন্যও অনেক সময় অসহনীয় হয়ে পড়ে। তবে জাতি ও রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। জামায়াত ও ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত জঙ্গি উত্পত্তি বন্ধ হওয়ার নয়, হবে না। এটাই আমাদের জাতীয় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জকে সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।

লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

sikder52@gmail.com

এই পাতার আরো খবর
up-arrow