Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই, ২০১৭

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই, ২০১৭
প্রকাশ : সোমবার, ২৫ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৪ জুলাই, ২০১৬ ২৩:০৬
তুরস্কের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের নেপথ্যে
মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার পিএসসি (অব.)
তুরস্কের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের নেপথ্যে

১৫ জুলাই শুক্রবার হঠাৎ করেই সারা বিশ্বের দৃষ্টি নিক্ষেপিত হলো তুরস্কের ওপর। সশস্ত্র বাহিনীর একাংশ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘ প্রায় ১৪ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সরকারকে উত্খাতের ঘোষণা দেয়। সঙ্গত কারণেই একটা নির্বাচিত সরকারকে অবৈধ ও অসাংবিধানিকভাবে উত্খাতের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সারা বিশ্বের নেতৃবৃন্দ সোচ্চার প্রতিবাদ জানান। প্রেসিডেন্ট এরদোগানের দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি, যা তুরস্কে একেপি নামে পরিচিত, তারা মূলত ধর্মাশ্রয়ী ইসলামিস্ট ক্যাডারভিত্তিক দল। অভ্যুত্থানের রাতে প্রেসিডেন্ট এরদোগান রাজধানী আঙ্কারা বা ক্ষমতার অন্য ভরকেন্দ্র ইস্তানবুুলে ছিলেন না। তিনি ছিলেন রাজধানী থেকে ৬০০ কিলোমিটার দূরে ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী একটি অবকাশ যাপন কেন্দ্রে। ফলে অভ্যুত্থানের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজস্ব মোবাইল ফোনের অ্যাপসে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে তার দলের লোকজনকে অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে পড়ার হুকুম দেন। রেজিমেন্টেড ও ক্যাডারভিত্তিক দল হওয়ার কারণে নেতার হুকুমে দলের হাজার হাজার ক্যাডার বাহিনী জীবন বাজি রেখে রাস্তায় নেমে পড়ে, রাস্তায় ট্যাংকের সামনে শুয়ে পড়ে। প্রাথমিক প্রতিরোধ সফল হওয়ার আভাস ফুটে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে জনগণের একাংশ, যারা সবসময় সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে, তারাও এরদোগানের দলীয় ক্যাডারদের সঙ্গে যোগ দেয়। যার ফলে পরিস্থিতি উল্টে যেতে সময় লাগেনি। অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সেনা সদস্যরা জনগণের কাছে আত্মসমর্পণ করে, আবার অনেকে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে। এভাবেই এ যাত্রায় এরদোগান টিকে গেলেন এবং সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেল।

অভ্যুত্থান প্রচেষ্টায় জড়িত সামরিক নেতৃবৃন্দের পরিকল্পনায় স্ট্র্যাটেজিক ভুলের কারণেই কট্টর ইসলামিস্ট শাসক এরদোগান নতুনভাবে আরও কট্টর পন্থার দিকে তুরস্ককে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেলেন। অভ্যুত্থানের পরিকল্পনাকারীরা হয়তো ভেবেছিলেন প্রেসিডেন্ট এরদোগান ক্ষমতার ভরকেন্দ্র আঙ্কারা ও ইস্তানবুুলের বাইরে থাকার সুযোগে কাজটি সেরে ফেলবেন। কিন্তু এ কৌশল হিতে বিপরীত হয়েছে। কট্টর ধর্মভিত্তিক ও রেজিমেন্টেড দলের হাজার হাজার কর্মী থাকে, যারা নেতার হুকুমে জীবন দিতে প্রস্তুত, এ হিসাবটি অভ্যুত্থানকারীরা বিবেচনায় নেয়নি। সম্পূর্ণ বিষয়টি তুরস্কের অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু সারা বিশ্বের মানুষ এটা নিয়ে এত আগ্রহী কেন? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার উদ্দেশ্যই আজকের লেখা। এ অভ্যুত্থানকে শুধু সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখলে সে হিসাব ভুল হবে। জাতির পিতা কামাল আতাতুর্ক ১৯২৩ সালে আধুনিক তুরস্কের জন্ম দেন। দর্শন ও আদর্শগতভাবে আধুনিক তুরস্কের মূল অবলম্বন হয় গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। আজকের তুরস্ক যে বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে তার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে রাষ্ট্রের ওই দুটি মূল দর্শন। তুরস্ক আজ আধুনিক শিল্প উন্নত দেশ, ইউরোপ-আমেরিকা তুরস্ককে হিসাব করে চলে, সামরিক জোট ন্যাটো বাহিনীর অন্যতম শক্তিশালী সদস্য এবং মর্যাদাপূর্ণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার দ্বারপ্রান্তে, এগুলো সবই সম্ভব হয়েছে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের কারণে। তা না হলে আধুনিক শক্তিশালী রাষ্ট্র হওয়া তো দূরের কথা, তুরস্কের বর্তমান রাষ্ট্রীয় যে অবয়ব দেখছি তা এতদিন টিকে থাকতে পারত না। নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে ইউরোপ ও পশ্চিমা বিশ্ব ইউরোপের অংশের সঙ্গে আরও পূর্বদিকে এসে কোথাও আরেকটি বার্লিন দেয়াল তৈরি করে ফেলত। অথবা হতে পারত আরেকটি ইউক্রেন। আর নয়তো ইরাক, সিরিয়া ও লিবিয়া থেকেও খারাপ অবস্থা হতো তুরস্কের। এ ধারণাটি তুরস্কের জনগণের বৃহত্তর অংশের উপলব্ধিতে আছে। গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের মূল রক্ষাকবচ হিসেবে এতদিন অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করে আসছে সশস্ত্র বাহিনী। কিন্তু কয়েক মেয়াদে একাধিকবার দীর্ঘমেয়াদি সামরিক শাসন তুরস্কের জনগণ পছন্দ করেনি। সশস্ত্র বাহিনীর উচ্চ পদধারীদের ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও সম্পদের পাহাড় গড়া মানুষ পছন্দ করেনি, তারা বিকল্প খুঁজেছে। এ বিকল্পের সুযোগে উগ্র ওয়াহাবিতন্ত্রে বিশ্বাসী রাজনীতির ভয়ঙ্কর বাঘিনী মুসলিম ব্রাদারহুড মেষের চামড়া গায়ে জড়িয়ে জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি নামে আত্মপ্রকাশ করে, যার তুর্কি নাম একেপি। মুসলিম ব্রাদারহুড চিরদিনের জন্য তুরস্কে নিষিদ্ধ ছিল। তাদের ছদ্মবেশ ও ধীরে চলা নীতি বাস্তবক্ষেত্রে কাজে লেগেছে। ২০০২ সালে নতুন ছদ্মবেশে মাঠে নেমেই নির্বাচনের মাধ্যমে তারা ক্ষমতায় চলে আসে। প্রথমে আবদুল্লাহ গুল প্রধানমন্ত্রী হন। ক্যারেশমেটিক ও ভালো বক্তা হিসেবে পরিচিত এরদোগান অল্পদিনের মধ্যেই দলের সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলেও আসেন তিনি এবং প্রথমে প্রধানমন্ত্রী পরে প্রেসিডেন্ট হন। এরদোগানের রাষ্ট্রনায়কোচিত কৌশলী নীতির কারণেই তারা এতদিন ক্ষমতায় আছে এবং ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের সব অঙ্গনে নিজেদের শক্তি বলয় সৃষ্টি করতে পেরেছে, আর সে কারণেই আজ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টাকে এরদোগান ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম হয়েছেন। মিসরের মুহম্মদ মুরসির মতো ক্ষমতা গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে খোলস ফেলে মুসলিম ব্রাদারহুডের আসল রূপে আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টা করলে অনেক আগেই ইউরোপ, আমেরিকা ও সশস্ত্র বাহিনীর সম্মিলিত ধাক্কায় মুরসির মতো এরদোগানও উবে যেতেন।

কিন্তু এরদোগান নিজের ক্ষমতার হাত রাষ্ট্রের সব অঙ্গনের শিকড় পর্যন্ত বিস্তৃত করতে পেরেছেন বিধায় পশ্চিমা বিশ্বসহ সবাই তাকে সমীহ করেন। বিশ্ব সভ্যতা, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সবচেয়ে বড় হুমকি কথিত আইএস প্রসঙ্গে এরদোগান সরকারের দ্বিমুখী নীতি শুরু থেকে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং এটা নিয়ে আমেরিকা ও ইউরোপের সঙ্গে ভীষণ টানাপড়েনও সৃষ্টি হয়েছে। বেশিরভাগ বিশ্লেষক ও পশ্চিমা বিশ্বের অঘোষিত ধারণা এরদোগান প্রকাশ্যে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের অংশীদার হলেও মূলত ব্রাদারহুডের আদর্শের কারণে তুরস্ক সরকার আইএসকে সর্বতোভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা করছে। এ অভিযোগের বাহ্যিক কিছু প্রমাণও দৃশ্যমান হয়েছে। এক. আইএসের দখলকৃত ভূখণ্ডের অপরিশোধিত তেল গোপনে তুরস্ক ক্রয় করে আইএসের অর্থের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। দুই. বিশ্বের সব কর্নার থেকে হাজার হাজার যোদ্ধা আইএস বাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য নিরাপদ ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করেছে তুরস্কের বিমান ও স্থলবন্দরগুলো। সরকার কড়াকড়ি করলে এটা কিছুতেই সম্ভব হতো না। তিন. আইএসের বিরুদ্ধে গঠিত কোয়ালিশন ফোর্সের গুরুত্বপূর্ণ শরিক হওয়া সত্ত্বেও তুরস্ক এ পর্যন্ত আইএসের বিরুদ্ধে একটি কার্যকর অভিযানও চালায়নি। আইএসের নামে তারা অভিযান চালিয়েছে কুর্দি সম্প্রদায় কর্তৃক গঠিত পেশমার্গা বাহিনীর বিরুদ্ধে, যারা সবচেয়ে কার্যকর যুদ্ধ করছে আইএসের বিরুদ্ধে। চার. অভিযোগ আছে শুরুর দিকে তুরস্কের অভ্যন্তরে আইএস বাহিনী প্রশিক্ষণ ক্যাম্পসহ সব ধরনের সুবিধা পেয়েছে। উভয় সংকটের কারণে সব জেনেও ইউরোপ ও আমেরিকা এর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে শক্তিশালী কোনো প্রতিবাদ করতে পারেনি। তবে ভিতরে ভিতরে যে মনোমালিন্য ও দ্বন্দ্ব ছিল এবং এখনো আছে তা অনেক সময় বিভিন্ন প্রসঙ্গক্রমে বোঝা গেছে। তুরস্কের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিনালী ইলড্রিম ব্যর্থ অভ্যুত্থানের অব্যবহিতর পর সংবাদ সম্মেলন ও পার্লামেন্টে যে ভাষণ দিয়েছেন তাতে স্পষ্টতই বোঝা যায় অভ্যুত্থান চেষ্টার পিছনে আমেরিকার কোনো গোপন হাত রয়েছে কিনা সে ব্যাপারে এরদোগান সরকার প্রবলভাবে সন্দিগ্ধ। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধকে কেন্দ্র করে এবং আইএসের আবির্ভাবে মধ্যপ্রাচ্যে যে সংকটের সৃষ্টি হয়েছে তার বিরূপ প্রভাবে আমেরিকাসহ তার স্ট্র্যাটেজিক মিত্র ইউরোপের নিরাপত্তা আজ ভয়ঙ্কর হুমকির মুখে পড়েছে। এমতাবস্থায় তুরস্কের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের যত মতপার্থক্য থাকুক, সরাসরি প্রকাশ্যে কোনো সংঘর্ষে যাবে না, যেতেও পারবে না, গেলে হিতে বিপরীত হবে। এই মোক্ষম সুযোগটিই গ্রহণ করেছেন এরদোগান। গত প্রায় ছয় মাস হলো মেষের ছদ্মবেশ ছেড়ে মুসলিম ব্রাদারহুডের আসল রূপে আবির্ভূত হওয়া শুরু করেন এরদোগান। সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা তিনি নিজের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে তুরস্কের অভ্যন্তরে চরমপন্থি ইসলামিস্ট রীতিনীতি প্রবর্তন শুরু করেন। এ নিয়ে সরকারের অভ্যন্তরে যে প্রচণ্ড দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিল তার আভাস পাওয়া যায় আগের প্রধানমন্ত্রী দাভুলগুলের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে। সঙ্গত কারণে ঐতিহাসিক লেগেসির  সূত্র ধরে যা হওয়ার তাই ঘটেছে গত ১৫ জুলাই শুক্রবার। আপাতত অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এরদোগান প্রচণ্ড প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠেছেন। ব্যাপক আকারের শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। বিপুল সংখ্যক সিনিয়র অফিসারসহ হাজার হাজার সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য, পুলিশ বাহিনীর সদস্য, বিচার বিভাগের বিচারক কর্মকর্তাদের কোনোরকম তদন্ত, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার একদিনের মধ্যে বরখাস্ত করেছেন। এতে বোঝা যায়, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বহুদিনের পুরনো এবং এর পিছনে ঐতিহাসিক আদর্শগত প্রেক্ষাপট কাজ করেছে। সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল পদবির অফিসারদের প্রকাশ্যে মিডিয়ার সামনে যেভাবে অপদস্থ করা হয়েছে তার পরিণতিতে শেষমেশ তুরস্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা দেখার জন্য আরও কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে। বোঝা যাচ্ছে এরদোগান এবার অত্যন্ত কঠোর ও নির্দয় হবেন। ২০০৪ সালে তুরস্কে ফাঁসির দণ্ড রহিত করা হয়েছে, তা আবার ফিরিয়ে আনার ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী দাভুলগুল। এ বিষয়ে ইউরোপের নেতৃবৃন্দ ইতিমধ্যেই প্রবল প্রতিবাদ জানিয়েছেন। যাই হোক বিশ্বের গণতন্ত্রকামী মানুষ যেমন সামরিক অভ্যুত্থান পছন্দ ও সমর্থন করে না, তেমনি তুরস্কের মতো একটি রাষ্ট্র আবার ধর্মান্ধতার মোড়কে ডুবে যাক তাও পছন্দ করবে না।

লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

     sikder52@gmail.com

এই পাতার আরো খবর
up-arrow