Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : রবিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২২:৫৬
জন কেরির ঢাকা সফর
মুহা. রুহুল আমীন
জন কেরির ঢাকা সফর

গত ২৯ আগস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি একদিনের সফরে ঢাকা আসেন এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সুশীল সমাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে দিল্লি গমন করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সব বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে এ সফর দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ সংরক্ষণে মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।  মার্কিন মন্ত্রীর এ সফর খুব সংক্ষিপ্ত হলেও এর অন্তর্নিহিত তাত্পর্য অপরিসীম। এখন আমরা জন কেরির ঢাকা সফরের প্রেক্ষিত ও প্রেক্ষাপট নিয়ে সংক্ষিপ্ত ধারণা অর্জন করব। গত বছর মে মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানালে তিনি তাতে সম্মতি দেন। এর পরের মাসে গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পঞ্চম অংশীদারিত্ব সংলাপে অংশ নেওয়ার ফাঁকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বিশেষ সহকারী পিটার লেভয় ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী চিফ অব স্টাফ জনাথন ফিনারের সঙ্গে আলোচনা করেন। দুই দেশের পররাষ্ট্রিক পর্যায়ের উপর্যুক্ত আলোচনার ফলে শেষ পর্যন্ত জন কেরির ঢাকা সফর সফলভাবে সম্পন্ন হলো। এখন আমরা এ সফরের তাত্পর্য ও গুরুত্বের ওপর আলোচনা করব। প্রথমেই আসা যাক বর্তমান বিশ্বের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কেন্দ্র ইস্যুতে। বর্তমান সময়ে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, রেস্তোরাঁসহ নানা স্থানে সন্ত্রাসী হামলা ও বাংলাদেশে সমজাতীয় সন্ত্রাসী তত্পরতা বৈশ্বিক সন্ত্রাস ইস্যুতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ করণীয় বিষয়টি উভয় দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে গুরুত্ব পাচ্ছে। গত বছরসমূহে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সন্ত্রাস ইস্যুতে বাংলাদেশের সঙ্গে একত্রে কাজ করার আগ্রহ জানিয়েছেন। সম্প্রতি গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি বাংলাদেশের সঙ্গে এ ব্যাপারে যৌথ নীতি প্রণয়নের তাগিদ দেয়। বাংলাদেশে এ নিয়ে বেশ বিতর্ক ওঠে। আমরা দ্বিপক্ষীয় ফোরাম নাকি বহুজাতিক ফোরামের অধীনে কোন দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা গ্রহণ করব, তা নিয়ে পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞরা মত দিতে থাকেন। এমনি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে জন কেরির ঢাকা সফর সন্ত্রাস ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের যৌথ কর্মসূচির রূপরেখা প্রদর্শন করবে বলে ধারণা করা যায়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, গত পাঁচ বছরের মধ্যে আসন্ন সফরটি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশে দ্বিতীয় সফর। ২০১২ সালে তদানীন্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বাংলাদেশ সফর করে দিল্লি গিয়েছিলেন। জন কেরিও বাংলাদেশ সফর শেষে দিল্লি গেছেন। ধারণা করা যায়, কেরির ঢাকা সফর সন্ত্রাস এবং অন্যান্য ইস্যুতে বাংলাদেশ, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে সমন্বিতভাবে কাজ করবে তার একটি হোমওয়ার্ক হিসেবে পরিগণিত হবে। দ্বিতীয় যে কারণে কেরির ঢাকা সফর গুরুত্বপূর্ণ তা হলো— এ সফরে ক্ষুদ্র এক-দুটি বিষয়ে আলোচনা হয়নি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আগেই এ প্রসঙ্গে বলেছেন যে, এ সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সব দিক নিয়ে আলোচনা হবে অর্থাৎ এ সফরটি হবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সর্বাত্মক সাফল্য। গণতন্ত্র, সুশাসন, উন্নয়ন বাণিজ্য, মানবাধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রভৃতি বিষয় নিয়ে জন কেরি যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান তুলে ধরেছেন এবং এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত কর্মসূচি পরবর্তীতে জানা যাবে বলে আমরা অপেক্ষা করছি। এখন বাংলাদেশের ওপর গুরুদায়িত্ব বর্তায় জন কেরির সফর-পরবর্তী সময়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলো বাস্তবায়নের নীতি-কৌশল অবলম্বন করা। এটা ঠিক যে, জন কেরির সফরটি অনেকটা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের প্রকাশ ছিল। এখানে তেমন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর বা এ ব্যাপারে দিকনির্দেশনার গুরুত্বপূর্ণ দলিল তৈরির সম্ভাবনা ছিল না। তবে গত পাঁচ বছরের মধ্যে দু-দুবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরের কূটনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে এ সফর থেকে বাংলাদেশ প্রভূত জাতীয় স্বার্থ অর্জন করতে পারবে বলে আমরা আশাবাদী। এখন বাংলাদেশের অনুসরণীয় কূটনীতির ওপর কয়েকটা কথা বলব। একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক উদ্দেশ্য হলো তার নম্র পররাষ্ট্রিক বিষয়সমূহ বা সফট ইস্যুগুলোর ওপর জোর দেওয়া। তবে তাই বলে আমি তার বজ্র পররাষ্ট্রিক বিষয়গুলো বা হার্ড ইস্যুগুলোর গুরুত্বকে কোনোভাবে খাটো করে দেখছি না। আমাদের নম্র পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্যসমূহ অর্জিত হলে মূলত আমাদের বজ্র পররাষ্ট্রনীতির সাফল্যগুলোও অর্জিত হয়ে যায়। পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে কোনো দেশের আকার ও পরিধি বা সাইজ সে কারণে পররাষ্ট্রনীতির বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

গত জানুয়ারি থেকে আমি বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে বিনিয়োগভিত্তিক উন্নয়ন কূটনীতির প্রযোজ্যতা নিয়ে লেখালেখি করেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগভিত্তিক উন্নয়ন মডেলের স্বরূপ ব্যাখ্যা করেছি এবং বাংলাদেশের অনুসরণীয় নীতির প্রতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা ঘুরতে শুরু করেছে প্রবল গতিতে। এ উন্নয়ন ধারা জারি রাখতে হলে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগনির্ভর কূটনীতির বহুল ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

জন কেরির ঢাকা সফরের আগেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীকুলের সম্ভাব্য বিনিয়োগের ক্ষেত্র নির্ধারণ, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগনীতির রূপরেখা নির্ধারণ প্রভৃতি বিষয়ে ব্যাপক ও সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে পারলে জন কেরির সফর থেকে বাংলাদেশ বেশি লাভবান হতে পারত। জন কেরির সফর শেষ হওয়ায় এখন বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারগুলোকে নিয়ে অচিরেই কার্যকর পররাষ্ট্রিক লেনদেন শুরু করা এখন এ সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের মন-কাঠামো বা মাইন্ডসেট সম্পর্কে সম্যক ধারণা দরকার। জন কেরি নির্মোহ আবেগহীন, ব্যক্তিত্বের অধিকারী এবং তার কাছে কথার চেয়ে কাজের মূল্য অনেক বেশি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কত যোগ্যতাসহকারে কত কার্যকরভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অর্থনৈতিক কূটনীতিকে শাণিত করা যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। আশা করি, বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ নিয়ে কার্যকর কৌশল ও নীতি গ্রহণ করবে এবং প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগনির্ভর অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যকে এ সফরের মধ্য দিয়ে বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। খবর এসেছে তাতে মনে হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক ইস্যুতে বেশি আগ্রহী। এ ইস্যুটি কিন্তু আমাদের পররাষ্ট্রনীতির বজ্র দিক। আগেই উল্লেখ করেছি, এ দিকটিকে আমরা কম গুরুত্ব দিচ্ছি না। কিন্তু আমাদের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত নম্র বিষয়গুলোতে। এক্ষেত্রে দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই সত্তরের দশকে আমরা অর্থনৈতিক কূটনীতির দ্বার উন্মোচন করেছিলাম, যা এখন আরও বেশি মসৃণ, বেশি শক্তিশালী হওয়া দরকার। একদিনের সফরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সুশীল সমাজের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কৌশলগত বিষয় দুই দেশকে অন্যান্য ক্ষেত্রেও পারস্পরিক সহযোগিতায় জড়িয়ে ফেলবে। জন কেরির ঢাকা সফরের পরের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ব্যবসায়ীবৃন্দ, গার্মেন্ট মালিকপক্ষ এবং শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে সংলাপের ব্যবস্থা জারি রাখা। বাংলাদেশ থেকে ভারতে গিয়ে মার্কিন মন্ত্রী তিন দিন অবস্থান করেছেন এবং সেই সময়ের মধ্যে ৩০ আগস্ট জন কেরি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী পেনি প্রিত্স্কার যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের দ্বিতীয় কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সংলাপে যৌথভাবে সভাপতিত্ব করেছেন।  এমন ধরনের সংলাপ বাংলাদেশের স্বার্থে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং আমাদের কূটনীতি সেদিকে ধাবিত হওয়া উচিত যাতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অধিকতর মজবুত ও দৃঢ় হয়।

লেখক : প্রফেসর, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ডিন স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড সোস্যাল সাইন্সেস, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow