Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বুধবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:৩৭
দৃষ্টিপাত
সব মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে
মুহাম্মদ ফারুক খান এমপি
সব মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে

বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্র্রীতির দেশ। এ দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি যুগ যুগ ধরে সাম্প্র্র্রদায়িক সম্প্র্র্রীতির স্বাক্ষর বহন করছে।

ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে ভিন্নতা থাকলেও এদেশের হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সুদৃঢ় সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ। প্রাচীন, মধ্য, আধুনিক— কোনো যুগেই এ সহাবস্থানের বন্ধন ছিঁড়ে যায়নি। আমাদের মহান  মুক্তিযুদ্ধে, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম-আন্দোলনে এবং অধিকার আদায় ও সংরক্ষণের সংগ্রামে বাংলার মানুষ সবসময়ই একত্রে থেকেছে। এ সময় মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বলে কোনো আলাদা পরিচয় তাদের ছিল না।  

দেশের সিংহভাগ মানুষ ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলেও বকধার্মিক ও কাণ্ডজ্ঞানহীনদের কারণে কখনো কখনো তাদের সুনামও কণ্টকিত হয়ে ওঠে। যেমনটি হয়েছে ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে পাবনার সাঁথিয়ায়, কক্সবাজারের রামু ও উখিয়ায়, সাতক্ষীরা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু এলাকায়। তিন বছর আগে বকধার্মিক মতলববাজদের উন্মত্ততার শিকার হয়েছিল এসব এলাকার কিছু ধর্মীয় স্থাপনা। অন্য সম্প্র্র্রদায়ের বেশ কিছু বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে হিংসাত্মক চেতনার ঘৃণ্যজীবেরা। সাম্প্র্র্রদায়িক সহিংসতা দেশের ঐতিহ্যের অংশীদার বেশ কিছু মূল্যবান স্থাপনাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তারা ক্ষতবিক্ষত করেছে দেশের গণমানুষের অসাম্প্র্র্রদায়িক ভাবমূর্তিকে।

প্রায় ১৬ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশে ধর্মীয় দিক থেকে প্রায় ৮৮ ভাগ মুসলমান, প্রায় ৯ ভাগ হিন্দু, প্রায় ১ ভাগ বৌদ্ধ, প্রায় ১ ভাগ খ্রিস্টান এবং অন্যান্য জাতি প্রায় ১ ভাগে বিভক্ত। ধর্মীয় দিক ছাড়াও এই জনগোষ্ঠী আরও বিভিন্ন আঞ্চলিক সম্প্র্র্রদায়ে বিভক্ত। এখানকার সংখ্যাগুরু মুসলিম সম্প্র্র্রদায় যুগ যুগ ধরে সংখ্যালঘু সম্প্র্র্রদায়কে নিয়ে সুখে-দুঃখে, মিলেমিশে বসবাস করছে।

ইসলাম শান্তি-সম্প্র্র্রীতি ও মানবতার ধর্ম। কোনোরূপ সহিংসতা, বিবাদ-বিসংবাদের স্থান ইসলামে নেই। ন্যূনতম শান্তি-শৃঙ্খলা ও সম্প্র্র্রীতি বিনষ্ট হয় এমন আচরণকেও ইসলাম প্রশ্রয় দেয় না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন ‘ফিত্না-ফাসাদ বা দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করা হত্যার চেয়েও কঠিন অপরাধ। ’ (বাকারা-১৯১)। ‘পৃথিবীতে শান্তি স্থাপনের পর তাতে ফাসাদ সৃষ্টি করো না। ’ (আরাফ-৫৬)। অমুসলিমদের প্রতিও কোনো অন্যায় আচরণ ইসলাম অনুমোদন করে না। শান্তি-সৌহার্দ্য ও সাম্প্র্র্রদায়িক সম্প্র্র্রীতি সুরক্ষায় ইসলামের রয়েছে শাশ্বত আদর্শ ও সুমহান ঐতিহ্য। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর প্রতিটি আচরণ সাম্প্র্র্রদায়িক সম্প্র্র্রীতির বিরল ও প্রোজ্জ্ব্বল দৃষ্টান্ত।

মানুষের মধ্যে যেসব গুণাবলি থাকলে মানুষকে মানুষ বলা যায় এবং না থাকলে আর মানুষ বলা যায় না, সেসব গুণাবলিই মানুষের ধর্ম। সব ধর্মীয় বিধিবিধান ও আচার-অনুষ্ঠান মানবকল্যাণে এবং মানুষকে সত্য-সুন্দর ও সুখ-শান্তির দিক-দর্শন প্রদানে নিয়োজিত। তাই পৃথিবীর সবকটি প্রধান ধর্মের প্রচারকরা মহান সৃষ্টিকর্তার প্রেরিত মহামানব হয়েও সদা মানবকল্যাণে নিয়োজিত ছিলেন। তাই বিশ্বব্যাপী আন্তধর্মীয় সম্প্র্র্রীতি প্রতিষ্ঠা করতে হলে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও আন্তধর্মীয় সম্প্র্র্রীতি বা সাম্প্র্র্রদায়িক সম্প্র্র্রীতি একান্ত প্রয়োজন।

ইসলাম শুধু আরব ভূমিতেই নয়, বহির্বিশ্বে ক্রমান্বয়ে যখন ইসলামের পতাকা উড্ডীন হচ্ছে তখন সব বিজিত অঞ্চলে অমুসলিম ও সংখ্যালঘু সম্প্র্র্রদায়ের সঙ্গে সদাচরণ করার এবং পরমতসহিষ্ণুতার আদর্শকে কঠোরভাবে পালন করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাম্প্র্র্রদায়িক সম্প্র্র্রীতি ও পরমতসহিষ্ণুতা ইসলামের অন্যতম বিষয় হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দরুন এক্ষেত্রে যেসব শর্ত বাস্তবায়নে ইসলাম দায়বদ্ধ মনে করে থাকে তার উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো— শত্রুর হাত থেকে অমুসলিমদের রক্ষা করা হবে। অমুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখা হবে। তাদের ধন-সম্পদ ও প্রাণের নিরাপত্তা দান করা হবে। স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি তাদের হাতেই ন্যস্ত থাকবে। পূজা-অর্চনা থেকে পাদ্রী-পুরোহিতদের পদচ্যুত করা হবে না। তাদের ধর্মীয় প্রতীক (ক্রুশ ও মূর্তি) বিনষ্ট করা হবে না। তাদের কাছ থেকে উসুল নেওয়া হবে না। তাদের অঞ্চলে অভিযান প্রেরণ করা হবে না। তাদের ধর্মীয় চেতনার ওপর আঘাত করা হবে না। ইসলামে মদিনার সনদের চেতনাই হলো, কারও ওপর জোরজবরদস্তি নয়। চাপ প্রয়োগ বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা নিষেধ।

অনেকে মনে করেন সাম্প্র্র্রদায়িকতা মানে প্রতিদিন সংখ্যালঘু নির্যাতন বা সংখ্যালঘুর ওপর হামলা করা। কিন্তু না মানসিক নির্যাতনও এর মধ্যে পড়ে। তাই সাম্প্র্রদায়িক সম্প্র্রীতির দেশ বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নাগরিকদের জানমাল, ইজ্জতের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা ও আইনি অধিকার সংরক্ষণে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।   সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নয়, সবার সহাবস্থানের নিশ্চিত করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।  

লেখক : আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, সাবেক মন্ত্রী বাণিজ্য, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow