Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২২:৫৩
ধর্মতত্ত্ব
কোরবানি একমাত্র আল্লাহর জন্য
মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী
কোরবানি একমাত্র আল্লাহর জন্য

‘কোরবানি’ শব্দের অর্থ উৎসর্গ করা, উপঢৌকন দেওয়া, সান্নিধ্য লাভের উপায়, ত্যাগ করা, পশুত্বকে বিসর্জন দেওয়া। আল্লাহর নবী ইবরাহিম (আ.) নিজ পুত্র ইসমাইলকে (আ.) আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী কোরবানি করার উদ্যোগ গ্রহণের ঘটনার মাধ্যমেই কোরবানির তাত্পর্য লুকিয়ে রয়েছে। পবিত্র কোরআন থেকে জানা যায়, স্বপ্নে আল্লাহর নির্দেশপ্রাপ্ত হয়ে এবং নিজ পুত্র হজরত ইসমাইলের (আ.) সম্মতিতে হজরত ইবরাহিম (আ.) কোরবানি করার মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি পুত্র ইসমাইলকে  নিয়ে মিনার একটি নির্জন স্থানে যান এবং তার চোখ বেঁধে মাটিতে শুইয়ে দেন। অতঃপর কোরবানি করার জন্য পুত্রের গলায় ছুরি চালাতে উদ্যত হন। পিতা-পুত্রের এই অপরিসীম ত্যাগে মহান আল্লাহতায়ালা খুশি হন এবং হজরত ইসমাইলকে (আ.) বাঁচিয়ে  দেন। কারণ ইসমাইল (আ.)-এর রক্ত ঝরানো আল্লাহর উদ্দেশ্য ছিল না। আল্লাহ দেখতে চেয়েছেন, ইবরাহিম (আ.)-এর আত্মা আল্লাহর রাহে ত্যাগের জন্য প্রস্তুত কিনা। ইবরাহিম (আ.)-এর এ ঘটনা আল্লাহতায়ালা যুগে যুগে মুমিনদের স্মরণ ও শিক্ষার জন্য প্রতীকী কোরবানির বিধান দিয়ে জাগিয়ে রেখেছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘প্রত্যেক উম্মতের জন্য আমি কোরবানির একটি নিয়ম ঠিক করে দিয়েছি যাতে আমি তাদের জীবনোপকরণস্বরূপ যেসব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছি সেগুলোর ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।’ (হাজ, ২২:৩৪।)

তবে কোরবানির এ নিয়ম শুরু হয়েছে আরও আগ থেকেই। মানব সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই কোরবানির বিধান ছিল। প্রথম নবী ও প্রথম মানব হজরত আদমের (আ.) সময় কোরবানির প্রথা প্রচলিত ছিল। আবুল ফিদা হাফিজ ইবন কাসির দামেস্কির (র.) লেখেন, ‘আদম (আ.) তার দুই ছেলে হাবিল এবং কাবিলকে কোরবানি করার আদেশ দিয়ে নিজে হজ করার জন্য মক্কায় চলে যান। আদম (আ.) চলে যাওয়ার পর তারা তাদের বকরি কোরবানি করেন। হাবিল একটি মোটাতাজা বকরি কোরবানি করেন। তার অনেক বকরি ছিল। আর কাবিল কোরবানি দেন নিজের উৎপাদিত নিম্নমানের এক বোঝা শস্য। তারপর আগুন হাবিলের কোরবানি গ্রাস করে নেয়। আর কাবিলের কোরবানি অগ্রাহ্য করে।’ (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১/২১৭)। এ ঘটনাটি পবিত্র কোরআনে এভাবে বলা হয়েছে— ‘আদমের দুই পুত্রের বৃত্তান্ত তুমি তাদের যথাযথভাবে শোনাও, যখন তারা উভয়েই কোরবানি করেছিল, তখন একজনের কোরবানি কবুল হলো এবং অন্যজনের কবুল হলো না। আল্লাহ তো কেবল মুক্তাকীদের কোরবানিই কবুল করেন।’ (সূরা মায়েদা ৫:২৭)। এখানে কোরবানি কবুল হওয়ার জন্য মুত্তাকী বা আল্লাহভীতিপূর্ণ পরিশুদ্ধ চিত্ততার কথা বলা হয়েছে। হাবিলের মধ্যে এটা ছিল তাই তার কোরবানি আল্লাহর দরবারে কবুল হয়েছে। কিন্তু কাবিলের চরিত্রে এর অভাব ছিল, ফলে তার কোরবানির কবুল হয়নি।

আমাদের যাদের কোরবানি করার সামর্থ্য আছে তাদের অবশ্যই হাবিল-কাবিলের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। শিক্ষা নিতে হবে ইবরাহিম-ইসমাইল (আ.)-এর ঘটনা থেকেও। প্রথমত. আমরা যাই কোরবানি করি না কেন তা যেন হয় লৌকিকতামুক্ত। কোরবানি শুধু হবে আল্লাহর জন্য। অনেকে কোরবানির পশু কিনে বলেন, এতে গোশত কম হবে। কিনে ঠকে গেলাম। অথবা বলেন, কোনোরকম রক্ত ঝরাতে পারলেই হলো। ভালো পশুর দরকার নেই। এসব চিন্তা সঠিক নয়। আপনার সামর্থ্য থাকলে আপনি সবচেয়ে দামি পশু কোরবানি করবেন। বিদায় হজে রসুল (সা.) একশতটি উট কোরবানি করেছিলেন। আর কোরবানি যেহেতু আল্লাহর জন্য হবে তাই এতে গোশত কম হবে না বেশি হবে, গরু কিনে ঠগ হলো জিত হলো এসব আলাপ না করাই ভালো।

মনে রাখবেন এ কোরবানি শুধু পশুর গলায় ছুরি চালানোই নয়, নফসের ঘাড়েও ছুরি চালাতে হবে। মহান আল্লাহর হুকুমের কাছে বিনা প্রশ্নে নিজ গর্দান নিচু করে দেওয়ার নামই কোরবানি। নিজের নফসকে যদি আল্লাহর ইচ্ছার সামনে কোরবানি করতে না পারি তবে শত পশুর গলায় ছুরি চালালেও কোনো লাভ হবে না। আমাদের অবশ্যই কোরবানির মূল শিক্ষা ও উদ্দেশ্য সামনে রাখতে হবে। তবেই আমাদের কোরবানি প্রকৃত কোরবানি হবে। যে কোরবানি করেছিলেন সাইয়্যেদেনা ইবরাহিম (আ.)। তিনি বলেছিলেন, ইন্না সালাতি ওয়া নুসুকী ওয়া মাহয়ায়া ও মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। অর্থ— আমার সব ভালো কাজ এবং ভালোর পথে চলতে গিয়ে যত ত্যাগ-তিতিক্ষা, অত্যাচার-নির্যাতন সব আমার আল্লাহর জন্য।  আমার পুরো জীবনই আল্লাহর জন্য এবং মৃত্যুও তার জন্যই। 

লেখক : বিশিষ্ট মুফাসিসরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।

www.selimazadi.com

এই পাতার আরো খবর
up-arrow