Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০৫
মুমিনদের বিনয়ী ও সদাচরণের অধিকারী হতে হবে
মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী
মুমিনদের বিনয়ী ও সদাচরণের অধিকারী হতে হবে

ইসলাম মানব জাতিকে সত্য সুন্দর কল্যাণের পথে পরিচালিত হতে উৎসাহ জুগিয়েছে। মানুষের মধ্যে সৎ গুণ যাতে বিকাশ হয় সে শিক্ষাই দেওয়া হয়েছে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে। মানুষ যাতে সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠে তা নিশ্চিত করতেই ইসলামে বারবার তাগাদা দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে অহংকার থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে। আল-কোরআনে অহংকারী শয়তানের পতনের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে মানুষের শিক্ষার জন্য। তাতে দেখা যায় নিজের অহংকারবোধের কারণে শয়তান আল্লাহর আদেশে আদম (আ.)-কে সেজদা করতে অস্বীকার করে, যার ফলে সে জান্নাতের সুশোভিত বাগিচা থেকে বিতাড়িত হয়। অহমিকা হচ্ছে এমন এক আচরণ যা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত, এর বিপরীত হচ্ছে বিনয় যা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়।

মানুষের অহমিকা ও গর্বের পরিণতি বর্ণনা করে কোরআনে অনেক ঘটনার উল্লেখ আছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, পবিত্র কোরআনে অহংকারী ফেরাউনের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে, যার পরিণতি হয়েছিল ধ্বংস এবং পুরো সেনাবাহিনীসহ সলিল সমাধি। আল-কোরআনে আরও বর্ণিত হয়েছে, অহংকারী ফেরাউন এবং তার বাগানের সাথীদের কথা। তাদের সবার যাবতীয় সম্পদ নষ্ট হয় তাদের অহংকারের কারণে। যদিও এসব ঘটনায় এই জীবনের শাস্তির কথা বলা হয়েছে তবে অহংকারের আসল শাস্তি তো হবে পরকালে। রসুল (সা.)-এর একটি হাদিসে অহংকারের বিষয়ে ইসলামের কঠোর অবস্থানের বিষয়টি জানা যায়। তা হচ্ছে, ‘তোমাদের যার মধ্যে কণা পরিমাণ অহংকারও আছে তাকেই জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে।’ মানুষের জন্য নিকৃষ্টতম অহংকার হচ্ছে সত্য তার সামনে স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হওয়ার পর এবং সে তা উপলব্ধি করার পরও তা প্রত্যাখ্যান করা। সবচেয়ে বড় সত্য হচ্ছে, ‘আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই।’ এই সত্যকে প্রত্যাখ্যান হচ্ছে সবচেয়ে শস্তিযোগ্য অপরাধ (এটা হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে অহংকার)। আর এক ধরনের অহংকার হচ্ছে অন্যান্য মানুষের সঙ্গে আচরণে যা প্রকাশিত হয়, যথা পোশাক ও হাঁটাচলায় অহংকার, মানুষের প্রতি অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্যভাব, রূঢ়তা ইত্যাদি। মর্যাদা সংক্রান্ত ইসলামী পরিভাষা হচ্ছে ‘ইজ্জত’, যার অর্থ সম্মান ও মর্যাদা দুটোই। ইসলামী পরিভাষায় ইজ্জত হচ্ছে এমন মর্যাদা যা সরাসরি আল্লাহর প্রতি ইমান আনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। রসুল (সা.)-এর একটি হাদিসে বলা হয়েছে, ‘মুসলমানদের ব্যবহারের প্রতিটি ক্ষেত্রে দয়া প্রদর্শন প্রয়োজন।’ ইসলামী আদবের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রতিটি বিষয়ে দয়া ও সহানুভূতিশীল হতে লোকদের প্রশিক্ষণ দান। এক্ষেত্রে যা আমাদের করতে হবে তা হলো কথা বলার সময় স্পষ্ট করে বলতে হবে, যাতে করে সংশ্লিষ্ট লোকজন শুনতে পায়, তবে উচ্চকণ্ঠে নয়। খারাপ অথবা আপত্তিকর ভাষা পরিহার করতে হবে। অট্টহাসি অথবা অপ্রীতিকর শব্দ কাম্য নয়। নির্মল হাসি হাসতে হবে। কাঁদার সময় সংযম পালন করতে হবে; হৈচৈ করে বা বুক চাপড়ে কাঁদা উচিত নয়। পানাহারের বেলায় ভদ্র পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। মুসলমানকে অবশ্যই তার ক্রোধ সংবরণ করতে হবে, সৌজন্যের সীমা অতিক্রম করা চলবে না। প্রেম, ভালোবাসার ক্ষেত্রে সহৃদয়তা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয়। লোকজনের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে আন্তরিকতার সঙ্গে সম্ভাষণ করা। অন্যের সঙ্গে আলোচনায় প্রীতিকর চাহনি সদাচরণ হিসেবে বিবেচিত। অন্যদের ক্ষতি করা বা সে উদ্দেশ্যে শারীরিক, মনস্তাত্ত্বিক অথবা নৈতিক নির্যাতন পরিত্যাগ করতে হবে।

মহানবী (সা.)-এর ভাষায়, কারও ক্ষতি করা অথবা কারও ওপর প্রতিশোধ নেওয়া উচিত নয়। কারও সঙ্গে ঘৃণাচ্ছলে কথা বলা সত্যিকার মুসলমানের আচরণ নয়। প্রকৃতপক্ষে ইসলামে সদাচরণ অনেকখানি নির্ভর করে অন্যের প্রতি সুবিবেচনাপ্রসূত ব্যবহারের ওপর। এক্ষেত্রে ইসলামী আদবের অবদান অনেক। যেমন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কারও বিশ্বাসের নিন্দা বা গালাগাল দেওয়া নিষিদ্ধ। রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে ব্যবহারের নীতি হবে চেঁচামেচি না করা। অপরের ক্ষতি না করা, বাধাদান অথবা বিরক্ত না করা।

কোনো মুসলমানকে কেউ তার দোষত্রুটি প্রকাশ করলেও তাকে গালি দেওয়া ঠিক নয়। অন্যের সঙ্গে ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করা, অভদ্র বা তির্যক কথা বলা নিষিদ্ধ। কটাক্ষ করা, চোগলখুরি করা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত আন্দাজ, অনুমানের মাধ্যমে চরিত্র হনন ইসলামে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। খাবার গ্রহণকালে অপ্রীতিকর ভাবভঙ্গি দেখানো উচিত নয়, কারণ এতে অন্যরা বিরক্ত হতে পারে। তিনজন একসঙ্গে থাকলে দু’জন একান্তে আলোচনা করা উচিত নয়; কারণ এতে তৃতীয় ব্যক্তি আহত হতে পারে।  মৃতদের গালিগালাজ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কারণ এতে তাদের জীবিত আত্মীয়রা মনে আঘাত পায়।

লেখক : বিশিষ্ট মুফাসিসরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।

www.selimazadi.com

up-arrow