Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : সোমবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:১৫
বঙ্গবন্ধু পরিবার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ড. শেখ আবদুস সালাম
বঙ্গবন্ধু পরিবার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানসহ বিএ ডিগ্রি গ্রহণ করে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর পরই কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন। তিনি সে বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। সে সময় আইন বিভাগের হেড অব দি ডিপার্টমেন্ট ছিলেন অধ্যাপক এম ইউ সিদ্দিক। ভর্তির সময় তিনি তাকে নিয়মিত মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তার রোল নম্বর ছিল-১৬৬। আইনের ছাত্র শেখ মুজিব তখন এসএম হলের সংযুক্ত ছাত্র হলেও তিনি থাকতেন মোগলটুলিতে। একটি সাইকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতেন। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারীদের আন্দোলনে সমর্থন দান এবং ভীষণভাবে তাদের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে ২৬ মার্চ (১৯৪৯) বিশ্ববিদ্যালয় এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সভায় সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করায় তার আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করা সম্ভব হয়ে উঠেনি।

কেবল বঙ্গবন্ধুই নন, তার পরিবারের অনেক সদস্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথা এই ক্যাম্পাসের সরাসরি শিক্ষার্থী ছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর সর্বজ্যেষ্ঠ সন্তান (জন্ম : ২৮.০৯.১৯৪৭ সাল)। তিনি ২৬ আগস্ট ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। তিনি ছিলেন রোকেয়া হলের সংযুক্ত ছাত্রী। রোকেয়া হল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারকে লেখা এক পত্রে (রোহ/পিএফ/৬১/২০১৬ তাং ৩.৮.২০১৬) জানা যায় শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৬৭-৬৮ সেশনে বিএ (সম্মান) শ্রেণিতে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। তার রেজিস্ট্রেশন নং হ-৭১৬। ক্লাস রোল : ৮৫২। ভর্তি খাতায় তার নাম ঐধংবহধ ঝযবরশয লেখা রয়েছে। সেই সময়ে রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষ ছিলেন মিসেস আখতার ইমাম এবং বাংলা বিভাগের প্রধান ছিলেন অধ্যাপক মোহম্মদ আবদুল হাই (প্রয়াত)। অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী (প্রয়াত), অধ্যাপক ড. নীলিমা ইব্রাহীম (প্রয়াত), অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম, ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান প্রমুখ তার সরাসরি শিক্ষক। 

শেখ হাসিনা ইডেন কলেজের ছাত্রী থাকাকালীন ছাত্রীদের মিছিলের নেতৃত্ব দিয়ে বহুবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এসেছিলেন। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর ছিল তার কাছে অনেক আগে থেকেই পরিচিত। তার সহপাঠীরা আজও অনেকেই বেঁচে আছেন। তাদের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার সাদামাঠা জীবন ও বন্ধুবৎসল গুণের কথা এখনো শোনা যায়। প্রয়াত বৈজ্ঞানিক ড. ওয়াজেদ মিয়া রাজশাহী বোর্ড থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে। উত্তরকালে তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং পরিণত হন বঙ্গবন্ধুর বড় জামাতায়। তিনিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কৃতী ছাত্র। তিনি ছিলেন দেশের একজন বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী। তার চাকরির স্থলও ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনে। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের জন্ম ৫ আগস্ট ১৯৪৯ সালে। জানা যায় কামাল আতাতুর্কের নামের অংশ থেকে তার নাম রাখা হয়েছিল। শেখ কামালের ন্যায় শেখ জামালের নামও রাখা হয়েছিল জামাল আবদুল নাসেরের নামের অংশ থেকে। শেখ কামাল ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। তার ক্লাস রোল ছিল ২৬৮। তিনি ১৯৭২ সালে সমাজ বিজ্ঞানে অনার্স (পরীক্ষার রোল নং ৯৪২) এবং ১৯৭৩ সালে মাস্টার্স (পরীক্ষার রোল নং ২৭৬০) পরীক্ষায় [১৯৭৫ সালে অনুষ্ঠিত] অংশগ্রহণ করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকাকালে তিনি যেমন ছিলেন ছাত্রলীগের নেতা, তেমনি সে সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া, সংস্কৃতি, সামাজিক সংগঠন প্রভৃতি সব জায়গায় তার পদচারণা ছিল সক্রিয়। শেখ কামাল তার শিক্ষকদের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তার সরাসরি শিক্ষক প্রয়াত অধ্যাপক রঙ্গলাল সেন একদিন আমাকে বলেছিলেন, ‘আসলে শেখ কামালের গুণের কোনো অভাব ছিল না। প্রতিদিন সমাজবিজ্ঞান বিভাগে আসা, আড্ডা দেওয়া, রাজনীতি তো আছেই, বিভাগের উন্নয়ন, বিভাগের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সপ্তাহ আয়োজন, বিভাগের জন্য একটি সমৃদ্ধ মিউজিয়াম গড়ে তোলা, বিশ্ববিদ্যালয়ে খেলাধুলা ও কালচারাল অনুষ্ঠান সংগঠিত করা সব জায়গাতেই শেখ কামালের পদচারণা, অংশগ্রহণ কিংবা নেতৃত্বদান এটা ছিলই।’

শেখ কামাল এক সময় মনোযোগ দিয়েছিলেন আবাহনী ক্লাব গঠনে। এই ক্লাবটি গঠনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আধুনিক ফুটবল প্রবর্তনের ক্ষেত্রে শেখ কামালের অবদান অপরিমেয়। শেখ কামাল সম্পর্কে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম তার এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ‘আমি যখন ডাকসুর ভিপি তখন একবার ভিসি স্যারের কাছে গেলাম যে ছাত্রদের থাকার জায়গা নেই, আপনি হলের ব্যবস্থা করেন। স্যার বললেন, আমার তো টাকা নেই। বললাম যা আছে তাই দিন, বাকিটা আমরা ছাত্ররা স্বেচ্ছাশ্রমে করে দেব। এএফ রহমান হল। আমিসহ শত শত ছাত্র ভলান্টিয়ার হিসেবে মাথায় করে ইট-বালু টেনেছি, টিনের বেড়া লাগিয়েছি। চুয়াত্তর সালে একবার ভয়াবহ বন্যা হলো, সমস্ত বীজতলা নষ্ট হয়ে গেল। আমরা সেদিন রেসকোর্সে ট্রাক্টর এনে বীজতলা তৈরি করেছি, আবার চারা উঠিয়ে হেলিকপ্টারে করে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে গেছি। শেখ কামাল আমাদের সঙ্গে এসব কাজেও অংশগ্রহণ করত।’

তিনি আরও জানান, ‘আমরা ছাত্র ইউনিয়ন-ছাত্রলীগ মিলে অ্যাকশন কমিটি করলাম যে, গ্রামে সামার ভ্যাকেশনের সময় এক মাস দেশের সব জায়গায় আমাদের ‘ছাত্র ব্রিগেড’ থাকবে। মানুষের কাছে রাষ্ট্রীয় চার নীতি— গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ এবং সমাজতন্ত্র এগুলো পৌঁছে দেবে। গ্রামে গিয়ে দেখা গেল যে কৃষকরা লেখাপড়া জানে না, অক্ষরজ্ঞান নেই, এমনকি ক খ চেনে না; ১, ২ বলতে পারে কিন্তু পড়তে পারে না। আমাদের ছাত্র ব্রিগেড গ্রামে গিয়ে মাঠে যেসব গরু ঘাস খায় কৃষকের সম্মতি নিয়ে কাগজে ক খ অক্ষর লিখে একেকটা গরুর পিঠে তা বসিয়ে দিল। কোনো কোনোটার পিঠে ১, ২ সংখ্যা লাগিয়ে দিল যাতে কৃষকরা বর্ণ এবং সংখ্যাগুলো বুঝতে পারে। এটা ছিল নিরক্ষরতা দূর করার একটি অভিযান। ছাত্র ইউনিয়ন এবং ছাত্রলীগের অনেকে সেখানে ছিল, শেখ কামালও ছিল— সবাই মিলে আমরা এসব কাজ করেছি।’

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের স্মৃতির বর্ণনা দিয়ে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম আরও জানান, ‘১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসাকে কেন্দ্র করে আগের দিন সারা রাত ধরে পাহারা দিচ্ছি যে, কাল বঙ্গবন্ধু আসবেন। ওই সময় একটু সিকিউরিটি প্রবলেম ছিল। আগের দিন ১৪ আগস্ট বিকালের দিকে কে বা কারা শামসুন্নাহার হলের সামনে একটা পাকিস্তানি ফ্ল্যাগ টানিয়ে দিয়েছিল, তারপর ক্যাম্পাসে দুই-তিনটা গ্রেনেডও বিস্ফোরিত হয়েছিল। পরে মনে হয়েছে আসলে এগুলো ছিল মনোযোগ ডাইভারশনের ট্যাকটিস, যাতে সিকিউরিটি ফোকাস বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে থাকে আর বঙ্গবন্ধুর বাসার নিরাপত্তা একটু কম জোর দেওয়া হয় আর-কি। সম্ভবত এভাবেই জিনিসটা করা হলো। সেদিন ১৪ আগস্ট সারা দিন এবং গভীর রাত পর্যন্ত কামালও আমাদের সঙ্গে ছিল। রাত ১২টা নাগদ কামাল আমাকে বলল, সেলিম ভাই, কাজ তো চলছেই, আপনি অনুমতি দিলে আমি না হয় একটু বাসায় যাই। আমার কাছ থেকে পারমিশন নিল আর-কি। আমার মনটা একটু নরম হলো। ভাবলাম কয়েক দিন ধরে ও দিন-রাত লেগে আছে, এদিকে অল্পদিন মাত্র বিয়ে করেছে। আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি যেতে পার তবে শর্ত একটি। কাল তুমি প্রেসিডেন্টের গাড়িতে বা মোটরকেডে আসতে পারবে না, আগে এসেই ডিউটিতে সময় মতো জয়েন করতে হবে। আহ! আমি সেদিন যদি একটু শক্ত হইতাম তাহলে হয়তো ও বাড়ি যেত না। কামাল আমাকে খুবই মানতো। এই আফসোসটা আমার আজও হয়।’

সেদিন ১ আগস্ট টিএসসিতে সে সময়ের আর একজন ছাত্রনেতা বাহালুল মজনু চুন্নুর এক বক্তৃতায় শুনেছি শেখ কামাল সেই রাতে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে বেরিয়ে প্রথমে বকশীবাজারের দিকে তার শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিলেন। সেখানে তার স্ত্রী সুলতানা কামাল ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর বড় পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্রী, এক অনন্য উজ্জ্বল অ্যাথলেট। সুলতানা কামালের বাবা জনাব দবির উদ্দিন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী। স্ত্রীকে নিয়ে শ্বশুরালয় থেকে সেই রাতে তারা ৩২ নম্বরে চলে গিয়েছিলেন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, পরের দিন তাদেরও আর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে  আসা হয়ে ওঠেনি। শেখ কামাল কোনো দিনও আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবেন না। শেখ কামালের শৈশবের আফসোস ‘তার হাছু আপা শুধু তার আব্বাকে আব্বা ডাকতো’। ১৫ আগস্টের সেই কালোক্ষণ থেকে শেখ কামালই এখন হয়তো বঙ্গবন্ধুর গলা জড়িয়ে ধরে পরম মমতায় তাকে আব্বা ডেকে তার শৈশবের সেই সাধ মিটিয়ে চলেছেন। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর এক কৃতী শিক্ষক হলেন অধ্যাপক ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিক। তিনি যশোর বোর্ড থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অধিকার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হিসাব বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। পরে একই বিভাগে শিক্ষকতা আরম্ভ করেন। অধ্যাপক শফিক সিদ্দিক হচ্ছেন বঙ্গবন্ধুর ছোট কন্যা শেখ রেহানার স্বামী। অত্যন্ত অমায়িক ব্যক্তিত্বের মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে তিনি সেবা দিয়েছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও তাকে পরিচর্যা করেছে। খুবই মার্জিত ও নির্বিবাদী গবেষণানুরাগী এই মানুষটি এখন অবসর পূর্ব ছুটিতে থেকেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যুরো অব বিজনেস রিসার্চের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

বঙ্গবন্ধুর সর্বকনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেলও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের একজন সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি স্কুলের ছাত্র। শেখ রাসেলের জন্ম ১৮ অক্টোবর ১৯৬৪ সাল। শেখ রাসেলের নামকরণের একটি দার্শনিক-রাজনৈতিক রহস্য রয়েছে। বঙ্গবন্ধু বার্ট্র্যান্ড রাসেলের খুবই ভক্ত ছিলেন। বার্ট্র্যান্ড রাসেল সম্পর্কে শুনিয়ে এক সময় বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবকে তিনি রাসেল অনুরাগী করে তোলেন। এই ভক্তি-অনুরাগ থেকে তারা দুজন মিলে তাদের সর্বকনিষ্ঠ সন্তানের নাম রাখেন শেখ রাসেল। ১৯৭৫ সালে শেখ রাসেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত। তখন তার বয়স ছিল ১১ বছরের কিছু কম। সব ঠিক থাকলে রাসেল ল্যাবরেটরি স্কুলের ১৯৮২ সালের এসএসসি’র ব্যাচ থাকত। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক ব্যস্ততার কারণে পরিবারের সব খোঁজখবর রাখতে পারতেন না। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল ও কলেজের সুবর্ণজয়ন্তী (২০১৪) উপলক্ষে প্রকাশিত ‘আলোকের এই ঝর্ণা ধারায়’ শীর্ষক একটি প্রকাশনায় এই বিদ্যালয়ের এক সময়ের শিক্ষক আফরোজা বেগম একটি লেখায় লিখেছেন, ‘চতুর্থ শ্রেণিতে পাঠরত ছোট্ট একটি ছেলে। মিষ্টি চেহারা, নম্র-ভদ্র-অমায়িক। হাঁটতো নিচের দিকে তাকিয়ে। সামনে কোনো শিক্ষক পড়লে সামান্য উঁচু করে হাত তুলে সালাম দিত লজ্জামিশ্রিত হাসি হেসে।’

এই স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে শেখ রাসেলের ক্লাস টিচার ছিলেন মিস কামরুন্নাহার। রাসেলের ক্লাস ওয়ার্কের জন্য যেসব খাতা তার একটি খাতা একবার স্কুলের আলমারিতে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। ১৫ আগস্টের পর সেটি অধ্যক্ষ রাজিয়া মতিন চৌধুরীর হাতে পড়েছিল। খাতার মলাটের রং ছিল সবুজ। যেন সবুজ বাংলার রঙের সঙ্গে মিল। রাসেলের এই খাতাটিতে শ্রেণি শিক্ষক কর্তৃক ক্লাসওয়ার্ক মূল্যায়নের পর অভিভাবকের যে স্বাক্ষর নিতে হতো সেসব জায়গায় বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের স্বাক্ষর থাকত বলে দেখা গেছে। ওই প্রকাশনাটিতে রাজিয়া মতিন চৌধুরী লিখেছেন, ‘রাসেল যতদিন এই স্কুলে পড়েছে কোনো দিন সে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অবাধ্য হয়নি। সবাইকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করত। এ শিক্ষা হয়তো সে তার বাড়িতে পেয়েছিল। রাসেল ছিল খুবই সাদাসিধে। সে বাড়িতে তার প্রিয় একটি সাইকেল চালাতো। সে  যে গাড়িটিতে চড়ে স্কুলে আসত সেটি কোনো ঢাউস গাড়ি ছিল না বা ফ্ল্যাগওয়ালা গাড়িতে চড়ে কখনো সে স্কুলে আসত না। প্রতিদিন নির্ধারিত সময়েই সে ক্লাসে আসত। প্রধানমন্ত্রী ও পরে রাষ্ট্রপতির ছেলে বলে কোনো বাহুল্য বা আড়ম্বর তার মধ্যে ছিল না। সে ছিল খুবই বন্ধুবৎসল। তার একজন শিক্ষকের উদ্ধৃতি দিয়ে রাজিয়া মতিন চৌধুরী লিখেছেন, ‘১৪ আগস্ট অর্থাৎ স্কুলে তার শেষ দিন টিফিন পিরিয়ডে দেখি একটি পোঁটলা দুহাতে বুকে চেপে ধরে ছোট রাসেল ক্যান্টিন থেকে আসছে। দুহাত জোড়া, তাই হাত না তুলেই সালাম জানাল শিক্ষককে। শিক্ষক তার হাতের ওই পোঁটলাতে কী জিজ্ঞেস করায় রাসেল উত্তর দিল, ‘স্যার শিঙ্গাড়া’। শিক্ষক হেসে এত শিঙ্গাড়া দিয়ে কী হবে জিজ্ঞেস করায় লাজুক রাসেল হাসিমুখে জবাব দিল ‘বন্ধুদের নিয়ে খাব’।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলে ১৫ আগস্ট ইউ ল্যাব স্কুলের পক্ষে ছয়জন সমান লম্বা এবং স্মার্ট শিক্ষার্থী তাকে স্যালুট জানাবে বলে স্কুল থেকে তাদের বাছাই করা হয়েছিল। রাসেল ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম একজন। ১৪ আগস্ট (১৯৭৫) ছিল শেখ রাসেলের শেষ স্কুল দিবস, জীবনেরও শেষ দিন। বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য বঙ্গবন্ধুকে পরের দিন স্যালুট বা সালাম জানানোর জন্য রাসেলসহ বাছাইকৃত ছয় শিক্ষার্থী সেদিন তাদের প্রধান শিক্ষককে বলে বাসায় চলে যাওয়ার জন্য তার রুমে ঢুকেছিল। ঢুকতে এবং বের হতে উভয় সময়েই রাসেল তার প্রধান শিক্ষককে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে সালাম জানিয়েছিল। প্রধান শিক্ষকও আসার সময় দেওয়া সালামের জবাবে তাকে ‘ওয়ালাইকুম আসসালাম’ বলেছিলেন। বলেছিলেন তোমরা কাল যথাসময়ে চলে এসো। এর মাধ্যমে রাসেল আগামীকাল যথারীতি যথাসময়ে স্কুলে আসবে বলে এক ধরনের ‘প্রতিশ্রুতি’ দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ওইদিন রাতে ঘাতকের হাতে নিহত হওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি স্কুলে আর কোনো দিন তার পদচিহ্ন পড়েনি।

রাসেলের আর বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় আচার্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্যালুট জানানো হয়নি। প্রার্থনা করছি পরপারে রাসেল যেন বঙ্গবন্ধুর বঙ্গবন্ধুকে তার এই গল্প শোনায়। ১৯৭৫ সালে আগস্ট মাসে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যরা প্রায় সবাই নিহত হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাদের স্মৃতি আজও অম্লান। এসব ঘটনা আজ কেবল ইতিহাসেরই অংশ।

লেখক : অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

     ই-মেইল : skasalam@gmail.com

এই পাতার আরো খবর
up-arrow