Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২২:৫১
আমেরিকার কাছে ভারতকে কারা বিক্রি করল
সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত
আমেরিকার কাছে ভারতকে কারা বিক্রি করল

গত শতকের ’৯১ সালের ২৬ জুলাই ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের হাত ধরেই ভারত আর্থিক স্বাধীনতা অর্জন করে। তিনি যখন নরসিমা রাও মন্ত্রিসভার অর্থমন্ত্রী তখনই বাজার অর্থনীতি ঘোষণা করার প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে তৎকালীন বিরোধী দলনেতা তথা বিজেপির জন্মদাতা লালকৃষ্ণ আদভানি বলেছিলেন, এত সর্বনাশ হয়ে গেল। ভারত আমেরিকার কাছে বিক্রি হয়ে গেল। ’৯৮ থেকে ছয় বছর ক্ষমতায় থাকাকালে বিজেপি ড. মনমোহন সিংয়ের দেখানো অর্থনীতিই আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে নিয়ে যায়। ওই ছয় বছরে বিজেপি তথা এনডিএ রাজত্বকালে অটল বিহারি বাজপেয়ি এবং আদভানির যৌথ উদ্যোগে ভারত আর পেছনে ফিরে তাকায়নি। আমেরিকার কাছে ভারতকে কারা বিক্রি করল— বিজেপি না কংগ্রেস? একবার সেদিকে তাকানো যাক।

আগস্টের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা থেকে দিল্লি পৌঁছে মার্কিন বিদেশ সচিব জন কেরি এবং ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছে, তাতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ভারত তাদের জল, স্থল ও নৌবাহিনী আমেরিকাকে ব্যবহার করতে লজিস্টিক সাপোর্ট দেবে। এই চুক্তির পরে ভারতের কূটনৈতিক মহলের সাবেক ও বর্তমান অফিসার এবং রাজনৈতিক মহল বিস্মিত হয়নি। তারা বলেছে, কেন ভারতের সেনাবাহিনী আমেরিকাকে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে? কার স্বার্থে তা দেওয়া হবে? ষোড়শ শতাব্দীতে ব্রিটিশরা এসেছিল ব্যবসা করার নামে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই ব্যবসার উদ্যোক্তা ছিল। পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশরা যখন জোর করে শাসন করতে শুরু করে, তার পরবর্তীকালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন— বণিকের মানদণ্ড দেখা দিল রাজদণ্ডরূপে। এবারও কি ভারত দেখতে পাবে জল-স্থল-নৌবাহিনীর লজিস্টিক সাপোর্ট নিয়ে আমেরিকা তার শাসনের থাবা বসাবে। এ আশঙ্কা ভারতের দিকে দিকে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে দেখা দিয়েছে। আর এবার যে মার্কিন বাহিনী ভারতের মাটি ব্যবহার করবে, তার জন্য কোনো মূল্য দিতে হবে না। প্রসঙ্গত, ’৯১ সালে তিন মাসের জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন চন্দ্রশেখর। সে সময় ইরাকের সঙ্গে আমেরিকার যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ওয়াশিংটনে ক্ষমতাসীন সিনিয়র জর্জ বুশ। ওই বছরে নরসিমা রাওয়ের হাত ধরে ক্ষমতায় আসার পরে চন্দ্রশেখর-বুশ চুক্তি বাতিল করে দেয় সরকার। চুক্তিটি ছিল যুদ্ধ চলাকালে মুম্বাই বন্দরটি ব্যবহার করতে পারবে আমেরিকা।

এবার প্রশ্ন উঠেছে ভারতের জল-স্থল-বিমানবাহিনী ব্যবহার করে ওয়াশিংটন কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে? চীন না দক্ষিণ এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশের বিরুদ্ধে? মোদি সরকারের এই সিদ্ধান্ত ভারতকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য সব দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক যে এখনো বজায় আছে, তা ভেঙে চুরমার করে দেবে। সন্ত্রাসবাদ আর যুদ্ধ এক নয়। আমেরিকা কি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে? নৈব নৈব চ। দক্ষিণ চীন সমুদ্র নিয়ে চীনের সঙ্গে তাদের যে বিরোধ চলছে, তাতে ভারত কেন ভাগীদার হবে? ভারতের দারিদ্র্য, ক্ষুধা, বেকার সমস্যা এবং নিরাপত্তা দিতে মোদি সরকার যখন পুরো ব্যর্থ, তখন নরেন্দ্র মোদি কেন মার্কিনিদের কুচক্রে পা দিলেন? ভারতের জোটনিরপেক্ষ বিদেশনীতির সম্পূর্ণ বিরোধী এই পদক্ষেপ। গুজরাটের ত্র্যহস্পর্শ নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ এবং আরএস-প্রধান মোহন ভাগবত ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাস মুছে দিতে বদ্ধপরিকর। তাদের বিদেশনীতিতে তোলপাড় গোটা হিন্দুস্তান। সদ্যসমাপ্ত জি-২০ সম্মেলনে চীনে ভারত তথা প্রধানমন্ত্রীকে টিভির পর্দায় দেখা গেছে। বিশ্বের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার পরিবর্তে নরেন্দ্র মোদি সময় কাটিয়েছেন বারাক ওবামার হাত ধরে। ওবামাই যেন ১২৫ কোটি লোকের ত্রাণকর্তা। পৃথিবীর কোনো দেশ তাদের নিজস্ব জল-স্থল-নৌবাহিনী তৃতীয় দেশের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য দিয়েছে বলে শোনা যায় না। এই লজিস্টিক সাপোর্টের চুক্তি কত দিনের তাও স্পষ্ট করে লেখা নেই। মোদির অবশ্য আমেরিকার প্রতি দুর্বলতা গোপন নেই। ২০-২২ বছর বয়স থেকে তিনি একটানা প্রায় ১৫-১৬ বছর আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্য ঘুরে ঘুরে আরএসএসের মাহাত্ম্য প্রচার করেছেন। ওবামার দেশ কেনিয়া। কেনিয়া, উগান্ডাসহ আফ্রিকার বহু দেশ থেকে লাখো লাখো গুজরাটি ব্যবসায়ী আমেরিকার বিভিন্ন শহরে আস্তানা গেড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করেছেন। তারাই মোদি ক্ষমতায় আসার পর আহ্লাদে আটখানা।

জি-২০ বৈঠকে যাওয়ার আগে মোদি ভিয়েতনামে এক দিনের জন্য গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি ৫০ মিলিয়ন ঋণ দিয়ে বলেছেন, এই টাকা দিয়ে ভিয়েতনাম ভারত থেকে অস্ত্র কিনতে পারবে। বহু রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ভিয়েতনাম মার্কিন দখলদারদের সরিয়ে দিয়েছিল। মনে পড়ছে, আমাদের ছেলেবেলার কলকাতার রাস্তায় সেসব স্লোগান— ‘তোমার নাম, আমার নাম... ভিয়েতনাম ভিয়েতনাম। ভুলতে পারি বাপের নাম, ভুলব না তো ভিয়েতনাম, ভিয়েতনাম। হো চি মিন লাল সেলাম।’ সেই ভিয়েতনামকে আবার মার্কিন কূটনীতির চালে নরেন্দ্র মোদি যুদ্ধের পথে নামানোর চেষ্টা করছেন না তো?

দিল্লি-ওয়াশিংটনের এই চুক্তিতে পর্যবেক্ষকরা শুধু উদ্বিগ্নই নন, তারা এর নেপথ্যে কোথাও ষড়যন্ত্র দেখতে পাচ্ছেন। নভেম্বরে ভারতের সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে বিরোধীরা যে ঝড় তুলবেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। একাধিক বিদেশ সচিব এবং যারা ওয়াশিংটনের রাষ্ট্রদূত ছিলেন, তারা বিভিন্ন চ্যানেলে জল-স্থল-অন্তরীক্ষ ব্যবহার করতে দেওয়া চুক্তি সম্পর্কে মনে করেন, আগামী নভেম্বরে আমেরিকার নির্বাচনে ডেমোক্রেট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের জয় হলে তার শাসনকালে নরেন্দ্র মোদি ভারতের ৭০ বছরের বিদেশনীতি বদলে দেবেন। ভারত হবে আমরিকার তাঁবেদার একটি দেশ। নির্জোট আন্দোলনের ১৯৫টি দেশ যে নীতি আঁকড়ে ধরে ছিল, তা ভাঙার জন্য ওয়াশিংটন সেই ট্রুম্যানের আমল থেকেই নানা চাল চেলেছে। কখনো দরিদ্র দেশগুলোয় আমেরিকান আইনের পি-এল ৪৮০ ধারায় বিনামূল্যে গম সরবরাহ করেছে।

১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেন কলকাতার ময়দানে প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীকে সামনে বসিয়ে বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গ আমেরিকার এই ঘরবাড়ি সাহায্যের গম আর নেবে না। নেয়ওনি। আমেরিকার আর্থিক অবস্থা বর্তমান চীনের থেকে ভালো নয়। চীনের মাটিতে দাঁড়িয়ে জি-২০ সভায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্লজ্জভাবে আমেরিকার তাঁবেদারি করেছেন। তাই জি-২০ সভায় এবারের ফল শূন্যের থেকেও নিচে নেমে গেছে। জি-২০-এর উদ্দেশ্য ও কর্মসূচি কী ছিল? সে ব্যাপারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী খুব একটা উৎসাহ দেখিয়েছেন বলে কোনো খবর এ দেশের পত্রপত্রিকায় নজরে পড়েনি। রাজনৈতিকভাবে তিনি অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে কংগ্রেসের সঙ্গে লড়াই করুন। কিন্তু তা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে টেনে নিয়ে যাওয়ার মাশুল একদিন ভারতকে দিতে হবে বলে মনে করছেন সর্বভারতীয় এবং আঞ্চলিক দলের নেতারা। তারা নিন্দায় মুখর হয়েছেন। একদা লৌহমানব তথা উপপ্রধানমন্ত্রী আদভানি এখনো এই চুক্তির ব্যাপারে মুখ খোলেননি। ৮৮ বছরের বৃদ্ধ রাজনীতিক হয়তো আর মুখ খুলবেনও না। কারণ তিনি জানেন, যে দলটির তিনি জন্ম দিয়েছিলেন সেখানে তিনি ব্রাত্য।

১৯৯২ সালে আদভানির সেই কুখ্যাত রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে বাবরি মসজিদ ভাঙা নিয়ে এখনো বিজেপির প্রথম সারির পাঁচ-ছয় জন নেতার বিরুদ্ধে ভারতের শীর্ষ আদালতে মামলা চলছে। ২০০২ সালে গুজরাটের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, বিজেপির শীর্ষ নেতা অটল বিহারি বাজপেয়ি নরেন্দ্র মোদিকে রাজধর্ম পালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। মন্ত্রিসভার দ্বিতীয় ব্যক্তি আদভানি তখন মোদির পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ কলঙ্কজনক অধ্যায়ের পর পরবর্তী নির্বাচনে মোদি জয়ী হলে তাকে ফুলের তোড়া পাঠিয়েছিলেন, তার পশ্চিমবঙ্গের দিদি। মোদি যেমন ভারতের জোটনিরপেক্ষ বিদেশনীতি তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন, তখন তার দিদি বিদেশনীতির ব্যাপারে মুখ খোলেননি। কারণ হয়তো এ বিষয়টি তিনি খুব একটা বোঝেন না। মোদি না চাইলেও তার বিদেশ সচিব সম্প্রতি ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টারে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বলেছেন, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বহুত্ববাদ বজায় রাখার স্বার্থে বাংলাদেশের পাশেই থাকবে ভারত। এস জয়শঙ্কর বলেছেন, কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে চলেছে বাংলাদেশ সরকার। এ মুহূর্তে সমালোচনার থেকে সমর্থন পাওয়াটা তাদের বেশি প্রয়োজন। ভারত বরাবর তাদের পাশে থেকেছে। আন্তর্জাতিক মহলেরও উচিত বাংলাদেশের পাশে থাকা। কাশ্মীরে যে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ চলছে তাতে তিনি কতটা উদ্বিগ্ন, তা নিয়ে যতটা না মুখ খুলেছেন, তার চেয়ে বেশি মুখ খুলেছেন চীনের বিরুদ্ধে। ঈদের সময় অনেকে আশা করেছিলেন, মোদি একটা ফর্মুলা দিয়ে শান্তির প্রক্রিয়া শুরু করবেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। উল্টো তিনি বলেছেন, পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদ রপ্তানি করে। ’৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জনসংঘের (বিজেপির সাবেক নাম) খুব একটা ভূমিকা ছিল না। ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ওই যুদ্ধে বাংলাদেশের জন্ম হয়। যেসব অনভিজ্ঞ সন্ত্রাসবাদী ওই যুদ্ধে ভারতের স্বার্থ ছিল বলে প্রচার করছে, তা সর্বৈব অসত্য। ৩ ডিসেম্বর ইন্দিরা গান্ধী কলকাতায় ছিলেন। তার আগের দিন রাতে পাকিস্তান জম্মু-কাশ্মীর, পতিয়ালা, আগ্রা, চণ্ডীগড় প্রভৃতি স্থানে গোলাবর্ষণ শুরু করে। দিল্লি ফিরে গিয়ে পাকিস্তানকে সমুচিত শিক্ষা দেওয়ার নির্দেশ দেন পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তে। সেই থেকে যে অপপ্রচার চলছিল পাকিস্তান ও আমেরিকার যৌথ উদ্যোগে তা স্বাধীন বাংলার মাটিতে আজও চলছে।

সব ঘটনা মিলিয়ে মোটামুটিভাবে বলা যায়, মোদি যদি না শোধরান, তাহলে আজ হোক বা কাল, রবীন্দ্রনাথের কবিতাই সত্য বলে প্রমাণিত হবে। মোদির কাছে ভারতীয়দের দাবি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করুন গোটা উপমহাদেশের স্বার্থে। এ চুক্তি এক ভয়ঙ্কর বিপদ ডেকে আনতে পারে। অন্যদিকে চট্টগ্রামে নৌঘাঁটি বানানোর জন্য আমেরিকা বার বার চাপ সৃষ্টি করেছে। ভারতের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বলেন, জয়শঙ্কর ঠিক কথাই বলেছেন, ভারতের উচিত বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সুস্পষ্ট নীতি গ্রহণ করা।

           লেখক : ভারতীয় প্রবীণ সাংবাদিক

এই পাতার আরো খবর
up-arrow