Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২২:৫১
ধর্মতত্ত্ব
হাজীরা নিষ্পাপ শিশুর মতো
মুফতি আমজাদ হোসাইন
হাজীরা নিষ্পাপ শিশুর মতো

অন্যান্য বছরের ন্যায় এ বছরও লক্ষাধিক মানুষ পবিত্র কাবাবুল্লাহর জেয়ারত, জেয়ারতে মদিনা, এক কথায় হজ করার জন্য পবিত্র ভূমি মক্কা নগরীতে গিয়েছেন। মহান রাব্বুল আলামিনের ইচ্ছায় সুষ্ঠুভাবে হজ পালন করে দেশের মাটিতে ফিরতে শুরু করেছেন। হাজী সাহেবরা দেশের মাটিতে সুস্থ ও নিরাপদে ফিরে আসুক এ কামনা দেশের প্রতিটি নাগরিকের। একের জন্য অপরজন এমন কামনা করাই উচিত। পবিত্র কোরআনে সূরা হুজরাতের ১০ নং আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে, ‘মুমিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই। অতএব তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও।’ বোঝা গেল ভাই ভাইয়ের জন্য শুভ কামনা করাটা কোরআনের নির্দেশ। হাদিসে এসেছে, হজরত আবু মূসা আশআরী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘এক মুমিন অন্য মুমিনের জন্য প্রাচীরস্বরূপ। এর এক অংশ অন্য অংশকে সুদৃঢ় ও শক্তিশালী করে। এ কথা বলার সময় তিনি এক হাতের আঙ্গুল অন্য হাতের আঙ্গুলের ফাঁকে ঢুকিয়ে দেখালেন’। (বুখারি, মুসলিম)। বুখারি, মুসলিমের অপর হাদিসে এসেছে, হজরত নু’মান ইবনে বাশীর (রহ.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেন, ‘পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া-অনুগ্রহ ও মায়া-মমতার দৃষ্টিকোণ থেকে সব মুমিন মুসলিম একটি দেহের ন্যায়। যদি দেহের কোনো অংশ অসুস্থ হয়ে পড়ে তবে অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও অনুভব করে। সেটা জাগ্রত অবস্থাই হোক বা জ্বরের অবস্থায় (সর্বাবস্থায়)’। এ ধরনের বহু হাদিস বর্ণিত রয়েছে। এ ছাড়াও হাজী সাহেবরা যখন হজ করে আসে তখন তারা শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে যায়। একজন নিষ্পাপ শিশু যেমনিভাবে বহু কল্যাণ নিয়ে দুনিয়ার বুকে আগমন করে, একটি পরিবারে আনন্দের বন্যা বইয়ে দেয়। ঠিক একজন হাজী সাহেব যখন নিষ্পাপ শিশুর মতো দেশে বা পরিবারে নিরাপদে ফিরে আসে তখন ওই পরিবারে আনন্দের বন্যা বইয়ে যায়। তার মাধ্যমে শান্তির হাওয়া বইতে থাকে। হাজী সাহেবরা দেশে ফিরে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন। সঙ্গে সঙ্গে আয়োজকদের ভূয়সী প্রশংসা করেন। বার বার হজে যাওয়ার তামান্না প্রকাশ করেন। হজের সফরের সব কষ্ট ভুলে যান। মনে একটি শীতলতা অনুভব করেন। নামাজ রোজার প্রতি আগের থেকেও এখন বেশি যত্নবান হন। কথাবার্তায় শালীনতা প্রকাশ পায়। নিজেকে তিনি গুছিয়ে পরকালমুখী করেন। এ সবকিছুই শান্তির আলামত। ইসলাম শান্তির ধর্ম। শান্তির কথা বলে। মানবতার কথা বলে ও মানুষের অধিকারের কথা বলে মানুষকে এক আল্লাহমুখী করে এবং পরকালে অনাদি অনন্তকালের জন্য থাকতে হবে তার জন্য চিন্তাশীল বানায়। প্রিয় পাঠক! প্রায় লক্ষাধিক হাজী সাহেব এ বছর হজ করতে গেছেন। এখন আবার হজ করে ফিরতে শুরু করেছেন। তাদের পদচারণায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রত্যহ মুখরিত হচ্ছে। তাদের দেখলে অন্য লোক থেকে আলাদা মনে হচ্ছে। প্রায় সব হাজী সাহেবের পরনে সুন্নতি জামা, মাথায় সুন্দর টুপি। মুখে রয়েছে দাড়ি। এক জান্নাতি মানুষের মতো দেখাচ্ছে। তাদের দেখলে মনে কেমন জানি এক ধরনের প্রশান্তি অনুভূত হয়। এ লক্ষাধিক হাজী সাহেবের সঙ্গে লাখ লাখ পরিবার যুক্ত আছেন। হাজী সাহেবদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য বা একনজর দেখার জন্য লাখ লাখ মানুষ আগমন করছে। আর হাজী সাহেবরা কাউকে জায়নামাজ, তাসবিহ জমজমের পানি ও খুরমা উপহার দিচ্ছেন বা কাউকে মক্কা মদিনার টুপি হাদিয়া দিচ্ছেন। আবার কোনো কোনো হাজী সাহেব নিজ হাতে আগত মেহমানদের জমজমের পানি পান করাচ্ছেন। মেহমানরাও কেবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে (আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকা ইমানান কামেলান, ওয়াইকীনান সাদেকান, ওয়াআমালান সালেহান, ওয়াইলমান নাফেয়ান, ওয়াফাহমান কামেলান, ওয়ালিসানান যাকেরান, ওয়াকালবান খাশেয়ান, ওয়াশিফাআন মিন কুল্লে দায়িন ওয়া দাওয়াআন) অর্থাৎ হে আল্লাহ আমাকে পূর্ণ ইমান দান কর, সঠিক বিশ্বাস দান কর, নেক কাজ করার তৌফিক দান কর, উপকারী জ্ঞান দান কর, পরিপূর্ণ বুঝ দান কর, জবানে জিকির জারি করে দাও, বিনয়ী অন্তর দান কর এবং সব রোগ-বিরোগ ও বালা-মসিবত থেকে মুক্তি দান কর। বস্তুত মহান রাব্বুল আলামিন জমজমের পানির মধ্যে এত পাওয়ার রেখেছেন যে, কোনো ব্যক্তি পূর্ণ বিশ্বাসের সঙ্গে যে কোনো কঠিন থেকে কঠিন রোগ মুক্তির নিয়ত করে পান করলে আল্লাহতায়ালা সঙ্গে সঙ্গে তাকে আরোগ্য দান করেন। প্রিয় পাঠক। একজন হাজী সাহেবের মাধ্যমে একটি পরিবার, সমাজ ও দেশ সুষ্ঠু ও সুন্দর হয়ে যেতে পারে। দেশে শান্তির হাওয়া বয়ে যেতে পারে। কারণ হাজী সাহেব হজ করাকালীন শুধু্ হজই করেননি, তিনি পবিত্র মক্কাতুল মুকাররামা ও মদিনাতুল মুনাওয়ারার বহু ঐতিহাসিক চিত্র দেখে এসেছেন। রসুল (সা.) কত কষ্ট করে মক্কায় অবস্থান করেছেন, কীভাবে হেরা গুহায় ওহির জন্য ধ্যান করেছেন। পবিত্র মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেছেন। ছুর গুহায়ে অবস্থান করেছেন এবং দীন-ইসলামের জন্য, সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য এবং অজ্ঞতা দূর করে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করার জন্য কতই না কষ্ট করেছেন। এ ছাড়াও আরও বহু কিছু হাজী সাহেব অবলোকন করে মানসপটে চিত্রাঙ্কিত করে নিয়ে এসেছেন এবং তিনি এটাও দেখে এসেছেন সারা বিশ্ব থেকে লাখ লাখ হাজী স্ব স্ব দেশ থেকে হজ করতে আসেন। হাজী সাহেবদের মাঝে ভাষা, রং ও বর্ণের ভিন্নতার পরও নেই কোনো বাদানুবাদ বা ঝগড়াঝাটি। সবাই নিয়মতান্ত্রিকভাবে আপন আপন কর্ম সম্পাদন করছেন। আল্লাহপাকের ধ্যানে নিজেদের মগ্ন রেখেছেন। সুস্থ ও সবলভাবে আপন আপন দেশে ফিরে যাচ্ছেন শান্তির বাণী নিয়ে। এ সবকিছু একজন হাজী সাহেব দেখে মুগ্ধ হয়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে এমন ভ্রাতৃত্ববোধ যেন আপন দেশেও থাকে আল্লাহপাকের দরবারে একান্তে দোয়া করেন। প্রিয় পাঠক। একজন হাজী সাহেব হজ থেকে ফিরে আসার পর হাদিসের বাণী অনুযায়ী চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার দোয়া কবুল হতে থাকে। তাই হাজী সাহেবগণ প্রত্যেক নামাজের পর নিজ পরিবার-পরিজনের জন্য দোয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপন দেশের শান্তি, উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য দোয়া করলে ইনশাআল্লাহ এ দেশও শান্তি ও সুখময় এক দেশে পরিণত হবে বলে আমরা আশা রাখি।  আমিন।

লেখক :  মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও খতিব বারিধারা, ঢাকা।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow