Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:৩৬
যুদ্ধের পূর্বাভাস এবং শক্তির ভারসাম্যতা
আবু হেনা
যুদ্ধের পূর্বাভাস এবং শক্তির ভারসাম্যতা

বাংলাদেশ প্রতিদিনে শুক্রবারের প্রতিবেদন : দিল্লিতে ‘ওয়ার রুমে’ গভীর রাতে বৈঠকে মোদি। কলকাতা থেকে প্রেরিত দীপক দেবনাথের প্রেরিত বার্তায় জানা গেছে, ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু কাশ্মীরে উড়ির সেনাক্যাম্পে জঙ্গি হামলার বদলা নেওয়ার দাবি ক্রমশ জোরদার হচ্ছে। হামলায় গত রবিবার ১৮ জন ভারতীয় সৈন্য নিহত হওয়ার পর নিহত জওয়ানদের পরিবারের পাশাপাশি রাজনীতিবিদ, সেলিব্রিটি এবং সেনাবাহিনীর একাংশের প্রত্যেকের বক্তব্য- ‘অনেক হয়েছে, আর নয়। এবার সময় এসেছে পাকিস্তানে পাল্টা আঘাত হানার। ভারতের সেনাবাহিনী এই জঙ্গি হামলার সঙ্গে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে মনে করছে এবং তারা প্রতিঘাতের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত নোভাল, সেনাবাহিনী প্রধান দলবীর সিং সুহাগ, বিমান বাহিনী প্রধান অরূপ সাহা ও নৌবাহিনীর প্রধান সুনীল লাম্বার সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পরে শনিবার জনসভায় বক্তব্যে পাকিস্তানকে সম্মুখ ‘সমরে’ আহ্বান জানান তিনি। এ সময় শত্রুঘাঁটিতে কীভাবে আঘাত হানা সম্ভব, তা বালুর মডেল করে তাকে বুঝিয়েছেন তিন প্রধান।

যুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে কীভাবে ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানের অভ্যন্তরে আঘাত করবে কিংবা পাকিস্তানি সীমানায় প্রবেশ করে জঙ্গি এবং সেনাঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেবে, সেসব পরিকল্পনাই ছিল এই বৈঠকের মূল বিষয়বস্তু।

এই পরিস্থিতিতে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এখন সময়ের ব্যাপার। অন্য খবরে জানা যাচ্ছে, পরদিন অর্থাৎ শনিবারেও ভারতীয় তিন বাহিনী প্রধান নরেন্দ্র মোদির বাসভবনে আবারও বৈঠক করেছেন। কাশ্মীর সীমান্তে হঠাৎ করে উত্তেজনা বৃদ্ধির পেছনে জঙ্গি সংগঠন না পাকিস্তানের সেনা গোয়েন্দা সংস্থার কাজ তা স্পষ্ট নয়।

পাকিস্তান এই হামলার সঙ্গে কোনোরূপ সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছে। কিন্তু ভারত তা মানতে নারাজ।

পাকিস্তান-ভারতের মধ্যে সাংঘর্ষিক অবস্থা ১৯৪৭ সাল থেকে অবিচ্ছিন্নভাবে চলে আসছে। এর মূলে রয়েছে ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত বিভাজন যার ফলে মুসলিম অধিবাসী বিধৃত পূর্ববাংলার এবং ভারতের পশ্চিম সীমান্তের মুসলিম অধ্যুষিত চারটি অঞ্চলকে সংযুক্ত করে পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব। বাকি অংশগুলো ভারত রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হলেও মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীর নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়। আর সেই জটিলতাই ১৯৬৫ এবং ১৯৭১ সালে দুটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়াও ১৯৯৯ সালে কাশ্মীরি মুজাহিদের ছদ্মাবরণে পাকিস্তানি সৈন্যরা ভারতীয় সেনাবাহিনীর ওপর যে অতর্কিত আক্রমণ চালায় তাতে ভারতীয় সেনারা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভারত এর জন্য পাকিস্তানকেই দায়ী করে। যদিও পাকিস্তান তা বরাবরের মতোই অস্বীকার করে। কিন্তু এত বড় একটি বিপর্যয়ের পরও ভারত পাল্টা আঘাত করেনি। কিন্তু উড়ির ঘটনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা এখন চরমে পৌঁছেছে। এর পেছনে যে কারণগুলো রয়েছে তা শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই উত্তেজনার পরিসর এখন দুই দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বেশ কটি প্রধান সামরিক শক্তির মধ্যে পরিব্যাপ্ত। এই শক্তিগুলো হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং রাশিয়া। সেই কারণেই এই সংঘর্ষ যদি সত্যিই সম্মুখযুদ্ধে রূপান্তরিত হয় তাহলে তা আর একটি বিশ্বযুদ্ধের রূপ নিতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই আণবিক শক্তি ছিল, আর সেই শক্তি ব্যবহার করেই মিত্রশক্তি জাপানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেছিল।

এরপর সারা বিশ্বে সামরিক শক্তির পরিবর্তন, পরিবর্ধন এবং বিবর্তন ঘটেছে। ১৯৪৯-এর সেপ্টেম্বর মাসেই সোভিয়েত ইউনিয়ন আণবিক বোমার বিধ্বংসী শক্তির অধিকারী হয়ে যায়। একই সময়ে মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে গণচীন সাম্যবাদী শিবিরের অন্তর্ভুক্ত হয়। স্নায়ুযুদ্ধের প্রধান নাট্যমঞ্চও এই সময়েই ইউরোপ থেকে এশিয়ায় স্থানান্তরিত হয়। ১৯৪৯-৫৩ সময়কালে কোরীয় যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সহযোগিতায় সদ্য সৃষ্ট কমিউনিস্ট চীনের পৃষ্ঠপোষকতা পুষ্ট উত্তর কোরীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ অভিযান চালায়। ১৯৫০ সালে চীন এবং সোভিয়েট ইউনিয়নের একটি মৈত্রী চুক্তি সম্পাদিত হয়। এই মৈত্রী মূলত অর্থনৈতিক এবং কারিগরি ধরনের হলেও যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো জোটের ধারণায় এটা ছিল চীন, সোভিয়েত বিশাল ভূখণ্ডের সাম্যবাদী রাজনৈতিক শিবিরে উত্তরণের এক উদ্বেগজনক প্রক্রিয়া। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র সাম্যবাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক বিশ্বের রক্ষাকর্তা রূপে অবতীর্ণ হয়। ফলে সৃষ্টি হয় ‘গণ্ডিকরণ’ তত্ত্বের। এই তত্ত্বানুসারে চীন সোভিয়েত ইউনিয়নে ঘাঁটি গেড়ে বসা সাম্যবাদী দর্শন ও জীবনধারাকে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখাই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র লক্ষ্য। এই সময়টা ছিল অনাধুনিক বোমারু বিমানের যুগ, যখন ওই বিমানগুলোর এককালীন উড়ার আওতা ছিল ১৫০০ থেকে ১৮০০ মাইল। তাই চীন, সোভিয়েত যৌথ সামরিক শক্তিকে গণ্ডিবদ্ধ সীমানায় আবদ্ধ রাখার উপায় হিসেবে মরক্কো থেকে থাইল্যান্ড পর্যন্ত বিমান ঘাঁটির একটি মালা গাঁথা হয়। এই উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সোভিয়েত ভূখণ্ডের পরিসীমায় বহু বিমান ঘাঁটি গড়ে তোলে। যৌথ নিরাপত্তা ও রক্ষাব্যবস্থায় মিত্রদের নিয়ে ১৯৫৪ সালে সিয়াটো এবং ১৯৫৫ সালে সেন্টো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতে স্বাক্ষরকারী ছিল পাকিস্তান এবং তুরস্ক। ১৯৫৬ সালে কোরীয় যুদ্ধের অবসান ঘটে। সারা বিশ্ব দুটি জোটে বিভক্ত হয়ে যায়— একদিকে ন্যাটো অন্যদিকে পূর্ব ইউরোপীয় মিত্রদের নিয়ে ‘ওয়ারশ’ চুক্তি করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। পঞ্চাশ দশকের যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ নিরাপত্তা জোটজনিত চুক্তিতে ছিল জাতিসংঘের ৭৬টি রাষ্ট্রের মধ্যে ৬০টি। সোভিয়েত রক্ষাজোটে যুক্ত হয় ১৪টি রাষ্ট্র।

এরপর ১৯৯০ সাল অবধি আন্তর্জাতিক বিবাদ, বিসংবাদ ও উদ্বেগ স্নায়ুযুদ্ধে পরিণত হয়। দুই জোটের প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে উদ্বেগ আর অস্থিরতা সৃষ্টি করে। বিশ্বব্যবস্থায় শুরু হয় মেরুকরণ- দুই ত্রিভুজের সমাহার। এর একটি ছিল সামরিক। এতে ছিল তিনটি বৃহৎ সামরিক শক্তি-যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীন। অন্যটিতে ছিল তিন প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি-যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম ইউরোপ এবং জাপান। আজ তার পরিবর্তন ঘটেছে। এখন বিশ্ব অর্থনীতি এবং সামরিক শক্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী। যুক্তরাষ্ট্রের পরে সামরিক শক্তি এবং অর্থনৈতিক শক্তিতে দ্বিতীয় স্থানে চীন। সামরিক শক্তিতে রাশিয়া দ্বিতীয় স্থানে হলেও অর্থনৈতিক দুর্বলতা রাশিয়াকে পরাশক্তির অবস্থান থেকে কক্ষচ্যুত করেছে। ১৯৮৮ সালে অধুনালুপ্ত সোভিয়েত সাম্রাজ্যের সামরিক বাহিনীতে ছিল ৩৩,৭৬০০০ সদস্য। একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল ৭,৭৬,০০০। এ ছাড়া এয়ারক্র্যাফট ক্যারিয়ার সাবমেরিন ডেস্ট্রোয়ার/ফিগেট, জেট ফাইটার সব ক্ষেত্রেই সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রাধান্য ছিল অন্যসবার ওপরে। তার পরও রণকৌশলের উৎকর্ষতার কারণে এবং ন্যাটো জোটের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের কারণে যুক্তরাষ্ট্র বরারবই সোভিয়েট ব্লককে ছাড়িয়ে যায়।

যুক্তবিগ্রহ এবং সমর প্রতিযোগিতা যে একটি দেশের সর্বনাশ ডেকে আনে তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৮৮ সালে প্রতিরক্ষা খাতে এদেশের ব্যয় ছিল ৭০০ বিলিয়ন ডলার যা ছিল  সে দেশের জিএনপির ১৭%, পুরো সোভিয়েত ব্লকে এই ব্যয় ছিল জিএনপির ২৫%। এই ব্যয় সোভিয়েত অর্থনীতির ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করে যার ফলশ্রুতিতে গরবাচেভের পেরেস্ট্রয়কার মাধ্যমে সংস্কার এবং সামরিক খাতে ব্যয় সংকোচনসহ পূর্ব ইউরোপ থেকে সেনা অপসারণ সম্ভব হয়। একই সঙ্গে চীনা সীমান্ত থেকেও সৈন্য প্রত্যাহার করা হয় এবং একই সঙ্গে আফগানিস্তান ও তালেবানের হাতে পরাজয় বরণ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন পিছু হটে আসে এবং সেই সঙ্গে সোভিয়েত সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।

একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৮৮ সালে প্রতিরক্ষা ব্যয় ছিল ২৮৫ বিলিয়ন ডলার যা ছিল জিডিপির ৬.৪% এবং বাজেটের শতকরা ২৮ ভাগ। চীনে এ সময় সেনাবাহিনী সদস্য ছিল ২৩ লাখ, নৌবাহিনী ছিল ৩ লাখ এবং বিমান বাহিনীতে ৪ লাখ ৭০ হাজার সদস্য। ভারতের এ সময় সেনাবাহিনীর সদস্য ছিল ১২ লাখ, নৌবাহিনীতে ছিল ৫২ হাজার এবং বিমান বাহিনীতে ছিল ১ লাখ ১৫ হাজার সদস্য। সেই অনুপাতে পাকিস্তানে ছিল ৪ লাখ ৫০ হাজার সেনাসদস্য, ১৫ হাজার নৌসেনা এবং ১৮ হাজার বিমান বাহিনী সদস্য।

আজকের হিসাবে ভারতের সেনাসদস্য সংখ্যা ১৩,২৫,০০০ আর পাকিস্তানের সংখ্যা এখন আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৬,২০,০০০-এ। তখনকার মতোই এখনো ট্যাংক, কামান, যুদ্ধবিমান সবকিছুতেই পাকিস্তান ভারতের তুলনায় অনেক পেছনে। কিন্তু এখন সময় বদলে গেছে। আণবিক শক্তিতে পাকিস্তান ভারতের চেয়ে এগিয়ে আছে। তাছাড়া চীনের কাছ থেকে ৮টি সাবমেরিন পাচ্ছে।

আরও পরিবর্তন হয়েছে বিশ্ব পরিস্থিতিতে। পাকিস্তান তার চিরদিনের মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছেড়ে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সহযোগিতা গড়ে তুলেছে। আর ভারত তার চিরকালের বিশ্বস্ত মিত্র রাশিয়াকে ত্যাগ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ভারত সামরিক বলয় সৃষ্টি করেছে। পাকিস্তান ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে চীন তার ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ পরিকল্পনা ৪৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে বাস্তবায়ন করে সোজা বেলুচিস্তানের মধ্য দিয়ে গোয়াদর বন্দরে পৌঁছে যাবে। এই কারণে ভারত বেলুচিস্তানের বিষয়ে যে নীতি গ্রহণ করেছে তা ভারত-যুক্তরাষ্ট্র জোট বনাম চীন-পাকিস্তান-রাশিয়া জোটের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং পরিশেষে সংঘাতে রূপান্তরিত হবে। মাত্র কিছুদিনের মধ্যেই এই পক্ষালম্বন অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে গেছে। ‘সাউথ টাইনা সিতে’ রাশিয়া-চীন নৌবাহিনীর মহড়া চলছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানে রাশিয়া-পাকিস্তান যৌথ সামরিক ড্রিল চলছে। অতএব, এ সময়ে যুদ্ধ মানে এই দুই জোটের মধ্যে যুদ্ধ-শুধুমাত্র ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ নয়।

     লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য

এই পাতার আরো খবর
up-arrow