Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : সোমবার, ৩ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:১০
আয়কর সম্পর্কে জরুরি কিছু কথা
তপন কুমার ঘোষ
আয়কর সম্পর্কে জরুরি কিছু কথা

আয়কর হচ্ছে আয়ের ওপর আরোপিত করভার। প্রত্যেক করদাতার জন্য আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক।

আয়কর কর্তৃপক্ষের কাছে বার্ষিক আয়ের সংক্ষিপ্ত বিবরণ উপস্থাপন করা হয় আয়কর রিটার্নের মাধ্যমে। কোনো অর্থবছরে মোট আয়ের পরিমাণ একটা নির্দিষ্ট অঙ্ক অতিক্রম করলে আয়কর দিতে হয়। এবার ২০১৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০১৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আয়ের ওপর ভিত্তি করে রিটার্ন দাখিল করতে হবে। এক্ষেত্রে ২০১৫-১৬ হবে আয়বর্ষ এবং ২০১৬-১৭ হবে করবর্ষ। এ বছরের ১ জুলাই থেকে ২০১৬-২০১৭ করবর্ষের রিটার্ন দাখিল শুরু হয়েছে। আগের বছরগুলোতে ৩০ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত ছিল আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ দিন। এ বছর সময় দুই মাস বাড়িয়ে ব্যক্তি-শ্রেণির করদাতাদের আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ধার্য করা হয়েছে ৩০ নভেম্বর। এ দিনটিকে ‘কর দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। নির্ধারিত সময় অর্থাৎ ৩০ নভেম্বরের মধ্যে কেউ রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থ হলে আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর বিধান অনুযায়ী জরিমানাসহ ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত সরল সুদ এবং মাসিক ২ শতাংশ হারে বিলম্ব সুদ পরিশোধ করতে হবে। তবে করদাতা রিটার্ন দাখিলের জন্য সময়ের আবেদন করে উপ কর কমিশনার কর্তৃক মঞ্জুরকৃত বর্ধিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল         করলে জরিমানা গুনতে হবে না, তবে অতিরিক্ত সরল সুদ ও বিলম্ব সুদ আরোপিত হবে।

আয়ের খাত : নয়টি খাতের আয় ব্যক্তি-শ্রেণির করদাতার মোট আয়ের অন্তর্ভুক্ত। খাতগুলো হচ্ছে- বেতনাদি, নিরাপত্তা জামানতের ওপর সুদ, গৃহসম্পত্তির আয়, কৃষি আয়, ব্যবসা বা পেশার আয়, ফার্মের আয়ের অংশ, স্বামী/স্ত্রী বা অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের আয় (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে), মূলধনী মুনাফা ও অন্যান্য উৎস থেকে আয়।

করমুক্ত আয়সীমা : ২০১৬-১৭ করবর্ষে করমুক্ত আয়সীমায় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। কোনো করদাতার বার্ষিক করযোগ্য আয় আড়াই লাখ টাকার বেশি হলে কর দিতে হবে। তবে নারী এবং ৬৫ বছর ও তার ঊর্ধ্বের প্রবীণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়সীমা তিন লাখ টাকা,  প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পৌনে চার লাখ টাকা এবং গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে সোয়া চার লাখ টাকা। এ ছাড়া সন্তান প্রতিবন্ধী হলে পিতামাতা ও আইনানুগ অভিভাবক আরও ২৫ হাজার টাকা করমুক্ত সুবিধা পাবেন।  

কর হার : করের হারের ক্ষেত্রে আগের হার বহাল আছে। ব্যক্তি-শ্রেণির করদাতাদের আয়ের প্রথম আড়াই লাখ টাকার ওপর কোনো কর দিতে হবে না। পরবর্তী চার লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর ১০ শতাংশ হারে, পরবর্তী পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ হারে, পরবর্তী ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর ২০ শতাংশ হারে, তত্পরবর্তী ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর ২৫ শতাংশ হারে এবং অবশিষ্ট আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। নারী, প্রবীণ নাগরিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়সীমা আড়াই লাখ টাকার বেশি যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।

করমুক্ত বা কর অব্যাহতিপ্রাপ্ত আয় : করমুক্ত এবং কর অব্যাহতিপ্রাপ্ত আয় করদাতার মোট আয়ে অন্তর্ভুক্ত হবে না।   রিটার্নে করমুক্ত আয়ের কলামে দেখাতে হবে।   করমুক্ত আয়ের তালিকার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, পেনশন, আড়াই কোটি টাকা পর্যন্ত গ্র্যাচুইটি, স্বীকৃত প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে প্রাপ্ত অর্থ, পঁচিশ হাজার টাকা পর্যন্ত নগদ লভ্যাংশ, সরকারি সিকিউরিটিজের সুদ যা সরকার করমুক্ত বলে ঘোষণা করেছে।   

বেতনাদি খাতের আয় : সাধারণভাবে একজন করদাতার প্রাপ্ত মূল বেতন, উৎসব ভাতা, পরিচালক ভাতা, সম্মানী ভাতা, ওভারটাইম ভাতা, স্বীকৃত ভবিষ্যৎ তহবিলে নিয়োগকর্তার প্রদত্ত চাঁদা এবং বিভিন্ন পারকুইজিট (সুবিধা) বেতন খাতের করযোগ্য আয়। এই খাতে করযোগ্য আয় নিরূপণের পৃথক তফসিল রয়েছে। তফসিল পূরণপূর্বক মূল রিটার্নের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। প্রসঙ্গত, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে করযোগ্য আয় গণনার পদ্ধতি ভিন্ন। মাসিক মূল বেতন ১৬ হাজার টাকা উত্তোলনকারী সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বাধ্যতামূলকভাবে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হবে। বিগত অর্থবছরে প্রাপ্ত মূল বেতন, উৎসব ভাতা এবং বোনাস করযোগ্য আয় হিসেবে গণ্য হবে। অন্যান্য সুবিধা যেমন, বাড়ি ভাড়া ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত ভাতা, শ্রান্তি বিনোদন ভাতা, নববর্ষ ভাতা ইত্যাদি করমুক্ত থাকবে।

নিরাপত্তা জামানতের ওপর সুদ : সরকার কর্তৃক ইস্যুকৃত বন্ড বা সিকিউরিটিজ যেমন, ট্রেজারি বন্ড, ট্রেজারি বিল, ডিবেঞ্চার থেকে অর্জিত সুদ এবং জাতীয় সঞ্চয় পরিদফতর কর্তৃক ইস্যুকৃত বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্রের মুনাফা/সুদ  এই খাতের আয় হিসেবে দেখাতে হবে। যেসব ক্ষেত্রে সুদ বা মুনাফা থেকে উেস আয়কর কর্তন করা হয়েছে সেসব ক্ষেত্রে সুদ বা মুনাফা থেকে আয় হবে উেস আয়কর কর্তনের পূর্ববর্তী অঙ্ক। ২০১৬-২০১৭ করবর্ষে যে কোনো ধরনের সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে প্রাপ্ত মুনাফা/সুদ আয়ের ওপর উেস কর্তিত কর চূড়ান্ত করদায় পরিশোধ হিসেবে গণ্য হবে। করদায় পরিগণনার সময় প্রথমে সঞ্চয়পত্রের সুদ আয় ব্যতীত অন্যান্য খাতের করযোগ্য আয়ের ওপর প্রযোজ্য আয়করের হিসাব করতে হবে। এরপর সে অঙ্কের সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের সুদ থেকে কেটে রাখা উেস কর যোগ করে ‘মোট আয়ের ওপর আরোপযোগ্য আয়কর’-এর পরিমাণ নিরূপণ করতে হবে।

পেনশনার সঞ্চয়পত্রের সুদ/মুনাফা : আয় বছরে পেনশনার সঞ্চয়পত্রে পুঞ্জীভূত বিনিয়োগের পরিমাণ পাঁচ লাখ টাকা অতিক্রম না করলে পেনশনার সঞ্চয়পত্র থেকে প্রাপ্য সুদ করমুক্ত থাকবে।  

গৃহসম্পত্তির আয় : কোনো করদাতা তার বাড়ি আবাসিক বা বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য ভাড়া দিলে, সে আয় গৃহসম্পত্তির আয় খাতে দেখাতে হবে।   গৃহসম্পত্তির করযোগ্য আয় নিরূপণের জন্য পৃথক তফসিল রয়েছে। তফসিল পূরণপূর্বক মূল রিটার্নের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে।   গৃহসম্পত্তির আয়ের ক্ষেত্রে ভাড়া বাবদ বার্ষিক আয় থেকে দাবিকৃত ব্যয় বাদ দিয়ে নিট আয় নির্ণয় করতে হবে।

ব্যবসা বা পেশা খাতে আয় : এই খাতে করযোগ্য আয় নিরূপণের জন্য পৃথক তফসিল আছে। ব্যবসা বা পেশা খাতে আয় থাকলে তফসিল পূরণ করে মূল রিটার্নের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। ব্যবসা থেকে আয়ের ক্ষেত্রে মোট বিক্রয় মূল্য থেকে ব্যবসা সংক্রান্ত সব খরচ বাদ দেওয়ার পর নিট আয় নির্ণীত হবে।

লেখক : সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি), জনতা ব্যাংক লিমিটেড

এই পাতার আরো খবর
up-arrow