Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৩ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:২৭
কলকাতার চিঠি
মারজান ছাত্রশিবিরের প্রাক্তন সদস্য
সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত
মারজান ছাত্রশিবিরের প্রাক্তন সদস্য

যিনি সারা জীবন অহিংসার মন্ত্রে দীক্ষিত সেই মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর জন্মদিনে, ২০১৪ সালে কলকাতা থেকে ৭৫ কিলোমিটার দূরে খাগড়াগড়ে বাংলাদেশ ও ভারতের হিংসাশ্রয়ী সন্ত্রাসবাদীরা বোমা-বিস্ফোরক তৈরি করছিল। আর এ ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন বর্ধমান জেলার তৎকালীন পুলিশ সুপার।

পরবর্তীকালে তিনি নারদকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। তখন বাংলাদেশ প্রতিদিন কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। খাগড়াকাণ্ডের প্রত্যক্ষ নায়ক দুই বাংলার হিংসাশ্রয়ী জঙ্গিরা। তার উত্তর দিতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বার বার বলেছেন, ওরা কালীপুজোর আগে কালীপটকা বানাচ্ছিল। তা নিয়ে এত হৈচৈ করার কী দরকার। সেই সময় কলকাতার পুলিশ কমিশনার ছিলেন মমতা ব্যানার্জির একান্ত ঘনিষ্ঠ রাজীব কুমার। ধৃতদের মধ্যে একজন মহিলাও আছেন। বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদী ইউসুফের স্ত্রী আয়েশা পশ্চিমবঙ্গে জেএমবি নারী বাহিনীর প্রধান। খাগড়াগড় কাণ্ডের পর ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বিভাগ এনআইএ’র কয়েকজন অফিসার ঢাকায় যান। ঢাকারও কজন অফিসার কলকাতায় এসেছিলেন। দুই বছর গাঢাকা দিয়েও শেষ রক্ষা করতে পারল না এই জঙ্গিরা। এখন আবার তাদের জেরা করার জন্য দুই দেশের গোয়েন্দা অফিসাররা লালবাজারে আসবেন। তবে এনআইএ’র এক কর্তা বলেন, সজিদকে ধরে বিধাননগর পুলিশ তাদের হাতে তুলে দিয়েছে। কিন্তু কলকাতা পুলিশের এসটিএফ এদের গ্রেফতার করে নির্দিষ্ট মামলা দায়ের করেছে। ইউসুফ ও আবদুল কালামের বিরুদ্ধে খাগড়াগড় মামলায় চার্জশিট পেশ করেছে এনআইএ। বাকি ধৃতদের মধ্যে রফিক উত্তর-পূর্ব ভারতে জেএমবির প্রধান শাহিদুল ইসলাম ও বাংলাদেশের নাগরিক জবিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে চার্জশিট নেই। তবে তারা খাগড়াগড় মামলায় মোস্ট ওয়ান্টেড। এক গোয়েন্দা অফিসার জানিয়েছেন, এ ঘটনায় জড়িত হিসেবে ওদের ভূমিকা স্পষ্ট। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো তথ্য-প্রমাণ হাতে আসেনি। আরও এক ধৃত বাংলাদেশি নাগরিক। আনোয়ার হোসেন ফারুক ওরফে কালু ভাইয়ের সঙ্গে খাগড়াগড় বিস্ফোরণ মামলার কোনো যোগাযোগ এনআইএ পায়নি। তবে কলকাতা পুলিশের দাবি ইনামই এই রাজ্যে জেএমবির সর্বোচ্চ পদে ছিল। ফলে সে খাগড়াগড়ের ব্যাপারে কিছুই জানবে না, তা হতে পারে না। গোয়েন্দা সূত্রের খবর, জঙ্গিরা হোয়াটস অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখত। প্রযুক্তিগত কৌশলে সেসব তথ্য গোয়েন্দাদের হাতে আসে। তাতেই বাজিমাত হয়। খাগড়াগড় কাণ্ডের পর জঙ্গিরা আসাম সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ঢুকত। আসামে বন্যা হওয়ায় তারা পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত ব্যবহার করছিল। তাতেও গোয়েন্দাদের খানিকটা সুবিধা হয়ে যায়। গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, আসামের কাছাড় থেকে জাল নোটসংক্রান্ত একটি মামলায় ধরা হয় জবিরুলকে। তাকে কলকাতায় এনে দেওয়ার পরে বাকিদের সন্ধান পাওয়া যায়। এনআইএ আরও জানিয়েছে, নতুন নাম নিয়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করছিল জেএমবি। নিউ জেএমবি বাংলাদেশ নামে কাজ শুরু করেছিল নুরুল ইসলাম মারজানের সূত্রে। এই মারজান ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রাক্তন সদস্য। এই মারজান গুলশান হামলার পরিকল্পনাকারী নিহত জঙ্গি তামিম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিল। গোয়েন্দা অফিসাররা জানান, খাগড়াগড় কাণ্ডের পরপরই জেএমবির পশ্চিমবঙ্গ শাখার শীর্ষ নেতারা বাংলাদেশে চলে যান। দুই বছর তারা সেখান থেকেই কাজ করেছেন। ধৃত কওসর খাগড়াগড় বিস্ফোরণের সময় ঘটনাস্থলে ছিল। এই শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ফুট সোলজারদের সরাসরি যোগাযোগ থাকত না। বাংলাদেশে এদের এজেন্টদের মাধ্যমেই ‘জিহাদিদের’ সঙ্গে যোগাযোগ রাখত সন্ত্রাসের এই পাণ্ডারা। পারতপক্ষে এই জঙ্গি দলের সদস্যরা সেলফোন ব্যবহার করে না। যদি একান্ত করতেই হয়, তাহলে হোয়াটস অ্যাপ মারফত যোগাযোগ করত। এই ছয় সন্ত্রাসবাদী গ্রেফতার হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে পশ্চিমবঙ্গে। তবে সেই সঙ্গে একটা সংশয়ও তৈরি হয়েছে। আগামী কালীপূজা কি শান্তিতেই কাটবে? নাকি আবার কোনো গোপন জায়গায় পাকানো হচ্ছে কালীপটকার সলতে।

ঠিক দুই বছর আগে অক্টোবরেই আচমকা বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছিল বর্ধমান জেলার খাগড়াগড় গ্রামটি। বাড়িতে বোমা তৈরি করার সময় বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল কয়েকটি শরীর। সেই বিস্ফোরণের সূত্র ধরেই প্রকাশ্যে এসেছিল, বাংলাদেশের জেএমবির মদদপুষ্ট জঙ্গিরা মারাত্মক বিস্ফোরক তৈরি করছে বর্ধমানসহ এপার বাংলার কয়েকটি সীমান্তবর্তী জেলায়। খাগড়াগড় কাণ্ডের রেশ দেশ ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল আন্তর্জাতিক মহলেও। সে সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বার বার তৃণমূলের জামায়াতযোগ আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন। সে সময় তিনি বলতেন ছোট ছেলেরা কালীপুজোর পটকা ফাটাচ্ছিল, তা থেকেই আগুন লাগে। কিন্তু তিনি যে দিনের পর দিন ভাঁওতা দিচ্ছিলেন তা প্রমাণ করল তার নিজের পুলিশই।

পুজোর আগে নাশকতার ছক বানচাল করে আসাম এবং উত্তর ২৪ পরগনা থেকে ছয় কুখ্যাত জঙ্গিকে গ্রেফতার করেছে কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্স বা এসটিএফ। এদের মধ্যে তিনজন বাংলাদেশের নাগরিক, তিনজন ভারতের। পুজোর ভিড়ে কলকাতা বা তার আশপাশে বড় ধরনের হামলার চক্রান্তে লিপ্ত ছিল তারা। এরা জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের শীর্ষ নেতা। এদের মধ্যে মাওলানা ইউসুফ ওরফে বক্কর ছিল মোস্ট ওয়ান্টেড। তার এবং রুবেল নামে অন্য এক জঙ্গির মাথার দাম ছিল ১০ লাখ টাকা। ইউসুফ একটি মাদ্রাসা চালাত। শিক্ষকের ছদ্মবেশে সে খাগড়াগড় মডিউল পরিচালনা করত বলে পুলিশের কাছে খবর।

ধৃতদের ব্যাঙ্কশাল আদালতে তোলা হয়েছে। কলকাতা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার বিশাল গর্গ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এদের সঙ্গে খাগড়াগড় কাণ্ডের যোগসাজশের প্রমাণ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এদের খোঁজা হচ্ছিল। আসাম থেকে ধৃত শাহিদুল নামক জঙ্গি প্রথমে ধরা পড়ে। তাকে জেরা করে বাকিদের খোঁজ পাওয়া যায়। পুলিশের অনুমান এরা একই মডিউলের সঙ্গে যুক্ত। কলকাতায় নাশকতার পাশাপাশি এরা দক্ষিণ ভারতেও হামলা করার ছক কষছিল। জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ’র গোয়েন্দারা এদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে লালবাজারে যাচ্ছেন। জানা গেছে, এই ছয়জনের মধ্যে দুজন ছিল ভারতীয় গোয়েন্দাদের কাছে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’।

যুগ্ম কমিশনার জানান, এদের কাছ থেকে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম-সংক্রান্ত বই, মোবাইল ফোন সেট, ল্যাপটপ, তার, পাউডার জাতীয় বিস্ফোরক, ডেটোনেটর, জেএমবির শীর্ষ নেতাদের নামের তালিকা, আট জিবি মেমরি কার্ড, বোমা তৈরির কলাকৌশল শেখানোর বই ও বাংলায় লেখা কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজ পাওয়া গেছে। তার থেকে প্রমাণ হয় যে, এরা রাজ্যে বড়সড় বিস্ফোরণ ঘটানোর তালে ছিল। জানা গেছে, এদের মধ্যে জাহিদুল ইসলাম নামে এক জঙ্গিকে আসামের কাছাড় থেকে গ্রেফতার করা হয়। বাকিদের গ্রেফতার করা হয়েছে বনগাঁ ও বসিরহাট থেকে। ধৃতদের মধ্যে আছে ভারতীয় গোয়েন্দাদের কাছে মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গি আইইডি জাতীয় বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ মহম্মদ রুবেল। সে আদতে বাংলাদেশের বাসিন্দা। আসামের বড়পেটার বাসিন্দা আবদুল কালামেরও বিস্ফোরক বানানোর ব্যাপারে বিশেষ দক্ষতা ছিল। অন্য তিন জঙ্গির মধ্যে মাওলানা ইউসুফ ও আনোয়ার হোসেন বাংলাদেশের বাসিন্দা। শাহিদুল ইসলাম নামে অন্য এক জঙ্গি আসামের বড়পেটার বাসিন্দা। শাহিদুলের কাজ ছিল বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে জঙ্গিদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা। ধৃত ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনই খাগড়াগড় কাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে প্রমাণ পেয়েছে এসটিএফ। ধৃত এক জঙ্গির কাছে বাংলাদেশের ট্রেড লাইসেন্স পাওয়া গেছে। কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এদের জেরা করে আইসিস যোগ আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

     লেখক : ভারতীয় প্রবীণ সাংবাদিক।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow