Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৩ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:২৮
ইলিশ রাজপুত্তুরের সাতকাহন
সাইফুর রহমান
ইলিশ রাজপুত্তুরের সাতকাহন

তখন বোধ করি সকাল ৯টাও বাজেনি। এমন সময় আমার স্ত্রী আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলল— এই শুনছ! ওঠো, দেখ কী এনেছি।

আমার স্ত্রী খুব ভালো করেই জানে সকালের এ ঘুমটুকুই আমাকে সারা দিনের শক্তি জোগায়। আমি রাতের অনেকটা সময় পর্যন্ত পড়ি। লেখালেখি করি। লেখালেখিটা হয় যৎসামান্যই বলা চলে। ওটা রাত জাগার একটা অজুহাত মাত্র। বই পড়াই হয় বেশি। কোনো প্রয়োজনে পড়ি না, মনের আনন্দের জন্য পড়ি। ছেলেবেলা থেকে এই পরিণত বয়স পর্যন্ত কোনো নেশাই বেশি দিন টেকেনি শুধু রাত জেগে বই পড়ার নেশাই সিন্দবাদের ভূতের মতো ঘাড়ে চেপে বসে আছে এখনো। সে যাক, আমি অর্ধনিমীলিত চোখে বললাম, এই সাত-সকালে এত চেঁচাচ্ছ কেন? সাত রাজার ধনভাণ্ডারের সন্ধান পেলে নাকি। নাকি দেশে গণতন্ত্র ফিরে এসেছে হঠাৎ। আমার চিকিৎসক স্ত্রী আমার শরীরে ধাক্কা দিয়ে বলল, আরে ভালো করে চোখ মেলে আগে দেখই না। আমি বিছানা থেকে চোখ খুলতেই দেখলাম অ্যালুমিনিয়ামের বড় একটি থালার ওপর দুই জোড়া ইলিশ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমার স্ত্রী। কী আর বলব, ইলিশের সে কী সৌন্দর্য! মাছের শরীর থেকে চকচকে রুপালি আলো যেন ঠিকরে বেরোচ্ছিল। রুপালি শরীরের ওপর হালকা গোলাপি আভা। এ যেন সত্যি কোনো ঐশ্বরিক রূপ দেখছি আমি। চোখ তো নয়, যেন প্রতিটি মাছের মাথার ওপর এক জোড়া করে স্বচ্ছ নীল হীরা বসিয়ে দিয়েছে কেউ, চোখের চারপাশে রক্তিম লাল রঙের বৃত্ত। আমি লাফিয়ে বিছানায় উঠে বসলাম। বউকে উদ্দেশ করে বললাম, বেশ সরস জিনিস এনেছ তো। আমি মাছগুলোর ওপর আঙ্গুল চেপে দেখলাম, না, আঙ্গুলগুলো দেবে যাচ্ছে না। তার মানে মাছগুলো এখনো টাটকা ও সতেজ আছে বলতে হয়। আমি বললাম, তা এগুলো পেলে কোথায়। আমার স্ত্রী বলল, পাব আবার কোথায়, ফেরিওয়ালা নিয়ে এসেছে এগুলো। এই ফেরিওয়ালাগুলো আজকাল বেনিয়ার জাতকেও হার মানিয়েছে বলতে হয়। তাদের পণ্যগুলো নিয়ে হাজির হয় একেবারে মোক্ষম সময়ে। সকালে বাড়ির কর্তাদের বাজারে যাওয়ার আগেই এরা এসে হাজির হয় খদ্দেরের দোরগোড়ায়। ফেরিওয়ালাদের ব্যবসাজ্ঞান কিংবা সময়জ্ঞান যাই বলি না কেন সভ্যতার একেবারে শুরু থেকেই কিন্তু বেশ টনটনে। ১৩০০ শতাব্দীতে মাস্টারড বা কাসুন্দির ফেরিওয়ালাগুলো ঠিক রাতে লোকেরা খেতে বসার আগে প্যারিসের রাস্তায় রাস্তায়, অলিগলিতে মাস্টারড্ সস্, গার্লিক সস্ বলে চিৎকার করে ছুটে বেড়াত। সেই ডাক শুনে ঘরের মহিলারা জানালা খুলে মাংসের সঙ্গে মেখে খাবার জন্য পছন্দমতো কাসুন্দ সস্ কিংবা রসুনের সস্ কিনতেন। শুধু ফরাসি ফেরিওয়ালা হবে কেন, এই তো পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে যখন আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা এত ভালো ছিল না বলে শহরাঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষ সারা দিন খেটে বিকালে যেটুকু মজুরি পেত তাই দিয়ে চাল, ডাল, মাছ কিনে বাড়ি ফিরত। সেজন্য প্রায়ই দেখা যেত পুরান ঢাকা কিংবা কলকাতায় তপসে মাছ ফেরিওয়ালাদের, যারা সন্ধ্যাবেলায় মহিলাদের উনুনে আঁচ দেওয়ার সময়— ‘চাই তপসে মাছ’ বলে অলিগলিতে হেঁকে বেড়াত। এবার ইলিশ প্রসঙ্গে কিছু কথা বলা যাক। দ্বাদশ শতকে অর্থাৎ এখন থেকে প্রায় ৯০০ বছর আগে পণ্ডিত জীমূত বাহন এই মাছের নাম সর্বপ্রথম ইলিশ বলে উল্লেখ করেছেন। শুধু তাই নয়, বারো শতকে সর্বানন্দের ‘টীকাসর্বস্ব’ গ্রন্থেও পরিষ্কারভাবে ‘ইল্লিষ’ শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায়। কবি ভারতচন্দ্রের (১৭১২-১৭৬০) লেখায় ‘পাঙ্গাস ইলিশ’ বলে একটি শব্দ পাওয়া যায়। ১৮২২ সালে হ্যামিল্টন বুকানোন নামে এক ইংরেজ সাহেব বঙ্গোপসাগরের মাছ নিয়ে গবেষণার সময় ইলিশ শব্দটির আগে হিলস্া শব্দটি জুড়ে দেন। হিলস্া এবং ইলিশ একসঙ্গে হয়ে যায় ইলিশা। ইলীশ- ‘ইল’ মানে হলো ‘জলের মধ্যে’ আর ঈশ মানে ঈশ্বর, শাসক, প্রভু কিংবা রাজা। ইল+ঈশ=ইলীশ। অর্থাৎ এই শব্দের মানে দাঁড়ালো, যে জলের মধ্যে রাজা সেই ইলীশ। আজকাল ‘ইলিশ’ এই বানানে লেখা হয়। কিন্তু ব্যুত্পত্তি সম্মত বানান হওয়া উচিত ‘ইলীশ’। প্রাচীন কাল থেকেই বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে ইলিশ মাছ যে খুবই জনপ্রিয় সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ ১৫শ শতকের কবি বিজয় গুপ্তের মনসামঙ্গল কাব্যে দক্ষিণ সাগর কলা দিয়ে ইলিশ মাছের অপূর্ব ঝোলের কথা বলা হয়েছে- আনিয়া ইলিশ মৎস্য/করিল ফালাফালা/তাহা দিয়া রান্ধে ব্যঞ্জন/দক্ষিণ সাগর কলা। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সমস্ত মৎস্যকুলের মধ্যে ইলিশই হচ্ছে একমাত্র মাছ যার জীবন সত্যিই রহস্যে ঘেরা। যেমন- ইলিশের ঝাঁক নদীর উপরি ভাগ দিয়ে চলাচল না করে কেন ওরা নদীর ৩০-৪০ ফুট নিচ দিয়ে যাতায়াত করে। বর্ষা মৌসুমে ইলিশ না হয় ডিম পাড়ার প্রয়োজনে মিষ্টি জলের নদীতে চলে আসে। কিন্তু গ্রীষ্ম এবং শীতে ইলিশ মাছদের নদীতে চলে আসার কারণ কি? কেন পূর্ণিমা রাতে ইলিশ মাছ নদীর একেবারে উপরে চলে আসে। কিংবা অমাবস্যায় দিনের বেলায় কেন ইলিশ ধরা পড়ে বেশি, ইত্যাদি। এসব প্রশ্নের উত্তর আমি এক এক করে দেওয়ার চেষ্টা করব এই নিবন্ধে। সমুদ্র থেকে ইলিশ নদীর যত উজানে যেতে থাকে ততই তার শরীর থেকে ঝরতে থাকে আয়োডিন, লবণ ইত্যাদি সমুদ্র জাত খনিজ। এই মাছগুলো যত বেশি মিষ্টি পানিতে থাকবে ততই তার স্বাদ যাবে বেড়ে। তাই মোহনায় ধরা ইলিশের চেয়ে নদীর ইলিশ খেতে ভালো। অনুকূল ও প্রতিকূল পরিবেশ ও খাদ্যের তারতম্যের জন্যও এই মাছের স্বাদ পাল্টে যায়। একই কারণে বরফের ইলিশেও এই স্বাদের কিছু কমতি লক্ষ্য করা যায়। ইলিশের স্বাদ সম্পর্কে বোধকরি সঠিক কথাটি বলেছেন সাহিত্যিক রামলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। তার রম্যনাটক কষ্টিপাথর (১৮৯৭)- এ দেখা যায় নাটকের নায়ক নবীন বাবু এক টাকায় একজোড়া ইলিশ কিনে লোকদের বলছেন, “রাজপুত্তুর মশাই রাজপুত্তুর। কি যে গড়ন, যেন ননীর চাপ থেকে কেটে তুলেছে। ” এই যে ননী বা তেল এটাই কিন্তু ইলিশের স্বর্গীয় স্বাদের প্রকৃত কারণ। কিন্তু একটি বিষয় এখানে লক্ষণীয় যে, বর্তমান সময়ে ইলিশ মাছে কিন্তু আর আগের মতো তেল কিংবা গন্ধ দুটোর একটিও তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। পণ্ডিত প্রবর সাহিত্যিক রাধাপ্রসাদ গুপ্ত তাঁর ‘মাছ ও বাঙালি’ গ্রন্থে লিখেছেন- একটি সময় ছিল যখন এক বাড়িতে ইলিশ মাছ ভাজা হলে প্রায় আধ মাইল দূর থেকেও নাকি সে মাছ ভাজার গন্ধ পাওয়া যেত। তাই যে কোনো বর্ষার দিনে অত্র অঞ্চলটি হয়ে উঠতো যেন এক মৎস্যগন্ধা নারী। কলকাতার ভোজনরসিক বাঙালি বাবুরা নাকি ইলিশ খেয়ে বলতে পারতেন মাছটি কোন ঘাটের কোলাঘাট, বাবুঘাটের বা বাগবাজারের গঙ্গার ঘাটের, নাকি পদ্মা নদীর ইলিশ। আমি নিজেও বরিশালের বেশকিছু জেলেকে জিজ্ঞেস করে জেনেছি তাদের মধ্যেও নাকি এমন অনেক দক্ষ জেলে রয়েছে যারা যে কোনো ইলিশ মাছ দেখেই বলে দিতে পারেন এটা কোনো নদী থেকে ধৃত- তেঁতুলিয়া, মেঘনা নাকি পদ্মা। দিগেন বর্মন তার ‘ইলিশ পুরাণ’ গ্রন্থে লিখেছেন- সে অনেক দিন আগের কথা। তখন নাকি এক জেলে তাকে বলেছিল- “বুঝলেন নাকি দাদা পদ্মা নদীর ইলিশের এতো তেল হইতো যে, ইলিশ মাছ রান্না হওনের পর হাতা দিয়া সেই তেল ফালাইয়া দেওয়া হইতো। ” বরিশাল অঞ্চলের মানুষ এক সময় ইলিশের তেল দিয়ে হামাই ধানের ফুলেকা মুড়ি ভাজা মাছের সঙ্গে খেতো। ইলিশের তেল দিয়ে সেই মুড়ি ভাজা নাকি অমৃত। বিশিষ্ট লেখক আব্দুল জব্বার তাঁর ‘বাংলার জীবন ও জীবিকা’ গ্রন্থে লিখেছেন- তাঁর নানী-দাদীদের তিনি বলতে শুনেছেন- ইলিশ আনলে তার গন্ধে এক সপ্তাহ আর গেলাস— ঘটিতে পানি খাওয়া যেতো না। বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ একবার বলেছিলেন- “ঢাকা থেকে বন্ধুর পাঠানো ইলিশ খেয়ে কলম যেন আর ঠিক মতো ধরতেই পারছি না। ইমপোর্টেড পদ্মার ইলিশের তেলে কলম শুধু পিছলে যাচ্ছে বারবার। ” এখন প্রশ্ন হচ্ছে ইলিশের সেই তেল ও গন্ধ হঠাৎ করেই কেন এমন উবে গেল। আমার মতে নদীর পাশ ঘেঁষে নির্মিত কল-কারখানাগুলো থেকে প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ বর্জ্য গিয়ে পড়ছে নদীতে। আর নদীর মাছগুলো এসব ভক্ষণ করছে। আর তাতেই মাছের গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে খুব দ্রুত। বর্ষা ঋতুতে সাধারণত যখন নদীতে পানির প্রবাহ অনেক বেশি হয়। তখন ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ মাছ ঢুকে পড়ে নদীতে। তবে সব নদীতে নয়। নদীঘাত অন্তত ৪০ ফুট গভীর হতে হয়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো মাছগুলো নদীর ৩০-৪০ হাত নিচে থাকলেও কীভাবে যেন ওরা ঠিক ঠিক টের পেয়ে যায় যে বর্ষাকাল এসেছে। এখন ডিম ছাড়তে যেতে হবে নদীতে। শুধু কি তাই। বর্ষার পাড়ভাঙা ধোয়া পানি যখন সমুদ্রে এসে পড়ে তখন সেই জলের মাটির দোষগুণ বিচার করে তারপর ওরা নদীতে ঢোকে। আবার নদীর পানির এমন জায়গায় ডিম পাড়ে যাতে জোয়ার-ভাটায় ডিমগুলো ধুয়ে না যায়। আল্লাহর জীব, আল্লাহই ওদের এরকম বোধ দিয়েছে। ইলিশ সাধারণত শ্রোতের প্রতিকূলে ৬০ মাইল বেগে ছুটতে পারে। ফারাক্কা বাঁধ তৈরি হওয়ার আগে ইলিশের ঝাঁকগুলো নাকি সাঁতরে এলাহাবাদ, আগ্রা, দিল্লি পর্যন্ত চলে যেত। প্রখ্যাত লেখক হুমায়ূন আহমেদ পদ্মার ইলিশ চেনার একটি মোক্ষম উপায় বােল দিয়েছেন আমাদের। ইলিশ রান্নার একটি বইয়ের ভূমিকা লিখতে গিয়ে সেখানে তিনি লিখেছেন- ইলিশ দ্রুত বেগে ছুটতে গিয়ে পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর উপর নির্মিত হার্ডিঞ্জ ব্রিজের স্প্যানে ধাক্কা খেয়ে ওদের নাক বোঁচা হয়ে যায়। আর নাক ভাঙা সেই ইলিশগুলোই নাকি আসল পদ্মার ইলিশ। ইলিশের প্রতিটি ঝাঁকে কম করে হলেও এক-দুই লাখ মাছ থাকে। অনেক সময় আরো বেশিও থাকতে পারে। এখন তো ইলিশের খরা চলছে। কিন্তু দশ-বিশ বছর আগেও ইলিশের ঝাঁকে হাত বোমা ফাটিয়ে কিংবা বিকট শব্দ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে তারপর তাদের ধরা হতো। আর তা না হলে ট্রলার ও নৌকা উল্টে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকতো। এক এক লটে উঠে আসতো বিশ-পঁচিশ টন ইলিশ। সাধারণত গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ও প্রবল বাতাস প্রবাহে ইলিশ ধরা পড়ে বেশি। এছাড়াও পূর্ণিমা রাতে ও অমাবস্যায় দিনের বেলায় প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ে। কবি সতেন্দ্রনাথ দত্ত ১৯১৫ সালে একটি কবিতা লিখেছিলেন- হালকা হাওয়ায় মেঘের ছাওয়ায়/ইলশে গুঁড়ির নাচ/ইলশে গুঁড়ির নাচন দেখে/নাচছে ইলিশ মাছ। এই ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি নামটা কিন্তু এমনি এমনি হয়নি। অতি সামান্য ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যে নদীর পানির সঙ্গে মিশে থাকা ইলিশের একমাত্র খাদ্য ফাইটো প্লাঙ্কটন (সবুজ শ্যাওলা জাতীয় উদ্ভিদ) পানির উপরের স্তরে ভেসে ওঠে। আর সেগুলো খেতে ইলিশের ঝাঁকও উঠে আসে নদীর উপরে। পদ্মার ইলিশের স্বাদ অতুলনীয় হওয়ার মুখ্য কারণটিই হচ্ছে, বর্ষা-মৌসুমে এই সবুজ শ্যাওলা জাতীয় উদ্ভিদ পদ্মা নদীতে পাওয়া যায় সবচেয়ে বেশি। পদ্মায় সাধারণত তিন রকম ইলিশ পাওয়া যায়। পদ্ম ইলিশ, চন্দনা ইলিশ আর গুর্তা ইলিশ। পদ্ম ইলিশের দেহ চকচকে রুপোলি এবং পিঠের দিকে সবুজ আভা। পদ্ম ইলিশের মধ্যে মেয়েরা পুরুষের চেয়ে আকারে একটু বড়। চন্দনা ইলিশের দেহে রুপোলি হলেও পিঠে কালো, হলুদ ও কমলা রঙের ছটা থাকে। এদের প্রকৃত আবাস সমুদ্রে, তবে নদী মোহনায় এদের কখনো কখনো পাওয়া যায়। কারণ বর্ষাকালে এরা মাঝে মাঝে নদীতে বেড়াতে আসে। আকারে এরা পদ্ম ইলিশের চেয়েও ছোট। ‘গুর্তা ইলিশ’ মূলত এরা উপকূলীয় সাগর এবং সাগর মোহনায় বাস করে। নদীর মোহনা থেকে সাত-আট কিলোমিটারের মধ্যেই এদের চলাফেরা করতে দেখা যায়। বিশেষজ্ঞদের কাছে চন্দনা ও গুর্তা ইলিশের জীবনযাত্রা এখনো রহস্যজনক। সপ্তাহখানেক আগে আমার ঢাকা কলেজের ৯৩ এর ব্যাচের বেশ কিছু বন্ধু বিশেষ করে যুগান্তর পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার মোজাম্মেল হক চঞ্চলের নেতৃত্বে হৈহৈ করে সোয়ারী ঘাটে গিয়েছিল ইলিশ কিনতে। কিন্তু ফিরে এলো বিফল মনোরথে। কারণ সতীর্থ বন্ধুদের মুখে ইলিশের যে দর শুনে তারা গিয়েছিল বাস্তবে গিয়ে দেখা গেল ইলিশের দাম তার চেয়েও অনেক চড়া। বর্ষা মৌসুমে প্রতিদিন নদী থেকে বিপুল পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়লেও একদল সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের জন্য প্রতিনিয়তই ইলিশের দাম ওঠা-নামা করে। পাঁচ-সাত দিন আগে একটি টিভি চ্যানেলে দেখলাম বরিশালের পাথরঘাটা নামক ইলিশের অন্যতম বড় আড়তের নিয়ন্ত্রণ করছে পিতা ও পুত্র। আর এই সিন্ডিকেট চক্রের জন্যই নাকি ইলিশের প্রকৃত মূল্য পাচ্ছে না গরিব মৎস্যজীবীরা। এ প্রসঙ্গে আমার লন্ডনে মৎস্য সিন্ডিকেটের ইতিহাসটি মনে পড়ে গেল। যা আমি পড়েছিলাম বেশ কয়েক বছর আগে। অন্যান্য আরো বহু সমবায় সমিতির মতো মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির ইতিহাসও অতি প্রাচীন। ১২৭২ খিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে রাজা প্রথম অ্যাডওয়ার্ডের রাজত্বকালে একটি রাজকীয় সনদের মাধ্যমে লন্ডন শহরে প্রথম মৎস্য ব্যবসায়ীদের সমিতি করার অনুমতি প্রদান করা হয়। অ্যাডওয়ার্ডের উদ্দেশ্য ছিল মহৎ। তিনি আইন করে দিয়েছিলেন যে মৎস্য ব্যবসায়ীরা এক শিলিং-এ এক পেনির বেশি মুনাফা করতে পারবে না। সেই সঙ্গে বিদেশি কোনো ব্যবসায়ীকেও অংশীদার হিসেবে নিতে পারবে না মৎস্য ব্যবসায়ীরা। কিন্তু মৎস্যজীবী সমিতি আসলে সমিতির অন্তরালে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাছের ব্যবসায় একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার শুরু করে দেয়। এক সময় এই সিন্ডিকেট সদস্যরা এতটা বিত্তশালী ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে তাদের কেউ কেউ প্রচুর অর্থ খরচ করে বিভিন্ন শহরের মেয়র নির্বাচিত হয়ে যায় এবং আরও বেশি করে ক্ষমতা খাটাতে থাকে।   আর এ কারণে দ্বিতীয় অ্যাডওয়ার্ড ক্ষমতায় এসেই পার্লামেন্টে আইন প্রণয়ন করেন যে, মাছ ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত কেউই আর মেয়র হতে পারবে না। ইংল্যান্ডে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ছিল সেই আট-ন’শ বছর আগে। অথচ আমাদের দেশে তথ্যপ্রযুক্তির এই একবিংশ শতকেও সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের জন্য বঞ্চিত হচ্ছে, মেহনতি গরিব মৎস্যজীবীরা।   পাঠকদের একটি বিস্ময়কর তথ্য জানিয়ে আজকের মতো এই লেখাটি শেষ করছি। বিগত বেশ কিছু বছর ধরে ইলিশ মাছের উপর গবেষণা করছেন দিগেন বর্মন নামে এক মৎস্য অনুরাগী। তিনি বঙ্গোপসাগর ও দিঘাতে বেশ কয়েক বছর ধরে ইলিশ মাছ ধরছেন, এমন কয়েকজন জেলের সঙ্গে কথা বলে অবাক হয়েছেন, যখন তারা তাকে বলেছে- “এবার আমরা সমুদ্রে অনেক ছোট ছোট ইলিশ মাছ ধরেছি। যা আমরা বিগত ২০ বছরের মধ্যে কখনো দেখিনি। কেন জানি না আমাদের মনে হচ্ছে, সমুদ্রেও ইলিশ মাছের ডিম ফুটে বাচ্চা হচ্ছে। তাদের কাছ থেকে আরও একটি কথা শুনে অবাক হলাম- সমুদ্রের বেশ কিছু অঞ্চলে তারা নাকি নোনাজল পাননি। তাদের ধারণা, যে অঞ্চলের সমুদ্রের পানি নোনা নয়, সেই সেই অঞ্চলেই তারা ছোট ছোট বাচ্চা ইলিশ দেখেছেন। মাছ শিকারিদের আরও ধারণা, এই সব অঞ্চলেই মনে হয় ইলিশের ডিম ফুটে বাচ্চা হচ্ছে। ”

     লেখক : গল্পকার ও সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী।

     ই-মেইল :  barristershaifur@yahoo.com

এই পাতার আরো খবর
up-arrow