Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৫ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:০৫
সত্য বললে বিপদ
তসলিমা নাসরিন
সত্য বললে বিপদ

সৈয়দ শামসুল হক মারা যাওয়ার পর আমি ফেসবুকে লিখেছিলাম,— “সৈয়দ শামসুল হক মারা গেছেন ৮১ বছর বয়সে। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত মান, সম্মান, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, প্রচার, জনপ্রিয়তা, সরকারি-বেসরকারি পুরস্কার— সবই পেয়েছেন তিনি।

একজন লেখকের যা যা কাঙ্ক্ষিত থাকতে পারে, তা পাওয়া হয়ে গেলে তাঁকে সফল বা সার্থক লেখকই বলা যায়। সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে আটের দশকের শেষদিকে ভালো যোগাযোগ ছিল আমার। মাঝে মধ্যে ময়মনসিংহে গেলে আমার সঙ্গে দেখা করতেন। একবার আমার সাহিত্য সংগঠন ‘সকাল কবিতা পরিষদ’-এর অনুষ্ঠানে তাঁকে বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। তিনি গিয়েছিলেন। ভালো বক্তৃতা করেছিলেন। সেসময় আমার সাহিত্যচর্চার বেশ খবর নিতেন তিনি। আমার লেখা কবিতাগুলো মন দিয়ে পড়তেন, মন্তব্য করতেন। তিরিশ বছরের বড় ছিলেন, আমাকে কন্যার মতো স্নেহ করেন বলতেন।

‘খেলারাম খেলে যা’র বিখ্যাত লেখকের সঙ্গে একসময় যোগাযোগ সম্পূর্ণই বন্ধ করে দিই। সে অনেক গল্প। ‘ক’ বইটিতে সেইসব ভালো-মন্দের স্মৃতি অনেকটাই আছে।

আজ তিনি চলে গেলেন, কাল আমরা যাবো। জীবনের এই তো নিয়ম। এক এক করে আমাদের সবাইকে যেতে হবে। আমাদের মধ্যে ক’জন আশি পার করে যেতে পারবো সেটাই প্রশ্ন। এখন যে জরুরি বিষয়টি আমি জানতে ইচ্ছুক সেটি হলো, তিনি যে ঢাকা হাইকোর্টকে দিয়ে ‘ক’ বইটিকে নিষিদ্ধ করিয়েছিলেন, সেটির কী হবে? বারো বছর পার হয়ে গেছে, এখনও কি বইটি নিষিদ্ধ রয়ে যাবে? নাকি বাদীর অনুপস্থিতিতে বইটি এখন মুক্তির স্বাদ পেতে পারে! ‘ক’ বইটি লিখেছি বলে সৈয়দ হক ১০০ কোটি টাকার মামলা করেছিলেন আমার বিরুদ্ধে। এই মামলাই বা কী অবস্থায় আছে কে জানে । এটির কোনও শুনানি হয়েছে বলে শুনিনি। তিনি কি পাওয়ার অব এটর্নি দিয়ে গেছেন কাউকে? যদি দিয়ে থাকেন, তাহলে পাওয়ার অব এটর্নি কি মামলা চালিয়ে যাবেন, এবং বইটি নিষিদ্ধ রাখার ব্যবস্থা করবেন?

মত প্রকাশের অধিকারের পক্ষে গত তিন দশক লড়ছি। মনে হচ্ছে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত লড়তে হবে। ”

আমার ওই লেখাটি পড়ে অনেকে বেশ রুষ্ট হয়েছে। তারা মনে করছে সৈয়দ হকের আত্মার শান্তি আমি ঘটতে দিচ্ছি না। বলেছে, ‘এখনই কি এসব বলার খুব দরকার ছিল? আর সময় পেলে না?’ আসলে আমি ঠিক বুঝি না কোন সময়টাকে সত্য বলার জন্য উপযুক্ত সময় বলে ধরা হয়। আমি মনে করি না, অপ্রিয় সত্য বলার জন্য কোনও সময়কে কেউ উপযুক্ত সময় বলে মনে করে। যারা অপ্রিয় সত্য কথা শুনতে পছন্দ করে না, তাদের কাছে কোনও সময়ই উপযুক্ত নয়, এবং অধিকাংশ মানুষই অপ্রিয় সত্য কথা শুনতে পছন্দ করে না। শুধু মৃত্যুর পরই কেন, জীবিত থাকাকালীন বললেও সকলে রুষ্ট হয়।

 

 

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বেলাতেও লক্ষ করেছি একই ঘটনা। তিনি অনেক ভালো কবি, ভালো লেখক, ভালো মানুষ— এটুকু বললে ঠিক আছে। কিন্তু যেই না বলেছি উনি অনেক মেয়েকে এক্সপ্লয়েট করেছেন। অমনি সকলে রুষ্ট হলো। কেন, এই কথা এখন কেন? যেন এ কথা বলার জন্যে এ সঠিক সময় নয়। আমি মনে করি যে কোনও সময়ই, সত্য কথা সে প্রিয় হোক অপ্রিয় হোক, বলার জন্য উপযুক্ত এবং সঠিক সময়। কিন্তু আমি মনে করলে কী লাভ। পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষই তা মনে করে না।

সত্য কথা বললে যে বিপদ বাঁধে, তা আমার চেয়ে বেশি কেউ জানে না হয়তো। যাদের কুপিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে, তারা বিপদ ভালো করে বোঝার আগেই মরে গেছে। আর যাদের ঘাড়ে এখনও কোপ পড়েনি, তারা বছরের পর বছর প্রতিদিনই অদৃশ্য কোপ খাচ্ছে, রক্তাক্ত হচ্ছে। যেমন আমি। আত্মজীবনী লিখতে গিয়ে আমার আশেপাশের মানুষের কথা বলেছি, কিছু বিখ্যাত মানুষও ছিল পথচলায়। অখ্যাত মানুষের ভালো মন্দ নিয়ে লিখেছি, ওতে অসুবিধে নেই কারওর। যেই না বিখ্যাত মানুষের ভালো মন্দ নিয়ে লিখেছি, অমনি গোল বাঁধলো। বিখ্যাত মানুষের শুধু ভালোটাই বলা যাবে, মন্দটা নয়, মন্দটা গোপন করে যেতে হবে।

বিখ্যাত মানুষ সম্পর্কে তাঁদের জীবিত থাকাকালীনও বললে দোষ, মরলেও বলা দোষ। আমি কিন্তু এককালে বিখ্যাত ছিলাম, এখনও সামান্য আছি। আমার সম্পর্কে সেই কতকাল যাবৎ যে নোংরা আর মিথ্যে কথা বলা হচ্ছে লেখা হচ্ছে, কতকাল যাবৎ করা হচ্ছে অবিরাম নিন্দে— তা নিয়ে অবশ্য কারওর আপত্তি কখনও ছিল না, এখনও নেই। বিখ্যাত মানুষগুলো পুরুষ বলেই আপত্তি।

বিখ্যাত পুরুষদের এই সুবিধে, তাঁদের সাত খুন মাফ। কেন আমাদের সমাজে বিখ্যাত পুরুষের মুখোশ খোলার রেওয়াজ নেই? এরা যাকে একবার বড় মানে, তাকে বড়ই মানে। ঈশ্বর ভক্তি বেশি যে সমাজে, সেখানেই ভক্তি চর্চার প্রকোপ, মানুষকেও অবচেতনে ঈশ্বর বানিয়ে ফেলে।

সত্য কথা বললে নিন্দে শুনতে হয়, একঘরে হতে হয়, দুর্নাম রটে, জনপ্রিয়তা নষ্ট হয়, বই বিক্রি কমে যায়— এসব জেনেও সত্য বলি। যতদিন বেঁচে আছি বলবো।

অধিকাংশ পুরুষেরা পলিটিশিয়ান হলে যা করে, গায়ক নায়ক লেখক শিল্পী হলেও অনেকটা তাই করে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে। কিন্তু এসব নিয়ে মুখ খুলতে সকলেই নারাজ। পুরুষের যা ইচ্ছে তাই করার অধিকার আছে, কিন্তু এ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার অধিকার কোনও মেয়ে মানুষের নেই।

নারী পুরুষ উভয়ে জোর গলায় বলে আমরা সুনীল ভক্ত, আমরা আজাদ ভক্ত, আমরা ছফা ভক্ত, আমরা হক ভক্ত। এতে ভক্তদের কোনও দুর্নাম হয় না। কিন্তু আমি লক্ষ করেছি, আমার ওপর অন্যায় আচরণ করা হলে কেউ যদি সেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, কেউ যদি ডিফেন্ড করে আমাকে, তাহলে তাকে গালাগালি করা হয়, বলা হয় সে আমার ‘অন্ধ ভক্ত’। ভক্ত হওয়া বা অন্ধ ভক্ত হওয়া যে মোটেও ভালো কাজ নয়, আমার দোষগুলো যে তুলে ধরা উচিত, তা বারবার করে বলে দেওয়া হয়। তারাই বলে যারা কোনও পুরুষ-লেখকের অন্ধ ভক্ত হিসেবে পরিচয় দিতে কোনও গ্লানি বোধ করে না, বরং ভালোবাসে। পুরুষ লেখকের ভক্ত হওয়া সম্মানের কাজ আর নারী লেখকের ভক্ত হওয়া অসম্মানের কাজ— এটাই মূল কথা। অনেক পাঠক পাঠিকা যারা আমার লেখা খুব পছন্দ করে, তারাও জনসমক্ষে বলতে সাহস পায় না তারা আমার লেখা পছন্দ করে। অপদস্থ হওয়ার ভয়ে চেপে যেতে হয় সত্যটা।

যে সমাজ সত্যকে আড়াল করে, সত্যকে সহ্য করে না, সে সমাজ মিথ্যের আবর্জনার ওপর খুব শক্ত পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে মিথ্যে থেকে তুলে এনে সুস্থ এবং মুক্ত পরিবেশে রাখা সহজ নয়। কিন্তু এটুকুই আশা, কঠিন কাজ তো সংখ্যায় অল্প হলেও কেউ কেউ করে।

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা

এই পাতার আরো খবর
up-arrow