Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ১৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৩ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:০৩
সভ্যতার সংকট যখন মন এবং মস্তিষ্কে!
গোলাম মাওলা রনি
সভ্যতার সংকট যখন মন এবং মস্তিষ্কে!

মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমীর কিছু নীতিবাক্য পড়তে গিয়ে আজকের নিবন্ধের শিরোনামের কথা মনে হলো। পারস্যের এ মহান কবি মানব সভ্যতার ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করেছেন তার মসনবী নামক গ্রন্থের জন্য। তাকে বলা হয় আধ্যাত্মিক জগতের সম্রাট। মানব মন, মানব মস্তিষ্ক এবং মানব প্রেমের সর্বোত্তম ব্যবহার করে কিরূপে স্রষ্টা এবং সৃষ্টির সর্বোত্কৃষ্ট ভালোবাসা,  শ্রদ্ধা এবং স্নেহ-মায়া-মমতা অর্জন করা যায় তা মাওলানা রুমী কেবল তার লেখনীর মাধ্যমে নয়, নিজের ব্যক্তিগত জীবনাচরণের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে প্রমাণ রেখে গেছেন। তার জীবনকাল অর্থাৎ ১২০৭ সাল থেকে ১২৭৩ সালের মধ্যবর্তী সময়টুকু নানা কারণে তৎকালীন দুনিয়া উত্তাল হয়ে পড়েছিল। তার জন্মভূমি পারস্য এবং পার্শ্ববর্তী তুর্য, তাজিক, পশতুন এবং মধ্য এশিয়ায় তখন ইতিহাসের নৃশংসতম জ্বালাও-পোড়াও, মারামারি-কাটাকাটি, খুন-জখম এবং উচ্ছেদের মতো অমানবিক ঘটনা ঘটে চলছিল।

মাওলানা রুমীর জীবৎকালের প্রায় সমসাময়িক ছিলেন কুখ্যাত মোঙ্গল নেতা হালাকু খান। তিনি জন্মেছিলেন ১২১৮ সালে এবং মারা গেছেন ১২৬৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। তার হাতে পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ দুটি সাম্রাজ্যের পতন হয় এবং প্রায় পঞ্চাশ লাখ লোকের রক্তে মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া এবং পারস্যের বিশাল অঞ্চল প্লাবিত হয়। বাগদাদের ভুবন বিখ্যাত আব্বাসীয় খিলাফত এবং পারস্যের নামকরা বহু জনপদ এবং মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ অংশের শাসক খাওয়েরেজম শাহীর পতন তার হাতে হয়। সিরিয়া, মিসরসহ অন্যান্য অঞ্চলের মুসলিম শাসনও দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য, ইরান, উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্য এশিয়ায় যে সীমাহীন অস্থিরতা, রক্তারক্তি এবং লঙ্কাকাণ্ড ঘটতে থাকে তার নির্মমতার সঙ্গে পৃথিবীর ইতিহাসের কোনো কালের এবং কোনো জনপদের সঙ্গে তুলনা চলে না।

হালাকু খানকে মানব সভ্যতার বিকাশ বাধাগ্রস্তকারীদের তালিকার অন্যতম পুরোধা বিবেচনা করা হয়। তার অসভ্য শাসন এবং বর্বরতার বিরুদ্ধে অস্ত্র নিয়ে দাঁড়ানোর মতো কোনো বীর তৎকালীন দুনিয়ায় ছিল না। তার বিশাল সাম্রাজ্যে তাকে প্রকাশ্যে তো দূরের কথা মনে মনে ঘৃণা জানানোর মতো সাহসী মন খুঁজে পাওয়া ছিল রীতিমতো অসাধ্য ব্যাপার। চক্ষুষ্মান মানুষ অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাদের কান থাকা সত্ত্বেও তারা বধির হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। মানুষের আত্মা মরে গিয়েছিল এবং আবেগ অনুভূতিও উধাও হয়ে গিয়েছিল। ফলে প্রতিটি নর-নারী, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার জীবন ছিল মূলত জিন্দা লাশের মতো। ঠিক এ সময়টিতে মাওলানা রুমী তার কলম এবং বাণীর মাধ্যমে সমসাময়িক দুনিয়ার মানুষকে বেঁচে থাকার প্রেরণা জুগিয়েছিলেন। কেবল প্রেম এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দ্বারা যে হালাকু খানের মতো সন্ত্রাসীদের তাবৎ অপকর্ম-সন্ত্রাস এবং নির্মমতা রুখে দেওয়া যায় তা মাওলানা রুমী হাতেকলমে বিশ্ববাসীকে শিখিয়ে দিয়ে গেছেন।

মাওলানা রুমী প্রচারিত সুফিবাদ এবং সুখ-শান্তি অর্জনের জন্য মানবিক বোধ-বুদ্ধি এবং আত্মার শুদ্ধি অর্জনের উপায়সমূহ বলতে গেলে হুবহু অনুসরণ করার পরামর্শ দিচ্ছে আধুনিককালের বিজ্ঞান। আমি নিজে বেশ কিছুকাল ধরে রুমীর কিছু মতবাদ নিজের ব্যক্তিগত জীবনে প্রয়োগ করতে চেষ্টা করেছি। ক্ষেত্রবিশেষে সুফল পেয়েছি এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মজার মজার অভিজ্ঞতা নিয়ে ব্যর্থ হয়েছি। বিশেষ করে আত্মার প্রশান্তি এবং আমার পারিপার্শ্বিক সমাজের সঙ্গে মানিয়ে চলা নতুবা সমাজকে বিরক্ত না করে এড়িয়ে চলার সূত্রসমূহ ব্যক্তিগত জীবনে প্রয়োগের সমন্বয় করা যে কতটা দুরূহ তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো— প্রতিবার ব্যর্থ হওয়ার পর যখন পুনরায় সূত্রগুলোর দিকে তাকাই তখন মনে হয় আমিই ভুল— সূত্রগুলো নির্ভুল। আমার দুর্বল মস্তিষ্ক এবং তার চেয়েও দুর্বল বোধ-বুদ্ধি এবং প্রয়োগ করার জ্ঞানের অসীম সীমাবদ্ধতার কারণে আমি ব্যর্থ হয়ে যাই কিছু কিছু ক্ষেত্রে।

মাওলানা রুমীর মতে, পৃথিবীর তাবৎ সভ্যতার সৃষ্টি হয় মানুষের মস্তিষ্ক থেকে। সভ্যতার সৌন্দর্য বিকশিত হয় বিশুদ্ধ চিত্তের বিশালতার মাধ্যমে। অন্যদিকে সভ্যতার বিস্তার লাভ ঘটে উন্নত চরিত্র, মানবিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং কৃতজ্ঞ মনের বিনয় প্রকাশের কারণে। যেসব কারণে সভ্যতার সৃষ্টি, বিকাশ এবং বিস্তার ঘটে ঠিক সেসব কারণ অনুপস্থিতির জন্য সভ্যতার ক্ষয়, বিনাশ এবং ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়ে। এখন প্রশ্ন হলো— সভ্য হওয়ার প্রক্রিয়াটি কোথা থেকে শুরু করতে হবে? এ ব্যাপারে মাওলানা রুমীর বক্তব্য হলো— শুরুটা ব্যক্তির মন-মস্তিষ্ক এবং মননশীলতা থেকেই হতে হবে এবং তা করতে হবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে। ব্যক্তি তার একান্ত ভাবনা, পছন্দ এবং প্রবল ইচ্ছাশক্তির দ্বারা নিজেকে সভ্যতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং অসভ্যতা থেকে বেঁচে থাকার সর্বোত চেষ্টা করবে।

আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অভাববোধ, দুঃখ ও কষ্টের বিরাট একটি অধ্যায় রচিত হয় ঈর্ষাবোধ থেকে। আমাদের মস্তিষ্ক যখন কোনো ব্যক্তিকে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী অথবা উদহরণ হিসেবে দাঁড় করিয়ে বলতে আরম্ভ করে যে— তুমি লোকটির তুলনায় ভালো নেই ঠিক তখন থেকেই শুরু হয় অসুখ। ঈর্ষার আরেকটি শাখার নাম হিংসা এবং দ্বেষ। এসব রোগে আক্রান্ত মস্তিষ্ক কোনো উন্নয়নমূলক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে পারে না। মস্তিষ্কের এ রোগ ধীরে ধীরে মনকে কলুষিত করে এবং পর্যায়ক্রমে তা মানবদেহে বিস্তার লাভ করে। এ রোগে আক্রান্ত মানুষের পোশাক, খাবারদাবার, চালচলন এবং কথাবার্তা তার আশপাশের পরিবার, সমাজ, পরিবেশ এবং প্রতিবেশকে ক্রমাগত অশান্তির দিকে নিয়ে যায়, যা থেকে শুরু হয় নিত্য নতুন অসভ্যতার।

মস্তিষ্কে সভ্যতার সংকট দেখা দিলে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হয়ে যায়। সে কোনো কিছুই স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখতে পায় না— কোনো কিছু স্বাভাবিকভাবে শুনতে পারে না এবং অনেক কিছু বুঝতে পারে না। সে শত্রুকে মিত্র ভাবে এবং মিত্রকে শত্রু উপাধি দিয়ে অশান্তি সৃষ্টি করে। নিত্যনতুন ফ্যাতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি, কলহ বিবাদে জড়িয়ে পড়ার প্রবল আগ্রহ এবং সারাক্ষণ হা হুতাশ করা তার অভ্যাস হয়ে দাঁড়ায়। সে কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না— এমনকি নিজেকেও নয়। কারও মঙ্গল কিংবা উন্নতি দেখলে সে অকারণে আঁতকে ওঠে, মঙ্গলের বিরুদ্ধে অমঙ্গল এবং শান্তির বিরুদ্ধে অশান্তি সৃষ্টির প্রবল তাড়না দ্বারা চালিত হতে থাকে। আধুনিক সমাজবিজ্ঞান এটিকে স্যাডিস্ট এবং চিকিৎসাবিজ্ঞান একে হ্যালুসিনেশন রোগ বলে আখ্যা দিয়েছে।

মানব সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে মানুষের মন-মস্তিষ্ক ও দেহে যে রোগবালাই বাসা বেঁধেছে তার শতকরা ১০ ভাগও বাহ্যিক কারণে হয়নি। অর্থাৎ বাইরের রোগজীবাণু, দুর্ঘটনা, অন্য প্রাণী, পশু, কীটপতঙ্গ ইত্যাদির কারণে রোগাক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ১০ শতাংশেরও কম। অন্যদিকে শতকরা ৯০ ভাগ রোগের উত্পত্তি, বিস্তার এবং বিস্তৃতি ঘটে অসভ্য মস্তিষ্কের কারণে। অসভ্য মস্তিষ্কসম্পন্ন মানুষ নিজেকে যেমন তিলে তিলে শেষ করে দেয় তেমনি অশান্তি সৃষ্টির মাধ্যমে পারিবারিক বন্ধন ধ্বংস করে ফেলে। তারা সামাজিক বন্ধন শিথিল এবং গোত্র বা দলসমূহের মধ্যে বিবাদ বিসংবাদ সৃষ্টি করে মানব সভ্যতার চাকা পেছনের দিকে ঘুরিয়ে অসভ্যতার দিকে টানতে আরম্ভ করে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্যাণে এ যাবৎ যত ওষুধপত্র আবিষ্কার হয়েছে তার বেশির ভাগই মন ও মস্তিষ্কের ওষুধ। এ যাবৎ যত থেরাপি আবিষ্কার হয়েছে তার বেশির ভাগই শরীরের পরিবর্তে মন-মস্তিষ্কের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয়। শরীর বিজ্ঞানের চেয়ে মনোবিজ্ঞানের ব্যাপ্তি অনেক অনেক গুণ বেশি। শারীরিক চিকিৎসালয়ের তুলনায় মানসিক চিকিৎসালয়ের সংখ্যা কয়েক হাজার গুণ বেশি। পৃথিবীর তাবৎ হাসপাতাল, নার্সিংহোম এবং ডাক্তারদের চেম্বারের তুলনায় সাধু-সন্ন্যাসীর আশ্রম, পীর-দরবেশদের খানকা, মাজার, মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা এবং তীর্থ কেন্দ্রে মানুষের আনাগোনা কয়েকগুণ বেশি। মানুষ শরীরের জন্য যা খরচ করে তার চেয়েও লাখ লাখ গুণ বেশি খরচ করে মনের জন্য। মানুষ বনের হিংস্র প্রাণী, বিষধর কীটপতঙ্গ এবং সরীসৃপকে যতটা না ভয় পায় তার চেয়েও বেশি ভয় পায় উন্মাদ এবং ঔদ্ধত্য অত্যাচারীকে।

অসভ্য মন-মস্তিষ্ক এবং অসুস্থ দেহের চিকিৎসার জন্য সেই আদিকাল থেকেই বিজ্ঞানীদের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। যাবতীয় ওষুধপত্রের কাঁচামাল তৈরি হয় গাছপালা, লতা, গুল্ম, মাটি, প্রাণী, পশুপাখি, কীট-পতঙ্গের শরীর অথবা শরীর নিসৃত বর্জ্য থেকে। এসব কারণে সভ্য মন-মস্তিষ্ক সব সময়ই প্রকৃতির সব সৃষ্টির প্রতি যথাযোগ্য সম্মান এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। নিজেদের অজ্ঞতার কারণে আমরা কিছু প্রাণীকে ভয় পাই এবং সুযোগ পেলেই মেরে ফেলি। অথচ মানুষের টিকে থাকার জন্য ওসব প্রাণী যে কতটা দরকারি তা ভাবলে শ্রদ্ধা-কৃতজ্ঞতা এবং ভালোবাসায় মানুষের অন্তর পূর্ণতা লাভ করে। উদাহরণ হিসেবে আমি বিষধর সাপ সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু বলে আজকের প্রসঙ্গে ফিরে যাব।

সাপের শরীরের বিষের ৯৯ ভাগ ব্যবহৃত হয় তাদের হজম শক্তির জন্য। বাকি একভাগ প্রতিরক্ষার জন্য। সাপের বিষ দ্বারা মানুষের দেহ-মন ও মস্তিষ্কের অসুখের জন্য যে দুর্লভ ওষুধসমূহ তৈরি হয় তা অন্য কোনো প্রাণী থেকে পাওয়া সম্ভব নয়। কাজেই সাপকে শত্রু মনে করার মতো নির্বুদ্ধিতা সভ্য মস্তিষ্ক প্রদর্শন করে না। ঠিক একই রূপে ঘোড়া ও গাধার উপকারিতা এবং মানব সভ্যতার বিকাশে প্রাণীগুলোর অবদান জানলে কেউ ভুলেও ওসব নাম নিয়ে কাউকে গালি দিত না— অন্যদিকে গালি খাওয়া মানুষগুলোর বুদ্ধিসুদ্ধির সভ্যতা শঙ্কিত পর্যায়ে থাকলে তারাও অপমানিতবোধ করে ক্রোধান্ধ হতো না। বর্তমানকালের চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নয়ন এবং হাজারও মরণব্যাধির প্রতিষেধক আবিষ্কার এবং সফল অস্ত্রোপচারের দক্ষতা অর্জনের জন্য চিকিৎসাশাস্ত্রের জনক জননীবৃন্দ তিনটি প্রাণীর প্রতি সর্বদা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং সেগুলোকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখেন। প্রাণী তিনটি হলো— ইঁদুর, বানর এবং ব্যাঙ।

ইঁদুর সম্পর্কে যারা খুব বেশি ওয়াকিবহাল নন তাদের জ্ঞাতার্থে প্রাণীটি সম্পর্কে কিছু তথ্য পেশ করতে চাচ্ছি। এরা নিজেদের মধ্যে কোনো দিন ঝগড়া বিবাদ করে না— অন্য কোনো প্রাণীদের সঙ্গে গণ্ডগোল, মারামারি কিংবা যুদ্ধ করে না। প্রকৃতির সব প্রাণীর মধ্যে ইঁদুরের সহনশীলতা এবং পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে চলার ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি। ইঁদুরের মতো শক্তিশালী চোয়াল, দাঁত এবং মুখের ক্ষমতা অন্য কারও নেই। ইঁদুরের হৃদযন্ত্রের স্পন্দন, হজম করার ক্ষমতা এবং রেচনতন্ত্রের কার্যক্ষমতা সবচেয়ে বেশি। তাদের পেট খারাপ, বদহজম এবং পাতলা পায়খানা হয় না। ইঁদুরের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস এবং মলমূত্রের দুর্গন্ধ সব প্রাণীর চেয়ে কম। ইঁদুরের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অসীম, দুঃখ-কষ্ট-বেদনা এবং প্রতিকূল আবহাওয়া সহ্য করার ক্ষমতা অসাধারণ। ইঁদুরের মন অন্য প্রাণীর প্রতি শত্রু ভাবাপন্ন নয় আর তাদের মস্তিষ্কের চিন্তাশক্তি সীমা অতিক্রম করে না। ইঁদুরেরা নির্দিষ্ট স্থানে পরিবারভুক্ত অথবা দলভুক্ত হয়ে থাকতে পছন্দ করে এবং যাযাবরের মতো জীবনযাপন একদম পছন্দ করে না। এতসব গুণাবলির জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞান সব সময় ইুঁদরকে তাদের গবেষণা কর্মে সর্বাধিক প্রাধান্য দিয়ে আসছে।

ইঁদুরের আত্মমর্যাদা, মান-সম্মান এবং লজ্জা শরমের মাত্রাও অন্য প্রাণীদের থেকে আলাদা। তারা রাগ করে না, অভিমান করে না। কিন্তু অতিরিক্ত লজ্জা-শরমের কারণে প্রকাশ্যে চলাফেরাও করে না। মলত্যাগ এবং দৈহিক মিলনের ক্ষেত্রে তারা সর্বোত্তম শালীনতা ও গোপনীয়তা বজায় রাখে। ইঁদুরের যৌন মিলন প্রত্যক্ষ করেছে এমন কোনো মানুষ কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণাগার ছাড়া অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না। আগেই বলেছি যে, ইঁদুর কাউকে আক্রমণ করে না। তবে তার আত্মমর্যাদা ও মান-সম্মানের একটি স্থানে আঘাত এলে সে কাউকে ছাড়ে না। এ ব্যাপারে তথ্য পেশের আগে জ্ঞানার্জনের মাহাত্ম্য এবং জ্ঞানী ব্যক্তির সম্মান সম্পর্কে সংক্ষেপে একটি ঘটনা বলতে চাই। যাদের মনমানসিকতা হীরক রাজার মতো, অর্থাৎ জানার কোনো শেষ নেই, জানার চেষ্টা বৃথা এ তথ্যে বিশ্বাসী তাদের প্রতি অনুরোধ তারা যেন নিবন্ধের বাকি অংশটুকু না পড়েন। অন্যদিকে যারা হজরত ইমাম আবু হানিফার মতো জ্ঞান অন্বেষণকারী তারা নিশ্চয়ই পরবর্তী অংশের মধ্যে ভিন্নতর স্বাদ, রূপ ও রসের সন্ধান পাবেন।

ইমাম আবু হানিফা (র.)-কে প্রশ্ন করা হলো— কুকুর শাবকের সাবালকত্ব প্রাপ্তির নমুনা বা চিহ্ন কি? আবু হানিফা বিষয়টি জানতেন না। তিনি পাগলের মতো কয়েক বছর ঘুরে অবশেষে এক মুচির কাছ থেকে বিষয়টি জানলেন। মৃত্যুর আগে ইমাম আবু হানিফা তার ভক্তকুলকে অছিয়ত করে গেলেন যে, তার যুব্বাটি যেন তার শিক্ষক মুচিকে সসম্মানে পৌঁছে দেওয়া হয়। কুকুর-শাবকের সাবালকত্বের নমুনার তথ্যটি জানার জন্য বছরের পর বছর ঘুরে বেড়ানো এবং একজন মুচিকে শিক্ষক হিসেবে সম্মান জানানোর মতো বিশাল হৃদয়, বিনয়ী মন এবং উন্নত মস্তিষ্কের কারণে ইমাম আবু হানিফা তামাম দুনিয়ার মানুষের মাথার তাজ হিসেবে সম্মানিত হয়ে আছেন এবং কেয়ামত পর্যন্ত থাকবেন ইনশা আল্লাহ!

আমরা আজকের নিবন্ধের একদম শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। কুকুরের সাবালকত্বের নমুনা, ইঁদুরের আত্মমর্যাদা এবং মান-সম্মানের স্পর্শকাতরতার বিষয়টি বলে আজকের প্রসঙ্গ শেষ করব। কুকুর-শাবক যখন তিন পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে এক পা উঁচু করে জলবিয়োগ আরম্ভ করে ঠিক তখন থেকে তার সাবালকত্ব শুরু হয়। অন্যদিকে কেউ যদি ইঁদুরের লেজটি ধরে টান মারে এবং উঁচু করে তুলে ধরার চেষ্টা করে তবে সে ভীষণ অসম্মানিতবোধ করে এবং ক্রোধান্বিত হয়ে সর্বশক্তি দিয়ে লেজ ধরে টান মারা প্রাণীটিকে আক্রমণ করে থাকে।  উল্লিখিত দুটো ঘটনার কার্যকারণ এবং নেপথ্যের গুপ্ত কথা নিয়ে পরবর্তী কোনো সময়ে সুযোগ হলে বিস্তারিত আলোচনার চেষ্টা করব।

লেখক : কলামিস্ট।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow