Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০৭
চীনা রাষ্ট্রপতির ঢাকা সফর এবং বাংলাদেশ-চীন মৈত্রীর বন্ধন
হাসান তারিক চৌধুরী
চীনা রাষ্ট্রপতির ঢাকা সফর এবং বাংলাদেশ-চীন মৈত্রীর বন্ধন

চীনের মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করেছে। চীন এবং বাংলাদেশের রয়েছে হাজার বছরের ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক।

১০৪০ সালে এই বাংলাদেশেরই জ্ঞান তাপস অতীশ দীপঙ্কর মাত্র ৩৫ জন সঙ্গী নিয়ে জ্ঞান বিস্তারের কাজে চীনের দুর্গম অঞ্চল তিব্বত সফর করেন। তার দুঃসাহসিক অভিযানের গুণ গেয়ে কবি লিখেছিলেন— ‘বাঙ্গালী অতীশ লঙ্ঘিল গিরি তুষারে ভয়ঙ্কর, জ্বালিল জ্ঞানের প্রদীপ্ত তিব্বতে বাঙ্গালী দীপঙ্কর। ’ তখন থেকেই চীনের সঙ্গে বাংলার এক মেলবন্ধন রচিত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় চীনা রাষ্ট্রপতির এ সফর ঐতিহাসিক এবং নানা বিবেচনায় বিরাট তাত্পর্য বহন করে। জাতীয়-আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমসমূহ, কূটনৈতিক মহল এবং বিশ্লেষকদের মতে, ‘এ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী ও সহযোগিতার এক নবদিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে’। শি জিনপিং হলেন দ্বিতীয় চীনা রাষ্ট্রপতি যিনি বাংলাদেশ সফর করলেন। এর আগে ১৯৮৬ সালে চীনা রাষ্ট্রপতি লি জিয়াননিয়ান বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। ৩০ বছরের ব্যবধানে এ ধরনের উচ্চ পর্যায়ের সফর দুদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে এক নতুন মাত্রায় উন্নীত করেছে। যার ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশ আত্মনির্ভরশীলতা ও উন্নয়নের পথে অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারে।

এ কথা দল-মত- নির্বিশেষে সবাই স্বীকার করেন যে, আজকের দুনিয়ায় চীন এক অপার বিস্ময়। চীনের অর্থনীতিকে প্রশংসা করে বলা হয়, মিরাকল ইকোনমি বা চমকপ্রদ অর্থনীতি। আর চীনকে বলা হয় ‘অর্থনৈতিক পরাশক্তি’। চীনের উৎপাদিকা শক্তির এবং জাতীয় অর্থনীতির বিস্ময়কর সাফল্যের কারণেই এসব কথা বলা হয়ে থাকে। ১৯৪৯ সালে চীনের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবই দেশটিকে আজ এ সাফল্যের জায়গায় নিয়ে গেছে। যে সাফল্যের ধারা আজও অব্যাহত রয়েছে। চীনের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নতি সেই প্রাচীনকাল থেকে অদ্যাবধি এক মহা-বিস্ময়। সুতরাং কমিউনিস্ট চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের গ্রহণ করার জায়গা অনেক বিস্তৃত এবং ব্যাপক। রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের এ সফর এ গ্রহণ করার জায়গাটিকে অনেকদূর সম্প্রসারিত করেছে। যে প্রক্রিয়া চলমান রাখা একটি দেশপ্রেমিক কর্তব্য। চীন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পর্ক সবসময়ই একটি ইতিবাচক গতিধারায় ধাবিত হয়েছে। বাংলাদেশ আজ দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। চীন ইতিমধ্যেই ৮৪টি বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ট্যারিফ বাধা অপসারণ করেছে। চীনা রাষ্ট্রপতির এ সফরে বাংলাদেশের সঙ্গে ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ মূল্যের ঋণচুক্তি সম্পাদন হওয়ার কথা। এ ঋণচুক্তির আওতায় বাংলাদেশের সড়ক ও রেল যোগাযোগ, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি ও জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নবিষয়ক মোট ২১টি প্রকল্প পরিচালিত হবে। এর মধ্যে পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ খাতে ২.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইন খাতে ৩.০৩ বিলিয়ন, ঢাকা- আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে খাতে ১.৩৯ বিলিয়ন, সীতাকুণ্ড-কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ এক্সপ্রেসওয়ে এবং উপকূলীয় বেষ্টনী রক্ষা খাতে ২.৮৫ বিলিয়ন এবং ঢাকা-সিলেট হাইওয়ে খাতে ১.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ ব্যয় করা হবে বলে জানানো হয়েছে। ফলে চীনের তরফ থেকে এ উন্নয়ন সহযোগিতা বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণে বিরাট ভূমিকা রাখবে। চীনা সহযোগিতার সঙ্গে পশ্চিমা অনুদানের এক মৌলিক ব্যবধান রয়েছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ কিংবা বিভিন্ন পশ্চিমা দাতারা যখন বাংলাদেশকে ঋণ বা আর্থিক সহযোগিতা দেয় তখন তাদের দেওয়া শর্ত, কনসালট্যান্টদের খরচ কিংবা সহযোগী বাণিজ্যিক সংস্থাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের খরচ গোটা প্রকল্পকেই গিলে ফেলে। বাংলাদেশের ঋণমুক্তি আর হয় না।   সে ঋণদাসত্বকে কাজে লাগিয়ে তারা বাংলাদেশের ওপর তার লুণ্ঠন অব্যাহত রাখে। পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের ঋণ সাহায্য নিয়ে কেলেঙ্কারির ঘটনা  উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। সে কারণে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের এ মৈত্রী ও সহযোগিতার সম্পর্ক জোরদার হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা উদ্বিগ্ন। ২০১৪ সালের জুন মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেইজিং সফরের সময় রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং বাংলাদেশকে তাদের কৌশলগত অংশীদার বলে উল্লেখও করেছেন। এতে পশ্চিমাদের উদ্বেগ আরও বেড়ে গেছে। শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, বাংলাদেশের সামরিক ক্ষেত্রেও চীনা সহযোগিতার কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চীনা ট্যাঙ্ক, ফাইটার জেট, মিসাইল, সাবমেরিনও অন্যান্য সমরাস্ত্র বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সমৃদ্ধ করেছে। চীন যেমন বাংলাদেশের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশও তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেয়নি। বাংলাদেশ বরাবরই ‘এক চীন নীতি’কে সমর্থন দিয়ে এসেছে। রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং ঘোষিত বহুল আলোচিত ‘একুশ শতকের ম্যারিটাইম সিল্ক রুট’কে স্বাগত জানিয়েছে। চীন থেকে শুরু হয়ে বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের ভিতর দিয়ে এ রাস্তা আফ্রিকায় গিয়ে শেষ হবে। এ যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হলে পশ্চিমাদের বাণিজ্য আধিপত্যের বিপরীতে এক বিকল্প আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। যা থেকে এশিয়ার দেশগুলো বেশ লাভবান হবে।

লেখক : সম্পাদক, বিশ্ব গণতান্ত্রিক আইনজীবী পরিষদ।

ই-মেইল : htarique@gmail.com

এই পাতার আরো খবর
up-arrow