Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৭ অক্টোবর, ২০১৬ ২২:৫৬
মহামান্য অতিথি শি জিনপিং
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম
মহামান্য অতিথি শি জিনপিং

পাঠকদের কথা দিয়েছিলাম বীর মুক্তিযোদ্ধা মোয়াজ্জেম খানকে নিয়ে লিখব কিন্তু মহাচীনের মহামান্য রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফর জাতীয় স্বার্থ ও সময়ের বিবর্তনের এক সর্বোত্তম নিদর্শন। জননেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফল নেতৃত্বের এ এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর।

পারস্পরিক বোঝাপড়া ও বন্ধুত্বের এক নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে ভাবীকালে বিবেচিত হবে মহাচীনের মহামান্য রাষ্ট্রপতির এ সফর। বাংলাদেশ যেমন অধীর আগ্রহে মহাচীনের মহান নেতার সফরের অপেক্ষায় ছিল তেমনই চীনের নেতা এবং তার প্রতিনিধিদের কথাবার্তা, চলাফেরা, আচার-আচরণে দেখা গেছে তারাও এ সফরের মাধ্যমে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য কম ব্যাকুল ছিলেন না। তাই এ সফর নিয়ে কিছু না লেখা একটা ঐতিহাসিক ঘটনাকে জেনেশুনে আড়াল করা। সেটা করা কোনোক্রমেই উচিত নয়। আর এমন ঐতিহাসিক ঘটনা প্রতিদিন সকাল-বিকাল ঘটে না।

স্বাধীনতার পর মহান ভারতের মহান নেত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর বাংলাদেশ সফরে যে সাড়া পড়েছিল, তেমন আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছিল মহাচীনের মহান নেতার আগমনে। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর আগমনে সারা দেশে, গ্রাম-গঞ্জে, খেত-খামারে, গাছপালা, লতাপাতায় দোল লেগেছিল। বিজ্ঞানের উন্নতি ও আধুনিকতার কারণে শি জিনপিংয়ের সফর গ্রাম-গঞ্জে অতটা দোলা দেয়নি। গ্রাম-গঞ্জের ৮০-৯০ লাখ প্রবাসীর স্ত্রী, পুত্র-কন্যা ও অন্যরা এখন কিরণমালা, ইন্টারনেট, ফেসবুক ও মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। তাদের দিন-দুনিয়ার খবর রাখার সময় কোথায়? তবে কমবেশি দেশ ও জাতি সম্পর্কে যারা ভাবে তাদের মধ্যে মহাচীনের মহামান্য রাষ্ট্রপতির সফর যথেষ্ট শুভ সাড়া জাগিয়েছিল। এটা সত্যি সত্যিই জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের এক অসাধারণ সাফল্য।

একেই বলে সময়ের দাবি, দেশের স্বার্থ। মহাচীনের মহামান্য রাষ্ট্রপতি আমাদের দেশের সীমানায় প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে বিমানবাহিনীর কয়েকটি যুদ্ধবিমান তাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে আসে। কী অসাধারণ সম্মান দেখানো হয়। অথচ আমাদের জন্মের সময় এই মহাচীন ছিল পাকিস্তান হানাদারদের সারথি। এমনকি বাংলাদেশের জন্ম বা অভ্যুদয় তারা মেনে নেয়নি। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যা পর্যন্ত মহাচীন আমাদের স্বীকৃতি দেয়নি। অথচ আজ সেই চীন কত প্রিয়, কত আপন! এটাই সময়ের দাবি, নিয়তির বিধান। মুক্তিযুদ্ধে ভারত ছিল আমাদের প্রথম এবং প্রধান বন্ধু, আশ্রয়দাতা, সাহায্যকারী। চীন ছিল শত্রুর প্রধান সাহায্যকারী। কিন্তু আজ বন্ধুত্ব, সহযোগিতা, সহমর্মিতা পেতে আমরা উভয় দেশ কত ব্যাকুল। এটাই রাজনৈতিক কূটনীতি সর্বোপরি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বাস্তবতা। মহাচীনের মহান নেতাকে বাংলাদেশ যেভাবে লালন করেছে, ধারণ করেছে এটাই শাশ্বত রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান। সে ক্ষেত্রে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব এবং তার সরকারের অসাধারণ সফলতার স্বাক্ষর। বহির্বিশ্বের মতো দেশের অভ্যন্তরেও যদি অমন রাজনৈতিক-সামাজিক সফলতা আসত তাহলে সেটা হতো তার আর এক অসাধারণ সাফল্য।

স্বাধীনতার পরপর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ইসলামী সম্মেলনে যোগদান করে অনেকের গোসার কারণ হয়েছিলেন। চীনের সঙ্গে গভীর ও নিবিড় সম্পর্ক গড়তে গিয়ে আমরা না আবার কোন বিপদে পড়ি। যত কথাই বলি ছোট দেশ হিসেবে আমরা কতটা স্বাধীন, নিজের মতো করে কতটা চলতে বা বলতে পারি। একটা সীমারেখা তো নিশ্চয়ই রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভুল হলে বা করলে কত ক্ষতি হবে বা হতে পারে অনেকের ধারণারও অতীত। বর্তমানের চীন সারা বিশ্বে এক উল্লেখযোগ্য শক্তি। সে কারণে মহাচীনকে বিবেচনায় রাখতেই হবে। দুই-তিন শ’ বছর আগের আফিম খেয়ে ঘুমিয়ে থাকা চীনকে ভাবলে চলবে না। এখন চনমনে সর্বক্ষেত্রে অগ্রসরমান চীনের কথা ভাবতে হবে। মহাচীনের মহামান্য রাষ্ট্রপতির এ সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-চীনের মধ্যে আস্থা, সম্মান, নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের এক সেতুবন্ধ রচনা হবে। এটাই আপামর দেশবাসীর প্রত্যাশা বা কামনা। উপরন্তু পদ্মা সেতু নিয়ে অত টানাহেঁচড়ার পরও সাত বছরের মাথায় মহাচীনের মহামান্য রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং যেতে না যেতেই বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন দেখতে আসা আমাদের জন্য আর এক রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় মর্যাদার প্রতিফলন ও ঐতিহাসিক সাফল্য।

 

 

আমার জানাজায় যাদের শরিক হওয়ার কথা তাদের অনেকের জানাজায় শরিক হলাম। আরও কত শরিক হব বা হতে পারব তা দয়ালু প্রভুই জানেন। টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী স্কুল মাঠে কদিন আগে আলী আজগর খান দাউদের জানাজায় গিয়েছিলাম। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিন্দুবাসিনীর ছাত্র। তারাপদ রায়, সাবেক রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, ডা. আলীম আল রাজী— কতজন এই বিন্দুবাসিনীতে পড়েছেন। বাংলাদেশে ভারতের প্রথম রাষ্ট্রদূত সুবিমল দত্ত ছিলেন বিন্দুবাসিনীর ছাত্র। প্রখ্যাত রাজনীতিক শ্রী জ্যোতি বসুর স্ত্রী কমলা বসু বিন্দুবাসিনী গার্লস স্কুলে পড়তেন। সেদিক থেকে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্য তুলনাহীন। পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু টাঙ্গাইলে যে রেস্ট হাউসে উঠেছিলেন তা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানে পৌরভবন করা হয়েছে। যে জায়গায় শেরেবাংলা, মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধুর পদধূলি পড়েছিল, সে জায়গা এখন নিশ্চিহ্ন। কারণ আমরা কোনো স্মৃতি বা ঐতিহ্য রাখতে জানি না। তিন-চার শ’ বছরের পুরনো টাঙ্গাইল জামে মসজিদ শুধু ব্যবসার জন্য এক রাজাকার ভেঙে চুরমার করে ফেলেছে। যেহেতু সে সরকারি দলে, তাই তার রাজাকার হওয়ায় কোনো দোষ নেই। বিন্দুবাসিনীর অবস্থাও তথৈবচ। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে টাঙ্গাইল ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক দাউদ খান হুজুর মওলানা ভাসানীর উপস্থিতিতে সভাপতিত্ব করতে গিয়ে গোলমাল থামাতে ‘খামোশ’ বলে হুঙ্কার ছেড়ে খোদ হুজুর মওলানা ভাসানীকেই তাজ্জব করে দিয়েছিলেন। ১৯৭১-এর ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে আমরা পতাকা দিবস পালন করেছিলাম। সারা দেশে লাখ লাখ বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। আমরাও বিন্দুবাসিনী স্কুল মাঠে এক বিরাট সভা করে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পতাকা তুলেছিলাম। সেই সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক আলমগীর খান মেনু। আমি পরিচালনা করেছিলাম। লতিফ সিদ্দিকী তার জীবনের শ্রেষ্ঠ আবেগময়ী এক শপথবাক্য পাঠ করিয়েছিলেন। এই বিন্দুবাসিনী মাঠেই বাংলাদেশের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পায়ের কাছে ২৪ জানুয়ারি, ১৯৭২ কাদেরিয়া বাহিনীর অস্ত্র বিছিয়ে দিয়েছিলাম। এই মাঠে স্বাধীনতার পর আমাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। যার সভাপতি ছিলেন জনাব আবদুস সামাদ উকিল। জনাব আবদুস সামাদ উকিলের ছেলে খন্দকার আসাদুজ্জামন স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী সরকারের অর্থসচিব ছিলেন। তার বাবা শান্তি কমিটির সদস্য সামাদ উকিল ছিলেন সেই সংবর্ধনার সভাপতি। ফজলুর রহমান খান ফারুকের চাচা আবদুল জলিল মিয়া শান্তি কমিটির সদস্য। অধ্যাপক খলিলুর রহমান শান্তি কমিটির সদস্য। টাঙ্গাইল শান্তি কমিটিতে যেমন হেকিম হবিবুর রহমান, গোপালপুরের অধ্যাপক আবদুল খালেক, বিজু মিয়া, মির্জাপুরের আবদুল অদুদ মওলানা, ধলাপাড়ার শওকত ভূঁইয়া, এমদাদ দারোগাদের মতো কসাইরা ছিল, তেমনি সামাদ উকিল, জলিল মিয়া, অধ্যাপক খলিলুর রহমানের মতো সোনার মানুষরাও ছিলেন। আমরা সেদিন সেটা বিবেচনা করেছি। কিন্তু আজ সে সবের মূল্যায়ন নেই। বিন্দুবাসিনী স্কুল মাঠ দালানকোঠায় ঢাকা পড়ে তার ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলছে। সেই মাঠেই জননেতা আবদুল মান্নানের জানাজা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা অবিস্মরণীয়। ভুল-ত্রুটি যাই থাকুক মানুষের জন্য তার ত্যাগের তুলনা হয় না। জনাব শামসুর রহমান খান একই উচ্চতার মানুষ। শওকত আলী তালুকদারকে বাদ দিয়ে আমাদের সময় টাঙ্গাইলের ছাত্র রাজনীতি, শ্রমিক রাজনীতি ভাবা যায় না। আজ তাদের নিয়ে কোনো কথা নেই। এমনকি তাদের মৃত্যুবার্ষিকী পর্যন্ত পালন করা হয় না। এখন সবই ‘ওই নূতনের কেতন উড়ে, তোরা সব জয়ধ্বনি কর’, নিয়ে ব্যস্ত।

বিন্দুবাসিনী স্কুল মাঠে মোয়াজ্জেম হোসেনের জানাজায় শরিক হয়ে বড় ব্যথা পেয়েছি। কত আর হবে তিন-চার শ’। যেখানে জানাজায় চল্লিশ হাজার অথবা চার লাখ লোক হলেও মোয়াজ্জেম হোসেনের ত্যাগের সঠিক মূল্যায়ন হতো না। সেখানে কেন তিন-চার শ’? কারণ মুক্তিযোদ্ধাদের সমাজ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। তাদের জনসম্পৃক্ততা নেই বললেই চলে। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা পরলোকে গেছেন। বিন্দুবাসিনীতে জানাজা হবে কেউ বলেনি। মাইকিং হয়নি। আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা-কর্মী ছাড়া কেউ ছিল না। আমি গিয়েছিলাম নাড়ির টানে। আওয়ামী লীগের সরকার। তাদের জয়জয়কার। মুজিবকোট ছিল আমার আর প্রবীণ নেতা জনাব ফজলুর রহমান খান ফারুকের গায়ে। জনাব ফজলুর রহমান একজন পোড় খাওয়া মানুষ। মুক্তিযুদ্ধে তার পরিবার-পরিজনকে যতটা পেরেছি সাহায্য করেছি। তাকে সব সময় সম্মান করেছি, এখনো করি। প্রবীণ মানুষ হিসেবে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও আমাকে যতটা সম্ভব সম্মান করেন। মোয়াজ্জেম খানের জানাজায়ও করেছেন। আমার মতামত চেয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গার্ড অব অনার এখানে হবে নাকি ঘাটাইলে? তোমার মত কী? বলেছিলাম যেহেতু ঘাটাইলে জানাজা হবে সেহেতু সেখানে হলেই ভালো। প্রশাসন তার সুবিধামতো গার্ড অব অনারের ব্যবস্থা করে। মূলত গার্ড অব অনার হওয়া উচিত কবরে নামানোর আগে কবরের কাছাকাছি। জানাজা উদ্দেশ্য করে নয়।

টাঙ্গাইলে জানাজায় যেমন নামাজির অভাব ছিল আবহাওয়া খারাপ থাকার পরও ঘাটাইলে তেমন ছিল না। প্রচুর লোক হয়েছিল। আসরের পরে রতনপুর মসজিদের পাশে পারিবারিক গোরস্থানে যখন দাফন করা হয় তখন সেখানে ছিলাম। কবরে মাটি দেওয়ার বড় ইচ্ছা ছিল। তাই গিয়েছিলাম রতনপুর। তিন মুঠো মাটি দিয়ে অনেকটা শান্ত হয়েছিলাম। পাশে ছিল বীরপ্রতীক হাবিবুর রহমান, আবুল মল্লিক, হাসমত নেতা, আবদুল হাই, বাবুল সিদ্দিকী ও অন্যরা। কয়েক বছর আগে তার কচুক্ষেতের বাড়ি গিয়েছিলাম। তার স্ত্রী নাহারের রান্না অনেকটাই আমার মায়ের মতো। সুসন্তান তার বাপ-মাকে যেমন আদর-যত্ন করে মোয়াজ্জেম খানের স্ত্রী আমাকে তেমন করে। নাহার প্রখ্যাত নাট্যকার, অভিনেতা মামুনুর রশীদ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কামরুলের বোন। কামরুলকে স্বাধীনতার আগে দেখিনি। রতনপুরে কবর দিতে গিয়ে কত স্মৃতি মনে পড়ছিল। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে মোয়াজ্জেম খানের বাড়ির পাশে ফারুকদের বাড়িতে এক রাত ছিলাম। ফারুকের চাচা রুনু এক অসাধারণ মানুষ। তার স্ত্রী ঘাটাইল গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। ১০ ডিসেম্বর, ১৯৭১ ঘাটাইল থানা দখলে মোয়াজ্জেম খানের বাড়ির দক্ষিণে ফারুকদের বাড়ির পশ্চিমে থ্রি-ইঞ্চি মর্টার বসানো হয়েছিল। কমান্ডার আবদুল হাকিম বীরপ্রতীক বড় নিখুঁত নিশানায় সেদিন মর্টার ফায়ার করেছিল, যাতে ঘাটাইল থানার টিনের ঘর তছনছ হয়ে গিয়েছিল।

মোয়াজ্জেম খানের কবরে মাটি দিয়ে স্মৃতির পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে টাঙ্গাইল ফিরছিলাম। থানার পশ্চিমে মাতবর খাঁর বাড়ি। বহুদিন পর হঠাৎ তার সঙ্গে দেখা। এস. আকবর খান ফুরারের বাবা মাতবর খান এক বিচিত্র মানুষ। আমার থেকে ১৫-২০ বছরের বড়। স্বাধীনতার পর থেকে আমায় বাবা বলে ডাকে। আমিও তাকে সন্তান জ্ঞান করে তুমি বলে ডাকি। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে আমি যখন ঘর থেকে এক কাপড়ে বেরিয়ে যাই, একদিন হঠাৎই সে খবর পায় আমাকে মিলিটারিরা বন্দী করেছে। মাঠে কাজ করার সময় খবর পেয়ে পাগলের মতো ছুটে গিয়ে গোয়ালে বাঁধা দুটি ষাঁড় ছেড়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠে, ‘হে আমার আল্লাহ, হে আমার প্রভু, আমি এই যে আমার দুই ষাঁড় মুক্ত করে দিলাম। তুমি আমার বাবা কাদের সিদ্দিকীকে হেফাজত কর, মুক্ত করে দাও। ’ তার যেন কোনো বিপদ না হয়। কত বড় মানুষ এরা। কত বড় হৃদয় তাদের। সমুদ্রের বিশালতা দিয়েও পরিমাপ করা যাবে না। যখন যেখানে দেখে তখন সেখানেই পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে। প্রথম আমার দ্বিধা হতো, অস্বস্তি বোধ করতাম। কিন্তু তার ভালোবাসা, শ্রদ্ধা বহু বছর আগে আমার সেই দ্বিধা কাটিয়ে দিয়েছে। মাতবর খাঁর ছেলে আকবরও পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে। মনে হয় সব সময় নয়, সুবিধা-অসুবিধা, আলো-অন্ধকার বিবেচনা করেই হয়তো করে। কিন্তু মাতবর খাঁ সব সময় অন্তরাত্মা দিয়ে পিতার মতো মনে করে।

ঘাটাইল থেকে ফেরার পথে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিলাম, আল্লাহ যেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোয়াজ্জেম হোসেন খানকে ক্ষমা করে বেহেশতবাসী করেন। তার পরিবার-পরিজনকে শোক সইবার শক্তি দেন। আমিন...।

লেখক : রাজনীতিক।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow